বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
জ্বিন কফিল
(রচনা-হুমায়ুন আহমেদ)
পর্ব ১
জায়গাটার নাম ধুন্দুল নাড়া ।
নাম যেমন অদ্ভূত জায়গাও তেমন জঙ্গুলে ।
একবার গিয়ে পৌছলে মনে হবে সভ্য সমাজের
বাইরে চলে এসেছি । সেখানে যাবার ব্যবস্থাটা
বলি । প্রথমে যেতে হবে ঠাকরোকোনা ।
ময়মনসিংহ মোহনগঞ্জ লাইনের ছোট একটা
স্টেশন ।ঠাকরোকোনা থেকে গয়নার নৌকা যায়
হাতির বাজার পর্যন্ত । যেতে হবে হাতির বাজারে ।
ভাগ্য ভাল হলে হাতির বাজারে কেরায়া নৌকা পাওয়া
যাবে । যদি পাওয়া যায় সেই নৌকায় শিয়ালজানি খাল ধরে
মেইল দশেক উত্তরে যেতে হবে । বাকি পথ
পায়ে হেটে । পেরুতে হবে মাঠ, ডোবা ,
জলাভূমি ।জুতা খুলে হাতে নিতে হবে ।পা কাটবে
ভাঙ্গা শামুকে । গোটা বিশেক জোক ধরবে।
বিশ্রী অবস্থা । কতটা হাটতে হবে তারো অনুমান
নেই । একটা সময় আসবে যখন লোকজন
হাসিমুখে বলবে,ধুন্দুল নাড়া ? ওই তো দেখা যায় ।
তখন বুঝতে হবে আরো মেইল সাতেক বাকি ।
বছর পাচেক আগে এই জঙ্গুলে জায়গায় আমাকে
এক সাধুর সন্ধানে যেতে হয়েছিল । সাধুর নাম-
কালু খা । মুসলমান নাম হলেও সাধু হিন্দু ব্রাহ্মন । বাবা
মা তাকে শৈশবেই পরিত্যাগ করেন। তিনি মানুষ হন
মুসলিম পরিবারে । কালু খা নাম তার মুসলিম পালক বাবার
দেওয়া ।যৌবনে তিনি সংসার ত্যাগী হয়ে শ্মশানে
আশ্রয় নেন ।তার অসাধারন ক্ষমতা । বিভূতীর
কোন সীমা সংখ্যা নেই । তিনি কোন রকম খাদ্য
গ্রহন করেন না । তার গা হেকে সব সময় কাথালচাপা
ফুলের তীব্র গন্ধ বের হয় । পূর্নিমার সময়
সেই গন্ধ এতো তীব্র হয় যে কাছে গেলে
বমি এসে যায় । নাকে রুমাল চেপে কাছে
যেতে হয় ।
সাধু সন্ন্যাসি , তাদের অলৌকিক ক্ষমতা এইসব নিয়ে
আমি কখনো মাথা ঘামাই না । আমি মনে প্রানে
বিশ্বাস করি ব্যাখ্যার অতীত কোন ক্ষমতা প্রকৃতি
মানুষকে দেয়নি । কোনো সাধু যদি আমার সামনে
শূন্যে ভেসে থাকতে পারেন, আমি চমৎকৃত হবনা
। ধরে নেব এর পেছনে আছে ম্যাজিকের
সহজ কিছু কলা কৌশল যা এই সাধু আয়ত্ত করেছেন ।
কাজেই আমার পক্ষে সাধুর খোজে ধুন্দুল নাড়া
নামের অজ অজ অজ পাড়াগায়ে যাবার প্রশ্নই
আসেনা । যেতে হয়েছিল সফিকের কারনে ।
সফিক আমার বাল্যবন্ধু । সে বিশ্বাস করেনা এমন
জিনিস নেই । ভূত-প্রেত থেকে সাধু সন্ন্যাসী
সব কিছুতেই তার অসীম বিশ্বাস । বিংশ শতাব্দীর
মানুষ হয়েও সে বিশ্বাস করে যে সাপের মাথায়
মনি আছে । কৃষ্ণপক্ষের রাতে এই মনি সে
উপড়ে ফেলে । চারদিক আলো হয়ে যায় ।
আলোয় আকৃষ্ট হয়ে পোকা মাকড় আসে । সাপ
তাদের ধরে ধরে খায় । ভোজনপর্ব শেষ
হলে মনিটি আবার গিলে খায় ।
সাধু কালু খার খবর সফিকই নিয়ে এলো এবং এমন ভাব
করতে লাগল যে অবতারের সন্ধান পেয়েছে ।
