বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
WOLF MOUNTAIN
লেখক : জে. আর. পিন্টো
ভাষান্তরে : সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়
পর্ব ৩
।। তদন্ত।।
সে রাতে আর কোনো গর্জন কানে এলো না আশার গ্রীনের। এমনকি বিশেষ কিছু নজরেও পড়ল না। ভোরের দিকে চোখ ভারী হয়ে এসেছিল গ্রীনের। গাছতলার মাটিতেই চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছিল সে। ঘুম ভাঙল কোকো'র হাতের ঠেলায়।
"...ওঠো! ওঠো এবার!" কানে এলো তার পরিচিত কণ্ঠস্বর।
এতই গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল গ্রীন যে প্রথমটায় কিছু বুঝতেই পারল না। তারপরেই সব এক লহমায় মনে পড়তে ধড়মড় করে উঠে বসল সে। চোখ রগড়াতে লাগল।
"....এই রোদে এভাবে শুয়ে আছো কি করে?" বিস্ময় প্রকাশ না করে পারল না কোকো।
ঘাড়ের পেছনে ডলতে ডলতে গ্রীন বলল, "সারারাত জেগে ছিলাম কিনা। ভোরের দিকে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছিল চোখে"।
বড় করে একটা হাই তুলল গ্রীন। তারপর একটু থেমে বলল, "সারারাত জেগে আমি এই তাঁবুর মানুষগুলোকে পাহারা দিচ্ছিলাম। ওয়্যারউলফের কবল থেকে", গা থেকে ঘাস-পাতা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়িয়ে বলল গ্রীন।
"....সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো গ্রীন?" জানতে চাইল কোকো, "কোথাও কোনো গোলমাল নেই তো?"
কোকো'কে বেশ সতেজ দেখাচ্ছিল।
"....না, কোনও গোলমাল নেই", বলল গ্রীন, " আমার জানা মতে গত রাতে কোনও গণ্ডগোল হয়নি কোথাও"।
"....এখানে হয়নি তো কি", এবার গম্ভীর স্বরে বলল কোকো, "শহরে একটা খুন হয়েছে। মিস্টিরিয়াস !"
"....খুন! আবার! শহরে! " বিস্ময়ে যেন কথা সরছে না গ্রীনের মুখে, "কে আবার খুন হলো?"
"....একটা লোক...শহরের পথের ওপর পড়ে আছে।"
"....কি বলছ?" গ্রীনের বিস্ময় সপ্তমে চড়ল।
আধঘন্টার মধ্যেই দুজনে শহরের সেই বিশেষ জায়গাটিতে এসে পড়ল। অকুস্থলে, যেখানে গতরাতে খুন হয়েছে ম্যাথিউ লন্ড্রি। ইতিমধ্যে পুলিশ এসে পড়েছে, এসে পড়েছে কাগজের চিত্রসাংবাদিকরাও। লাশ'টাকে পলিথিনের শিট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। অকুস্থলেই ইন্সপেক্টর চৌভেটের সাথে দেখা হলো গ্রীনের। গ্রীনকে দেখেই হেসে বললেন, "মঁসিয়ে গ্রীন, কি হঠাৎ শুরু হলো বলুন তো এসব?"
গ্রীন সুকৌশলে প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলল, "আপনার কি মনে হয় ইন্সপেক্টর, এই খুনটার সঙ্গে ক্যারিফোরের টেন্ট সিটি'তে ঘটা খুন'গুলোর কোনো সম্পর্ক আছে?"
ইন্সপেক্টর চৌভেট এক মূহুর্ত কি যেন চিন্তা করে বললেন, "মনে হচ্ছে, এই খুনটা কোনো ড্রাগ-রিলেটেড ক্রাইম"।
"....কিভাবে বুঝলেন?"
"....এই যে লোকটাকে দেখছেন, এ ছিল এই পোর্ট অফ প্রিন্সের একজন কুখ্যাত ড্রাগ ব্যবসায়ী। তবে এটা আমার কাছে suspicious লাগছে, গত রাতে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের পরিত্যক্ত পথের ওপর একে এইভাবে খুন কে করল!"
"....আচ্ছা, একেও কি সেই একইভাবে খুন করা হয়েছে, ঠিক যেরকমভাবে খুন করা হয়েছে আগের ভিক্টিমদের?"
এবার ইন্সপেক্টর চৌভেটের মুখে একগাল হাসি দেখা গেল। বলল, "ভালো বলেছেন, মঁসিয়ে গ্রীন। আমরা হাইতিয়ান'রা এখনো মনেপ্রাণে আধুনিক হয়ে উঠতে পারিনি, বুঝলেন তো? কিন্তু আপনি তো একজন আমেরিকান, আপনি কি পারেন আমাদের এই কেসটায় কোনো আলোকপাত করতে?"
ইন্সপেক্টর এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন পলিথিনের শিট দিয়ে ঢাকা দেহটার কাছে। তারপর হাতের বেঁটে লাঠিটা দিয়ে শিট'টা ওঠাতে ওঠাতে বললেন, "নিজের চোখেই দেখে নিন"।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল কোকো, গ্রীন একবার কোকো'র দিকে ফিরল। ওর দু'চোখে গাঢ় অস্বস্তি। কোকো'ও তাকাল তার দিকে। চোখে চোখে নীরবে কিছু একটা কথা হয়ে গেল দুজনের।
পলিথিনের শিট'টা ওঠাতেই লাশটার যে অবস্থা গ্রীনের চোখের সামনে ফুটে উঠল, তা দেখামাত্রই তীব্র ঘৃণা এবং বিতৃষ্ণায় মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল গ্রীন। নিজেকে ধন্যবাদ দিল, ভাগ্যিস এখনও সকালের ব্রেকফাস্ট পেটে পড়েনি ওর, নইলে নির্ঘাত বমি হয়ে যেত। শুধু গ্রীন নয়, একইরকম অবস্থা দেখা গেল ভিড়টার মধ্যেও। একজন মহিলা তো রীতিমতো হাঁউমাঁউ করে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিল। ম্যাথিউ লন্ড্রির শরীরের অর্ধেকটা যেন কোনো হিংস্র জন্তু খেয়ে নিয়েছে। ওর চোখদুটো মণিসুদ্ধ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। দেহের ভেতরের মাংস বা organs বলে কোনওকিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
বীভৎস! নারকীয়!
