বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

চিরনিদ্রার বাগানে একদিন

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ ডিসেম্বরে বাতাসে এক ধরনের আলাদা শীতের ছোঁয়া থাকে—মৃদু, কোমল, কিন্তু স্মৃতির স্তর জাগিয়ে তোলার মতো গভীর। বাতাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই শীতের সকালেই প্রস্তুত হয়েছিল শিক্ষা সফরের জন্য। তারিখ ০৯ ডিসেম্বর। ভোরের আলো ফোটার আগেই স্কুলের মাঠে জড়ো হয় সবাই। কেউ উত্তেজনায় জানালার পাশে বসার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, কেউ জলখাবারের প্যাকেট আঁকড়ে ধরে আছে যেন সফরের সাথী হলো কোনো গুপ্তধন। শিক্ষকদের মুখেও সেই দিনের সহজস্বাভাবিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে একটু অন্য রকম উচ্ছ্বাস—কারণ এই শিক্ষা সফরের গন্তব্য শুধু বেড়ানোর জায়গা নয়, অতীতের গভীর এক ইতিহাসের দরজা, যার নাম ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। বাসটি যখন কুমিল্লা শহর পেরিয়ে ময়নামতির দিকে এগোতে লাগল, জানালার দু’পাশে ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট। সমতল থেকে ওঠানামা করা ছোট ছোট পাহাড়, দূরে জঙ্গলের পাতার মৃদু দোল, মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে এক-দুইটি পুরনো চায়ের দোকান—সব মিলিয়ে যেন ঐতিহাসিক কোনো উপত্যকার দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প জানত, কেউ আবার শুধু নাম শুনেছে ইতিহাস বইয়ের পাতায়, কিন্তু প্রকৃত পরিপ্রেক্ষিত তাদের কেউই ঠিকভাবে কল্পনা করতে পারেনি। তাই সবার চোখে কৌতূহলের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। টিপরা বাজারের কাছাকাছি এসে বাসটি ধীরে ধীরে থামল। পাহাড়ি ঢিবির মাঝখানে বিস্তৃত নীরব এক জায়গা—ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, প্রায় ৪.৫ একর ভূমির ওপর ছড়িয়ে থাকা চিরশান্তির অঞ্চল। প্রবেশদ্বার পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই যে দৃশ্যটি সামনে ভেসে উঠল, তা এক অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি করল—সবুজ কার্পেটের মতো সাজানো ঘাসের ওপর সারিবদ্ধ কবরগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেন নিস্তব্ধ সৈনিকদের অসীম শৃঙ্খলা। বাতাসে মৃদু শীত, আর গাছের পাতার দোলায় সূর্যের আলো এসে পড়ছে সমাধিফলকের ওপর। শব্দ বলতে শুধু দূরের কোনো পাখির ক্ষীণ ডাকা। শিক্ষার্থীরা প্রথমে একটু বিমূঢ় হয়ে গেল। এত নিখুঁতভাবে সাজানো, এত শান্ত, এত পরিচ্ছন্ন—মনে হচ্ছিল যেন কোনো বাগান, অথচ প্রতিটি ফুলের নিচে ঘুমিয়ে আছে একেকটি ইতিহাস, একেকটি জীবন, যুদ্ধের ছিন্নভিন্ন বাস্তবতা। শিক্ষকরা ধীরে ধীরে তাদের কাছে এগিয়ে গেলেন এবং ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন—এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৩৭ জন সৈন্য শায়িত আছেন। কেবল সৈন্যই নয়, রয়েছে জাপানি ২৪ জন যুদ্ধবন্দি, আর একজন বেসামরিক ব্যক্তি, যাদের গল্প পৃথিবীর বড়-বড় ইতিহাস বইয়ের পাতায় লেখা থাকলেও এই সমাধিক্ষেত্রেই তারা পেয়েছে চূড়ান্ত বিশ্রাম। শিক্ষার্থীদের মধ্যে রুমানার চোখে বিস্ময়। সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “স্যার, এখানে কি সবই ইংরেজ সৈন্য?” শিক্ষক হেসে মাথা নেড়ে বললেন, “না। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান, এমনকি ইহুদি সৈন্যও আছে। যুদ্ধ জাতি, ধর্ম, ভাষা চেনে না। মৃত্যু তো আরও বড় সমতা তৈরি করে।” কথাগুলো শুনে রুমানা আর কয়েকজন শিক্ষার্থী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারা আগে কখনো ভাবেনি যে এমন এক জায়গায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সমানভাবে শায়িত থাকতে পারে। কবরগুলোর মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যাচ্ছিল প্রতিটি সমাধিফলকের ওপর নাম, বয়স, দেশের নাম, রেজিমেন্ট, এবং মৃত্যুর তারিখ খোদাই করা আছে। কোনো কোনো সমাধিফলকে লেখা—“A Soldier of the Second World War – Known Unto