বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
ফারহানা ঢাকা শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী। বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে, সংসার জীবনে প্রায় আট বছর। স্বামী রাকিব একজন সরকারি অফিসের কর্মকর্তা। সংসারটা খারাপ নয়—ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট, সাত বছরের ছেলে, নিয়মিত সংসারের টানাটানি—সবকিছু একরকম ঠিকঠাকই চলে। তবে ফারহানার মনে মাঝে মাঝে শূন্যতা খেলে যায়।
রাকিব দায়িত্ববান, সংসার চালানোর মতো যথেষ্ট উপার্জন করে। কিন্তু তার স্বভাবটা অতটা রোমান্টিক নয়। সে ভালোবাসা প্রকাশ করতে জানে না, প্রশংসার ভাষা তার ঠোঁটে আসে না। অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে টিভির সামনে বসে যায়। ফারহানার গান শোনা বা গল্প করার আশা ম্লান হয়ে যায় টিভির খবরের আওয়াজে।
ফারহানা ছোটবেলা থেকেই গান ভালোবাসে। কণ্ঠ তার স্বাভাবিকভাবেই মধুর, স্কুল–কলেজে অনুষ্ঠান হলে সে-ই গান গাইত। বিয়ের পর সংসারের ঘেরাটোপে গান যেন হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রান্না করতে করতে কিংবা সন্তানকে ঘুম পাড়াতে গেয়ে ওঠে, কিন্তু সেটুকুই। রাকিব একদিনও বলেনি—“তোমার গলায় এখনো আগের মতোই মিষ্টি সুর আছে।” এই অবহেলা তাকে কষ্ট দেয়, যদিও সে কাউকে বলেনি।
একদিনের ঘটনা। ফারহানা তাদের এলাকার নারী উন্নয়ন সংগঠনের অনলাইন মিটিংয়ে যোগ দিয়েছিল। সেখানেই ছিল জাহিদ, একজন তরুণ সমাজকর্মী। সে নিয়মিত সবার সাথে যোগাযোগ রাখে। মিটিং শেষে হঠাৎ সে বলল,
—“একটা কথা বলি আপু? আপনার কণ্ঠটা এত্ত সুন্দর! সত্যি বলছি, টানা ২৪ ঘণ্টা শুনলেও বোরিং লাগবে না।”
ফারহানা প্রথমে চমকে উঠল। কণ্ঠ নিয়ে এতদিন কেউ কিছু বলেনি, অথচ এই মানুষটি এমনভাবে বলল, যেন তার গলার ভেতরে লুকানো অমূল্য ধন আবিষ্কার করেছে। তার বুকের ভেতর কেমন যেন দোলা লাগল। মনে হলো, কেউ যেন তাকে নতুন করে চিনল।
এরপর থেকে ফারহানা টের পেল, জাহিদ তার সাথে আলাপ জমাতে চাইছে। মাঝে মাঝে ফোন দেয়, কোনো অজুহাতে গান শুনতে চায়। বলে,
—“আপু, আপনার কণ্ঠে একটা পুরনো গান শুনলে মনটা ভালো হয়ে যায়।”
প্রথমদিকে ফারহানা দ্বিধায় পড়ল। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আবার তার মনে হচ্ছিল, এই মানুষটি তার আত্মাকে বুঝতে পেরেছে। স্বামী তো কখনো এমনভাবে তার কণ্ঠের প্রশংসা করেনি। জাহিদ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং গভীর কোনো অনুভূতিকে স্পর্শ করেছে।
দিন যেতে লাগল। ফারহানা ধীরে ধীরে বুঝল, সে এই কথাগুলো শোনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। রাতে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে যখন গান গায়, মনে হয়—যদি জাহিদ শুনতে পেত! অথচ রাকিব তখন পাশের ঘরে খবরের কাগজ পড়ছে, কোনো খেয়ালই নেই।
একদিন ছোট্ট ছেলেটা পড়ার টেবিলে বসে ছিল। হঠাৎ বলল,
—“মা, তোমার গান শুনতে আমার ভালো লাগে। তুমি গাইলে আমার পড়া সহজ হয়।”
এই কথাটা যেন বাজের মতো আঘাত করল ফারহানার মনে। এতদিন ধরে যে স্বীকৃতি খুঁজছিল, সেটা তো তার নিজের সন্তানের কাছেই ছিল! সে-ই তার কণ্ঠের সবচেয়ে সত্যিকারের শ্রোতা, যে কোনো ফাঁদে ফেলতে চায় না।
সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে ফারহানা রাকিবকে বলল,
—“শোনো, আমি মাঝে মাঝে গান গাইলে তুমি খেয়াল করো?”
রাকিব একটু চমকে তাকাল।
—“অবশ্যই খেয়াল করি। তবে অফিসের টেনশনে হয়তো কিছু বলি না। আসলে তোমার গান আমার খুব ভালো লাগে। আমার মা তো বলতেন, তোমার গলা দিয়ে না হয়ত সংসার টানতে হবে, কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমি সেই সৌভাগ্যবান হয়েছি।”
ফারহানার চোখে জল চলে এলো। এতদিন ধরে সে যে অভিমান বয়ে বেড়াচ্ছিল, তা আসলে একরকম ভুল বোঝাবুঝি। রাকিব তাকে প্রশংসা করে না মানেই যে সে তার কণ্ঠের মায়া অনুভব করে না—তা নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা শব্দের আড়ালে থাকে, দায়িত্ব আর নির্ভরতার ভেতরে গোপন থাকে।
ফারহানা বুঝল, জাহিদের প্রশংসা কেবল ফাঁদ। মধুর লাগলেও এর ভেতরে নেই কোনো ভিত্তি। কিন্তু রাকিবের নীরব ভালোবাসা, সন্তানের নির্মল প্রশংসা—এটাই তার জীবনের আসল শক্তি।
এরপর থেকে ফারহানা আর মিষ্টি কথার ফাঁদে পা দেয়নি। বরং সংসারের ভেতরেই নিজের কণ্ঠের মূল্য খুঁজে নিয়েছে। যখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে গান গায়, সন্তান হাততালি দেয়, রাকিব হাসিমুখে শোনে—তখন সে অনুভব করে, সত্যিকারের প্রশংসা বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেই আছে।
ঢাকার কোলাহলের ভেতরও সে নিজের আত্মাকে নতুন করে চিনল। কণ্ঠের মায়া তাকে ফাঁদে ফেলেনি, বরং ফিরিয়ে দিয়েছে সংসারের আসল সুরে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now