বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
গল্পের নাম- অপূর্ণতা
শেষ প্রহরের পাখিগুলো একে একে ফিরে যাচ্ছে অন্ধকার গুহা ছেড়ে, হয়তো কিছু সময় পড়ে তাদের আনন্দমুখর কলকাকুলিতে ভরিয়ে দেবে পৃথিবীর বুক। ভুরভুর ছন্দময় ভোরের আলোয় পাঁপড়ি মেলে হাসছে কানন ভরা ফুল। পাশের বাঁশ বাগানে বউ কথা কও, বউ কথা কও বলে সমান তালে ডেকে যাচ্ছে একটি পাখি, সুখের বিরক্তিতে ভরিয়ে তুলছে চারপাশ। বাড়ির আঙিনায় বকুল গাছটার একটা নিচুডালে তারস্বরে ডাকছে কাক।
রাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় চোখের পাতাগুলো সীসার মতো ভারী হয়ে আছে কিছুতেই খুলতে চাচ্ছেনা। তাই শোয়ার বালিশটা কানের উপর চাপ দিয়ে আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার চেষ্টা করল ধ্রুব। এমন সময় ছোট বোন নিশা দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে-
ভাইয়া? এই ভাইয়া? নদীর পারে কি যেন হয়েছে, সবাই দৌড়াচ্ছে। তুইয়ো যেয়ে একটু দেখনা কি হলো?
তুই যেতে পারিস না, আমাকে বিরক্ত করছিস কেন?
আমি কি তোর মতো ছেলে? যে ইচ্ছে হলো আর দৌড় দিলাম।
কানের কাছে প্যান-প্যান করিসনাতো যা, সবাই যখন গেছে একটু পরেই শুনতে পাবি কি ঘটেছে। ততক্ষণ ধৈর্য্য ধরে বসে থাক, আমাকে একটু ঘুমাতে দে।
আল্লাহ যে তোকে কেন ছেলে বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠালো, তোর মেয়ে হওয়া উচিৎ চিলো বুঝেছিস।
তুই এখান থেকে গেলি? সকাল বেলা উঠেই মায়ের মতো শুরু করে দিলো।
সকাল সকাল ধ্রুবর ধমক খেয়ে নিশার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সে নিজের ঘরে যেয়ে চুপচাপ বসে রইলো।
এমন সময় পাশের বাড়ির রহিমা খালা এসে বলে- ধ্রুব, ‘তুই কোনটে বাবা, এ্যাকনা যা ক্যানে নদীর পারোত। হায় আল্লাহ! কার যে বুকের মানিক নদীত পড়ি মরিল। কি সুন্দর তার চেহারা, লম্বা সোটা মুখ, চিকন টিনটিনা এ্যাকনা নাক, একেবারে হুরপরীর মতো দেখতে।’
রহিমা খালার কথায় ধ্রুব আর স্থির থাকতে পারলো না। বিছানা চেড়ে উঠে সোজা চলে গেলো নদীর পারে।
বর্ষার নদী, এখন ভরা যৌবন তার উথাল পাথাল ঢেউ কাউকে ভাসিয়ে নিতে তার খুব বেশী সময় লাগেনা। সবাই লাসটাকে ঘিরে ধরে আছে। ভিড় ঠেলে ধ্রুব লাসটির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল, এরই মধ্যে একজন বলে উঠল এটা পাশে গ্রামের মেয়ে কোন এক আত্মিয়র বিয়ে বাড়িতে নাকি তাকে দেখেছে। কার মেয়ে কোথায় বাড়ি নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।
