বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সূর্যের আলোয় নলুয়ার সকাল

"শিক্ষা উপকরন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X (লেখক: মোহাম্মদ শাহজামান শুভ) ভোরের আলো ফুটতেই নলুয়ার আকাশে পাখিদের কিচিরমিচির। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হালকা রোদ গলে গলে পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উঠোনে। মাটির গন্ধে ভরপুর সেই উঠোনে, আজ যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। মায়া ছুটে এসে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়ায়, হাতে ঝাড়ু। পাশে তার বন্ধু সুমন, জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, “আজ আপা বলেছেন—আমরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করব।” মায়া হেসে বলল, “হ্যাঁ, এখন থেকে নাকি আমাদের ক্লাস হবে একটু আলাদা। বইয়ের পড়া নয়, জীবনের পড়া।” সুমনা আপা স্কুলে নতুন নিয়ম চালু করেছেন—প্রতিদিন সকালে দশ মিনিট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, তারপর ক্লাস। তিনি বলতেন, “শুধু ভালো নম্বর পাওয়াই শিক্ষা নয়, ভালো মানুষ হওয়াই আসল শিক্ষা।” তাই সকাল শুরু হতো হাত ধোয়ার গান দিয়ে— “পরিষ্কার হাত, সুস্থ মন, পরিচ্ছন্নতাই আমাদের জীবন।” শিশুরা সেই গান গাইতে গাইতে মাটির ধুলো মুছত, বেঞ্চ ঠিক করত, জানালার কাচে হাত রাখে চকচকে করত। ________________________________________ একদিন ক্লাসে সুমনা আপা বোর্ডে বড় করে লিখলেন—“খাদ্যই আমাদের শক্তি।” তারপর বললেন, “তোমরা জানো, রাস্তার ফাস্টফুড দেখতে যেমন মজার, ভেতরে ততটাই ক্ষতিকর?” ছাত্ররা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। মায়া চুপচাপ বলল, “আপা, আমি তো মাঝে মাঝে স্কুলের পাশে চিপস খাই।” আপা হেসে বললেন, “ওটাই তোমার শরীরকে দুর্বল করে দেয়। বরং ঘরের তৈরি খাবার, ফল, শাকসবজি—এসবই তোমার শক্তির আসল উৎস।” সেই দিন থেকেই স্কুলের টিফিন সময় বদলে গেল। শিশুরা এখন আর প্যাকেট খাবার আনে না। কেউ ফল, কেউ ডিম, কেউ আবার কলা বা গাজর নিয়ে আসে। আপা মাঝে মাঝে নিজের হাতের তৈরি মুড়ি-মিষ্টিও ভাগ করে দেন। খাওয়ার সময় সুমন বলত, “দেখ, আপা এখন আমাদের মতোই খায়!” সবাই হেসে উঠত। ________________________________________ গরমের দিনগুলোয় স্কুলে রোদে আগুন পড়ে। ছেলেমেয়েরা ঘেমে একাকার। আগে তারা সিনথেটিক পোশাক পরত, যা ত্বকে ঘাম জমিয়ে রাখত। এখন সুমনা আপা তাদের বললেন, “গরমে সুতি কাপড় পরবে, শরীর যেন বাতাস পায়।” একদিন ক্লাসে মায়া নতুন সুতি ফ্রক পরে এলো। আপা দেখে বললেন, “তোমার পোশাকটাই আজকের শিক্ষার প্রতীক—পরিচ্ছন্ন, হালকা, আর আরামদায়ক।” শীতে আবার আপা তাদের বললেন, “ত্বক শুকিয়ে গেলে একটু ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করবে, নয়তো চুলকানি শুরু হবে।” শিশুদের কাছে বিষয়গুলো প্রথমে মজার লাগলেও ধীরে ধীরে তারা বুঝতে শিখল—নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াও এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব। ________________________________________ তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মশা। স্কুলের পেছনে একখণ্ড ডোবা, যেখানে পানি জমে থাকে। সন্ধ্যায় মশার ঝাঁক ওঠে। মায়া একদিন সুমনকে বলল, “আমাদের স্কুলটা তো প্রায় জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে!” সুমন বলল, “চলো, আপাকে বলি।” পরদিন আপা সবাইকে নিয়ে অভিযানে নামলেন। হাতে ঝাড়ু, কোদাল, বালতি—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলে পরিষ্কার করল পুরো জায়গাটা। মশার ডিম যাতে না ফোটে, তাই তারা পানিতে ঢেলে দিল ব্লিচিং পাউডার। সবাই মিলে চিৎকার করে উঠল— “মশা যাবে, স্কুল বাঁচবে!” সেই দিনের পর থেকে