বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মেঘের খোঁজে পাহাড়ের দেশে

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ। গল্পের নাম- মেঘের খোঁজে পাহাড়ের দেশে ছোট বেলা থেকেই বইয়ের পাতায় পড়ে আসছিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলের বর্ণনা কিন্তু বাস্তবে তা ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনো। সে জন্যই হয়তো বুকের ভেতর ভ্রমন বিলাসী মনটাও কোন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে বসেছিল। আমাদের “ছুটিছাটা ভ্রমন দল” হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে বলে- চলো সবাই ঘুরে আসি পাহাড়ের দেশে। ছোট খাট একটা বৈঠকও হয়ে গেলো আমাদের। কে কে যাচ্ছি, কিভাবে যাচ্ছি, কবে- কখন যাচ্ছি ইত্যাদি নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলো। দিনক্ষণও ঠিকঠাক করা হলো আগামী শুক্রবার। সবার মাঝে ভ্রমণের চিন্তা যেহেতু পাহাড়ে ওঠা হয়নি কখনো স্বাভাবিকভাবে মনের মধ্যে একটা কৌতুহল এসেই যায়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো সবার জন্য একই কালারের ট্রাউজার, টিশার্ট ও কেডস থাকবে আর সেটা কেনার দায়িত্ব ভ্রমণদলের। সুপ্রিয় পাঠক, এখানে একটু বলে রাখি-“ছুটিছাটা ভ্রমন দল” ভ্রমণ পিপাসী নারী-পুরুষ কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে গঠিত। ভ্রমণের উদ্দেশ্যই হলো দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান, প্রাকৃতিক নিদর্শন দেখা, সে সম্পর্কে জানা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করা, সেই সাথে লেখা-লেখির হাতকে সমৃদ্ধ কার। যাহোক, ভ্রমণের সুযোগ হাতছাড়া করা মানেই জীবন থেকে একধাপ পিছিয়ে পড়া। এতাটা বোকামি কি কেউ করতে পারে? আজ শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় রংপুরের কামার পাড়া থেকে ছাড়বে আমাদের বাস। কতো উদ্বেগের মধ্যে যে বিকেল হলো! একমুহুর্ত আর দেরি না করে ব্যাগ গোছা-গোছির কাজে নেমে পড়লাম। অবশেষে সেই মোহনীয় ক্ষণে আমাদের বাস ছেড়েদিল মেঘে ঢাকা, কুয়াশায় ঘেরা পাহাড়ের দেশ খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবনের উদ্দেশ্যে। সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম খাগড়াছড়ি বাস স্টাÐে। এখন আমাদের গন্তব্যস্থল হলো আপাতত রাঙ্গামাটি জেলার সাজেকভ্যালি। খুঁজে পেলাম পাহাড়ে যাওয়ার জন্য খোলা জীব গাড়ি যার স্থানীয় নাম হলো “চাঁন্দের গাড়ি”। ড্রাইভার আব্দুর রহিম কমবয়সী যুবক, বেশ হাসি-খুশি চেহারা তাদের স্থানীয় ভাষার সাথে সাথে খুব সুন্দরভাবে স্পষ্ট বাংলাও বলতে পারে সে। আমরা যে কয়েকদিন সাজেকে থাকব সেও থাকবে আমাদের সাথে, আমাদের গাইড হিসেবে। চাঁন্দের গাড়ি ছেড়েদিলো সাজেকভ্যালির উদ্দেশ্যে। প্রায় ঘণ্টা খানেক গাড়ি চলার পর আমরা এসে পড়লাম দীঘিনালা বাজারে। সেখানে “দীঘিনালা টুরিস্ট ক্যাম্প” নামে এক রেস্টুরেন্টে আমরা চা খেয়ে নিজেদের ক্লান্তি দুর করলাম। এদিক সেদিক একটু হাটাহাটি করার পর আবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এখান থেকে দিনে দু’বার সেনাবাহিনীর এসকোর্ট সাজেকভ্যালি যায়। প্রথমটা সকাল সাড়ে ন’টা থেকে এগারোটার মধ্যে আর দ্বিতীয়টি বেলা আড়াইটায়। