বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"মৃত্যুপথ"
নাজিম-উদ-দৌলা
----------------
(৫ম ও শেষ পর্ব)
"আ ফাইনাল কাউন্টডাউন"
অন্ধকার করিডোর ধরে ছোট ছোট পদক্ষেপে হেঁটে আসছে মৃত্যুপথ খেলার সপ্তম আসরের বিজয়ী মাহতাব চৌধুরী। করিডোরের শেষ মাথায় একটা উজ্জ্বল লাল রঙের বাতি জ্বলছে। তার অদ্ভুত আলোয় যেন কোন প্রাগৈতিহাসিক দুয়ারের অবয়ব অস্পষ্টভাবে দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। মাহতাব দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নবে হাত রেখে সামান্য মোচর দিতেই কোনরূপ ক্যাচ ক্যাচ প্রতিবাদ ধ্বনি ছাড়াই দরজা খুলে গেল।
খুব সাধারণ একটা অফিস রুম। দুইটা বড় সাইজের সোফা, একটা সাধারণ মানের ডেক্স, তার আশে পাশে কয়েকটি চেয়ার, মেঝেতে কার্পেট, দেয়ালে দুটো ক্যালেন্ডার আর দেয়াল ঘড়ি- এইতো!
“স্বাগতম মাহতাব! সপ্তম মৃত্যুপথ খেলায় বিজয়ী হওয়ায় মৃত্যুপথ পরিচালক আপনাকে জানাচ্ছে অভিনন্দন”।
কথা গুলো যিনি বললেন তিনি ডেক্সের পিছনের বসে চোখে মুখে মিটি হাসছেন। সত্যি কথা বলতে কি মৃত্যুপথ পরিচালককে দেখে মাহতাব এক প্রকার হতাশই হল। ছোট খাট গড়নের একজন মানুষ, উচ্চতায় তার চেয়ে এক ফুট কম, বয়সে কিছু বেশি হবে, আর খুব সাধারণ হাসি খুশি চেহারার অধিকারী। মাহতাব ভেবেছিল মৃত্যুপথ পরিচালক হবে দশাসই চেহারা আর বিরাট ব্যায়ামবীরদের মত স্বাস্থ্যের অধিকারী।
“তারপর বলুন মিস্টার মাহতাব! কেমন লাগছে এই খেলায় জিততে পেরে?”
“আপনার কি মনে হয়? চারটি খুন করেছি আমি! চারজন মানুষের জীবন মৃত্যুর সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি। এটা কি খুব আনন্দ পাওয়ার মত ব্যাপার?”
কথাটা সত্যি বলেনি মাহতাব। প্রথম খুনটা করার সময় প্রচুর বিবেকের দংশন উপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু শেষ দুটি খুন করার দৃশ্যগুলো তার কাছে খুব উপভোগ্য ছিল। পশুতুল্য কিছু অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে পারার মধ্যে আনন্দ আছে বই কি!
মৃত্যুদূত বলছে, “তা অবশ্য ঠিক বলেছেন মাহতাব। ব্যাপারটা আসলে দুঃখজনক। কিন্তু তাদের এই শাস্তি প্রাপ্য ছিল”।
“এবার আমাকে মুক্তি দিন”।
“হা হা হা হা.....”! আবারো মৃত্যুদূতের সেই অট্টহাসি! এই হাসি শুনেই মাহতাবের ধারনা হয়েছিল মৃত্যুদূত দেখতে হবে খুব ভয়ংকর।
“হাসছেন কেন?”
“মুক্তি আপনি পাবেন মাহতাব। তবে তার আগে খেলায় বিজয়ী হওয়ায় পুরস্কার তো আপনাকে নিতে হবে?”
“কি পুরস্কার?”