দু’চারজন মানুষকে সরিয়ে দিয়ে ধ্রুব লাসটির একেবারে কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তারপর নীলা বলে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল, তার এ চিৎকারের শব্দ যেন আকাশে বাতাস কেঁপে উঠলো, মেঘদের সরিয়ে সূর্য মহাবিশ্ময়ে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো সে গগন বিদারি আর্তনাদ। মাথার উপর আসমান যেন ভেঙে পড়লো, সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে যেতে লাগলো। তার দু’চোখ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো, ঝাপসা চোখের দৃষ্টিতে জলন্ত অগ্নিকুণ্ডলীর ভেতর থেকে জেগে উঠল নীলা, তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে আর ফিসফিস করে বলছে- ধ্রুব, তুমি মন খারাপ করোনা, এ জনমে নাইবা হলো আমাদের দেখা, তুমি পরজনমে এসো, সেখানে আমাদের মিলন হবে। তারপর আস্তে আস্তে সে দুরে, বহু দুরে, কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো।
ধ্রুবর এ অবস্থা দেখে আর যা হোক কার বুঝতে বাকি রইলো না যে, মেয়েটা তার পর নয়। সবাই একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলো এ মুহূর্তে কি করা উচিত, তারা এখন কি বা করতে পারে। সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ধ্রুব লাসটাকে প্াঁজাকোলা করে তুলেনিয়ে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। সে নির্বাক, কোন কথা বলার এতোটুকু শক্তিও তার মধ্যে অবশিষ্ট্য নেই। সবাই তাজ্জব! বাড়ির উঠোনে লাশটাকে রেখে বলে আমাদের পাশের গ্রামের রহিম হাজিকে খবর দেন, নীলা তারই মেয়ে।
নীলা আর ধ্রুব একই ক্লাসে পড়ত। অত্যন্ত নম্র ভদ্র ও সহজ সরল স্বভাবের মেয়ে ছিলো সে। খুব ভালো গানও গাইত। দু”বছর আগে কলেজের সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় নজরুল সঙ্গীতে সে প্রথম স্থান অধিকার করে। ব্যাস! যেই কথাটি রহিম হাজীর কানে অসে অমনি তার গান গাওয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। রহিম হাজী বলেন, মেয়ে মানুয়ের গান গাইতে নেই, গলার আওয়াজ পরপুরুষে শুনলে মস্ত বড় গোনা হয়, খুব শক্ত গোনা, যার কোন মাফ নেই।
অনেকদিন হয়েগেল নীলা কলেজে নেই, এদিকে ফরম পূরন করা না হলে সে পরীক্ষা দিতে পারবে না। ধ্রুব তাই কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী মিলে নীলাদের বাড়ি যায়। কিন্তু তার সাথে দেখা হওয়ার আগে রহিম হাজী সাব সাব বলে দিলেন তার মেয়ে কোন পরীক্ষা দেবে না, ফরম পূরনও করবে না। তাই সেদিন শেষ দেখাটিও হয়নি নীলার সাথে।
ধ্রুব শহরের ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হয় ধর্মীয় পর্ব গুলো ছাড়া খুব একটা বাড়িতে আসা হয়না। বছর খানেক পরে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে নীলার সাথে দেখা করতে যায়-
ধ্রুবকে সেদিন জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে নীলা অনেক্ষণ কেঁদেছিল। নয়নে আটকে থাকা কষ্টের লোনাজল বিস্মৃতির পথের সব ধুলো বালি সরিয়ে তার গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে। মনে মনে ধ্রæব বলে নীলা, তুমি কাঁদো, আরো কাঁদো। হৃদয়ের গহীনে লুকানো জমাট বাঁধা কষ্টগুলো তোমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তোমার চারপাশের ঐশ^র্য, চাকচিক্যময় বর্ণালী জগৎ, অহংকার করার মতো অনাগত ভব্িযষ্যত তোমার ভেতরে ভেতরে পঁচা কাঠের অভ্যন্তরে উঁই পোকার মতো ক্ষয় করে ক্রমাগত তোমাকে দুর্বল করে চলেছে, তুমি কাঁদো, কাঁদতে কাঁদতে সব কষ্টের জলগুলো নিশ্বেষ করে দাও। যেন তোমাকে আর কষ্ট দিতে না পারে।
