বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শ্রী আংটি !

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X শ্রী আংটি ! লিখেছেন- সাচৌ । _____________ ১ বসন্তের শুরুতেই টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে । অথচ সকালেও কি সুন্দর রোদ ছিল । ঢাকা চিটাগাং হাইওয়ের পাশ ঘেষে হেঁটে চলেছেন আকবর হুদা, হাতে কোন ছাতা নেই। কিশোর বালকের মত বৃষ্টি উপভোগ করছেন । ব্যাস্ত মহাসড়কে সাঁই সাঁই করে বাস ট্রাক আসা যাওয়া করছে । মহাসড়কের মাঝে ছোট ছোট গর্ত, দেখে মনে হচ্ছে একদল ইঁদুর অনেক যত্নকরে গর্তগুলো খুঁড়েছে, একটুখানি জমে থাকা পানি ছলকে উঠে একটু পরপর ভিজিয়ে যাচ্ছে হুদা সাহেবকে । তিনি হেঁটেই চলেছেন আনমনে । চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই, তার মাথায় কি চিন্তা ঘুরছে । একটু পরপর শার্টের পকেটে হাত দিয়ে চেক করছেন, একহাজার টাকার দশটা চকচকে নতুন নোট। ভালকরে তাকালেই দেখা যাবে তার ডানহাতের মুঠোতে খুব আলতো করে কিছু একটা ধরে রেখেছেন । ২ গত তিনমাস যাবত বেতন হচ্ছে না। সরকারী কারখানা, চলেও সরকারের হুকুম মত; তাই দুম করে বন্ধ করে দিল নিজেদের মর্জিমত । বাবুই স্কুলে পড়ে, তার তেমন কোন খরচ নেই । কিন্তু মিমু তো কলেজে পড়ে, তার উপর ছেলেমানুষ । প্রতিদিন কম করে হলেও ৪০ টাকা লাগে তার । হুদা সাহেব যেখান থেকেই হোক এই টাকার ব্যাবস্থা করেন । ধার যে কত হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। কোন অফিসারের কাছে ধার চেয়েও পাওয়া যায় না এখন । পাবেনই বা কিভাবে ? হুদা সাহেবের যে হাল,অন্যদেরও তাই । অথবা কারো কারো অবস্থা আরও বেশী খারাপ । আজকের টাকাটা হুদা সাহেব কারখানার এক দারোয়ানের কাছ থেকে ধার নিয়েছেন । বিপদের সময় গরীব মানুষের দারস্থ হলে, তারা কখনও ফিরিয়ে দেয় না । উপরন্ত উৎসাহ নিয়েই ধার দেয় । বিধাতা তাদের সাধ দিয়েছেন কিন্তু সাধ্য দেন নি । রুমু যে কিভাবে সংসার সামলাচ্ছে তা সেই জানে । হুদা সাহেব জানতে চান না ভয়ে । কিছুদিন আগে রুমুর বড় ভাই বেড়াতে এসেছিল । নিশ্চিত ছোট বোনের হাতে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে গিয়েছে । নিজের সংসারের অভাবের কথা বলে রুমু কখনও তাকে ছোট করবে না বড় ভাইয়ের কাছে, এতটুকু বিশ্বাস হুদা সাহেবের আছে । এত নেই নেই এর মাঝেও রুমুর একটু মুচকি হাসিতেই এই পৃথিবীর জান্নাত খুঁজে পান তিনি । রাতে হুদা সাহেবের ঘুম হয়না দুঃশ্চিন্তায়, কখন যে এই কারখানা আবার চালু করবে সরকার তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই । তিনি বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন । রুমু টের পেলেই তাকে ঘুমিয়ে যেতে বলে। তার স্নেহেই ঘুম আসে শেষমেশ । মিমুর ঘর থেকে মাঝরাতের পর থেকে গুনগুন শব্দ আসে, ছেলেটা নিশ্চিত ভালো রেজাল্ট করবে । অনেক মন দিয়ে