বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একজন শঙ্করাইয়া
-শুভাগত দীপ
জয়পুর সেন্ট্রাল জেল, ইন্ডিয়া। ১৫-ই মে, ১৯৭৯। বিকাল ৫ টা ৩৩ মিনিট। ইন্ডিয়া মিররের সাংবাদিক রাজানাথ আপ্টে বসে আছেন। বামহাতে জ্বলন্ত সিগারেট আর ডানহাতে নতুন টেপ ভরা টেপরেকর্ডার।
এখন ভিজিটিং আওয়ার না। তারপরো, এই জেলের ভিজিটিং রুমে রাজানাথ ছাড়াও আরো দুজন মানুষ আছেন। তারা এই জেলের এটেনডেন্ট। দূরাগত শেকলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাটিতে ঘষটাচ্ছে শেকল। শব্দটা এগিয়ে আসছে এদিকেই। রাজানাথ আপ্টে একটু নড়েচড়ে বসলেন।
লোহার গরাদের ভারি দরজা খোলার ধাতব শব্দ শোনা গেলো। সেই সাথে শেকল ঘষটানোর স্পষ্ট শব্দ। ভিজিটিং রুমের ঘুলঘুলি দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলো আর মরাটে হলদে সিলিং বালবের আলো ঘরের অন্ধকারকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। সেই রহস্যময় আলো আঁধারিতে তিনজন মানুষকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন রাজানাথ।
মাঝখানের লোকটা বুক ফুলিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে। তার দুই হাত ও দুই পায়ে ডান্ডাবেরি লাগানো। শেকল ঘষটাচ্ছে পাথুরে মেঝেতে। লোকটার দুই পাশের দুই পুলিশ হাবিলদার তার দুটো বাহু শক্ত করে ধরে আছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, বন্দি যেকোন মুহূর্তে উড়ে পালাবে।
আসামী আরেকটু সামনে আসতে রাজানাথ তার দিকে ভালোভাবে তাকালেন। ২৮ বছরের তরুণ চেহারায় কে যেন বৃদ্ধের চামড়া-মাংস লাগিয়ে দিয়েছে। ঠোঁটদুটো সামান্য বেঁকে আছে বিদ্রুপের হাসিতে। গালে এক দেড় মাসের জঙ্গুলে দাড়ি, তবে নাকের নিচটা কামানো। লোকটার মূল ব্যাপার হলো তার চোখে। চোখদুটো যেন অপার প্রাণশক্তিতে ভর্তি। সারাক্ষণ এদিক ওদিক করছে। একবার সে রাজানাথের দিকে নিজের দৃষ্টি ফেরালো। তিনি কেমন যেন শিউড়ে উঠলেন।
এ-ই তাহলে কাম্পাতিমার শঙ্করাইয়া! ভাবলেন রাজানাথ আপ্টে। বিশ্বাসই হতে চায়না, এই যুবকটাই প্রায় ৭০ জন মানুষকে ঠান্ডা মাথায় একের পর এক খুন করেছে! ইন্ডিয়া মিরর থেকে শঙ্করাইয়ার একটা সাক্ষাতকার নেয়ার কথা অনেক আগে থেকেই ছিলো। জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছিলোনা। সম্পাদক সাহেব অনেক কষ্টে এবার অনুমতি যোগাড় করেছেন। শঙ্করাইয়ার খবর মানেই হট আইটেম। পত্রিকার বিক্রি হু হু করে বাড়বে। রাজানাথের এই ব্যাপারে আগ্রহ বরাবরই ছিলো। তাই সম্পাদক সাহেব একবার বলতেই তিনি সবকিছু নিয়ে তৈরি হয়ে গেছিলেন।
আগামীকাল ভোরে শঙ্করাইয়ার ফাঁসি হবে। আর ঠিক তখনই গরম গরম ইন্ডিয়া মিররের ফ্রন্ট পেজে তার সাক্ষাতকার মানে মারাত্মক ব্যাপার! ভেবেই মুচকি হাসি ফুটে উঠলো রাজানাথের মুখে। তার সামনে পাতা চেয়ারে তিনি শঙ্করাইয়াকে বসতে ইশারা করলেন। সে বসলে টেপরেকর্ডারটা অন করে কথা শুরু করলেন রাজানাথ।
- কেমন আছো?
- আমি সবসময়ই ভালো থাকি, সাংবাদিক সাহেব।
- আমি যে সাংবাদিক, এটা তুমি জানো?
- জানবোনা কেন! আমার খবর বেচে আপনারা কতোজন বড়লোক হলেন!
রাজানাথ একটু লজ্জা পেলেন। বেশ অবাক হলেন শঙ্করাইয়ার ধীর স্থির বাচনভঙ্গিতে। কোনভাবেই যেন তাকে একজন সিরিয়াল কিলার ভাবা যাচ্ছেনা। রাজানাথ আবারো শুরু করলেন।
- শঙ্কর...
- কল মি শঙ্করাইয়া, প্লিজ।
- আচ্ছা। শঙ্করাইয়া, তুমি মোট কতগুলো খুন করেছো?
- আমাকে কি আপনার স্কুলের হেডমাস্টার মনে হয়? আমি রোলকল করার মতো করে আমার কাজের হিসাব রাখিনি।
- তুমি তাহলে এই খুনগুলোকে 'কাজ' হিসেবে দেখো?
- সেটাই কি দেখা উচিত না? সবই তো ক্রিয়া।
- আচ্ছা, তা-ও একটা আন্দাজ তো আছে।
- শুনলাম, আপনারা পত্রিকাতে লিখেছেন আমি ৭০ জনের ওপরে লোকের ওপর কাজ করেছি। তাহলে সংখ্যাটা সেরকমই কিছু একটা হবে।
- কেন তুমি খুন করতে?