স্কুলে নিয়ম হলো—প্রতি সপ্তাহে একদিন “পরিবেশ দিবস।” সবাই মিলেই শ্রেণিকক্ষ, মাঠ, এমনকি টয়লেট পর্যন্ত পরিষ্কার রাখে। দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো নতুন স্লোগান—“পরিষ্কার স্কুল, সুস্থ জীবন।” ________________________________________ একদিন রুবি নামের এক মেয়ে কাশতে কাশতে ক্লাসে এলো। নাক দিয়ে পানি পড়ছে। মায়া বলল, “তুই তো খুব কষ্টে আছিস, ওষুধ খাসনি?” রুবি নিচু গলায় বলল, “আম্মু দোকান থেকে এক ওষুধ এনে দিয়েছে, কিন্তু ভালো লাগছে না।” সুমনা আপা শুনে বললেন, “নিজে থেকে কখনো ওষুধ খেও না, ডাক্তারকে দেখাও।” রুবির মা পরদিন তাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার বললেন, “এটা অ্যালার্জি। ঠিক মতো ওষুধ খেলে সেরে যাবে।” কয়েকদিন পর রুবি আবার আগের মতো চঞ্চল হয়ে উঠল। স্কুলে এখন সবাই জানে—ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া মানে নিজের ক্ষতি করা। ________________________________________ দিন পেরোতে পেরোতে নলুয়ার স্কুলে এক আশ্চর্য পরিবর্তন এল। সকালে শিক্ষার্থীরা এখন একে একে গোসল করে, পরিষ্কার জামা পরে আসে। কেউ ডাস্টবিনে না ফেলে আর ময়লা ছুড়ে দেয় না। শ্রেণিকক্ষে এখন ফুলের মতো ঘ্রাণ, মাঠে শিশিরের মতো আলো। গ্রামের লোকজনও অবাক। আগে প্রায়ই দেখা যেত, শিক্ষার্থীরা নানা রোগে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে, কিন্তু এখন তাদের উপস্থিতি প্রায় শতভাগ। হাসিমুখে তারা গাইতে থাকে— “আমরা পরিষ্কার, আমরা শক্তিশালী, আমরাই নলুয়ার গর্ব।” ________________________________________ বছরের শেষ মাসে স্কুলে আয়োজন হলো “স্বাস্থ্য উৎসব।” প্রতিটি শ্রেণি তাদের শেখা বিষয় নিয়ে প্রদর্শনী সাজিয়েছে। তৃতীয় শ্রেণি বানিয়েছে হাত ধোয়ার মডেল, চতুর্থ শ্রেণি উপস্থাপন করেছে “স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকা,” আর পঞ্চম শ্রেণির মায়া ও সুমন মিলে তৈরি করেছে পোস্টার— “পরিষ্কার শরীর, সুন্দর মন, পরিচ্ছন্নতাই আমাদের জীবন।” উৎসব শেষে মঞ্চে উঠে সুমনা আপা বললেন, “তোমরা জানো, আজ আমি কী দেখে সবচেয়ে খুশি? তোমরা শুধু পাঠ্য বই মুখস্থ করো না, জীবন বোঝার চেষ্টা করছো। যে শিশুরা পরিচ্ছন্নতা শেখে, তারা বড় হয়ে দায়িত্ববান নাগরিক হয়।” বাতাসে তখন করতালির ঢেউ। মায়া হেসে তাকাল আপার দিকে। তার চোখে একরাশ আলো—আত্মবিশ্বাসের, আশার, ভবিষ্যতের। ________________________________________ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে মায়া মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটছে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, বাতাসে ধানের গন্ধ। হঠাৎ সে দেখে, এক বৃদ্ধ তার বাড়ির সামনে জমে থাকা পানি ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। মায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আপনি এটা করছেন কেন?” বৃদ্ধ হেসে বললেন, “তোমাদের স্কুলের বাচ্চারা তো বলেছে—মশা জন্মে জমা পানিতে। তাই ভাবলাম, আমিও পরিষ্কার রাখি।” মায়া নিঃশব্দে হাসল। তার মনে হলো, ছোট্ট এক স্কুলের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো গ্রামে। ________________________________________ রাত নামলে আকাশে তারা জ্বলে উঠল। দূর থেকে শোনা গেল মায়ার মায়ের কণ্ঠ, “খাবার রেডি মা!” মায়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা আজ যা শিখেছি, সেটা কেবল স্কুলের জন্য নয়, সবার জন্য।” সেদিন যেন নলুয়ার আকাশে এক নতুন সূর্য উঠল—পরিচ্ছন্নতার, স্বাস্থ্য সচেতনতার, আর ইতিবাচক পরিবর্তনের সূর্য। কারণ মায়ারা এখন জানে, ভালো অভ্যাসই সবচেয়ে বড় শক্তি, আর পরিচ্ছন্ন হৃদয়ই সবচেয়ে সুন্দর জীবন। ????


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now