পড়ছে । বাবুই গত কয়েক মাস ধরেই নতুন একটা স্কুল ব্যাগ আর জুতোর কথা বলছে । ক্লাসের সবাই বছরের শুরুতে নতুন ব্যাগ আর জুতো কিনেছে । শুধু বাবুই ছাড়া । হুদা সাহেব আজ এনে দিব, কাল এনে দিব এই করে সময় পার করছেন । এই কয়দিন হুদা সাহেব মেয়েটা ঘুমিয়ে যাবার পর ঘরে ফেরেন । ঘরে ফিরলেই মেয়েটা দৌড়ে আসে । তারপর হুদা সাহেবের খালি হাত দেখে মুখ কালো করে অন্যঘরে চলে যায় । রাতে তিনি মেয়েটার ঘরে যেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন । বাবুইয়ের চোখের এক পাশ অভিমানের কান্নার জলে তখনো ভিজে থাকে । ঘুমের মাঝেও মেয়েটা ফুফিয়ে ওঠে একটু পরপর । ৩ ভর দুপুর, গুমোট আকাশে বৃষ্টি আসি আসি করছে । হুদা সাহেবকে কয়েকজন লোক ধরাধরি করে নিয়ে আসছে । রুমু ছাদে ছিলেন, সেখান থেকেই এই দৃশ্য দেখে দৌড়ে নিচে নামলেন তিনি ।হুদা সাহেব চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন । অফিসের লোকজন নিচুস্বরে ফিসফিস করছে । রুমু কারন জানতে চাইলে তারা উত্তর দিলঃ স্যারের প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিল, ভাবী !কিন্তু তাদের কথার মাঝেই কেমন যেন মিথ্যের আভাস ছিল । রুমু হুদা সাহেবের পিওন পরশকে একপাশে ডেকে কি হয়েছিল জানতে চাইল । পরশের বয়স কম, ধমক দিয়ে কথা বলতেই হড়হড় করে বললঃ ‘আপনাদের ফ্রিজের কিস্তির টাকা নাকি দেন নাই গত চার মাস, ওই ফ্রিজের দোকানের মালিক এসে অফিসে স্যারের সাথে যাচ্ছেতাই আচরন করেছে । বলেছে দুই দিনের ভেতর কিস্তির টাকা না দিলে এরপর বাসায় যেয়ে অপমান করবে । স্যার মানী লোক, এই অপমান সহ্য করতে পারেন নাই । লোকটা চলে যাওয়ার পর মাথা ঘুরে অফিসেই পড়ে গিয়েছেন’ পরশ ফুপিয়ে উঠছে একটু পরপর ।সবাই চলে গেলে রুমু দরজা বন্ধ করে হুদা সাহেবের বুকে মাথা রাখল। রুমুর চোখের পানি হুদা সাহেবের বুকে পড়তেই হুদা সাহেব চোখ মেললেন । মধ্যবিত্তের একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন আত্মমর্যাদা, সেই কাঁচের দেয়ালে এতটুকু আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা তাদের নেই । রুমু অতিরিক্ত রাগে কথা বলতে পারছে না । তোতলাচ্ছে একটু পরপর । -তুমি আমাকে কেন বললে না, আজ কিস্তির দিন ছিল ? -বললে তুমি কি করতে ? ভাইয়ের প্রাসাদ থেকে টাকা ধার আনতে ? -তোমাকে কেউ অপমান করে কথা বললে আমি সহ্য করতে পারি না, জাননা ? তোমাকে ভাবী একটু ছোট করে কথা বলেছিল, এই জন্যে আমি গত চার বছর ধরে বাবার বাড়ি যাইনা । আর তুমি এমন একটা বিষয় আমার কাছ থেকে লুকালে ? -কি করব বল? কিছু করার ছিল না বউ । -ওঠ এখন, তুমি এখুনি ওই ফ্রিজের দোকানে গিয়ে পুরো টাকা পরিশোধ করে আসবে । -বিবিজান, টাকা কি মহামান্য আলাদিনের দৈত্য দিয়ে যাবেন ?রুমু হুদা সাহেবের হাতের মুঠোয় আলতো করে একটা ছোট শক্ত কিছু গুঁজে দিল । -কি?-যাও এটা বেচে এখুনি পুরো টাকা ছুড়ে মেরে আস ওই লোকের মুখে ।