সে অবতারের সঙ্গে দেখা না হলে জীবন বৃথা
।
আমি সফিকের সঙ্গে রওনা হলাম দুটি কারনে ।
এক,সফিককে আমি অত্যন্ত পছন্দ করি । তাকে
একা একা ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা । দুই-
সাধু খোজা উপলক্ষে গ্রামের দিকে খানিকটা
হলেও ঘোরা হবে । মাঝে মাঝে এরকম ঘুএ
বেড়াতে মন্দ লাগেনা । নিজেকে পরিব্রাজক-
পরিব্রাজক মনে হয় । যেন আমি ফা-হিয়েন । বাংলার
পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি ।
খুব আগ্রহ নিয়ে রওনা দিলেও আগ্রহ হাতির
বাজারে পৌছবার আগেই শেষ হয়ে গেলো ।
অমানুষিক পরিশ্রম হল । হাতীর বাজার থেকে যে
কেরায়া নৌকা নিলাম সে নৌকাও এখন ডোবে তখন
ডোবে অবস্থা । নৌকার পাটাতনের ফুটা দিয়ে বিজ
বিজ করে পানি উঠছে ।সারাক্ষন সেই পানি
সেচতে হচ্ছে ।শেষ পর্যন্ত সফিকের মত
পাগলেরও ধৈর্যচ্যুতি হল । কয়েকবার বলল,বিরাট
বোকামি হয়েছে । গ্রেট মিসটেক । এর
চেয়ে কঙ্গো নদীর উৎস বের করা সহজ ছিল
।
আমি বললাম,এখনো সময় আছে । ফিরে যাবি কি-না
বল ।
আরে না । এতোদুর এসে ফিরে যাব মানে । ভাল
জিনিসের জন্য কষ্ট করতেই হবে । জাস্ট চিন্তা
করে দেখ একজন মানুষের গা থেকে ভুর ভুর
করে কাঠালচাপা ফুলের গন্ধ বেরুচ্ছে ।ভাবতেই
গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে । হাউ এক্সাইটিং ।
সন্ধ্যার পরে ধুন্দুল নাড়া গ্রামে উপস্থিত হলাম ।
কাদায় পানিতে মাখামাখি ।তিনবার বৃষ্টিতে ভিজেছি ।
ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় জীবন বের হওয়ার উপক্রম ।
বিদেশী লোকজন দেখলেই গ্রামের মানুষ
সাধারনত খুব আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে ।এইখানে
উলটো নিয়ম দেখলাম ।আমাদের ব্যাপারে কারো
কোন আগ্রহ নেই ।‘কোত্থেকে এসেছি ।
যাব কোথায়?’এইটুকু দায়িত্ব পালন করার ভঙ্গিতে
জিজ্ঞেস করেই সবাই চলে যাচ্ছে ।একি যন্ত্রনা
।
সাধু কালু খা কে দেখেও খুব হতাশ হতে হলো ।
বদ্ধ উন্মাদ একজন মানুষ । শ্মশানে একটা পাকুড়
গাছের নিচে ন্যাংটো অবস্থায় বসা । আমাদের
দেখেই গালাগালি শুরু করল ।গালাগালি যে এত নংরা
হতে পারে তা আমার ধারনার বাইরে ছিল ।আমাকে
এবং সফিককে কালু খা সবচেয়ে ভদ্র যা বলল তা
হচ্ছে-বাড়িত যা ।বাড়িত গিয়া খাবলাইয়া খাবলাইয়া গু খা ।
আমি হতভম্ব ।ব্যাটা বলে কি ।
সগিকের দিকে তাকালাম । সে ভাব গদগদ স্বরে
বলল,লোকটার ভেতরে জিনিস আছে মনে
হচ্ছে ।
আমি বললাম,কি করে বুঝলি ?আমাদের গু খেতে
বলেছে এইজন্য ?
‘আরেনা ।সে আমাদের এড়াতে চাচ্ছে ।মানুষের
সংসর্গ পচ্ছন্দ নয় ।মানুষের হাত থেকে উদ্ধার
পাওয়ার এটা একটা সহজ টেকনিক ।’
‘লোকটা যে বদ্ধ উন্মাদ তা তোর মনে
হচ্ছেনা ?’
