বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
চোখ-পর্ব ২
‘অঙ্কশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি নিয়ে আমি আমেরিকা যাই
পিএইচডি করতে। এমএ-তে আমার রেজাল্ট
ভালো ছিল না। টেনেটুনে সেকেন্ড ক্লাস।
প্রাইভেট কলেজে কলেজে চাকরি খুঁজে
বেড়াচ্ছি, তখন বন্ধুদের দেখাদেখি জি-আর-ই
পরীক্ষা দিয়ে ফেললাম। জি-আর-ই পরীক্ষা
কী তা কি আপনি জনেন? গ্রাজুয়েট রেকর্ড
একজামিনেশন। আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে
গ্রাজুয়েট ক্লাসে ভর্তি হতে হলে এই পরীক্ষা
দিতে হয়।’
‘আমি জানি।’
‘এই পরীক্ষায় আমি আশাতীত ভালো করে
ফেললাম। আমেরিকান তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
আমার কাছে আমন্ত্রণ চলে এল। চলে গেলাম।
পিএইচডি করলাম প্রফেসর হোবলের সঙ্গে।
আমার পিএইচডি ছিল গ্রুপ থিওরির একটি শাখায়—নন
অ্যাবেলিয়ান ফাংশানের ওপর। পিএইচডির কাজ এতই
ভালো হলো যে আমি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে
গেলাম। অঙ্ক নিয়ে বর্তমান কালে যাঁরা নাড়াচাড়া
করেন তাঁরা সবাই আমার নাম জানেন। অঙ্কশাস্ত্রের
একটি ফাংশান আছে যা আমার নামে পরিচিত। আর কে
এঙ্পোনেনশিয়াল। আর কে হচ্ছে রাশেদুল
করিম।
পিএইচডির পরপরই আমি মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে
অধ্যাপনার কাজ পেয়ে গেলাম। সেই বছরই বিয়ে
করলাম। মেয়েটি মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন
আর্টসের ছাত্রী—স্প্যানিশ আমেরিকান। নাম জুডি
বারনার।
‘প্রেমের বিয়ে?’
‘প্রেমের বিয়ে বলাটা বোধ হয় ঠিক হবে না।
বাছাবাছির বিয়ে বলতে পারেন। জুডি অনেক
বাছাবাছির পর আমাকে পছন্দ করল।’
‘আপনাকে পছন্দ করার কারণ কী?’
‘আমি ঠিক অপছন্দ করার মতো মানুষ সেই সময়
ছিলাম না। আমার একটি চোখ পাথরের ছিল না। চেহারা
তেমন ভালো না হলেও দুটি সুন্দর চোখ ছিল।
আমার মা বলতেন, রাশেদের চোখে জন্ম-
কাজল পরানো। সুন্দর চোখের ব্যাপারটা অবশ্য
ধর্তব্য নয়। আমেরিকান তরুণীরা প্রেমিকদের
সুন্দর চোখ নিয়ে মাথা ঘামায় না—তারা দেখে
প্রেমিক কী পরিমাণ টাকা করেছে এবং ভবিষ্যতে
কী পরিমাণ টাকা সে করতে পারবে। সেই দিক
দিয়ে আমি মোটামুটি আদর্শ স্থানীয় বলা চলে।
ত্রিশ বছর বয়সে একটি আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে
ফ্যাকাল্টি পজিশন পেয়ে গেছি। ট্যানিউর পেতেও
কোনো সমস্যা হবে না। জুডি স্বামী হিসেবে
আমাকে নির্বাচন করল। আমার দিক থেকে
আপত্তির কোনো কারণ ছিল না। জুডি চমৎকার একটি
মেয়ে। শত বৎসর সাধনার ধন হয়তো নয়, তবে
বিনা সাধনায় পাওয়ার মতো মেয়েও নয়।
বিয়ের সাত দিনের মাথায় আমরা হানিমুন করতে চলে
গেলাম সানফ্রান্সিসকো। উঠলাম হোটেল
বেডফোর্ডে। দ্বিতীয় রাত্রির ঘটনা। ঘুমুচ্ছিলাম।
কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি
জুডি পাশে নেই। ঘড়িতে রাত তিনটা দশ বাজছে।
বাথরুমের দরজা বন্ধ। সেখান থেকে ফুঁপিয়ে
কান্নার শব্দ আসছে। আমি বিস্মিত হয়ে উঠে
গেলাম। দরজা ধাক্কা দিয়ে বললাম, কী হয়েছে?
