বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম-- মাজহারুল মোর্শেদ।
গল্পের নাম-শান্তিনিকেতনে হৃদয়ের প্রশান্তি- ১ম পর্ব
পশিচমবঙ্গের একটি স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকার নাম “পরিমল সাহিত্য পত্রিকা”। কাবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে পত্রিকাটির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে একজন ‘প্রাবন্ধিক’ হিসেবে আমন্ত্রিত অতিথি হওয়ার পরম সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। “পরিমল সাহিত্য পত্রিকা”র কর্ণধার ও সম্পাদক, কবি-সাহিত্যিক ও নাট্যকার শিল্পী দাস আগেভাগে আমন্ত্রণ পত্রটি পাঠিয়েছিলেন বলে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে আমার বিদেশ ভ্রমণের ছুটি কার্যকর করে নেয়াটা সহজ হয়েছিলো। যাহোক, নির্দিষ্ট দিনক্ষণের আগেই আমি কাবি গুরুর শান্তিনিকেতন যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। বুড়িমারী স্থলবন্দরের ইমিগ্রেসন সংক্রান্ত কার্যাদি শেষ করে প্রথমে টোটোযোগে চ্যাংড়াবান্ধা বাইপাসে গেলাম। আমার ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি বিজড়িত পার্শ্ববর্তিী ভারতের ধাপড়া, মেখলীগঞ্জ, চ্যাংড়াবান্ধা। তবে রাস্তাঘাটগুলো আর আগের মতো নেই, সব পাকা হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে টি-স্টলে চা বানানোর স্টাইল দেখে ছোট বেলার ধাপড়ারহাটে লক্ষী কাকার কথা মনে পড়ে গেলো। তাই একটা চায়ের কাপ নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তৃপ্তি ভরে চায়ের কাপে ডুবে আছি। এদিকে পরপর দু’টো বাস আমাকে না নিয়ে চলে গেলো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার নীরবতা দেখে কাকা জিজ্ঞাসা করে আমি কোথায় যাব, গন্তব্যের নাম বলতেই কাকা ফোকলা দাঁতে ফিঁক করে হেসে দিলো। কিন্তু আমি আমার মনের কথাটা তাকে বোঝাতে পারলাম না। যাহোক এবার চতুর্থ বাসটি আর মিস করতে চাচ্ছিনা, দেখতে দেখতে শিলিগুড়ির বাস চলে এলো ঘন্টাখানেক বাদে আমি এন, জি, পি রেলওয়ে স্টেশন, শিলিগুড়ি পৌছে গেলাম। যদিও ট্রেনের টিকেট আগে থেকে সংগ্রহ করা ছিলো কিন্তু অতিসাবধানতার কারণে আগেভাগে স্টেশনে যেয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হলো। আমার ট্রেন ছাড়ার সময় ছিলো সন্ধ্যা ৭.৪০ মিনিটে আর আমি স্টেসনে গিয়ে উপস্থিত হলাম বেলা ৩ টা নাগাত। অপেক্ষমাণ সুদীর্ঘ এ সময়টা একা একা পারি দেয়া আমার কাছে পাহাড় সমান বোঝা হয়ে মাথায় চাপলো। অগত্যা কোন উপায় না দেখে ছোট বোন জুঁই রায়কে ফোন দিলাম। সে এন, জি, পি স্টেশনের আশে পাশেই থাকতো। মিনিট দশেকের মাথায় সে এসে উপস্থিত হলো। তখনো আমার দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। জুঁইসহ একসাথে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু ঘোরাঘুরি করলাম। জুঁই আমাকে ট্রেনে তুলে দেয়ার জন্য স্টেশনে নিয়ে গেলো। পাঁচ মিনিট দেরিতে এন, জি, পি রেলওয়ে স্টেসনে এসে থামলো ‘কাঞ্চনজঙ্গা এক্সপ্রেস’। ট্রেনে উঠে জুঁই আমাকে সিট খুঁজে দিতে সাহায্য করলো। বিদায়ের সময় সে জানালো- ফেরার পথে আমি যেন একদিন সময় হাতে নিয়ে শিলিগুড়িতে নামি। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে তাকে বিদায় দিলাম।
