বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রহস্যময় আলুটিলা সুড়ঙ্গ

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম - মাজহারুল মোর্শেদ গল্মাপের নাম - রহস্যময় আলুটিলা সুড়ঙ্গ সাজেকভেলি ও কংলাক পাহাড়ের সেই মায়াময়ী সৌন্দর্যের মুগ্ধতার ঘোর কাটতে না কাটতে আমরা ফিরে এলাম আর এক অপরূপ সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। গা শিহরে ওঠার মতো অনুভূতি নিয়ে পাহাড়ি সুড়ঙ্গ পথ বেয়ে অন্ধকার পাতালে নেমে যাওয়া কল্পনার বিষয় হলেও আলুটিলার সুড়ঙ্গ পথ কল্পনার কিছু নয়। আলুটিলা কেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এর ‘রহস্যময় সুড়ঙ্গ’। ইন্টারনেটের তথ্যমতে খাগড়াছড়ির ‘আরবারী’ পর্বতমালার অন্যতম ব্যতিক্রমী পর্যটনকেন্দ্র আলুটিলার‘রহস্যময় সুড়ঙ্গ’। স্থানীয়রা একে বলে ‘মাতাই হাকড়’ বা দেবতার গুহা। ত্রিপুরা ভাষায় ‘মাতাই’ শব্দের অর্থ দেবতা আর ‘হাকর’ শব্দের অর্থ গুহা বা সুড়ঙ্গ। মাতাই হাকর অর্থ দেবতার গুহা বা সুড়ঙ্গ। পাহাড়ের পাদদেশে পাথর আর শিলা মাটির ভাঁজে গড়া এ রহস্যময় সুড়ঙ্গ। লোকমুখে শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খাগড়াছড়িতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে এখানকার জনগণ এ পর্বত থেকেই বুনো আলু সংগ্রহ করে তা খেয়ে বেঁচে থাকতো। তারপর থেকে এ পর্বতটি আলুটিলা নামেই পরিচিতি লাভ করে। যদিও আমাদের গন্তব্য ছিলো রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই লেক। কিন্তু পথের ধারেই এ রকম একটা ঐতিহাহিক রহস্যময় পর্বতগুহাকে না দেখে কিছুইতেই মন এগোচ্ছিলো না। গাড়ির ড্রাইভার আব্দুর রহিম আমাদের জানালো যে- সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ‘তিন হাজার’ ফুট উঁচু এই পর্বতটি খাগড়াছড়ি থেকে সাত-আট কিলোমিটার পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় পড়েছে। এখান থেকে সম্পূর্ণ খাগড়াছড়ি শহরটাকে দেখা যায়। আমরা বললাম, তাহলে আর কোন কথা নয় ভাই তুমি গাড়ি ঘোরাও সেদিকে। চান্দের গাড়ি, পুরোটাই খোলা কোন ছাদ নেই। শোঁ-শোঁ করে চলছে আমাদের গাড়ি। অন্যান্য পাহাড়ের মতো এটি খাড়া উঁচু নয় বলে গাড়ি চলতে তেমন বেগ পাচ্ছে না। পাহাড়ের একেবাড়ে কাছা কাছি এসে পড়েছি বলে এখন গাড়ির গতিবেগ আপনা আপনি কমে গেলো। পাহাড়ের প্রবেশ মুখে হাতের ঠিক বামে বিড়াট একটি ফলকে এর ইতিহাস লেখা দেখলাম, আমি সাথে সাথে এর ছবি নিয়ে নিলাম। এতে লেখা আছে-আলুটিলার পূর্বের নাম ছিলো ‘আরবারী’ পর্বত। এ পর্বতমালার অন্যতম দিক হচ্ছে পাহাড়ে অনেক বুনো আলু পাওয়া যেত যা খেয়ে স্থানীয় মানুষ নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছিলো। তাই এর নাম আলুটিলা হয়েছে। যেহেতু আলুটিলার রহস্যময় গুহার জন্য এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে ও আকর্ষণীয় হয়েছে তাই এটি আলুটিলা পর্বত নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে। চেঙ্গী নদীর তীরে আলুটিলার গা ছমছমে গুহায়! “ক্লান্ত পথিক ক্ষনেক বসিও, আলুটিলা বটমূলে নয়ন ভরিয়া দেখিও মোরে, চেঙ্গী নদীর কূলে”। আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আলুটিলার মূল ফটকের সামনের বটমূলে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে কবিতার এ কয়টি পঙক্তি। জেলা প্রশাসন পঙক্তিগুলো দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছে দূর-দূরান্তের পর্যটকদের। