বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জ্বিন কফিল পর্ব ৪

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X জ্বিন কফিল পর্ব ৪ (রচনা -হুমায়ুন আহমেদ) সফিক হতভম্ব হয়ে বলল, আপনি কি বললেন বুঝলাম না । মেয়েটি যন্ত্রের মত বললো,আমার সঙ্গে একটা জ্বিন থাকে । জ্বিনটার নাম কফিল । কফিল আমারে বড় যন্ত্রনা করে । সফিক অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে । আমি নিজেও বিস্মিত । ব্যাপার কি কিছু বুঝতে পারছি না ।ইমাম সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,লতিফা তুমি একটু ভিতরে যাও । ভদ্রমহিলা তীক্ষন গলায় বললেন,ক্যান ভিতরে ক্যান?থাকলে কি অসুবিধা ? ‘উনাদের সঙ্গে কিছু কথা বলব । তুমি না থাকলে ভাল হয় ।সব কথ আমেয়েছেলেদের শোনা উচিত না ।’ লতিফা তীব্র চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল । খাওয়া বন্ধ করে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকলাম । একি সমস্যা । লতিফা মেয়েটা রূপবতী । শুধু রূপবতী নয় চোখে পড়ার মত রূপবতী ।হালকা পাতলা শরীর । ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ । লম্বাটে স্নিগ্ধ মুখ । বয়সও খুব কম মনে হচ্ছে । দেখাচ্ছে আঠারো উনিশ বছরের তরুনীর মত । এত কম বয়স তার নিশ্চয়ই তার নয় । যার স্বামীর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি তার বয়স ১৮-১৯ হতে পারেনা । আরো একটি লক্ষ্যা করার মত ব্যাপার হল মেয়েটি সাজ-গোজ করেছে । চুল বেধেছে,চোখে কাজল দিয়েছে –কপালে লাল রঙের টিপ ।গ্রামের মেয়েরা কপালে টিপ দেয় বলেও জানতাম না। ইমাম সাহেব বললেন,লতিফা ভিতরে যাও । মেয়েটি উঠে চলে গেলো । ইমাম সাহেব স্বর নিচু করে বললেন,লতিফার মাথা পুরাপুরি ঠিক না ।ওর দুটো সন্তান নষ্ট হয়েছে । তারপর থেকে এ রকম ।তার ব্যবহারে আপনারা কিছু মনে করবেন না ।আমি তার হয়ে আপনাদের কাছে ক্ষময়া চাই ।কিছু মনে করবেন না-আল্লাহর দোহাই । আমি বললাম,আমরা কিছুই মনে করিনি ।তাছাড়া মনে করার মত কিছু তো উনি করেননি । ইমাম সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন,জ্বিনের কারনে এরকম করে ।জ্বিনটা তার সঙ্গে সঙ্গে আছে । মাঝে মাঝে মাস খানিকের জন্য চলে যায় তখন ভাল থাকে । গত এক মাস ধরে তার সাথে আছে । ‘আপনি এসব বিশ্বাস করেন?’ ‘বিশ্বাস করব না কেন ?বিশ্বাস না করার তো কিছু নাই ।বাতাস আমরা চখে দেখি না কিন্তু বাতাস বিশ্বাস কোরই ।কারন বাতাসের নানান আলামত দেখি ।সেই রকম জেইন কফিলেরও নানান আলামত দেখি ।’ ‘কি দেখেন?’ ‘জ্বিন যখন সঙ্গে থাকে তখন লতিফা খুব সাজগোজ করে /কথায় কথায় হাসে /কথায় কথায় কাদে ।’ ‘জ্বিন তাড়াবার ব্যবস্থা করেননি ?’ ‘করেছি ।লাভ হয়নি ।কফিল খুব শক্ত জ্বিন । দীর্ঘদিন লতিফার সঙ্গে আছে ।প্রথম সন্তান যখন গর্ভে আসলো তখন থেকেই কফিল আছে ।’ ‘জ্বিন চায় কি ?’ ইমাম সাহেব মাথা নিচু করে রইলেন ।তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোনো কারনে খুব কষ্ট পাচ্ছেন ।আমার মনে ক্ষীন সন্দেহ হলো-জ্বিন বোধ হয় লতিফা মেয়েটাকেই স্ত্রী হিসাবে চায় ।বিংশ শতাব্দীতে এই ধরনের চিন্তা মাথায় আসছে দেখে আমি নিজের ওপরও বিরক্ত হলাম ।ইমাম সাহেব বললেন,এই জ্বিনটা আমার দুইটা বাচ্চা মেরে ফেলেছে ।আবার যদি বাচ্চা হয় তাকেও মারবে ।বড় মনোকষ্টে আছি জ্বনাব । দিন-রাত আল্লাহপাকেরে ডাকি ।আমি গুনাহগার মানুষ । আল্লাহপাক আমার কথা শুনেন না । ‘আপনার স্ত্রীকে কোনো ডাক্তার দেখিয়েছেন?’ ‘’ডাক্তার কি করবে?ডাক্তারের কোনো বিষয় না । জ্বিনের ওষুধ ডাক্তারের কাছে নাই । ‘তবু একবার দেখালে হতো না ?’ ‘আমার শ্বশুর সাহেব দেখিয়েছিলেন ।একবার লতিফাকে বাপের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম । শ্বশুর সাহেব তাকে ঢাকা নিয়ে গেলেন ।চিকিৎসা টিকিৎসা করালেন ।লাভ হল না ।’ বারান্দা থেকে গুন গুন শব্দ আসছে ।উৎকর্ন হয়ে শুনলাম খুবই মিষ্টি গলায় টেনে টেনে গান হচ্ছে-যার কথাগুলোর বেশির ভাগই অস্পষ্ট । মাঝে মাঝে দু-একটা লাইন বোঝা যায় যার কোনো অর্থ নেই ।যেমন- ‘এতে না দেহে না দেহে না এতে না’ ইমাম সাহেব উচু গলায় বললেন,লতিফা চুপ করো । চুপ করো বললাম । গান থামিয়ে লতিফা বলল,তুই চুপ কর ।তুই থাম শুওরের বাচ্চা । অবিকল পুরুষের ভারী গলা ।আমার গা কাটা দিয়ে উঠলো ।সেই পুরুষ কন্ঠ থমথমে গলায় বললো,চুপ কইরা থাকবি ।একটা কথা কইলে টান দিয়া মাথা আলগা করুম ।শইল থাকবো একখানে মাথা আরেকখানে ।শুওরের বাচ্চা আমারে চুপ করতে কয় । আমরা হাত ধুয়ে উঠে পড়লাম ।এত কান্ডের পর খাওয়া দাওয়া চালিয়ে যাওউয়া সম্ভব না । এ জাতীয় যন্ত্রনায় পড়ব কখনো ভাবিনি । সফিক নিচু গলায় বললো,বিরাট সমস্যা হয়ে গেল দেখি ।ভয় ভয় লাগছে ।কি করা যায় বলতো ? মসজিদের ভেতরে এর আগে কখনো রাত্রি যাপন করিনি ।অস্বস্তি নিয়ে ঘুমুতে গেলাম ।কেমন যেন দম বন্ধ দম বন্ধ লাগছে ।মসজিদের একটা মাত্র দরজা সেটি পেছন দিকে ।ভেতরে গুমোট ভাব ।ইমাম সাহেব যত্নের চূড়ান্ত করেছেন ।স্ত্রীর অস্বাভাবিক আচরনজনিত লজ্জা হয়তোবা ঢাকার চেষ্টা করছেন ।আমাদের ২ জনের জন্য ২ টা শীতল পাটি ,পার্টির চারপাশে কার্বলিক এসিড ছড়নো হয়েছে ।