বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অন্তরের নীড়ে ফেরা

"ইসলামিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ শহরটা যেন অবিরাম শব্দের এক জটলা। বাইরে গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার, বিজ্ঞাপনের উজ্জ্বল আলো, মোবাইল স্ক্রিনের অবিরাম ঝিলিক—সব মিলে যেন এক দম বন্ধ করা কোলাহল। এই শহরের এক কোণে, ৩৫ বছরের যুবক নওশাদ বসে আছে নিজের ফ্ল্যাটের বারান্দায়। হাতে কফির মগ, চোখ স্থির, কিন্তু মন যেন অস্থিরতার সমুদ্রে ভাসছে। নওশাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা সুন্দর দেখায়, ভিতরে ততটাই ফাঁপা। প্রাইভেট কোম্পানির উচ্চপদে চাকরি, বড় ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা—সবই আছে। অথচ কোথাও যেন একটা শূন্যতা। রাতগুলো কেটে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে, ভোরে ওঠা হয় এলার্মের কড়া শব্দে, দিনের শুরু হয় মিটিং, রিপোর্ট, টার্গেট আর ডেডলাইনের চাপে। দিনের শেষে ঘরে ফিরেও শান্তি নেই—টিভির আওয়াজ, ফোনকল, ইমেইল, আর মনে অজানা ক্লান্তি। এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ঢেকে গেল। শহরের বিদ্যুতের লাইনও যেন নিভে গেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নওশাদ তাকাল আকাশের দিকে—বছরের পর বছর পরে সে দেখল তারাভরা আকাশ। বাতাসে অদ্ভুত এক প্রশান্তি, কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন চাপা হাহাকার। ঠিক তখন পাশের ফ্ল্যাটের বয়স্ক চাচা—হাসান চাচা—বারান্দায় এসে ডাক দিলেন, "নওশাদ, ঘুম আসছে না?" নওশাদ হেসে বলল, "ঘুম তো আসে, কিন্তু মনের ভেতর এক অদ্ভুত চাপা অস্থিরতা..." হাসান চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললেন, "তুমি কি কখনো চুপচাপ বসে আল্লাহকে মনে করো?" প্রশ্নটা নওশাদকে চমকে দিল। "মানে? নামাজ পড়ি, মাঝে মাঝে দোয়া করি... কিন্তু তেমন সময় পাই না," নওশাদ বলল। হাসান চাচা মৃদু হাসলেন, "সময় না পাওয়ার কারণেই হয়তো তোমার মন এত অস্থির। যে অন্তর আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকে, সে তো মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া এক তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো।" নওশাদ সেদিন বেশি কিছু বলল না। তবে হাসান চাচার কথাগুলো তার মাথায় গেঁথে গেল। ________________________________________ পরদিন অফিসে গেলেও মন বসছিল না। কম্পিউটারের স্ক্রিনে এক্সেল শিট খুলে রেখেও মন চলে যাচ্ছিল অন্য কোথাও। দুপুরের দিকে হঠাৎ সে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। যেন ভেতর থেকে কেউ তাকে ডাকছিল। নওশাদ চলে গেল শহরের এক পুরনো মসজিদে—যেখানে সে শৈশবে বাবার হাত ধরে যেত। মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা মার্বেলের মেঝে আর আযানের ধ্বনি তার ভেতরের জমে থাকা বরফ গলিয়ে দিতে লাগল। নামাজ শেষে সবার চলে যাওয়া পর, নওশাদ চুপচাপ বসে থাকল। মসজিদের ইমাম সাহেব এসে তার পাশে বসলেন। "বাবা, তোমার চোখে অদ্ভুত ক্লান্তি দেখছি," ইমাম সাহেব বললেন। নওশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "মনের শান্তি খুঁজে পাচ্ছি না, হুজুর। সব কিছু আছে, তবু ভিতরে শুন্যতা..." ইমাম সাহেব ধীরে ধীরে কোরআন থেকে একটি আয়াত পড়লেন— اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ تَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُهُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰهِ ۗ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰهِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ তারপর বললেন, "যে অন্তর আল্লাহর জিকিরে সিক্ত হয়, তার অস্থিরতা দূর হয়। জিকির শুধু মুখের উচ্চারণ নয়, এটা অন্তরের সংযোগ।" ________________________________________ সেদিন রাতে নওশাদ বাসায় ফিরে ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ করল। আলো নিভিয়ে সিজদায় গেল। তার ঠোঁট নরম সুরে আল্লাহর নাম জপতে লাগল— সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার... প্রথম কয়েক মিনিট মন ভেসে যাচ্ছিল নানা চিন্তায়। কিন্তু ধীরে ধীরে সে অনুভব করল, যেন বুকের ভেতরের ভারী পাথরটা সরে যাচ্ছে। চোখ ভিজে উঠল অকারণে। সে বুঝতে পারল—বছরের পর বছর ধরে যে অস্থিরতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তার মূল কারণ ছিল আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া। যেমন একটি শিশু মায়ের কোল ছাড়া অস্থির হয়, তেমনি তার অন্তর ছিল নিজের প্রভুর সান্নিধ্য ছাড়া। ________________________________________ নওশাদের এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর কিছুক্ষণ তিলাওয়াত, কিছুক্ষণ জিকির, আর কিছুক্ষণ নীরবে আল্লাহর নিয়ামতগুলো নিয়ে ভাবা—এগুলো তার জীবনের অংশ হয়ে উঠল। দিনের ব্যস্ততায়ও যখন চাপা টেনশন আসত, সে মনে মনে বলত— "হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হু, আলাইহি তাওাক্কালতু, ওয়া হুয়া রাব্বুল আরশিল আজীম" অফিসের চাপে, ট্রাফিকের জ্যামে, বা একাকী রাতে—যেখানেই থাকুক, এই জিকির তার অন্তরে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দিত। { আত্মা প্রশান্তি পায়।’ আল্লাহ তাআলা বান্দাকে লক্ষ্য করে বলেছেন- اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ تَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُهُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰهِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰهِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡب ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি পায়।’ (সুরা রাদ : আয়াত ২৮)} ________________________________________ কয়েক মাস পর, নওশাদের এক বন্ধু তাকে বলল, "দোস্ত, তুই অনেক বদলে গেছিস! আগের মতো রাগ, বিরক্তি—কিছুই নেই। তুই কী করেছিস?" নওশাদ হাসল, "শুধু একটাই কাজ—অন্তরকে তার নীড়ে ফিরিয়ে দিয়েছি।" বন্ধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নওশাদ শান্ত গলায় বলল, "যেভাবে শিশু মায়ের কোল ছাড়া শান্তি পায় না, তেমনি আমাদের অন্তর আল্লাহ ছাড়া শান্তি পায় না। আমি শুধু আমার অন্তরকে তার প্রভুর কোলেতে ফিরিয়ে দিয়েছি।" ________________________________________ নওশাদের গল্পটা শহরের অনেক মানুষের কানে পৌঁছাল। কেউ কেউ তার কাছে এসে বলত—"আমাদেরও শেখাও, কীভাবে এই প্রশান্তি পাওয়া যায়।" নওশাদ তাদের বলত, "প্রশান্তি টাকা, সাফল্য, ভ্রমণ বা বিলাসিতায় নেই। প্রশান্তি আছে আল্লাহর স্মরণে। যে একবার আল্লাহর জিকিরের মিষ্টি স্বাদ পেয়ে যায়, তার অন্তর আর অন্য কিছুর জন্য ছটফট করে না।" ________________________________________ শহরের কোলাহলের ভেতরেও নওশাদের মন এখন শান্ত। চোখে তারাভরা আকাশ পড়লেই সে মনে মনে বলত— "প্রভু, তুমি ছাড়া আমার অন্তর কিছু চায় না। তুমি ছাড়া আমার নীড় কোথাও নেই।" এভাবেই এক অস্থির হৃদয় ফিরে পেল তার প্রকৃত প্রশান্তি— প্রভুর স্মরণে, প্রভুর সান্নিধ্যে, প্রভুর ভালোবাসায়। ________________________________________


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now