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর ক্লান্ত পথিক প্রæথমেই খানিক জিরিয়ে নেয় শতবর্ষী এই বটমূলে। আমাদের গাইড আব্দুর রহিম জানালো যে- চেঙ্গী নদীর তীরে আলুটিলার পাহাড়ের প্রকৃতিক দৃশ্য আগের মতো নেই, এখন পুরোটাই ভিন্ন। পর্যটন কতৃপক্ষ, পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে সম্পূর্ণ নতুন রূপে সাজানো হয়েছে এখানকার চারপাশ। বৌদ্ধ স্থাপত্যে গড়া দৃষ্টিনন্দন তোরণ পার হলেই দুই পাহাড় নিয়ে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রের শুরু থেকে গুহা সব খানে এসেছে নতুনত্ব ও নান্দনিকতার ছোঁয়া। পাহাড় প্রকৃতির নতুন এই রূপ দেখতে আগে যারা এসেছেন তারাও আবার ফিরে আসছেন। মূল ফটক পেরিয়ে নয়নাভিরাম হাঁটাপথ কিছুটা এগুতেই চোখে পড়লো অনিন্দ্য সুন্দর এক সেতু। এ পাশে পাহাড় ওই পাশে আরেক পাহাড় মাঝে গিরিখাত। সেতুটি সঙ্গম করিয়েছে দুই প্রন্তের পাহাড়কে। সেতুর ওপর থেকে তাকিয়ে নিচের দিকটা দেখলে গা যেন শিউরে ওঠে। সেতুটি পার হতেই গোলচত্বর। কি ছিলো, কি হয়েছে। আলুটিলার রূপ! শুভ্রতায় যেন চার পাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। পাহাড়ের ধাপ কেটে তৈরি করা হয়েছে সিঁড়ি। তৈরি করা হয়েছে সুদৃশ্য বসার জায়গা। যেখানটায় বসে দর্শনার্থীরা এক সঙ্গে দেখছেন পাহাড় সেই সঙ্গে এক পলকে দেখে নিচ্ছেন চেঙ্গী নদী পাড়ের জনপদ খাগড়াছড়ি। একসময় প্রাকৃতিক গুহাটি আলুটিলার একমাত্র আকর্ষণ থাকলেও এখন দুই পাহাড়ের চারপাশে ছড়িয়ে আছে নান্দনিকতা। পুরো অঙ্গনে যেন মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে। আমাদের গাইড আব্দুর রহিম জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬শ’ ফুট উঁচু পাহাড়ে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের অবস্থান। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের অন্যতম আকর্ষণ ‘লাভ ব্রিজ’ দুই পাহাড়কে যুক্ত করতে তৈরি করা হয়েছে ১৮৪ ফুট দীর্ঘ লোহার এই সেতু (ক্যাবল ব্রিজ)। এই সেতুতে আছে কাঁচের বারান্দা। কাঁচের বারান্দা দিয়ে নিচে তাকালে এক অন্যরকম দৃশ্যের দেখা মেলে। গাইড আমাদেরকে পাহাড়ের বাঁ দিকে সড়ক ধরে এগিয়ে নিয়ে চললো অল্প কিছুক্ষণ হাঁটার পর চোখে পড়লো প্রাকৃতিক গুহা ও ভিউ পয়েন্ট। গাইড আমাদেরকে এও জানালো যে, ডান দিকের সড়ক ধরে অল্প কিছুদূর এগোলেই দেখা যাবে পর্যটন কতৃপক্ষের তৈরি করা ভিউ পয়েন্ট ‘কুঞ্জছায়া’। কিন্তু আমাদের মন পড়ে ছিলো গা ছমছম রহস্যময় সুড়ঙ্গের দিকে। পাহাড়ের চূড়া থেকে সিঁড়ির নিচে আলুটিলা পাহাড়ের পাদদেশে পাথর আর শিলা মাটির ভাঁজে গড়া এ রহস্যময় সুড়ঙ্গের অবস্থান। পাহাড়ের ঢালে সিঁড়ি বেয়ে আমরা নামছি নিচের দিকে। নামছিতো নামছি পথ যেন শেষই হচ্ছে না। কিছুদূর যাওয়ার পর চোখে পড়লো একটি বিশাল শতায়ূবর্ষী বটগাছ শিকড়-বাকল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চার পাশে। এ গাছটি হাজারো পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। মূল বটগাছটি থেকে নেমে আসা প্রতিটি ঝুড়িমূল কালের পরিক্রমায় এক একটি নতুন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। আশ্চর্য্যরে বিষয় ঝুড়িমূল থেকে সৃষ্ট প্রতিটি বটগাছ তার মূল গাছের সাথে সন্তানের মতো জড়িয়ে আছে। কথিত আছে এ বটবৃক্ষের নীচে বসে শীতল বাতাস গায়ে লাগালে মানুষও শতবর্ষী হয়। আরেকটু হাঁটার পর চোখে পড়লো এক পাহাড়ি কিশোর বসে আছে লাঠি নিয়ে। পাহাড়ে হাঁটতে যাদের কষ্ট হয় তারা এই কিশোরের কাছে লাঠি কিনে নিয়ে তাতে ভর করে খুব সুন্দর ভাবে হেঁটে হেঁটে এখানকার প্রকৃতিক সৌনন্দর্য উপভোগ করছি। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখা গেলো আলুটিলার গুহামুখ। গুহায় প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। আমরা টিকিট কিনে চারপাশের প্রাকুতিক সৌন্দর্য উপভোক করছি। চারিদিকেই বেশ উঁচু-নিচু রাস্তা। পর্যটন কতৃপক্ষ পর্যটকদের সুবিদার্থে ছোট ছোট সিঁড়ি করে দিয়েছেন। এই পাহাড়ে বন্য প্রাণিদের খুব বেশি চোখে পড়লোনা। হয়তো পর্যটকদের ভয়ে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। এতসব নতুন নান্দনিকতা যোগ হলেও এখনো এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো প্রাকৃতিক শীতল গুহাটি। এখানে আসা পর্যটকদের অনেকে ভয়ে গুহার ভেতরে ঢোকেন না, আবার কেউ সাহস করে ঢুকে পড়েন। আমাদের দলটা বেশ ভাড়ি হওয়ায় কারও মনে সাহসের অভাব নেই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে সম্মুখে গুহামুখ। কাছে যেতে সত্যি-সত্যি গা ছম ছম করে উঠলো। মিনিট কয়েক হাঁটার পর অন্ধকার যেন আরো প্রকট হচ্ছিলো। মুখে হাসি থাকলেও মনের মধ্যে নানা ভয় বাসা বাঁধতে লাগলো। অন্ধকার সাপ-বিচ্চুর ভয়। আবার মনে মনে এটাও ভাবছিলাম যে, সত্যি-সত্যি পাহাড়টা যদি ভেঙে মাথার ওপর পড়ে যায়, হায় আল্লাহ! সামনের দিকে যতোই এগোচ্ছি, সারা শরীর যেন শীতল হয়ে যাচ্ছে। পুরো গুহোটাই ঘুটঘুটে অন্ধকার, আলোর বালাই নেই। পাথুরে গুহার ওপর দিক থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে পানি পড়ছে, নিচ দিয়ে বইছে শীতল জলধারা। খুব সাবধানে পা ফেলে সামনে এগোচ্ছি আমরা, কারণ সুড়ঙ্গের তলদেশে অনবর্ত পানি থাকায় বেশ পিচ্ছিল মনে হচ্ছে। আমাদের সঙ্গে আরোও অনেক পর্যটক আছেন যারা টর্চরাইট নিয়ে এসেছেন আমরা মোবাইলে ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে পথ এগোচ্ছি। তবে মজার ব্যাপার হলো-সবার হাতে হাতে আলোর মশাল দেখে পুরো গুহাটাই যেন গোধুলি সন্ধ্যার জোনাকিদের স্বর্গরাজ্য বলে মনে হচ্ছে। কয়েক মিনিট হাঁটার পর গুহার অপর প্রান্তে সূর্যের আলো চোখে পড়ছে। এবার বুকে কিছুটা বল এলো, স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে এলো, প্রাণটা যেন বেঁচে গেলো। গুহা থেকে বেরিয়ে দেখি দুই পাহাড়ি কিশোর-কিশোরী শশা বিক্রি করছে। আমরা তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পাহাড়ি কিশোরী ভাঙা-ভাঙা বাংলায় বললো- স্যার ছছা খাবেন? দেব না কি দু’টো? আমরা সবাই একটা করে শশা নিয়ে খেতে খেতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি কিন্তু মন থেকে গুহার সেই কয়েক মিনিটের স্মৃতিকে কোন ভাবেই মন থেকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না। আমাদের গাইড আব্দুর রহিম জানালো, এখান থেকে প্রায় ৩কিঃ মিঃ পশ্চিমে খাগড়াছড়ি-মাটিরাঙ্গা সড়ক হতে বাম পার্শ্বে ১কিঃ মিঃ দক্ষিণে আলুটিলার ঝরনা বা রিছাং ঝরনা আছে। মারমা ভাষায় এর নাম রিছাং ঝরনা, ‘রি’ শব্দের অর্থ পানি আর ‘ছাং’ শব্দের অর্থ গড়িয়ে পড়া। রিছাং ঝরনা নাম করণ যে মারমা উপজাতিই করেছে এ থেকেই সেটা বোঝা গেলো। মূল সড়ক হতে রিছাং ঝরনা যাওয়ার পথে চারিদিকের পাহাড়ি প্রকৃতি মনের মাঝে এক অনুপম অনুভূতির সৃষ্টি করে। ইচ্ছে করে প্রকৃতির মাঝেই কাটিয়ে দিই সারাক্ষণ। ঝরনার সমগ্র যাত্রা পথটাই দারুণ রোমাঞ্চকর। যাত্রাপথে দূরের উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, বুনোঝোঁপ, নামহীন রঙিন বুনোফুলের নয়নাভিরাম অফুরন্ত সৌন্দর্য্য যে কাউকে কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যায়। ঝরনার কাছে গেলে এক পবিত্র স্নিগ্ধতায় দেহমন ভরে উঠে। ২৫-৩০ হাত উঁচু পাহাড় থেকে আছড়ে পড়ছে ঝরনার জলরাশি, ঢালু পাহাড় গড়িয়ে নিচে মেমে যাচ্ছে এই প্রবাহ। আমরা ছাড়াও অনেক পর্যটক এখানে এসেছেন ঝরনার শীতল পানিতে গা ভিজিয়ে প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে যেতে। ঝরনা ছেড়ে মন চায় না ফিরে আসতে কোলাহল মূখর জনারণ্যে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now