তার চেয়েও বড় কথা দুটো মশারি খাটানো হয়েছে । ইমাম সাহেব বলনে,ভয়ের কিছু নেই ।হারিকেন জ্বালানো থাকবে ।আলোতে সাপ আসেনা । সরজা বন্ধ ।সাপ ঢোকারও পথ নেই । আমি খুব যে ভরসা পাচ্ছি তা না ।চৌকি এনে ঘুমাতে পারল ভাল হতো ।মসজিদের ভেতর চৌকি পেতে শোয়া –ভাবাই যায় না । সফিকের হচ্ছে ইচ্ছা ঘুম ।শোয়া মাত্র নাক ডাকতে শুরু করেছে ।বাইরে ঝির ঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে । ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে মসজেদের ভেতরে আগরবাতির গন্ধ ।যে গন্ধ সব সময় মৃত্যুকে মনে করিয়ে দেয় ।সব মিলিয়ে গা ছমছমানো ব্যাপার । আমি ইমাম সাহেবকে বললাম,আপনি চলে যান,আপনি এখানে বসে আছেন কেন ?আপনার স্ত্রী একা ।তার শরীরও ভাল না । ইমাম সাহেব বললেন,আমি মসজিদেই থাকব ।এবাদত বন্দেগী করব ।ফজরের নামাজ শেষ করে বাসায় গিয়ে ঘুমুব । ‘কেন?’ ‘লতিফা এখন আমাকে দেখলে উন্মাদের মত হয়ে যাবে ।মেঝেতে মাথা ঠুকবে ।’ ‘কেন?’ ‘ওর দোষ নাই কিছু ।সঙ্গে জ্বিন আছে-কফিল । এই জ্বিনই সবকিছু করায় ।বেচারীর কোনো দোষ নেই ।’ আমি চুপ করে রইলাম ।ইমাম সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন,এমনিতে তেমন উপদ্রব করেনা ।সন্তান সম্ভবা হলেই কফিল ভয়ংকর যন্ত্রনা করে ।বাচ্চাটা মেরে না ফেলা পর্যন্ত থামে না । দুইটা বাচ্চা মেরেছে-এইটাও মারবে । ‘আপনার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা?’ ‘জ্বি’ ‘আপনি কি নিশ্চিত যে পুরো ব্যাপারটা জ্বিন করছে ?অন্য কিছু না?’ ‘জ্বি নিশ্চিত ।জ্বিনের সঙ্গে আমার মাঝে মধ্যে কথা হয় ।’ ‘অবশ্বাস্য সব কথাবার্তা বলছেন আপনি ।’ ‘অবিশ্বাসের কিছু নাই । একদিনের ঘটনা বলি তাহলে বুঝবেন ।ভাদ্র মাস ।খুব গরম ।একটা ভেজা গামছা শরীরে জড়ায়ে এশার নামাজে দাড় হয়েছি । মসজিদে আমি একা ।আমি ছাড়া আর কেউ নাই ।হঠাৎ দপ করে হারিকেনটা নিভে গেল ।চমকে উঠলাম । তারপর শুনি মসজিদের পেছনের দরজার কাছে ধুপ ধুপ শব্দ ।খুব ভয় লাগল ।নামাজ ছেড়ে উঠতে পারিনা ।নামাজে মন ও দিতে পারি না ।কিছুক্ষন পর পর পিছনের দরজায় ধুপ ধুপ শব্দ ।যেন কেউ কিছু টেনে এনে ফেলছে ।সেজদায় যাওয়ার সময় কফিলের গলা শুনলাম-টেনে টেনে বলল,তোরে আইজ পুড়াইয়া মারব ।তারপর দপ করে আগুন জ্বলে উঠল । দাউ দাউ আগুন ।নামাজ ছেড়ে উঠে দাড়ালাম ।দেখি দরজার কাছে গাদা করে রাখা শুকনা লাকড়ি ।আগুন জ্বলছে ।আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম-বাচাও বাচাও । আমার চিৎকার শুনে লতিফা পানির বালতি হাতে ছুটে আসল ।পানি দিয়ে আগুন নিভায়ে আমাকে মসজিদ থেকে টেনে বার করল ।