জুডি কী হয়েছে? কান্না থেমে গেল। তবে
জুডি কোনো জবাব দিল না।
অনেক ধাক্কাধাক্কির পর সে দরজা খুলে হতভম্ব
হয়ে আমাকে দেখতে লাগল। আমি বললাম, কী
হয়েছে?
সে ক্ষীণ স্বরে বলল, ভয় পেয়েছি।
‘কিসের ভয়?’
‘জানি না কিসের ভয়।’
‘ভয় পেয়েছ তো আমাকে ডেকে তোলনি
কেন? বাথরুমের দরজা বন্ধ করেছিলে কেন?’
জুডি জবাব দিল না। এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে
রইল। আমি বললাম, ব্যাপারটা কী আমাকে খুলে
বলো তো?
‘সকালে বলব।’
‘না, এখনি বলো। কী দেখে ভয় পেয়েছ?’
জুডি অস্পষ্ট স্বরে বলল, তোমাকে দেখে।
‘আমাকে দেখে ভয় পেয়েছ মানে? আমি কী
করেছি?’
জুডি যা বলল তা হচ্ছে—রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়।
হোটেলের ঘরে নাইট লাইট জ্বলছিল, এই
আলোয় সে দেখে তার পাশে যে শুয়ে
আছে সে কোনো জীবন্ত মানুষ নয়। মৃত
মানুষ। যে মৃত মানুষের গা থেকে শবদেহের
গন্ধ বেরোচ্ছে। সে ভয়ে কাঁপতে থাকে তবু
সাহসে হাত বাড়িয়ে মানুষটাকে স্পর্শ করে। স্পর্শ
করেই চমকে উঠে, কারণ মানুষটার শরীর
বরফের মতোই শীতল। সে পুরোপুরি নিশ্চিত
হয়ে যায় যে আমি মারা গেছি। তার জন্যে এটা বড়
ধরনের শক হলেও সে যথেষ্ট সাহস দেখায়—
টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে দেয় এবং হোটেল
ম্যানেজারকে টেলিফোন করবার জন্যে
টেলিফোন সেট হাতে তুলে নেয়। ঠিক তখন
সে লক্ষ করে মৃতদেহের দুটি বন্ধ চোখের
একটি ধীরে ধীরে খুলছে। সেই একটিমাত্র
খোলা চোখ তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে
তার দিকে। জুডি টেলিফোন ফেলে দিয়ে ছুটে
বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। এই হলো
ঘটনা।
রাশেদুল করিম কথা শেষ করে সিগারেট ধরালেন।
হাতের ঘড়ি দেখলেন। আমি বললাম, থামলেন
কেন?
‘সাতটা বেজেছে। আপনি বলেছেন সাতটার সময়
আপনার জন্যে চা আসে। আমি চায়ের জন্যে
অপেক্ষা করছি। চা খেয়ে শুরু করব। আমার গল্প
শুনতে আপনার কেমন লাগছে?’
‘ইন্টারেস্টিং। এই গল্প কি আপনি অনেকের
সঙ্গে করেছেন? আপনার গল্প বলার ধরন
থেকে মনে হচ্ছে, অনেকের সঙ্গেই এই
গল্প করেছেন।’
‘আপনার অনুমান সঠিক। ছয় থেকে সাতজনকে আমি
বলেছি। এর মধ্যে সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। পুলিশের
লোক আছে।’
‘পুলিশের লোক কেন?’
‘গল্প শেষ করলেই বুঝতে পারবেন পুলিশের
লোক কী জন্যে।’
চা চলে এল। চায়ের সঙ্গে পরোটা-ভাজি। মিসির
আলি নাশতা করলেন। রাশেদুল করিম সাহেব পরপর
দুকাপ চা খেলেন।
‘আমি কি শুরু করব?’