‘তাও মনে হচ্ছে তবে একটা প্রবাবলিটি আছে
যে সে উন্মাদ না ।’
গ্রামের কয়েকজন বয়স্ক মানুষ আমাদের সঙ্গে
আছেন ।সাধুর প্রতি তাদের ভক্তি শ্রদ্ধাও
সফিকের মতই ।তাদের একজন বললেন,বাবার মাথা
এখন একটু গরম ।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,মাথা ঠান্ডা হবে কখন ?
‘ঠিক নাই ।চাদের সাথে যোগাযোগ ।’
‘অমাবস্যা পূর্নিমায় মাথা গরম থাকে ।’
এই ব্যাপারেও মতভেদ দেখা গেলো । একজন
বলল,অমাবস্যা পূর্নিমাতেই মাথাটা ঠান্ডা থাকে ।অন্য
সময় গরম ।বাবার কাছে মাসের পর মাস পড়ে
থাকতে হয় ।অপেক্ষা করতে হয় কখন বাবার মাথা
ঠান্ডা হবে ।
আমি বললাম,সফিক,বাবার গা থেকে ফুলের
গন্ধতো কিছু পাচ্ছিনা ।আমাদের যে দ্রব্য
খেতে বলেছেন সেই গন্ধ পাচ্ছি ।তুই কি
পাচ্ছিস ?
সফিক জবাব দেবার আগেই আমাদের সঙ্গী
মানুষদের একজন ভীত গলায় বলল,একটু দূরে যান
। বাবা অখন ঢিল মারব ।আইজ মনে হইতাছে বাবার
মিজাজ বেশি খারাপ ।
কথা শেষ হওয়ার আগেই ঢিল বৃষ্টি হলো । দৌড়ে
নিরাপদ দূরত্বে চলে গেলাম । বাবার কান্ড কারখানায়
সফিকের অবশ্যি মোহভংগ হলনা ।সে বেশ
উৎসাহের সংগেই বলল,দু’টো দিন থেকে দেখি
।এতোদূর থেকে আসা ।ভাল মত পরীক্ষা না
করে চলে যাওয়াটা ঠিক হবে না ।
‘আর কি পরীক্ষা করবি ?’
‘মানে উনার ,আথা যখন ঠান্ডা হবে তখন দু’একটা কথা
টথা জিজ্ঞেস করলে......’
আমি হাল ছেড়ে দেয়া গলায় বললাম,’থাকবি
কোথায়?’
‘স্কুলঘরে শুয়ে থাকব ।খানিকটা কষ্ট হবে ।কি আর
করা ।কষ্ট বিনে কেষ্ট মেলে না ।’
জানা গেলো এই গ্রামে কোন স্কুল নেই ।
পাশের গ্রামে প্রাইমারী স্কুল আছে-এখান
থেকে ছ-মাইলের পথ ।তবে গ্রামে পাকা মসজিদ
আছে ।অতিথি মোসাফির এলে মসজিদে থাকে ।
মসজিদের পাশেই ইমাম সাহেব আছেন ।তিনি
অতিথিদের খোজ খবর করেন । প্রয়োজনে
খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন ।
আমি খুব একটা উৎসাহ বোধ করলাম না ।গ্রামের
একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,ইমাম সাহেব লোক
কেমন ?সে অনেকক্ষন চুপ করে থেকে
দার্শনিকের মত বলল,ভালয় মন্দয় মিলাইয়া মানুষ ।কিছু
ভাল ।কিছু মন্দ ।এই উত্তরও আমার কাছে খুব
সন্দেহজনক মনে হল ।উপায় নেই ।আকাশে
আবার মেঘ জমতে শুরু করেছে ।রওনা হলাম
মসজিদের দিকে ।গ্রামের লোকগুলো
অভদ্রের চূড়ান্ত ।কেউ সংগে এলো না ।কিভাবে
যেতে হবে তাই বলেই ভাবলো আমাদের জন্য
অনেক করা হয়েছে ।
(পরবর্তী পর্ব দেয়া হবে আজ বিকাল ৪ টায় ৷ ততক্ষন পর্যন্ত বেশি বেশি রেটিং ও মন্তব্য করুন ৷ 10+ মন্তব্য চাই)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now