এক পলক দেখার অনাদিকাল প্রতীক্ষা, বিস্মৃতির বেড়াজাল সরিয়ে মায়াবী মুখের প্রাণোচ্ছল হাসি, ক্ষমাহীন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বুকের মধ্যে তোমাকে পাওয়া, বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ তৃপ্তি সুধায় হৃদয় পরিপূর্ণতা পেয়েছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভরা পূর্ণিমার অ¤øান জোছনাকে স্বাক্ষী রেখে কতো নির্ঘুম রাত যে পার করেছ তার হিসেব আমি তোমাকে দিতে পারব না জানি, তবে জীবন ডায়রির খোলা পাতায় যে দুঃখ কষ্ট , জ্বালা-যন্ত্রণা, নিগৃহিত নিপিড়িত সময়ের কালো দাগ, ব্যর্থতার চরম গ্লানি, হতাশার কৌশলগত পরিক্রমায় ডুবে থেকে দিনে দিনে যে নিজেকে নিশ্বেষ করে দিয়েছ তা আমি বেশ উপলব্ধি করতে পাচ্ছি।
ভালোবাসার প্রতি তোমার যে শ্রদ্ধাবোধ এ আমার চির চেনা, সময়ের পালাবদলে তোমার কষ্টার্জিত অতীত, দম বন্ধকরা আবেগ অনুভুতি, ক্ষয়ে যাওয়া আত্মার অতৃপ্ত বাসনা নীরবে নিভৃতে কেঁদে কেঁদে যে মধ্যরাতের বাতাশ ভারী করে তা কেবল তোমারই নিজেস্ব ইচ্ছা অনিচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিয়ে। এক বুকভরা প্রতীক্ষার নরকীয় প্রহরের অবসানে নিবিষ্ট ধ্যানে অনেক্ষণ বিভোর থাািক। মরুসাহারার খরা বুকে উত্তপ্ত মন একটু প্রশান্তির ক্যানভ্যাসে স্বস্থির রংতুলির আঁচড়ে ভবিষ্যত জীবনের রঙিন ছবি আঁকে। সাঁঝের মায়া কাটিয়ে নিসিদ্ধ রাতের একাকিত্ব ঘুচিয়ে যখন সাবলিলতায় ফিরে আসে অস্থির মন তখন ভীষণ চঞ্চল হয়ে ওঠে, শূন্য হৃদয়ের উর্বর জমিনে বিলাসী স্বপ্নের দু”ফোটা বৃষ্টি পড়ে। তাই স্বপ্ন বিলাসী মন ক্ষণিকের জন্য হলেও সেই জমিনে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে।
জীবনের অগোছালো উঠোনে হঠাৎ এসে থমকে দাঁড়ায় চলমান বিবেক, নিজের বুকের উপর থেকে নীলাকে সরিয়ে নিয়ে ধ্রæব বলে- একটু অপেক্ষা কর নীলা? দেখবে একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমার ভয় তো কেবল সেখানেই ধ্রুব? যেখানে অপেক্ষমান রাতের নীরবতা গুমড়ে কাাঁদে, আশার থলিতে লাল সালু কাপড়ে মোড়ানো থাকে জীবনের চাওয়া পাওয়া। পাহাড় সমান উঁচু নিচু পথ, চলতে গিয়ে পিচলে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায় শরীরের অবয়ব। আমার ভাগ্যহত জীবনে একি নিয়তির নির্মমতা! জন্মের পাপে মাতৃ বিয়োগ, মমতার চাদরে মোড়ানো ভালোবাসার পরিবর্তে পেয়েছি রুক্ষতা, শাসনের ডাণ্ডাবেড়ি। আমার আর এ নরকে বাঁচতে ইচ্ছে করে না ধ্রুব?