“পুরস্কার স্বরূপ আপনি হবেন পরবর্তী মৃত্যুপথ খেলার পরিচালক অর্থাৎ মৃত্যুপথ সিজন এইট চলবে আপনার তত্ত্বাবধানে। তবে তার আগে একটা কাজ করতে হবে আপনাকে! আপনার পকেটের ঐ পিস্তল দিয়ে আমার মাথা বুকের বা পাশে ছোট্ট একটা ছিদ্র করে দিতে হবে”।
মাহতাবের সমস্ত শরীরে কেউ যেন গরম পানি ঢেলে দিয়েছে। রাগে আপাদমস্তক জ্বলছে তার। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বলল, “আমি এই পুরস্কার চাইনা। আমি মুক্তি চাই! আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চাই”।
“মুক্তির উপায় তো অনেক আগেই তোমাকে বলে দেয়া হয়েছে মাহতাব! তুমি সে সুযোগ গ্রহণ করনি”!
“কোন উপায়ের কথা বলছেন আপনি?”
“প্রতিটি রাউন্ডে তোমার হাতে সুযোগ ছিল আত্মহত্যা করে এই খেলার সমাপ্তি টানার”।
“কিন্তু তুমি বলেছ আমি খেলাটা শেষ করলে মুক্তি দেওয়া হবে আমাকে”।
“ব্যাপারটা এত সহজ নয় মাহতাব সাহেব”।
প্রায় দৌড়ে ডেক্সের কাছে চলে গেল মাহতাব। মৃত্যুদূতের শাটের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে সামনে নিয়ে এলো। গলার স্বরে সহস্র পরাধীনের আজীবন নিষ্পেষিত হওয়ার প্রতিবাদ, “কেন? কেন? এমন করসিস আমার সাথে? যা বলেছিস তাই শুনেছি! তোদের বেঁধে দেওয়া রেডিয়াসের বাইরে এক পাও যাই নি। একবারও মা,বউ,ছেলে- কারো সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও কোন তথ্য পাঠানোর চেষ্টা করিনি, বেঁধে দেওয়া সময়ের মাঝে রীতিমত প্লান করে প্রত্যেকটি খুন করেছি”।
“তুমি ভুলে যাচ্ছ মাহতাব! তোমার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ মনিটর করা হয়েছে। তুমি যদি তেমন কিছু করার চেষ্টা করতে তাহলে মাইক্রো বোমাটি ফেটে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে! তুমি মুক্তি পাওয়ার জন্য আমার কথা শোননি, শুনেছ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য”।
“যে কারণেই শুনি না কেন- শুনেছি তো! এবার এই অ্যাঙ্কলেট খুলে নে। মুক্তি দে আমায়! কতদিন বাচ্চা ছেলেটার মুখ দেখিনা”!
“তোমাকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই মাহতাব। বরং আমাকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা তোমার কাছে আছে। তোমার পিস্তলের একটা গুলি আমার মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে। আমিও এভাবে মুক্তি দিয়েছিলাম ষষ্ঠ মৃত্যুপথ পরিচালনাকারীকে। আজ তুমি যদি আমাকে মুক্তি দাও তাহলে তোমাকে মুক্তি দেবে অষ্টম সিজনের বিজয়ী”।
মৃত্যুদুতকে ছেড়ে দু পা পিছিয়ে এলো মাহতাব। “তুমি বলতে চাইছ এই খেলায় মুক্তি মানেই মৃত্যু?”
“ঠিক তাই মাহতাব!” বলে ডেক্সের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মৃত্যুদূত। প্যান্ট উঁচু করে ডান বায়ে বাঁধা আঙ্কলেটটা দেখাল। “দেয়ার ইজ নো এস্কেইপ ফ্রম দিস গেইম!”
“তারমানে এই খেলা তুমি একা পরিচালনা করছ না! কে আছে এর পিছনে?”
“তোমার কি মনে হয়? কোথায় কোন অপরাধ করে কোন অপরাধী পালিয়ে যাচ্ছে তা আমি ঘরে বসে এমনিতেই পেয়ে যাই? আমি কোন আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী নই! মৃত্যুপথ খেলার পেছনে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক ফ্যানাটিক সোসাইটি! তাদের কারো সাথে আমি সরাসরি দেখা করার সুযোগ পাইনি! আমিও তোমার মতই এই খেলায় এক বিজয়ী মাত্র”!
“কি হবে যদি আমি তোমাকে হত্যা না করি? নিজেই আত্মহত্যা করি?”