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় আমরা সেনাবাহিনীর সাকালের এসকোর্ট-টি পেয়ে গেলাম, অন্যথায় আড়াইটা পর্যন্ত বিড়ম্বনায় পড়া লাগত। আবার পাহাড়ি উঁচু-নিচু, আঁকা বাঁকা রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করল আমাদের গাড়ি। রাস্তার দু’দিকে উঁচু খাড়া পাহাড় নিচের দিকে তাকালে বুক ছমছম করে। সবুজ গাছ পালা প্রকৃতির কি অপরূপ রূপমাধুরী মিশে আছে পাহাড়ের গায়ে যা স্বচোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। রাস্তার দু’দিকে পাহাড়গুলো এতোটাই উঁচু যে, দেখলে মনে হয় এই বুঝি মাথার ওপর ভেঙ্গে পড়ে। খাড়া পাহাড়ের উপরে যখন আমাদের গাড়িটা উঠছে তখন ভয়ে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। আমার মনে হয়েছিলো যে, গাড়িটা যদি কোন ভাবে ইঞ্জিন ফেইল করে, কিংবা ব্রেক ফেইল করে তাহলে নির্ঘাৎ মৃত্যু, বাঁচার কোন সম্ভাবনা নেই। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আমরা রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় মারিশ্যা নামে একটি বাজার পেলাম। সেখানে সবাই নেমে আমরা পাহাড়ের কঁচি সুস্বাদু ডাবের পানি খেলাম। সুদীর্ঘ ভ্রমনের যে ক্লান্তি তা কঁচি ডাবের সুস্বাদু ঠাণ্ডা পানিতে অনেকাংশে দেহ থেকে মিলিয়ে গেলো। সাজেক, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় একাটি ইউনিয়ন। দুপুর গড়িয়ে গেলে অনেকটা ক্লান্ত অবস্থায় আমরা পৌছে গেলাম নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বেলাভ‚মি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেকভেলিতে। যে দিকে চোখ যায় শুধুই পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতি তান সাখে মেঘের অপরূপ মিতালি। সাজেকের এই মনোরম দৃশ্য দেখে মুহূর্তের মধ্যেই সব ক্লান্তি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেলো। বেশ ফুরফুরে লাগছে নিজেকে কিন্তু এখানকার প্রতিটি মিনিট অনেক মূল্যবান। সময়ের সদ্ধাবহার করতে না পারলে দু’দিনে সব জায়গায় ঘোরা সম্ভব নয়। আমরাও সব সুযোগ কাজে লাগাতে চেষ্টা করছি। যাহোক, আমাদের গাইড আব্দুর রহিমের সহায়তায় রাত্রিযাপনের জন্য খুব দ্রুত “দার্জিলিং রিসোর্ড” পেয়ে গেলাম। সবার চোখে-মুখে একরাশ ক্লান্তি এখন যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব দু’তিন ঘন্টার জন্য বিশ্রামে যাওয়া দরকার। আব্দুর রহিমের সাথে কথা হলো বিকেল ঠিক পাঁচটায় হোস্টেলের সামনে সে গাড়ি নিয়ে থাকবে। যেই কথা সেই কাজ, ঠিক বিকেল পাঁচটায় রহিম এসে হাজির। পড়ন্ত বিকেল সূর্যের তাপও অনেকটা কম, আমরা বেরিয়ে পরলাম সাজেক উপত্যকার দিকে। দার্জিলিং রিসোর্ড থেকে সাজেক উপত্যকা খুব বেশি দূওে নয় হেটেও যাওয়া যায়। কিন্তু আমি ভেবে দেখলাম যে, রহিম আমাদেরকে ভালো বেসে ফেলেছে। সে আমাদের সাথে বেশ ইনজয়ও করছে। রহিম আমাকে জানালো যে, সাজেকভ্যালি ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম সীমান্তবর্তি এলাকা। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৮০০ ফুট। এখানে মুলতঃ লুসাই, ত্রিপুরা, পাংখোরা উপজাতির বসবাস। পরিষ্কার আকাশে রাঙ্গামাটির পুরো শহরটা এখান থেকে দেখা যায়। এজন্য সাজেক ভ্যালিকে রাঙ্গামাটির ছাদও বলা হয়ে থাকে। যাহোক সাজেকভেলিতে পা রেখেই পৃথিবী সম্পর্কে আমার ধারণাটাই পাল্টে গেলো। পৃথিবীটা যে, এতো সুন্দর এখানে না আসলে আমি জানতেই পারতাম না। শেষ বিকেলের হলুদ মেঘের সোনালি আভা হালকা কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের উপর পড়ে যেন সোনায় মোড়ানো সামিয়ানা তৈরি করেছে। সূয্যি মামা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে সোনা বরণ আলো ছড়াচ্ছে। সোনায় সোনায় ভরে গেছে পার্বতী অঙ্গখানি। আহ! কি নৈসর্গিক রূপ, চারিদিকে যেন চুয়ে চুয়ে পড়ছে। প্রকৃতির নীরবতায় গোটা ভ্যালি যেন শান্ত-নিস্তব্ধতায় স্বর্গীয় সুধায় নিমগ্ন। অতঃপর প্রাকৃতিক নিয়োমেই গোধুলি সন্ধ্যা এসে আস্তে আস্তে সামিয়ানা গুটিয়ে ফেলে, ঠিক যেমন নাটকের শেষ দৃশ্যের পর যবনিকা পড়ে। আহ! প্রকৃতির কি নিয়োম, এবার দ্বিতীয় দৃশ্যের সূচনায় পূর্বাকাশে জ্বল-জ্বল কওে ওঠে সোনার থালার মতো চাঁদ। মুহুর্তের মধ্যে গোধুলির অন্ধকার সরিয়ে আলোয় ভরে দেয় চারিদিক। গাছের পাতায় হালকা শিশিরের উপর চাঁদের আলো পড়ে গোটা পাহাড় যেন হিরের টুকরোর মতো চকচক কওে জ্বলছে। বাতাস এসে পাতায় পাতায় হিরের টুকরোগুলোকে দোলা দিলে আলোর ঝলকানী এসে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আমি যেন বেহুশ হয়ে পড়ে থাকি। এভাবে কতোক্ষণ সেখানে ছিলাম নিজেও জানি না। ভ্রোমণ দলের কেউ আমাকে খুঁজে পাচ্ছিলো না। বন্ধু ডা.পলাশ ও তানজিলা এসে বলে-আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে তোকে খুঁজছি। চল্ নিচে যাই চা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। এখানে আদিবাসীদের দ’ুচারটা ছোট ছোট দোকান আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য এখানে বেচা-কেনা হয়। বিশেষ করে আদিবাসী খাদ্যদ্রব্য। সাজেকে খুব বেশি জনপ্রিয় ব্যাম্বো চা। সবাই খুব মজা করে এ চা খায়। এ চা বানানোও সহজ। প্রথমে বাঁশের ভেতর দুধ, চিনি দেওয়া হয়। এরপর চায়ের লিকার দিয়ে লুইসাইদের তৈরি এক ধরনের কাঠি দিয়ে নাড়তে হয়। এভাবেই তৈরি হয় ব্যাম্বো চা। আমি ব্যাম্বো চা খেয়ে সেটা স্মৃতি স্বরূপ সঙ্গে নিয়ে নিলাম। সাজেক ভ্যালীতে বি,জি,বি ক্যাম্প দেখতে পেলাম। এখানকার মানুষের সার্বিক নিরাপত্তার বি,জি,বি সদস্যরা কাজ করে। রাত বেশ খানিটা বেড়ে গেছে, রাতের খাওয়ারও সময় হয়ে গেছে। তাই আমাদের গাইড আব্দুর রহিম আমাদেরকে সোজা হোটেল ‘পেদা টিং টিং’ নিয়ে গেলো। সাজেকের স্বনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী সেরা হোটেলের মধ্যে ‘পেদা টিং টিং’ একটি। পর্যটকদের পছন্দের তালিতকায় এক নম্বওে থাকে ‘পেদা টিং টিং’। এখানে খাদ্য তালিকায় জুমের ভাত, পরোটা, বার বি কিউ, বাঁশ কুণ্ডল সবজি, আর ব্যাম্বো চিকেন, লইট্টা ফ্রাই, কাঁকড়া ফ্রাই, হাঁসের মাংস, খরহশ (পাহাড়ি ভর্তা) ইত্যাদি। আমরা সবগুলোরই একটু একটু করে খেয়ে পৃথকভাবে স্বাদ নেবো এমন সিদ্ধন্ত আসলো সবার পক্ষ থেকে। কিন্তু সমস্যাটা হলো এসকল খাবার আগে থেকে তৈরি থাকে না। বাঁশে রান্না করা খাবার অর্ডারের পর রান্না করে গরম গরম পরিবেশন করে কর্তৃপক্ষ। যাহোক কি আর করার আছে, খাবার