নন-এসি স্লিপিং সিটে শুয়ে শুয়ে আমার যাত্রা শুরু হলো। যদিও কলকাতা আমার ছোটবেলার চেনা-জানা শহর। এর অলি-গলিতে বিচরণ ছিলো ছোটবেলা থেকেই সে জন্য তেমন কোন সমস্যা মনে হয়নি। মধ্যরাতে ফারাক্কা বাঁধের উপর দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় নদীর শীতল হাওয়া যেন বুকের ভেতর একটা আলাদা অনুভুতির সৃষ্টি করেছিলো।
কাঞ্চনজঙ্গা এক্সপ্রেস আমাকে সকালে পৌছে দিলো হাওরা স্টেসনে। সেখানে আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ‘পরিমল সাহিত্য পত্রিকার’ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় শিল্পী দাস, তার জীবন সঙ্গী আরাধন দাস, শৈলেন্দ্রনাথ রায়, অরিজিৎ ঘোস সহ অনেক কবি সাহিত্যিক। কলকাতার একটি অভিজাত হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে প্রায় ঘন্টাখানেক বাদে আমরা শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম বোলপুর স্টেসনে। সেখান থেকে আবারো টোটোযোগে শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ভবনে।
যেহেতু অনুষ্ঠান পরের দিন তাই একটু বিশ্রামের সুযোগ হলো। ‘প্রকৃতি ভবনে’র রেস্টহাউজে উঠে বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে একটু বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু সে আর হলো কই? কবি শিল্পী দাস, শৈলেন্দ্রনাথ রায়, ড.সীমা রায় দলে-বলে এসে হাজির হলো-
“আরে মশাই প্রকৃতি ভবনে এসে কেউ ঘরে বসে থাকে নাকি? উঠুন! শুনতে পাচ্ছেন না, চারিদিকে কতো পাখি আপনাকে ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে”।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিজিরীত সাহিত্য সংস্কৃতির স্থান শান্তিনিকেতন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে কোপাই-খোয়াই নদীর নিকটবর্তী এ প্রকৃতি ভবন। এর চারিদিকে সবুজ-শ্যামল, স্নিগ্ধ কোমল, প্রকৃতি-উজার করা-রূপমাধুরী, গাছের ডালে পত্র-পল্লব, মুকুলে মুকুলে শোভিত চাঞ্চল্য চিত্তে দোলা দেয় এক অসম্ভব রকমের অনুভ’তি। প্রকৃতির মাঝে এখানকারও প্রকৃতিও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরূপে সাজে। ঋতু বৈচিত্রের পালাবদলে পাখিদের কলকাকুলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। প্রকৃতির নানা বৈচিত্র খুব স্পষ্ট করে বোঝা না গেলেও অনুভূতিপ্রবণ স্পর্শকাতর প্রকৃতি প্রেমীরা টেড় পায়। সারি সারি বৃক্ষমালা, ফুলের মায়াবী পাপড়ি মেলা, প্রকৃতির ছায়া ঘেরা ঋতু বৈচিত্রের মহাসমারোহ এই শান্তিনিকেতন। কী অপরূপ, কী মায়াবী বাহারি ফুলের ছড়াছড়ি। কষ্টমিশ্রিত শূন্যতার অনুভব হৃদয়ে খুব বেশি নাড়া দেয়। ভাবি, আবার কী এই শান্তিনিকেতনে আসতে পাবো!
পড়ন্ত বিকেলে কয়েকজন আড্ডাবাজ কবি, শিল্পী দাস, আরাধন দাস, শৈলেন্দ্রনাথ, ড.সীমা রায়, ড.অর্ণব রায়, গৌরী রায় এসে হাজির আমার শয্যার পাশে। শৈলেন দা এক রকম হাত ধরে টেনে আমাকে ঘরের বাইরে নিয়ে এলেন। অতঃপর সবাই মিলে বেড়িয়ে পড়লাম শান্তিনিকেতনের আদিবাসী গ্রাম দেখার জন্য।
আজ তাদের সংস্কৃতির উৎসব, সৌভাগ্য ক্রমে আমরাও উপস্থিত হয়ে গেলাম তাদের মাঝে। আবালবৃদ্ধ, তরুণ-তরুণী মেতে ওঠে উন্মাদনায়। নেচে গেয়ে উৎসব পালন করে। তাদের পূজো-পার্বণের জন্য একটা মন্দির চোখে পড়লো। ভারতীয় সরকার এটি নির্মাণ করে দিয়েছেন। সেই মন্দিরের উঠোনে আমাদের বসতে দেয়া হলো। উৎসবের শুরুতে তাদের গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনার দলীয় গান, নৃত্য। আদিবাসী মেয়েরা সব সময় অলঙ্কারে সজ্জিত থাকতে পছন্দ করে। একদল যুবতী একই পোষাকে, একই রকম গহনায় সজ্জিত হয়ে পুরুষদেও গানের তালে তালে মাথায় রঙিন কলস নিয়ে নৃত্য পরিবেশন করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো এ নৃত্যে তারা এতোটাই পারদর্শী যে, মেয়েরা হেলে-দুলে নৃত্য করলেও মাথার কলসটি পড়ছে না। আমরা সবাই এতোটাই মুগ্ধ হয়ে পড়ি যে, রাত কতোটা গভীরের দিকে যাচ্ছে সে খেয়াল পর্যন্ত কারও নেই। আদিবাসীদের প্রাণের এ উৎসবে এখন গোটা গ্রাম আনন্দে মুখরিত।
আদিবাসীদের ইতিহাস গৌরবময়। এ গৌবরের আবেগ যেমন তাদের চোখে-মুখে তেমনি তাদের সঙ্গে প্রকৃতিও বটে। কালের পরিক্রমায় দরিদ্রতা আজ জেঁকে বসেছে তাদের উপর কিন্তু হার মানাতে পারেনি। তাদের আবাস ছোট ছোট কুঁড়ে ঘরে হলেও সেগুলো বেশ পরিপাটি।
পরের দিন প্রকৃতি ভবনের উন্মুক্ত মঞ্চে সকাল থেকেই শুরু হয় ভারত বর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে কবি-সাহিত্যিক ও গুণীজনদের আগমন। নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা থেকে যে সকল কবি-সাহিত্যিক এসেছেন তারা আমাদের মতো আগের দিনেই আসে পড়েছেন। বেলা দশটা নাগাদ প্রকৃতি ভবনের উন্মুক্ত মঞ্চ ও এর আশেপাশের এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং বিভিন্ন দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন যুগ্ম সম্পাদক আরাধন দাস এবং সভাপতি বিশিষ্ট কবি বরুণ চক্রবর্তী মহাশয়। অনুষ্ঠান প্রথম থেকে শেষ অবধি সঞ্চালনা করেছেন কবি, গায়ক, অরিজিৎ ঘোষ। গুণী শিল্পীদের অংশগ্রহণে কবিতা কোলাজ, দলীয় রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনা বিজয়ার মিলন উৎসব কে প্রাণবন্ত করে তুলে। এর পরই পরিমল সাহিত্য পত্রিকার ৩য় বর্ষের চতুর্থ সংখ্যা “হৈমবতীর কথা” এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অতিথি কবি-সাহিত্যিকগণের বৈক্তব্য, স্বরচিত কবিতা পাঠ করে অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে। অনুষ্ঠানের মাঝেই চলে চা, কফি ও দুপুরের বাঙালিয়ানা খাওয়া। পরিমল সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় শ্রদ্ধেয় শিল্পী রায়ের দক্ষতা ও সুনিপুন বিচক্ষণতা অনুষ্ঠানকে সফল ও আনন্দমুখর করে তোলে। পূর্ণতায় ভরিয়ে দেয় সবার মন। বাধভাঙ্গা আনন্দে ভাসতে থাকে সবাই।
অতঃপর শেষ বিকেলের আলো যখন ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে পড়ে, সন্ধ্যার আগমন ঘরে ফেরার বার্তা জানিয়ে দেয়, মাথার ওপর পাখিরাও দল বেঁদে মনের আনন্দে কিচিরমিচির করতে করতে নীড়ে ফিরছে । কি আর করার আছে আমাদের? অনুষ্ঠানের সমাপ্তী ঘোষণা করে আমরাও যে যার মতো করে পাখিদের পথ ধরে ঘরে ফিরলাম।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now