“তাহলে মুক্তি পাওয়ার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাকে। তোমার বদলে আমি নিজেই মৃত্যুপথ খেলার অষ্টম সিজনের পরিচালক হব! তবে এখন পর্যন্ত কোন পরিচালক পর দুইটা সিজন পরিচালনার সুযোগ পায়নি!”
“আর যদি আমি তোমাকে হত্যার পর আর এই খেলা চালিয়ে যেতে না চাই? ফিরে যেতে চাই পরিবারের কাছে?”
“তোমার পায়ের অ্যাঙ্কলেটের কথা ভুলে গেলে মাহতাব? ওর ভেতর লুকিয়ে থাকা মাইক্রো বোমাটির কন্ট্রোল আমার হাতে না! আর অনেকটা বাধ্য হয়েই তুমি যাতে ফিরে যেতে না পার সেই ব্যবস্থা করেছি আমি”!
“কি করেছ তুমি?” দুচোখ দপ করে জ্বলে উঠল মাহতাবের।
এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল মৃত্যুদূত। তারপর যেন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল, “ফরিদপুরের একটা সুন্দর ছায়া সুনিবিড় গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে কদিন আগে এক বৃদ্ধার লাশ ভেসে উঠেছে। স্কুল থেকে ফেরার পথে মা ও ছেলেকে বহন করা একটা রিক্সাকে পেছন থেকে দুমড়ে দিয়েছে ভারী মালামাল ভর্তি ট্রাক! ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে"।
“ওহ গড! ওহ গড!” দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল মাহতাব।
“কার কাছে ফিরে যাবে মাহতাব?" মৃত্যুদূত প্রশ্ন করল। "তার চেয়ে এই পথ বেছে নাও। অন্য খুনিদের শাস্তি দিয়েছ আর তোমার আপনজনদের খুনিকে মারবে না?”
ঝট করে উঠে দাঁড়াল মাহতাব! সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে! পিস্তল তুলল। একটা গুলি মৃত্যুদূতের মাথার চাঁদি ফুটো করে দিয়ে বেরিয়ে গেল। দেহটা মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে তার। মুখে প্রশান্তির হাসি! অবশেষে এসেছে মুক্তি!
এবার পিস্তলটা নিজের মাথায় ঠেকাল মাহতাব। এই মুহূর্তে ট্রিগার টেনে দিলে কি হবে? বন্ধ হয়ে যাবে মৃত্যুপথ? পরিচালক না থাকলে মৃত্যুপথ চলবে কি করে? একটা ভয়ংকর খুনের খেলার সমাপ্তি হবে কি?
আফটারম্যাথ
সেই পুরনো ঘর! সেই পুরনো চেয়ার টেবিল আর দেয়ালে ব্যাটারি ফুরিয়ে বন্ধ হয়ে থাকা পুরনো ঘড়ি। এখান থেকেই শুরু হয় মৃত্যুপথ খেলা। নতুন মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে! দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। একজন মধ্য বয়সী পুরুষ, অন্য জন অল্প বয়সী যুবক।
উভয়ে জেগে উঠে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাউন্ড স্পীকারে ভেসে এলো অচেনা একটা কণ্ঠ, “স্বাগতম! শুরু হতে যাচ্ছে মৃত্যুপথ খেলার সিজন এইট! এই খেলায় অংশ নেয়ার যোগ্যতা অর্জন করায় আপনাদের জানাই অভিনন্দন”।
দুজনে শব্দের উৎসের খোঁজে এদিক ওদিক তাকাল। একজন জিজ্ঞেস করল, “কে কথা বলে?”
"আমি আপনাদের হোস্ট অষ্টম মৃত্যুপথ পরিচালনাকারী। আমাকে আপনারা চাইলে মৃত্যুদূত নামেও ডাকতে পারেন"। বিচিত্র শব্দে হাসতে থাকল মৃত্যুদূত। লোকটা হয়ত ভুলেই গেছে যে একসময় মানুষ তাকে "মাহতাব" নামে চিনত!
(সমাপ্ত)
-------------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now