অর্ডার দিয়ে সবাই বসে গল্প করছে। আমি সেই সুযোগে ম্যানেজারের অনুমতি নিয়ে হেসেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কারিগড়ের কাছে কিভাবে এ খারারগুলো বানানো হয় তা জানতে চাই। কারিগড় রামু লুসাই ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলে- আমরা ছোট থেকেই বাঁশের ভেতর রান্না করা খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। এখন নিজেই এগুলো রান্না করতে পারি। এ ধরনের রান্না করতে পাতিলের চেয়ে একটু বেশি কষ্ট হয়। কারণ পাহাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে তার একটি অংশ বাছাই করে এর ভেতরে রান্না করা হয়। রান্নার আগে সব কিছু গুছিয়ে নিতে হয়। সব ধরনের মশলা, মাংস, তেল ও চাল সব মিশিয়ে প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হলে বাঁশের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হয়। এরপর একটি অংশ আগুনে দিয়ে বাঁশটি চারপাশে ঘুরিয়ে ভেতরের খাবারগুলো সিদ্ধ করতে হয়। নির্দিষ্ট সময় পর বোঝা যায়, ভেতরে থাকা খাবার সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। তারপর পর্যটকদের সামনে বাঁশের ভেতর থেকে বাটিতে ঢেলে পরিবেশন করা হয়। পাহাড়ে বেড়াতে আসা লোকজন এ খাবার খেয়ে যেন সারা জীবন মনে রাখতে পারেন সে জন্য খুব যতœ করে রান্না করতে হয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর খাবার টেবিলে পরিবেশন করা হলে আমরা সবাই গোল হয়ে খেতে বসি। কিন্তু খাবটা কি? তার আগে খাবারের মনোমুগ্ধকর গন্ধে পেট ভরে গেলো। বিশেষ করে ‘বার বি কিউ’, বাঁশ কুণ্ডল সবজি, ব্যাম্বো চিকেন, খরহশ (পাহাড়ি ভর্তা)। খাবার শেষ হতে না হতেই শুরু হলো এর ভ’য়সী প্রশংসা। কারো মুখে ব্যাম্বো চিকেন, কারো মুখে বার বি কিউ আর আমার কাছে বাঁশ কুণ্ডল সবজিটা। আহ! মনে হয় এখনো তার স্বাদ মুখে লেগে আছে। আজ আমাদের শেষ দিন মানে বিদায়ের দিন। সময়টাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে আমরা যে সকল স্থান দেখার জন্য এতো কষ্ট করে এসেছি সেটা হয়তো পূর্ণতা পাবে। সাজেকভ্যালির প্রধান আকর্ষণ এর সর্বোচ্চ চ‚ড়া কংলাক পাহাড়। যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য হাজার হাজার পর্যটক এখানে এসে ভিড় জমায়। ওখানে যেতে না পারলে সাজেকে আসাটা বৃথা। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো ভোর চারটায় উঠতে হবে। তাহলে সূর্যোদয় দেখা সম্ভব। আমরা সবাই নিজেদের মোবাইল ফোনে এ্যার্লাম দিয়ে রাখলাম। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্যোদয় দেখার জন্য গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। কিছুদূর যেতে না যেতে আমাদের গাইড বললো-গাড়ি আর যাবে না। এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে এবং খুব সাবধানে পাহাড়ে উঠতে হবে। কারণ কংলাক চ‚ড়াটি নিচের অংশ থেকে একেবারে খাড়া উপরে। কোন ভাবে পা পিছলে গেলে আর রক্ষা নেই। জীবনের মায়া ছেড়ে দিতে হবে। আমরা একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল দু’টি ছোট ছেলে লাঠির বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানে পর্যটকরা সূর্যোদয় দেখার জন্য ভোরেই আসে আর