God”। শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে পড়ল এই বাক্যের সামনে। একজন বলল, “মানে… তাঁর নামও জানা নেই?” শিক্ষক উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, তাঁর দেশের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু তার পরিচয় হারিয়ে গেছে। হয়তো পরিবার কখনো জেনেই পারে না তিনি কোথায় ঘুমিয়ে আছেন। এই হলো যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা।” সবাই যখন ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল, তখন দূরেই দেখা গেল একটি উঁচু ক্রস—‘Cross of Sacrifice’। ইতিহাসের ভার যেন ওই ক্রসের গায়ে লেগে আছে। শিক্ষার্থীরা ওখানে গিয়ে চারদিকে তাকিয়ে অনুভব করছিল—শান্তির সৌন্দর্যের মধ্যেও কত গভীর রক্তক্ষয়ী ঘটনার স্মৃতি লুকিয়ে আছে। ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির নিখুঁত সৌন্দর্য—সমতল সবুজ প্রান্তর, ফুলের বাগান, পরিচ্ছন্ন পথ—এতটাই নিখুঁতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় যে স্থানীয়রা একে ‘ইংরেজ কবরস্থান’ নামে চেনে। শিক্ষার্থীরা তখন জানতে পারল, বাংলাদেশে এমন আরও একটি কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র রয়েছে চট্টগ্রামের বাদশা মিয়া চৌধুরী রোডে, যেখানে ৭৫৫ সৈনিক শায়িত আছেন। যুদ্ধের স্মৃতি দুই শহরের বুকেই সমানভাবে বহমান। একসময় শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতা ভাঙতে শুরু করল। কেউ ছবি তুলছে, কেউ সমাধিফলক পড়ছে, কেউ শিক্ষককে প্রশ্ন করছে—কেন যুদ্ধ হলো, কারা লড়ল, কেন এত মানুষের মৃত্যু হলো? শিক্ষকরা বুঝিয়ে বললেন সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাম্রাজ্যবাদ, জাপান–ব্রিটিশ দ্বন্দ্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামরিক উত্তাপ—সবই মিলে তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা। এই সমাধিক্ষেত্র সেই ইতিহাসের একটি নীরব দলিল মাত্র। একটি সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রিমন। সে ধীরে বলল, “স্যার, তাদের তো আর ফিরে আসা হয়নি।” শিক্ষক কাঁধে হাত রেখে বললেন, “হয়তো আর ফিরে আসা হয়নি, কিন্তু ইতিহাসের ভেতর তারা বেঁচে আছেন। আমরা যখন তাদের সম্মান জানাই, তখন যুদ্ধের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে এক ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করি। শান্তির মূল্য বুঝতে শিখি।” শিক্ষা সফরের আসল উদ্দেশ্য সেদিন যেন সত্যিই পূরণ হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা শুধু বাইরে বেরিয়ে ঘুরে দেখেনি, তারা অনুভব করেছে সময়ের গভীর এক অংশ—যেখানে জীবন, মৃত্যু, কর্তব্য, যুদ্ধ এবং শান্তির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস কেবল বইয়ের অক্ষরে নয়, কখনো কখনো জমিনের নিচে ঘুমিয়ে থাকা নামহীন এক সৈনিকের সমাধিতেই বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার আগে সবাই আবার বাসে উঠল। জানালার বাইরে তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে শীতল আলো। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরবতা। সারাদিনের উত্তেজনা যেন বদলে গেছে গভীর চিন্তায়। কেউ কথা বলছে ফিসফিস করে, কেউ শুধু চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে পাহাড়ি পথের দিকে। যুদ্ধের গল্প যে এমন নীরব আর স্পর্শকাতর হতে পারে—এ তা তাদের কল্পনার অতীত ছিল। ফিরে আসার পথে শিক্ষকরা যখন জিজ্ঞাসা করলেন—“আজকের সফর তোমাদের কেমন লাগল?”—তখন এক শিক্ষার্থী ধীরে বলল, “স্যার, আজ যেন পৃথিবীকে একটু নতুনভাবে দেখলাম।” এই ছিল ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির শিক্ষা—যেখানে স্মৃতি, শ্রদ্ধা, মৃত্যু এবং শান্তি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। আর বাতাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই দিন শিখল—ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় নয়, কখনো কখনো দেখারও; জীবনের মতোই অনুভব করার। লেখকঃ শিক্ষক ও লেখক


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now