- বড় জটিল প্রশ্ন।
- দেখো, আগামীকাল তোমার ফাঁসি হয়ে যাবে। সব কথা আমাকে বলো। মানুষ জানুক।
- মানুষ জেনে কি করবে? ওরা তো আমাকে ঘৃণা করে।
- তুমি কি বলতে চাও, এই ঘৃণা করাটা অস্বাভাবিক?
- দেখুন সাংবাদিক সাহেব, স্বাভাবিক অস্বাভাবিকের ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আমি আমার কাজগুলো করেছি আমার নিজস্ব যুক্তি থেকে। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
- সেটা কেমন?
- আমি যখন আমার প্রিয় হাতুড়িটা দিয়ে কারো খুলি ফাটাতাম, পুরো ব্যাপারটাই আমাকে খুব আনন্দ দিতো। এই ধরুন, খুলির হাড় ভাঙ্গার কড়মড়ে শব্দ, ফাটা খুলি থেকে ছড়িয়ে পড়া রক্ত, তার ঘ্রাণ... আহ! তারপর ধরুন, যন্ত্রণায় লোকটার শরীর মোচড়ানো, হাতুড়ি দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকায় ছিটকে আসা হলুদ মগজ... আর অবশ্যই চিৎকার। হ্যাঁ, লোকটার গলা ফাটানো চিৎকার আমার শরীরটা অবশ করে দিতো। নেশার মতো হতো আমার। এ নেশা আপনারা টাকা দিয়ে কিনতে পারবেননা।
এটুকু বলে শঙ্করাইয়া জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলো। রাজানাথের শরীরটা কেমন গুলিয়ে উঠলো। একটা মানুষ কিভাবে এত নির্বিকার ভাবে কাউকে খুনের পৈশাচিক বর্ণনা দিতে পারে! শঙ্করাইয়া লোকটা আসলেই খুব খারাপ ধরণের সাইকোপ্যাথ। রাজানাথ অসুস্থ্য বোধ করলেন। তিনি লোকটার জ্বলজ্বলে চোখের দিকে একবার তাকিয়ে আবারো কথা শুরু করলেন।
- তুমি কি তোমার শিকারদের সবাইকেই এভাবে খুন করেছো?
- হ্যাঁ। আমার কাজগুলো সবই এক ধাঁচের। ভেরিয়েশন আনার সময় দিলেন কই?
- তুমি শুধু নিজের অসুস্থ্য আনন্দের জন্যই এসব করেছো?
- আনন্দ জিনিসটাও আপেক্ষিক।
- শঙ্করাইয়া, কাল তোমার ফাঁসি। তোমার অনুশোচনা হয়না?
- কিসের অনুশোচনা? এই জিনিসটার সাথে আমার একদম কোন পরিচয় নেই।
- তুমি ঈশ্বরের কাছে কি জবাব দেবে?
- আপনারাই তো বলেন, ঈশ্বরের ইশারা ছাড়া নাকি এই দুনিয়ায় কিছু ঘটেনা। সেই যুক্তি মানলে, এসব তাঁর ইশারাতেই ঘটেছে। উনি আমাকে কোন যুক্তিতে প্রশ্ন করতে যাবেন?
রাজানাথ আপ্টে দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেপরেকর্ডারটা বন্ধ করলেন। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে একটা সিগারেট জ্বালালেন। এতদিনের সাংবাদিক জীবনে তিনি এর চেয়ে অদ্ভুত কোন সাক্ষাতকার নেননি। যে হাবিলদার দুজন শঙ্করাইয়াকে ভিজিটিং রুমে নিয়ে এসেছিলো, তারা আবার তাকে তার সেলে ফিরিয়ে নেবার উদ্যোগ নিতে লাগলো। আবারো শুরু হলো শেকলের শব্দ। হঠাৎ শঙ্করাইয়া কথা বলে উঠলো।
- সাংবাদিক সাহেব!
- বলো।
- আপনারা যেটাকে মার্ডার বলেন, সেটা আমার রক্তে বসবাস করে। আর এই কাজে আমার চেয়ে ভালো কেউ করতে পারবেনা, আমি নিশ্চিত।
হাবিলদার দুজন শঙ্করাইয়াকে নিয়ে এগোতে শুরু করলো। রাজানাথ আপ্টে নির্বাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। মাটিতে ঘষটাতে থাকা শেকলের শব্দ দূরে মিলিয়ে যেতে লাগলো।
পরদিন ১৬-ই মে,১৯৭৯, ভোর ৫ টা ৩০ মিনিটে জয়পুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি দেয়া হয় কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার কাম্পাতিমার শঙ্করাইয়াকে। যে প্রায় ৭০ জন মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হাতুড়ি ব্যবহার করে নৃশংসভাবে খুন করেছিলো। ফাঁসির মঞ্চে যমটুপি পরানোর সময় লোকটার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি দেখা গিয়েছিলো। রহস্যময় এক হাসি।
(কাম্পাতিমার শঙ্করাইয়ার এ ছবিটা তার ফাঁসির কিছুদিন আগে তোলা। পাঠকের সুবিধার জন্য দিয়ে দিলাম। কাম্পাতিমার শঙ্করাইয়া সম্পূর্ণ বাস্তব একটা চরিত্র। ইন্ডিয়ার ইতিহাসে সে একজন ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার। তবে এই গল্পের স্বার্থে কিছুটা কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে আমাকে।)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now