লাঠি ছাড়া উপরে ওঠা অসম্ভব। একটি লাঠির দাম বিশ টাকা। জনপ্রতি একটি করে লাঠি নিয়ে আমরা পাহাড়ে উঠতে শুরু করলাম। কিছুদূর ওঠার পর আমার পা যেন বলে দিচ্ছে যে, সে আর সামনে চলতে অপারক। অনেক কষ্টকরে শরীরের সবটুকু শক্তি ব্যয় করে অবশেষে আমরা পাহাড় চ‚ড়ায় উঠতে সক্ষম হলাম। প্রচণ্ড পানির তৃষ্ণা পেলো তাই সেখানে কোন দোকানপাট আছে কি না মনে মনে সেটাই খুঁজছি। একটু দূরে টিলার একেবারে শেষ প্রান্তের এক কোণে একটি দোকান চোখে পড়ল। খুব কাছে মনে হলেও ঘুরে ফিরে যেতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেলো। আর পাহাড়ের ধর্ম এটাই, চোখের দৃষ্টিতে দেখা এক কিলোমিটার-বাস্তবে সেটা দশগুণ বেড়ে যায়। যাহোক কাছে যেয়ে দেখি, সত্যি সেটা একটা দোকান। উপজাতি এক অপূর্ব যুবতি মেয়ে, পরনে সেলোয়ার আর ¯্রফে একটা বড় গলার টিশার্ট। সে বেশ উৎফুল্ল মনে হেলেদুলে নিজেস্ব ভঙ্গিমায় চায়ের কাপে চিনি মেশানোর কাজ করছে। প্রথমে আমার মনে হলো সে বাংলা বোঝে কি না তবুও সকল দ্বিধাদ্বন্দ¦ ভুলে তাকে বলি-দিদি এক কাপ চা হবে? সঙ্গে সঙ্গে সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বললো-হ্যাঁ হোবে, বছেন। আমরা সবাই চায়ের জন্য দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে পড়লাম। চা পানের ফাঁকে ফাঁকে তার সাথে কথাবার্তা বলে একটু অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করলাম। এক পর্যায়ে তার নাম জিজ্ঞাসা করলে সে বলে-বিনি লুসাই। তার বাবার নাম জানতে চাইলে- এক সেগেণ্ড দেরি না করে সাথে সাথে উত্তর দিলো -রামু লুসাই। রামু নামটা শুনে আমার কান খাড়া হয়ে গেলো। আমার মনে পরে গেলো গতরাতে পেদা টিং টিং হোটেলের কথা, সেই রামু নয়তো? যার সাথে আমি গতরাতে বেশ খানিকটা সময় গল্প করে কাটিয়েছি। সে এতোটাই মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে যে, তাকে দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করাটা নেহাত বোকামি ছাড়া কিছু না। কিন্তু আমার লেখার জন্য তার সাহায্যের যে খুব দরকার! নিরুপায় হয়ে আমি এবার তার নাম ধরেই ডাকলাম। নাম ধরে সম্বোধনটা হয়তো তার পছন্দ হয়েছে। সে কাজ ছেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে একটা মুচকি হাসি দিলো। তার হাসিতে আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম আর তার দিক থেকে চোখ নামিয়ে নিলাম। এবার সে নিজেই বললো- স্যার যেন কি বলতে চাইছেন? না মানে, তোমার বাবা কী পেদা টিং টিং হোটেলে থাকে? হ্যাঁ স্যার। কিন্তু আপনি বাবাকে কিভাবে চেনেন? আরে না, তেমন কিছু নয়। গতরাতে তোমার বাবার সাথে বেশ খানিকটা সময় গল্প করে কাটিয়েছিলাম। তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ, বিনি। আমার মুখে বাবার প্রশংসা শুনে তার চোখ দু’টো আনন্দে জ্বল জ্বল করে ওঠে। সে মনে মনে আমাকে আর অপছন্দ করছেনা। আবেগঘন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে- জানেন স্যার, আমার জন্মের সময় মা মরে গেলো। বাবাটা আর বিয়ে না করলো। আমাকে বড় করলো, বিয়েটাও দিলো। আমার বাবাটা ভগবান লাগে স্যার। আমি লক্ষ্য করলাম, আবেগে তার চোখ ছলছল করছে। আর একটু হলেই হয়তো পাহাড়ি ঝরনা হয়ে তার বুক ভিজিয়ে