বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
গ্রামের নাম ছিল শালবন। সবুজে ঘেরা, শান্ত-সৌম্য এক জনপদ। এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিল রাশেদ—অসাধারণ মেধাবী এক ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তার চোখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্ন পূরণে তার চেষ্টা ছিল অক্লান্ত। স্কুলে সে সবসময় প্রথম হতো, শিক্ষকরা তাকে নিয়ে গর্ব করতেন, আর সহপাঠীরা তাকে অনুসরণ করত। কিন্তু এই প্রশংসার বৃষ্টিতেই অজান্তেই তার ভিতরে জন্ম নিতে শুরু করেছিল এক অদৃশ্য বীজ—অহংকারের বীজ।
সময় গড়াতে লাগলো। রাশেদ কলেজে উঠলো, তারপর শহরের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। সেখানেও সে নিজের মেধার ছাপ রেখে দিলো। কিন্তু এবার তার ভেতরের পরিবর্তনটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো। আগে যে ছেলেটি বন্ধুদের পাশে দাঁড়াত, তাদের সমস্যায় সাহায্য করত, এখন সে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করলো। তার কথাবার্তায় আসতে লাগলো এক ধরনের তাচ্ছিল্য। সে মনে করতে লাগলো—এই পৃথিবীতে তার মতো মেধাবী আর কেউ নেই।
একদিন তার পুরনো বন্ধু সোহেল শহরে এসে তার সাথে দেখা করতে চাইল। সোহেল ছিল রাশেদের স্কুল জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যে রাশেদের সাফল্যে সবসময় খুশি হতো। কিন্তু যখন সোহেল তার সাথে দেখা করতে এলো, রাশেদ তাকে তেমন গুরুত্ব দিলো না। ব্যস্ততার অজুহাতে দ্রুত বিদায় করে দিলো। সোহেল কিছু না বললেও তার চোখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কিন্তু রাশেদ তা দেখার মতো সংবেদনশীলতা তখন আর রাখেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে রাশেদ একটি বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেলো। অল্প সময়ের মধ্যেই সে পদোন্নতি পেয়ে উঁচু পদে পৌঁছে গেলো। তার অধীনে অনেক কর্মচারী কাজ করতো। কিন্তু সে কখনো তাদের সম্মান দিয়ে কথা বলতো না। সামান্য ভুল হলেই সে তাদের অপমান করতো। তার আচরণে সবাই ভীত থাকলেও, কেউ তাকে ভালোবাসতো না। অফিসে তার উপস্থিতি মানেই ছিল এক ধরনের চাপা আতঙ্ক।
রাশেদ নিজের সাফল্যে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিল যে সে বুঝতেই পারেনি, সে ধীরে ধীরে সবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু রইলো না, সহকর্মীরা তাকে এড়িয়ে চলতে লাগলো, এমনকি পরিবারের সাথেও তার দূরত্ব তৈরি হলো। মা ফোন করলে সে বিরক্ত হয়ে কথা বলতো, বাবার উপদেশ শুনতে তার ভালো লাগতো না। সে ভাবতো—তারা তার অবস্থান বুঝতে পারে না।
একদিন অফিসে একটি বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো রাশেদকে। এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিন্তু এবার তার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তার জন্য বিপদ ডেকে আনলো। সে অন্যদের মতামতকে গুরুত্ব দিলো না, নিজের সিদ্ধান্তকেই সঠিক মনে করলো। তার টিমের সদস্যরা কয়েকবার সতর্ক করলেও সে তাদের কথা শুনলো না। ফলাফল হলো ভয়াবহ—প্রকল্পটি ব্যর্থ হলো, কোম্পানির বড় ক্ষতি হলো।
এই ব্যর্থতার পর প্রথমবারের মতো রাশেদ নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য হলো। তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার উপর আস্থা হারিয়ে ফেললেন। সহকর্মীরা মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে তার পতন দেখে এক ধরনের স্বস্তি পেলো। কারণ এতদিনের অবহেলা আর অপমানের প্রতিশোধ যেন তারা নীরবে পেয়ে গেলো।
সেই রাতে রাশেদ একা বসে ছিল তার ফ্ল্যাটে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ তার মনে পড়লো সোহেলের কথা, মায়ের মমতার কথা, বাবার উপদেশ। সে বুঝতে পারলো—সে আসলে কতটা একা হয়ে গেছে। তার এত অর্জন, এত সাফল্য—সবই যেন অর্থহীন মনে হতে লাগলো। সে উপলব্ধি করলো, সে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে গিয়ে নিজের চারপাশের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে।
পরদিন সকালে সে গ্রামে ফিরে গেলো। অনেকদিন পর সে তার মায়ের সামনে দাঁড়ালো। মা তাকে দেখে প্রথমে অবাক হলেন, তারপর জড়িয়ে ধরলেন। সেই স্পর্শে রাশেদের চোখ ভিজে উঠলো। সে বুঝতে পারলো—এই ভালোবাসা কখনো বদলায় না, কখনো অহংকার করে না।
সে সোহেলের কাছেও গেলো। লজ্জায় মাথা নিচু করে বললো, “বন্ধু, আমি ভুল করেছি।” সোহেল মৃদু হেসে বললো, “ভুল করলে মানুষ ছোট হয় না, ভুল বুঝতে না পারলে ছোট হয়।” এই কথাগুলো রাশেদের হৃদয়ে গভীরভাবে আঘাত করলো, কিন্তু সেই আঘাত ছিল জাগরণের।
ধীরে ধীরে রাশেদ নিজের আচরণ পরিবর্তন করতে শুরু করলো। অফিসে ফিরে গিয়ে সে সহকর্মীদের সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলা শুরু করলো, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিলো। প্রথমে সবাই অবাক হলেও পরে তার পরিবর্তন দেখে তারা তাকে নতুনভাবে গ্রহণ করতে শুরু করলো।
রাশেদ বুঝতে পারলো—সত্যিকারের বড় হওয়া মানে শুধু সাফল্য অর্জন নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। অহংকার তাকে সাময়িকভাবে উঁচুতে তুলেছিল, কিন্তু বিনয়ই তাকে স্থায়ী সম্মান এনে দিলো।
শেষ পর্যন্ত রাশেদ শিখে গেলো একটি বড় সত্য—আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন যতই বড় হোক না কেন, মাটির সাথে সম্পর্ক না থাকলে সেই উচ্চতা টিকে না। আর সেই মাটির নামই হলো বিনয়, ভালোবাসা আর মানবিকতা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now