বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সকালটা একটু অদ্ভুত।
খোলা জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে, অথচ রোদ নেই। যেন সূর্য উঠেছে শুধু হালকা আলো ফেলার জন্য, গা গরম করার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। বৃষ্টি হবে বুঝি।
নিমাই সাহেব পত্রিকার পাতা উল্টে বসে আছেন, কিন্তু পড়ছেন না। প্রতিবারের মতো এবারও চোখ আটকে গেছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে—
"আজ বিকেলের পর বৃষ্টি হতে পারে। কিছু কিছু জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টি হবে।"
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
নিমাই সাহেব একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। বয়স প্রায় সত্তর ছুঁইছুঁই। স্ত্রী নেই, ছেলেমেয়েরা যে যার মতো ব্যস্ত, আলাদা শহরে, আলাদা জীবন নিয়ে। এই পুরনো দোতলা বাড়িটার প্রতিটা ঘর এখন ফাঁকা ফাঁকা লাগে, যেন দেয়ালগুলো কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু কেউ শোনে না।
একসময় এখানে মানুষের হাঁটাচলা ছিল।
নিচের ঘরে রান্না, ওপরে ছাদে কাপড় শুকানো, দুপুরে স্কুলের ব্যাগ ফেলে টিভি দেখতে বসা, সন্ধ্যায় একসাথে খাওয়ার সময় কার কখন ফোন বাজবে—এইসব শব্দে বাড়িটা ছিল জীবন্ত।
এখন শুধু নিমাই সাহেবের একা পায়ের শব্দ শোনা যায়।
আর মাঝে মাঝে রান্নাঘরের চুল্লিতে পাতিল চাপা দেওয়ার আওয়াজ।
তবে বাড়িটাতে একসময় একজন ছিল, যার স্মৃতি সবকিছুর চেয়ে বেশি জেগে থাকে।
ইরা।
তাঁর ছোট মেয়ে।
তীব্র বুদ্ধিমতী, একটু জেদি, কিন্তু অসম্ভব নরম। সে এমনভাবে হেসে কথা বলত, যেন চারপাশের বাতাস হালকা হয়ে যেত।
ইরার একটা অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল—
"বাবা, আমি ফিরলেই বৃষ্টি নামবে।"
নিমাই সাহেব প্রথমে হেসেছিলেন।
তারপর একদিন সত্যিই ইরা আসার সময় বিকেলবেলা হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসে।
তারপর আবার। আবার।
প্রায় প্রতিবারই তার ফেরা মানেই ছিল বৃষ্টির আগমন।
জানালার কাচে ফোঁটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় ইরার ডাক শোনা যেত।
এমনকি একসময় তিনি নিজেও বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন..!
"বৃষ্টি হচ্ছে... মেয়েটা বুঝি এসেছে!"
শেষবার ইরা এসেছিল তিন বছর আগে।
একটি বড় ব্যাগ, কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ, চোখে চশমা, পরনে নীল শাড়ি।
বলেছিল,
“এইবারের মতো শেষ, বাবা। আমেরিকা যাচ্ছি। চাকরি পেয়েছি। এই জায়গায় আর ফিরে আসব না।”
নিমাই সাহেব কিছু বলেননি। তিনি জানেন...!
শুধু তার হাতটা চেপে ধরেছিলেন।
ইরা মৃদু হেসে বলেছিল,
"এইবার গেলে আর বৃষ্টি হবে না, আমি জানি। কিন্তু তুমি দুঃখ পেও না, হ্যাঁ?”
সেই যে সে গেল, আর ফিরল না।
প্রথম বছর ইরা মাঝেমধ্যে ফোন করত।
বড়দিনে, জন্মদিনে, হঠাৎ করে রাত ১১টায়—
“বাবা, এখন কী করো?”
“চা খাচ্ছি।”
“তুমি একা একা চা খাও কেন?”
“তুই তো থাকিস না।”
তারপর ধীরে ধীরে ফোন কমে গেল।
হয়তো ইরার জীবন অন্য রঙে রঙিন হয়ে গেল।
এখন মাসে একবার ইমেইল করে।
নিমাই সাহেব একবার ক্যালেন্ডারে কালি দিয়ে গোল করে রেখেছিলেন—ইরার বলা তারিখ অনুযায়ী ফেরার দিন।
সেদিন দুপুরে তিনি পায়েস রান্না করেছিলেন, ছোট মাছ ভেজেছিলেন, বারান্দা ঝাড়ু দিয়েছিলেন বার তিনেক।
রাস্তায় প্রতিটি রিকশার শব্দে ছুটে গিয়েছিলেন গেটের কাছে।
কেউ আসেনি।
সেই রাতে প্রথমবার তাঁর কান্না এসেছিল, কিন্তু চোখে জল আসেনি।
শুধু বালিশে মুখ গুঁজে নীরব হয়ে থেকেছিলেন।
একদিন দুপুরে ফ্রিজ খুলে দেখলেন, একটা ছোট কৌটায় ইরার রেখে যাওয়া জামের আচার শুকিয়ে গেছে।
তিনি সেই কৌটা ধুয়ে আবার ফ্রিজেই রেখে দিলেন।
ফেলে দিতে পারলেন না।
কারণ তিনি জানেন না কেন, কিন্তু মনে হলো—এটা ফেলে দিলে মেয়েটাকেও আর খুঁজে পাবেন না।
বিছানার পাশে একসময় একটা চিঠি রেখে গিয়েছিল ইরা—
ছোট কাগজে একটিই লাইন:
"তুমি আমার প্রিয় পৃথিবী, কিন্তু পৃথিবী সবসময় সঙ্গে রাখা যায় না, বাবা।"
নিমাই সাহেব চিঠিটা পড়েন মাঝে মাঝে।
চোখে জল আসে না, কিন্তু বুকের ভেতর হালকা চাপ পড়ে।
আজ আবার আকাশ ভারি।
তিন বছর হয়ে গেল ইরাকে দেখেন না।
বৃষ্টির খবরটা আজকে অন্যরকম লাগে।
বারান্দায় চুপ করে বসে আছেন তিনি।
পাশে এক কাপ চা। ঠান্ডা হয়ে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা দুপুর ছুঁইছুঁই।
হঠাৎ রিকশার শব্দ।
তিনি চোখ মুছলেন।
গাড়ি থামল গেটের সামনে।
একটা চেনা ছায়া নেমে এল।
নীল শাড়ি। কাঁধে ল্যাপটপ নেই বরং তার বদলে একটা ফুটফুটে বাচ্ছা। চোখে চশমা।
ইরা।
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
হাসছে না, কাঁদছে না।
শুধু তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।
নিমাই সাহেব উঠে দাঁড়ালেন না, কিছু বললেনও না।
শুধু চেয়ে রইলেন। অনেকটা সময়।
ইরা একটু হেসে বলল,
“তুমি দেখো বাবা, আমি ফিরলেই বৃষ্টি নামবে। এবারও।”
ঠিক তখনই প্রথম ফোঁটা এসে পড়ল নিমাই সাহেবের গালে, পাশে বারান্দার রেলিংয়ে।
একটা।
দুইটা।
তিনটা।
আরও অনেক।
হয়তো আকাশ শুধু জল ফেলে না,
চেনা কিছু ফেরতও দেয়।
- আমি ফিরলেই বৃষ্টি নামবে।
লেখা: অপু তালুকদার
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now