‘জি, শুরু করুন।’
‘আমাদের হানিমুন মাত্র তিন দিন স্থায়ী হলো।
জুডিকে নিয়ে পুরনো জায়গায় চলে এলাম। মনটা
খুবই খারাপ। জুডির কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না।
রোজ রাতে সে ভয়ংকর চিৎকার করে ওঠে।
ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আমি যখন
জেগে উঠে তাকে সান্ত্বনা দিতে যাই, তখন
সে এমনভাবে তাকায় যেন আমি একটা পিশাচ কিংবা
মূর্তিমান শয়তান। আমার দুঃখের কোনো সীমা
রইল না। সেই সময় নন এবিলিয়ান গ্রুপের ওপর
একটা জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলাম। আমার
দরকার ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার মতো পরিবেশ।
মানসিক শান্তি। সব দূর হয়ে গেল। অবশ্যি দিনের
বেলায় জুডি স্বাভাবিক। সে বদলাতে শুরু করে সূর্য
ডোবার পর থেকে। আমি তাকে একজন
সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেলাম।
সাইকিয়াট্রিস্ট প্রথমে সন্দেহ করলেন সমস্যা
ড্রাগঘটিত। হয়তো জুডি ড্রাগে অভ্যস্ত। সেই
সময় বাজারে হেলুসিনেটিং ড্রাগ এলএসডি প্রথম
এসেছে। শিল্প সাহিত্যের লোকজন শখ করে
এই ড্রাগ খাচ্ছেন। বড় গলায় বলছেন—মাইন্ড
অলটারিং ট্রিপ নিয়ে এসেছি। জুডি ফাইন আর্টসের
ছাত্রী। ট্রিপ নেয়া তার পক্ষে খুব অস্বাভাবিক না।
দেখা গেল ড্রাগঘটিত কোনো সমস্যা তার নেই।
সে কখনো ড্রাগ নেয়নি। সাইকিয়াট্রিস্টরা তার
শৈশবের জীবনে কোনো সমস্যা ছিল কিনা তাও
বের করতে চেষ্টা করলেন। লাভ হলো না। জুডি
এসেছে গ্রামের কৃষক পরিবার থেকে। এ
ধরনের পরিবারে তেমন কোনো সমস্যা থাকে
না। তাদের জীবনযাত্রা সহজ এবং স্বাভাবিক।
সাইকিয়াট্রিস্ট জুডিকে ঘুমের ওষুধ দিলেন। কড়া
ডোজের ফেনোবারবিটন। আমাকে বললেন,
আপনি সম্ভবত লেখাপড়া নিয়ে থাকেন। স্ত্রীর
প্রতি বিশেষ করে নববিবাহিত স্ত্রীর প্রতি যতটা
সময় দেয়া দরকার, তা দিচ্ছেন না। আপনার প্রতি
আপনার স্ত্রীর একধরনের ক্ষোভ জন্মগ্রহণ
করেছে। সে যা বলছে তা ক্ষোভেরই
বহিঃপ্রকাশ।
জুডির কথা একটাই—আমি ঘুমুবার পর আমার দেহে
প্রাণ থাকে না। একজন মৃত মানুষের শরীর যেমন
অসাড় পড়ে থাকে, আমার শরীরও সে রকম
পড়ে থাকে। ঘুমের মধ্যে মানুষ হাত নাড়ে, পা
নাড়ে—আমি তার কিছুই করি না। নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলি
না। গা হয়ে যায় বরফের মতো শীতল। একসময়
গা থেকে মৃত মানুষের শরীরের পচা গন্ধ
বেরোতে থাকে এবং তখন আচমকা আমার বাঁ
চোখ খুলে যায়, সেই চোখে আমি এক
দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই চোখের
দৃষ্টি সাপের মতো কুটিল।
জুডির কথা শুনে আমার ধারণা হলো, হতেও তো
পারে। জগতে কত রহস্যময় ব্যাপারই তো ঘটে।
হয়তো আমার নিজেরই কোনো সমস্যা আছে।
আমিও ডাক্তারের কাছে গেলাম। স্লিপ অ্যানালিস্ট।
জানার উদ্দেশ্য একটিই—ঘুমের মধ্যে আমার
কোনো শারীরিক পরিবর্তন হয় কি না। ডাক্তাররা
পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করলেন। একবার না, বারবার
করলেন। দেখা গেল আমার ঘুম আর দশটা
মানুষের ঘুমের চেয়ে আলাদা নয়। ঘুমের মধ্যে
আমিও হাত-পা নাড়ি। অন্য মানুষদের যেমন ঘুমের
তিনটি স্তর পার হতে হয়, আমারও হয়। ঘুমের সময়
আর দশটা মানুষের মতো আমার শরীরের
উত্তাপও আধ ডিগ্রি হ্রাস পায়। আমিও অন্য সবার
মতো স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন দেখি।
জুডি সব দেখেশুনে বলল, ডাক্তাররা জানে না।
ডাক্তাররা কিছুই জানে না। আমি জানি। তুমি আসলে
মানুষ না। দিনের বেলা তুমি মানুষ থাক—সূর্য ডোবার
পর থাক না।
আমি কী হই?
তুমি পিশাচ বা এই জাতীয় কিছু হয়ে যাও।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now