ধ্রুব নীলার মুখ চেপে ধরে বলে, ছিঃ অমন কথা মুখে বলতে নেই নীলা? আমি বলেছিতো একটু অপেক্ষা কর, আর কয়েকটা মাস। তারপর সকল জ্বালা যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে আমাদের মিলন হবে কোন এক সুখের মোহনায়। হৃদয়ের আলিঙ্গনে পরম তৃপ্তির উষ্ণতায় আপ্লুত চোখ ভালোবাসার নিবিড় স্পর্শে কেবল নতুনত্ব খুঁজে পাবে। আধারের গায়ে রঙিন আলো মেখে আমরা সেদিন নবজীবনের স্বাদ খুঁজে বেড়াব আমরা। হৃদয়ের গোপন গলিতে লুকিয়ে রাখা প্রেম বিকশিত হবে তোমার শালিক জোড়া চোখে, হাজার বছর ধরে চলবে আমাদের এ পথচলা, তবুও কখনো হবে না শেষ।
ধ্রুব আমার মনের ভেতর কেন জানি এক অজানা আতঙ্কের সুর বার বার বেজে উঠছে, হয়তো এটাই আমাদের শেষ দেখা। আর কোনদিন দেখা হবে না।
কথাগুলো বলার সময় থরথর করে তার ঠোঁট কাঁপছে, শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে গেছে। সে আর দাড়িয়ে থাকতে পাচ্ছে না ধপাস করে বিছানার উপর বসে পড়ল।
নীলা, তোমাকে শান্তনা দেবার মতো কোন অমোঘ বাণী আমার জানা নেই, শান্তিহীন নীরবতায় হাজারো চিন্তা মাথায় জড়ো করে নির্ঘুম রাত কাটাবে, এতোটা পাগল হলে কি অসম জীবনের পথে পাড়ি দেয়া যায়? এতোটা আবেক প্রবণ হলেকি কষ্টকে জয় করা যায়? তুমিই বলো?
নীলার পক্ষে যেমন কলেজের গণ্ডি পার হওয়া সম্ভব হয়নি, তেমনি সৎ মায়ের রক্ত চক্ষুশূল শাসনের গণ্ডি পার হতে পারেনি। তাই জন্মদাতার পিতৃ অধিকারের মর্যাদা দিতে গিয়ে একদিন লাল বেনারশি পরে চলে যায় অন্যের ঘরে। বিরহ বেদনা অনুভবের বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত স্বপ্ন গুলেকে হাতের মুঠোয় জড়ো করে বাক্সবন্দি করে রাখে। প্রকৃতির পালাবদলে দিন যায় রাত আসে, মাস যায় বছর আসে কিন্তু পরিবর্তন আসেনা অমোঘ নিয়োমের, অনাগত ভবিষ্যতের। অদম্য ইচ্ছে গুলোকে মাটি চাঁপা দিয়ে পুতে ফেলে সবার মনোরঞ্জনে নিজেকে আত্মহুতি দেয়। হৃদয়ের কোণে লালিত স্বপ্ন গুলোকে গুছিয়ে নেয়ার তিব্র বাসনা প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত, আপোষহীন দুর্বার তেজ দীপ্ত অস্থির চিত্ত কেবলি বারবার হারিয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়ে, ভেঙে যায় আকাশে উড়ানোর ডানা স্থিমিত হয়ে পড়ে মনের জোর বোবা কান্নায় থেমে যায় চঞ্চলতা, অদম্য সাহস বুকের শক্তি। দু”চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রæ হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণে রঙিন পৃথিবীটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে বাক শক্তি হারিয়ে যায়। নীলা গভীর রাতে বহু কষ্ট করে ধ্রুবকে একটা চিঠি লিখে-
প্রিয় ধ্রুব,