হুদা সাহেব হাতের মুঠো খুলেই আঁতকে উঠলেন । -তোমার শ্রী আংটি? -হ্যাঁ ! -এটা আমি দিয়েছিলাম বাসর রাতে তোমার মুখ দেখে । তুমি এটা বেচে ফেলতে বলছ ?একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে দামী উপহার এটা, তুমি জাননা ? রুমুর চোখে রাগ ঝরে পড়ছে । -বুঝলাম । ঠিক আছে, অন্য কিছু দাও, সেটা বিক্রি করে টাকা দিয়ে আসি । এই আংটিটা থাক । -অন্য কিছু নেই । অন্যদিকে তাকিয়ে রুমু জবাব দিল । -নেই মানে ? -তোমার বেতন নেই কয়মাস ? -তিন মাস প্রায় । -একটা সংসারের খরচ কত ? বাবুই আর মিমুর টিচারের খরচ কিভাবে চলে ? তার উপর মিমু আরও একটা নতুন একটা টিচারের কাছে যায় এখন। হুদা সাহেব চুপ হয়ে গেলেন । এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রুমুর দিকে। -রুমু ! -হুম ! -তুমি সব স্বর্ণ বিক্রি করে দিয়েছ? রুমু রেগে উত্তর দিলঃ তুমি যাবে এখন, নাকি আমি বাপের বাড়ি চলে যাব ছেলেমেয়ে নিয়ে ।হুদা সাহেব ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না, এই মেয়ের সাথেই এত বছর ধরে সংসার করলেন তিনি । যখন বিয়ে করেছিলেন, রুমু ছোট কিশোরী ছিল আর তিনি তরুন । বুঝতেই পারেন নি তার কিশোরী বউ কখন এত বড় হয়ে গেল । ৪ হুদা সাহেব হাঁটছেন, লক্ষ্যহীন নিরুদ্দেশ । যখন তিনি কিস্তির সব টাকা একসাথে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই ফ্রিজের দোকানের মালিকের চেহারা দেখার মত হয়েছিল । লোকটা স্যার স্যার , ভুল বুঝেছিলাম স্যার; করতে করতেই জান শেষ । হুদা সাহেব মুচকি হেসেই চলেছেন । আস্তে আস্তে হো হো করে হাসা শুরু করলেন তিনি । মাথার উপর দিয়ে একটা সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো রাস্তার একপাশে গিয়ে পড়ল । পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রিক্সা থেকেই ছুঁড়ে ফেলেছে কেউ । রিকশাটা বেশ আস্তে, হেলেদুলে চলছে । একজোড়া অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে হাসিতে গড়িয়ে পড়ছে । ছেলেটা মিমুর মতই দেখতে, কণ্ঠও শুনতে একই রকমই তো লাগছে প্রায় ।হুদা সাহেবের ঝাপসা লাগছে চারপাশ, চশমার কাঁচ ভিজে গিয়েছে বৃষ্টির ফোঁটায়, তাই হয়ত । বুকের মাঝে আবারো সেই দমবন্ধ করা অনুভূতি হচ্ছে, শ্বাস ফেলতে কেমন যেন কষ্ট হয় আজকাল । সেই ৫ বছর আগে অফিসে বুকে ব্যথা শুরু হলে ৭০০ টাকা ভিজিটের হার্টের ডাক্তার দেখিয়েছিলেন । ডাক্তার সাহেব প্রাইমারী একটা টেস্ট দিয়েছিলেন । টেস্টের রেজাল্ট দেখার পর ডাক্তার সাহেবের উদ্বিগ্ন চেহারাটা এখনও আবছা মনে আছে । এরপর হুদা সাহেব আর যাননি তার চেম্বারে । কি দরকার শুধু শুধু পয়সা নষ্ট করার । তাছাড়া বড় কোন অসুখ যদি ধরা পড়ে তাহলেই সেরেছে । এরচেয়ে এমনিতেই বেঁচে থাকা ভাল, যত দিন বেঁচে থাকা যায় । ৫ অনেক রাত হতে চলল হুদা সাহেব এখনো ঘরে ফেরেননি । বাবুই ঘুমিয়ে