দেবে। তাই আবেগের জায়গা থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য, একটু সহজ হওয়ার জন্য বললাম-বিনি, তুমি কিন্তু আমাকে চা দাও নি। হায় ঈশ্বর! মাফ করবেন স্যার। এই নিন আপনার চা, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে কি না বলবেন। চা ঠাণ্ডা-গরমের বিষয়টি আমার কাছে মূখ্য নয়, মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো তাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন প্রণালী সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা। কিন্তু তার ছোট্ট একটি ছেলে বয়স চার-পাঁচ বছরের মতো হবে, সে ভীষণ দুষ্টুমী করছে। সব সময় এদিক-সেদিক দৌড়া-দৌড়ি করছে। গোটা টিলাটি বোধয় তারই দখলে। যখনে সে খাড়া টিলার কাছে যাচ্ছে, বিনি দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে আনছে। একদিকে অবুঝ সন্তান অন্যদিকে দোকানের খরিদ্দার, সবমিলে তার ভীষণ ব্যস্ততা। পিছন থেকে বন্ধু সোহাগ ডেকে বললো যে, সূর্য ওঠার সময় হয়ে গেছে। সবাই দৌড়ে গিয়ে পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গা যেখানে, সেখান থেকে সূর্যোদয় স্পষ্ট দেখা যাবে সেখানে যেয়ে ভিড় জমাতে শুরু করলো। কিভাবে সেই মহা পরাক্রমশালী সূর্যটা বীরদর্পে উদিত হয়ে স্বীয়আলো দ্বারা পৃথিবীর সকল অন্ধকারকে দুরিভুত করছে। আমিও সব ছেড়ে তাদের দলে যোগ দিলাম। প্রতিক্ষিত সেই সূর্যটা উঁকি দিতে শুরু করছে। একি আশ্চর্যের বিষয়! সূর্যটাকে মনে হচ্ছে আমার হাতের নাগালে এসে গেছে, এতোটাই কাছে মনে হচ্ছে যেন হাত বড়ালেই ছোঁয়া যাবে। তুলোর মতো রাশি রাশি সাদা মেঘ এলো মেলোভাবে উড়ছে। মনে হচ্ছে যেন আমি মেঘের রাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছি। পাহাড়ের উপরে ঠাÐা বাতাস বইছে তাই একটু একটু শীতের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ের চ‚ড়ায় কুয়াশার মতো মেঘ জমে গাছ পালাগুলোকে ঢেকে রেখেছে। হঠাৎ সোনালী রঙে ছেয়ে গেল চারিদিক। মনে হচ্ছে যেন একবারে খাটি সোনা দিয়ে মোড়ানো হয়েছে গোটা পাহাড়কে। উপত্যকা পেরিয়ে ক্রমশ পাহাড়ের ভাঁজ যেন আকাশ চুম্বি হয়েছে সেখানে। সুদীর্ঘ উপত্যকা জুড়ে অরণ্যের সীমানা বিস্তৃত। কংলাক সবচেয়ে উঁচু চ‚ড়া বলে বাতাসের ঝাপটা ক্রমশ বেড়েই চলছে। বাতাসের টানে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের চ‚ড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন কেমন অচেনা লাগছে। প্রাণ পুলকিত হয়ে প্রকৃতির জয়গানে জাগ্রত হয়ে ওঠে সবার কবি মন। অপ্রেমিকও যেন আজ হয়ে ওঠে বিশ্ব প্রেমিক। বৃদ্ধরাও বয়সের ভারকে পিছনে ফেলে হয়ে ওঠে তেজদীপ্ত, নবতরুণ। বসন্তের বাতাস, সাদা সাদা মেঘের ভেলা, পাহাড়ি ফুল আর ভোমরের সাথে খেলতে খেলতে কখন যে বেলা গড়িয়ে যায় টেরও পাইনি। গাইড আমাদেরকে মনে করিয়ে দিল আজ আমাদের বিদায়ের দিন। দিবালোকের মাঝেই ফিরে যেতে হবে অন্যথায় বিপদে পড়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কি আর করার আছে, এক বুক ভরা তৃষ্ণা নিয়ে, অপূর্ণতার মাঝে ফিওে যেতে হচ্ছে। অবশেষে রবী ঠাকুরের মতো বলতেই হলো- ‘শেষ হয়েও হলো না, শেষ’।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now