বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যুদ্ধ শুরু হয়নি

"যুদ্ধের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। রাত তখন সাড়ে দশটা। শহরের ওপর নেমে এসেছে এক ধরনের গুমোট নীরবতা। আষাঢ়ের শেষ দিকে এমনিতেই বাতাসে একটা অদ্ভুত ভারী ভাব থাকে। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো, কিন্তু বৃষ্টি নামল না। ধর্মনগরের ছোট্ট বাজারের মোড়ে থাকা চায়ের দোকানগুলো তখন বন্ধ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দোকানদাররা শেষবারের মতো হিসাব মিলাচ্ছে, কেউ চায়ের কেটলি ধুচ্ছে, কেউ দিনের বিক্রি গুনছে। ঠিক সেই সময়, শহরের প্রায় সব মানুষের মোবাইলে একসঙ্গে ঢুকল একটি ভিডিও। ভিডিওর শুরুতে আগুনে জ্বলতে থাকা একটি শহর। তার ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা— “আজ রাতেই শুরু হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।” তারপর দ্রুত পাল্টাতে থাকা ছবি—বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, মানুষের চিৎকার, কালো ধোঁয়া। পেছনে উত্তেজনাপূর্ণ সুর। শেষে একটি কণ্ঠস্বর বলল, “বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরো পৃথিবীতে জরুরি অবস্থা জারি হবে। যত দ্রুত সম্ভব খাদ্য, টাকা ও প্রয়োজনীয় জিনিস মজুত করুন।” ভিডিওটি প্রথমে শেয়ার করেছিল শহরের এক জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ—‘ধর্মনগরের খবর’। তারপর এক মিনিটের মধ্যে সেটি হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইমো, টেলিগ্রাম—সবখানে ছড়িয়ে পড়ল। রবিউল প্রথম ভিডিওটা দেখে তার স্ত্রীর দিকে তাকাল। —শুনছ? যুদ্ধ লেগে গেছে নাকি! তার স্ত্রী জুঁই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ফোনটা হাতে নিল। কয়েক সেকেন্ড দেখেই তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। —আমাদের তো বাসায় মাত্র দুই কেজি চাল আছে! পাঁচ মিনিটের মধ্যে রবিউল বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল বাজারে। শুধু সে নয়। শহরের আরও শত শত মানুষ বেরিয়ে পড়ল। মুদি দোকানের সামনে লাইন। এটিএম বুথে লাইন। ফার্মেসিতে লাইন। সবাই যেন হঠাৎ বিশ্বাস করে ফেলেছে—আজ রাতের পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না। কেউ পাঁচ কেজি নয়, পঞ্চাশ কেজি চাল কিনছে। কেউ তিন মাসের ওষুধ। কেউ ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিচ্ছে। কেউ আবার দোকানদারের সঙ্গে ঝগড়া করছে— —দাম বাড়াইছেন কেন? দোকানদার নিজেও আতঙ্কিত। সে-ও ভিডিওটা দেখেছে। সে-ও মনে করছে, যদি সত্যিই যুদ্ধ হয়, তাহলে কাল থেকে আর কিছু পাওয়া যাবে না। তাই সে দাম বাড়িয়েছে। রাত এগারোটার মধ্যে শহরের প্রায় সব দোকান ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু একটি বাড়িতে তেমন কোনো হইচই ছিল না। শহরের পুরোনো স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল কাইয়ুমের বাড়ি। বয়স প্রায় সত্তর। চশমার কাচ মোটা। হাঁটতে লাঠি লাগে। কিন্তু মাথা এখনো পরিষ্কার। তিনি বসেছিলেন বারান্দায়, হাতে পুরোনো একটা বই। এমন সময় তার নাতনি মিথিলা দৌড়ে এল। —দাদু! যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! মা বলছে, কাল থেকে স্কুল থাকবে না! কাইয়ুম সাহেব চশমার ওপরে দিয়ে তাকালেন। —কে বলল? —সবাই বলছে। ফোনে এসেছে। মিথিলা ফোনটা এগিয়ে দিল। কাইয়ুম সাহেব ভিডিওটা দেখলেন। তারপর আরেকবার দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, —এই ভিডিওতে একটা কথাও প্রমাণসহ বলা হয়নি। —মানে? —মানে, ভয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সত্যি কি না, সেটা কেউ যাচাই করেনি। মিথিলা কিছু বুঝল না। —কিন্তু সবাই তো বলছে! কাইয়ুম সাহেব মৃদু হেসে বললেন, —একসময় সবাই বলত সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। তাই বলে কি সেটা সত্যি ছিল? মিথিলা চুপ করে গেল। এদিকে শহরের অন্য প্রান্তে আরও বড় বিপদ ঘটল। একটি গুজব ছড়াল—ব্যাংক কাল থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের সামনে বিশাল ভিড়। কেউ ঠেলাঠেলি করছে, কেউ চিৎকার করছে। একজন বৃদ্ধ পড়ে গেলেন। কেউ তাকে তুলল না। সবাই শুধু নিজের টাকা তুলতে ব্যস্ত। আরেকটি গুজব এল—মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সবাই আত্মীয়স্বজনকে ফোন করা শুরু করল। নেটওয়ার্ক ব্যস্ত হয়ে গেল। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারল না। এতে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল। রাত বারোটার সময় শহরের মসজিদের মাইকে ঘোষণা এল— “সবাই শান্ত থাকুন। গুজবে কান দেবেন না।” কিন্তু তখন আর কেউ শুনছে না। ভয় যখন মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, তখন সে আর শব্দ শোনে না; শুধু নিজের কল্পনার আওয়াজ শোনে। পরদিন সকাল। শহরে অদ্ভুত এক দৃশ্য। বাজারের অর্ধেক দোকান বন্ধ। খোলা দোকানগুলোর সামনে ভিড়। চাল নেই। তেল নেই। শিশুখাদ্য নেই। যাদের টাকা ছিল, তারা অনেক কিছু কিনে রেখেছে। যাদের টাকা ছিল না, তারা খালি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মিনা বেগম তার ছয় বছরের ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মুদি দোকানের সামনে। —একটু দুধ দেন ভাই। —শেষ। —একটু চিনি? —শেষ। —একটু চাল? —শেষ। মিনা বেগম হতাশ চোখে ফিরে যাচ্ছিলেন। এমন সময় দেখলেন, পাশের বাড়ির রবিউল তার ঘরে দশ বস্তা চাল তুলছে। মিনা বেগমের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, —আমরা পাইনি কেন? মিনা বেগম উত্তর দিতে পারলেন না। দুপুরের দিকে শহরের কলেজ মাঠে মানুষ জড়ো হতে শুরু করল। কারণ, সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হবে। মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল কাইয়ুম। তার পাশে মিথিলা। মাঠে মানুষের মুখে শুধু একটাই কথা— —যুদ্ধ কি সত্যি শুরু হয়ে গেছে? —আমরা কি নিরাপদ? —দেশ ছাড়তে হবে নাকি? একটু পর মাইকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এলেন। তিনি কাগজ হাতে নিয়ে বললেন, —আপনাদের যে ভিডিওটি দেখানো হয়েছে, সেটি ভুয়া। ভিডিওর ছবিগুলো বিভিন্ন দেশের পুরোনো যুদ্ধের ফুটেজ থেকে জোড়া লাগানো। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মানুষের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। —তাহলে? —সব মিথ্যা? —কিন্তু এত মানুষ শেয়ার করল কেন? কাইয়ুম সাহেব তখন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলেন। তিনি মাইক্রোফোন চাইলেন। প্রথমে কেউ দিতে চাইল না। তারপর তাকে চিনে একজন বলল, —স্যার কিছু বলবেন। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, —গতকাল রাতে আমাদের শহরে যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছি। সবাই চুপ। —আমরা একে অন্যের ওপর ভরসা হারিয়েছি। আমরা যাচাই না করে বিশ্বাস করেছি। আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনেছি, যাতে অন্যের প্রয়োজন মেটেনি। আমরা গুজবকে সত্যি ভেবেছি, আর সত্যিকে অপেক্ষা করতে দিইনি। তিনি একটু থামলেন। —আমি ছোটবেলায় এক গল্প শুনেছিলাম। এক গ্রামে একজন লোক প্রতিদিন চিৎকার করত—বাঘ এসেছে! সবাই দৌড়ে যেত। পরে দেখা যেত, বাঘ আসেনি। একদিন সত্যি সত্যি বাঘ এল। কিন্তু তখন আর কেউ বিশ্বাস করল না। তিনি চারদিকে তাকালেন। —এখন আমরা উল্টো অবস্থায় আছি। বাঘ না এলেও আমরা বিশ্বাস করে ফেলছি যে বাঘ এসেছে। কারণ, আমরা ভয় পেতে শিখেছি; কিন্তু ভাবতে শিখিনি। মাঠে নিস্তব্ধতা। কাইয়ুম সাহেব আবার বললেন, —সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হয় না। হয় মানুষের মাথার ভেতরে। যখন ভয় যুক্তিকে হারিয়ে দেয়, তখন মানুষ নিজের প্রতিবেশীর চালও কেড়ে নেয়। একজন যুবক উঠে দাঁড়াল। —স্যার, তাহলে আমরা কী করব? —প্রথমে থামব। তারপর ভাবব। তারপর যাচাই করব। কোনো খবর দেখলেই শেয়ার করব না। নিজেকে প্রশ্ন করব—আমি কি নিশ্চিত? যদি নিশ্চিত না হই, তাহলে বলব—আমি জানি না। মাঠের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রবিউল মাথা নিচু করে ফেলল। সকালে সে দেখেছে, তার বাড়িতে মজুত করা চালের অর্ধেকই নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ পাশের বাড়ির মানুষ খাবার পায়নি। সে বাড়ি ফিরে গেল। বিকেলে মিনা বেগমের দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুলতেই সে বলল, —ভাবি, একটু চাল নিবেন? মিনা বেগম অবাক। —কত? —যত লাগে। সেদিন সন্ধ্যায় শহরের অনেক মানুষ তাদের বাড়তি জিনিস অন্যদের দিয়ে দিল। কেউ চাল, কেউ দুধ, কেউ ওষুধ। আর কাইয়ুম সাহেব তার বাড়ির সামনে একটা ছোট ব্ল্যাকবোর্ড টাঙিয়ে লিখলেন— “খবর শেয়ার করার আগে তিনটি প্রশ্ন করুন— ১. এটা কি সত্য? ২. আমি কি নিশ্চিত? ৩. এটা শেয়ার করলে উপকার হবে, নাকি ভয় বাড়বে?” পরদিন স্কুল খুলল। বাজারও খুলল। মানুষ আবার কাজে ফিরল। কিন্তু শহরের মানুষ আগের মতো রইল না। মিথিলা স্কুলে গিয়ে তার বন্ধুদের বলল, —জানো, যুদ্ধ শুরু হয়নি। বন্ধুরা হাসল। —তাহলে সবাই এত ভয় পেল কেন? মিথিলা একটু ভেবে বলল, —কারণ, ভয় খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে। কিন্তু সত্য হাঁটে। সে থামল। তারপর দাদুর কথা মনে করে আবার বলল, —তবু শেষ পর্যন্ত সত্যই পৌঁছে যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now