গিয়েছে, মিমু দরজা বন্ধ করে পড়ছে । রুমু জানালায় বসে তাকিয়ে আছে রাস্তায়, একমনে । মৃদু শীতল বাতাসে গা শির শির করছে । আজ ও ছাতা নিয়েও বের হয়নি । না ভুল হল, ছাতাতো ছিলই না । দুটো ছাতার একটা নিয়ে মিমু কলেজে গিয়েছেল আর একটা ভাঙ্গা শিক নিয়ে , কংকালের মত দেহ দেখিয়ে চুপচাপ রান্নাঘরের কোনায় পড়ে আছে । বরের পায়ের শব্দ শুনেই এগিয়ে গেল রুমু, চলে আসল কিভাবে চোখ ফাকি দিয়ে ? রুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে হুদা সাহেবের দিকে । হুদা সাহেবের চেহারা বিধ্বস্ত, চোখ লাল, মুখে মুচকি হাসি । সে হাসি দেখলে বুকের কোথাও হাহাকার করে ওঠে । হাতে একটা স্কুল ব্যাগ আর একজোড়া নতুন জুতো। হুদা সাহেব ঘরে ঢুকেই বাবুইয়ের রুমে গেল । মাথার কাছেই প্যাকেট গুলো রেখে ইশারায় জানতে চাইল মিমু কোথায় ? রুমু ইশারায় বোঝাল তার ঘরেই, পড়ছে । হুদা সাহেব মিমুর দরজায় কান পাতলেন । মিমু চাপা কণ্ঠে কথা বলছে মুঠোফোনে । সেই গুনগুনকে পড়ার শব্দ বলে ভুল হয় । হুদা সাহেব চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ভেবেছিলেন ছেলেটাকে সমস্ত দুঃখ কষ্ট থেকে দূরে রাখবেন, কিন্তু সেই সীদ্ধান্ত কি ভুল ছিল? সংগ্রামহীন জীবন ছেলেটাকে বাস্তবতা বিবর্জিত মানুষ হিসেবে বড় করেছে। থাক আজ এসব চিন্তা ভাবনা, অনেক দিন রুমুর সাথে রাত জেগে কথা বলা হয় না । বিয়ের পর কত নির্ঘুম রাত শুধু কথা বলেই কেটেছে । কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে যেত রুমু তার বুকে । তিনি জেগে থাকতেন শেষ রাত পর্যন্ত রুমুকে বুকে জড়িয়ে । প্রহরের প্রথম আলোতে রুমুকে অচেনা লাগত প্রতিদিন । রুমু গত দুই বছর ঈদে শাড়ি কিনেন নি, হুদা সাহেব ইস্ত্রি বিহিন দুটো শার্ট আর একটা প্যান্ট পড়ে অফিসে যাওয়া আসা করেন । শুধু সন্তানদের পড়ালেখার খরচ যোগাতে গিয়ে নিজেদের সমস্ত সাধ-আহলাদ সেই কখন কবর দিয়ে দিয়েছেন নিজেদের অজান্তে ! পৃথিবীতে দেনা পাওনার এই অসম সমীকরণের কোন সমাধান নেই । ৬ হুদা সাহেব আর রুমু চুপচাপ বারান্দায় বসে আছেন । ছাদে বসার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অতিসাবধান বাড়িওয়ালা ছাদের দরজায় তালা দিয়ে রেখেছেন । রাতের খোলা আকাশ দেখার স্বাধীনতা রুমুদের নেই । মধ্যবিত্তের এই বিলাসিতা তালাচাবি দিয়ে বন্ধ । একটু পরপর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিঃশ্বাসের শব্দে কথা হচ্ছে দুজনার । রুমুর হাতটা হুদা সাহেব বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন । রুমুর অনামিকায় একটা ছোট বকুল ফুলের আংটি । রুমুর চোখের জল নীরবে সেই ছোট্ট ফুলটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে । হুদা সাহেব ও রুমু ছাড়া এই আংটি আর কারো কাছেই মূল্যবান নয় । পৃথিবী এই শ্রী আংটির মূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now