কোথায় আছ কেমন আছ জানিনা, অনেকটা স্বার্থপরের মতো তোমাকে ভুলে শুধু নিজেকে নিয়েই বেশ আছি। সংসারের আঁচলে নিজেকে জড়িয়ে আমার সমস্ত ঐশ্বর্যকে উজার করে দিয়েছি সবার জন্য বিনিময়ে পেয়েছি ত্যাগের আনন্দ। শুধু পরিশ্রম করার অধিকার টুকুই আমার চরম প্রাপ্তি। ধ্রুব, আমার মাথায় কয়েকগোছা চুল ছাড়া শরীরে অবশিষ্ট কিছুই নেই। গায়ের সোনা রঙ কালো হয়ে ঝরা পাতার মতো শুকিয়ে গেছে। সংসার জলধির বিশাল ঢেউয়ের বিপরীতে সাতার কাঁটতে কাঁটতে আমি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আর পাচ্ছিনা নিজেকে সামলে রাখতে। নিজের মানুষটা যে কিনা আমার সজ্জা সঙ্গী তাকে চাওয়াটাও যেন অরঙ্ঘণীয় পাপ। গভীর রাতে মাতাল হয়ে সে বাড়ি ফেরে শরীরের গন্ধে পাশে থাকা যায় না। চুলোয় যাক জীবন-যৌবন, সর্বনাশা শরীর। কি হবে বেঁচে থেকে বলো? শুধু কষ্টকে ধার করে জীবনের তাকে সাজিয়ে রাখা। পিতৃত্বের অধিকারের মর্যাদা দিতে গিয়ে তোমার জীবনটাকে নস্ট করে দিলাম। আমায় ক্ষমা করো। এ জনমে নাইবা হোল তোমায় পাওয়া, পরজনমে এ অধিকার টুকু পাওয়ার প্রত্যাশায় তোমায় ছেড়ে গেলাম। ভালো থেকো ।
ইতি- তোমার নীলা।
প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্ধস্ত কোন উপত্তকার মতো ধ্রুবর বুকটা দুমড়ে মোচড়ে যায়। হৃদয়ের নিভৃতে কোনে এক প্রচণ্ড শব্দের পর আবার চুপচাপ হয়ে যায়। ভাবনার কেন্দ্র বিন্দুতে আগুন লাগে, সব পুড়ে ছারকার হয়ে যায়। চোখের সামনে দৃশ্যমান থাকে কেবলি ছাইয়ের স্তুপ, তার শৈশব, যৌবন, ইপ্সীত প্রেম, অহংকার আশা নিরাশার ধুধু বালু চর। পার হয়ে যাওয়া পঁচিশ বছরের ইতিহাস। আজ যেন মুহূর্তেও মধ্যে কেমন ধুসর হয়ে গেল। এক মুহুর্ত দেরি না করে তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে ধ্রুব বেড়িয়ে পরে রাতের ট্রেন ধরার জন্য।
গভীর রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি ট্রেন চলে তার আপন গতিতে আর ধ্রুব যেয়ে থাকে খোলা জানালার বাইরে। একাকি নিঃসঙ্গতার মাঝে কেবলি নীলার কথা মনে পড়ে। চুলে তেল মাখার অভ্যাস তার ছিলোনা কোন কালে, উসকো খুসকো চুল নিয়ে ক্লাসে কতোদিন যে স্যারের হাতে মার খেয়েছে তার হিসে নেই। তার অবিন্যাস্ত চুলে নিজ হাতে সুগন্ধি নারকেল তেল মাখিয়ে দিয়ে নীলা বলেছিল, ‘ছাত্রজীবনে এ অভ্যাটা ধরে রেখো, ভবিষ্যতে তোমার নিয়ন্ত্রিত জীবন গড়ার কাজে লাগবে’।
এবার নীলার কথায় সত্যি সত্যি তার চোখে অশ্রু চলে আসে। মা নেই, বাবা নেই বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে সে নীলাকেই বুকে আকড়ে ধরে আছে। আজ সেও তাকে ছেড়ে চলে গেছে অন্যের ঘরে, তাহলে সে বাঁচবে কি নিয়ে? নীলার চিঠিটা পকেট থেকে বের করে ট্রেনের আবছা আবছা মৃদু আলোয় পড়া শুরু করলো, মৃদু আলোয় চিঠির অক্ষরগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা কিন্তু তাতে কি? চিঠিটা হাতে পাওয়ার পর এতোবার পড়া হয়েছে যে সেটা মুখমÍ হয়ে গেছে। চিঠির অক্ষরড়–লো যা বোঝায় তাতে নীলা ভালো নেই। তাহলে সে বিয়েতে রাজিবা হলো কেন? হাজারো প্রশ্নের হিল্লোল তার মাথার ভেতর গুরপাঁক খেতে থাকে। পূর্বাকাশে প্রভাতের আলো একটু একটু করে মাথা চাড়া দিতে থাকে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ধ্রুব আসে নীলার কাছে আর নীলাও লাস হয়ে ভাসতে ভাসতে আসে ধ্রæবর কাছে। মিলনের কি অমৃত সুখ, চোখের জলে।
রাত ক্রমশঃ গভীর হতে চলেছে, ধ্রুব একগোছা রজনীগন্ধ্যা নীলার সমাধিতে দিয়ে, পাশে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। তার বিশ্বাস নীলা উঠে এসে তার হাত ছুঁয়ে বলবে ধ্রুব, তুমি কেমন আছ?
সত্যি সত্যি নীলা উঠে এসেছে তবে জাগরণে নয় স্বপনে। সারারাত নীলার সমাধির পাশে বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন জানি ঝিমিয়ে পড়ে ধ্রুব, ঠিক তখনি নীলা উঠে এসে তার হাত ছুঁয়ে বলে- ধ্রুব, তুমি চলে আসো আমার কছে, ওখানে থেকো না আর। ওখানকার মানুষগুলো বড় নিষ্ঠুর, স্বার্থপর তুমি ওদের সাথে একাই লড়তে পাবে না।
নীলা কথা না বলে একদণ্ড থাকতে পারত না অথচ এখন কেমন শান্ত শিষ্ট, নীরব হয়ে শুয়ে আছে। তার সমাধির চিহ্নকে বুকে আকড়ে ধরে কেউ কষ্ট পাক তা সে চাযনি বলেই একাকি নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, শরীরের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াসে সে ঝাপিয়ে পড়েছিল অথৈ নদীতে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তার শেষ ইচ্ছাটুকুও পূরণ হলো না, মৃত্যু তাকে আবার টেনে নিয়ে গেল ধ্রæবর কাছে। মরে যাওয়া যাওয়া মানেই যে সরে যাওয়া নয়, জীবদ্দশায় সেটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় নীলা।
ঘরের ছাদের ফুটো যেমন বৃষ্টিকে স্বাক্ষী রেখে জানিয়ে দেয় তার বয়স কতো, ঠিক তেমনি নীলার মৃত্যু তাকে আজ জানিয়ে দিল সময়ের তলে পঁচিশটি বছর গত হয়ে গেছে যার নিখুত হিসেব সে কোন দিনই করার অবকাশ পায়নি। ছোট বেলায় দাদির মুখে শুনেছে কেউ মরে গেলে তার মাথার চুলে যে উকুনগুলো বাসা বাঁধে সেগুলো ভয়ে গুটিসুটি মেরে মাথা ছেড়ে বালিশের তলে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু নীলা সেই উকুন গুলোকেও সেই সুযোগ দিল না।
শরতের সাদা মেঘের আড়ালে শেষ রাতের পূর্ণিমার চাঁদ যেমন মলিন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নিজের অস্তিত্বকে বেচে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয়ে দিনের আলোর কাছে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হয় ঠিক তেমনি একখানা চাঁদমুখ পৃথিবীর সকল দুঃখ কষ্ট, লাঞ্চনা বঞ্চনা, হতাশা গ্লানির সাথে সংগ্রাম করে পরাজিত হয়ে লাস হয়ে পড়ে আছে সমাধিতে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now