আমার স্ত্রীর কারনে সেই যাত্রা বেচে গেলাম ।লতিফা সময় মত না আসলে মারা পড়তাম ।’ ‘জ্বিন মসজিদের ভেতরে ঢুকলো না কেন ?’ ‘খারাপ ধরনের জ্বিন ।আল্লাহর ঘরে এরা ঢুকতে পারে না ।আমি এই জন্যই বেশির ভাগ সময় মসজিদে থাকি ।মসজিদে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে পারি । ঘরে পারি না ।’ ‘কফিল আপনাকে খুন করতে চায়?’ ‘তাও ঠিক না-একবারই চেয়েছিল ।তারপর আর চায় নি ।’ ‘খুন করতে চেয়েছিল কেন?’ ইমাম সাহেব চুপ করে রইলেন ।আমি বললাম,আপনার যদি আপত্তি না থাকে পুরো ঘটনাটা বলুন ।আপত্তি থাকলে বলার দরকার নেঢ়। ‘না আপত্তির কি আছে ?আপত্তির কিছু নাই ।আমি লতিফার অবস্থা একটু দেখে আসি’ ‘যান দেখে আসুন ।’ ইমাম সাহেব চলে গেলেন ।আমি ভয়ে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম ।ভূত,প্রেত,জ্বূ ন,পরী কখনো বিশ্বাস করিনি-এখনো করছি না তবু আরংকে আধমরা হয়ে গেছি ।সফিক জেগে থাকলে খানিকটা ভরসা পাওয়া যেত ।সে ঘুমুচ্ছে মরার মত ।একেই বলে পরিবেশ ।ইমাম সাহেব ১০ মিনিটের মধ্যে ফিরে এলেন ।বিরস গলায় বললেন,ভালই আছে-তবে ভীষন চিৎকার করছে । ‘তালা বন্ধ করে রেখেছেন?’ ‘জ্বি না।তালা বন্ধ করে তাকে রাখা সম্ভবনা ।কফিল ওর সঙ্গে থাকে-কাজেই ওর গায়ে জোর থাকে অসম্ভব ।না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না ।’ ইমাম সাহেব মন খারাপ করে বসে রইলেন ।আমি বললাম,গল্পটা শুরু করুন ভাই । তিনি নিচু গলায় বললেন,আমার স্ত্রীর ডাকনাম বুড়ি । কথা পুরোপুরি শেষ করতে পারলেন না ।মসজিদে প্রচন্ড শব্দে ঢিল পড়তে লাগল ।ধুপ ধুপ শব্দ । সেই সঙ্গে মনে হচ্ছে কয়েকজন মানুষ যেন চারিদিকে ছুটাছুটি করছে ।আমি আতংকিত গলায় বললাম, কি ব্যাপার? ইমাম সাহেব বললেন,কিছু না ।কফিল চায়না আমি কিছু বলি । ‘থাক ভাই বাদ দিন ।গল্প বলার দরকার নেই’ ‘অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে ঢিল ছোড়া বন্ধ হবে । ভয়ের কিছুই নেই ।’ সত্যি সত্যি বন্ধ হলো ।বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগলো ।ইমাম সাহেব গল্প শুরু করলেন ।আমি তার গল্পটাই লিখছি এখন ।তার ভাষাতেই ।তবে আঞ্চলিকতাটা সামান্য বাদ দিয়ে । গল্পের মাঝখানেও একবার তুমুল ঢিল ছোড়া হলো ।ইমাম সাহেব একমনে আয়াতুল কুরসি পড়লেন ।আমার জীবনে সে এক ভয়াবহ রাত । (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জ্বিন কফিল—পর্ব ৬ (শেষ)
→ জ্বিন কফিল—পর্ব ৫
→ জ্বিন কফিল পর্ব ৩
→ জ্বিন কফিল—পর্ব ২— (রচনা হূমায়ূন আহমেদ)
→ জ্বিন কফিল—পর্ব ১—(রচনা-হুমায়ুন আহমেদ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now