"....এই খুন'টার ব্যাপারে আপনার কি আইডিয়া হচ্ছে? কেন হচ্ছে এই মিস্টিরিয়াস খুন'গুলো?"
ইন্সপেক্টর চৌভেট কিছু একটা বলার জন্য আমতা আমতা করছেন, ঠিও এইসময় একজন কনস্টেবলকে "স্যার....স্যার..!" বলতে বলতে হন্তদন্ত হয়ে এদিকে ছুটে আসতে দেখা গেল। ওর দু'চোখ কিসের উত্তেজনায় বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে।
ইন্সপেক্টরের কাছে এসে কনস্টেবলটি নিচু স্বরে কিছু যেন বলতে লাগল। শুনতে শুনতে ইন্সপেক্টরের মুখেচোখেও ফুটে উঠল একটা চরম বিস্ময় এবং উৎকণ্ঠা। ওদের মধ্যেকার সংলাপের টুকরো টুকরো কথাবার্তা কানে আসতে লাগল গ্রীনের।
ইন্সপেক্টর বলছেন, "হোয়াট...আবার খুন?...কোথায়?....কি?.... সী-বিচে!!! কি বলছ? লোকটা আমেরিকান? মেরিন!!!"
শুনতে শুনতে গ্রীনের মনে হলো, ওর দু-কান দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছে।
সী-বিচে পৌঁছতে গোটা দলটার একঘন্টার বেশী সময় লাগল না। পুলিশের সঙ্গে গ্রীন এবং কোকো'ও গিয়ে হাজির হলো। পাহাড়ের অনেকটা ওপরে একটা জঙ্গলে ঢাকা সরু পথের ওপর এসে থামল পুলিসের জিপ'টা। পেছনে ওদের অনুসরণ করে আসছিল কোকো'র গাড়িটাও। সেই গাড়িতে ছিল কোকো এবং গ্রীন দুজনে। পাহাড়ি জঙ্গলে ঢাকা পথের ওপর ওদের গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে রইল। এরপর এই পথে আর গাড়ি এগোবে না।
"...এটা কোথায় এলাম?" জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কোকোর দিকে চেয়ে জানতে চাইল গ্রীন।
"...এ জায়গাটা সমুদ্রের অনেকটা কাছে। একটু এগোলেই সী-বিচ। তবে এখানে লোকজন প্রায় আসেই না। হাইতিতে এরকম অনেক নির্জন সমুদ্র সৈকত আছে, এ জায়গাটা সেরকমই একটি জায়গা। আমরা সম্ভবত ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের একেবারে শেষের প্রান্তে এসে পৌঁছেছি"।
জঙ্গলে পথে নেমে হাঁটছিল ওরা। কিছুটা এগোতেই একটা ভাঙাচোরা গাড়ি নজরে পড়ল সবার। গাড়িটার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল পুলিশ এবং ওদের অনুসরণ করে গ্রীন।
"...ওহ মাই গড!" চোখে হাত চাপা দিলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট।
ততক্ষণে গ্রীনেরও চোখে পড়েছে দৃশ্যটা। সে-ও ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত গাড়িটার একদিকের জানলার কাছে ভনভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে একপাল মাছি। গাড়ির ভেতর পড়ে রয়েছে এক মহিলার ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। উলঙ্গ মহিলা। কেউ বা কিছু যেন ওর গলাটাকে শরীর থেকে উপড়ে ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে। মহিলার একটা হাত কাঁধ থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে গাড়ির জানলার বাইরে মাটিতে লুটোচ্ছে।
কনস্টেবলটি জানাল, সী বিচের দিকে যাবার পথের ওপর জঙ্গলের ধারে আরেকটি মৃতদেহ পড়ে আছে। সেটি এক পুরুষের। এক আমেরিকান মেরিনের।
দেরী না করে পুলিশ এগিয়ে চলল সী-বিচের দিকে। গ্রীনও ওদের অনুসরণ করে চলল। সবার মধ্যেই একটা ব্যস্ততা। কত তাড়াতাড়ি অকুস্থলে পৌঁছনো যায়, তার জন্যেই নিদারুণ একটা ব্যস্ত ভাব সবার মধ্যে।
সমুদ্রের তীরের কাছাকাছি এসে পাহাড়ের নিচে জঙ্গলের ভেতর সেই মেরিন আমেরিকান পুরুষটির বীভৎস ছিন্নভিন্ন দেহাংশ পড়ে থাকতে দেখা গেল। দূরে, বীচের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট মোটরবোট। পুলিশের সঙ্গে নেভি টিমের লোকজনও এসেছিল। ওরা মৃতদেহ পরীক্ষা করার কাজে লেগে গেল। দেহাংশগুলোকে একে একে একটি বিশেষ ধরনের ব্যাগে ভরে ফেলতে লাগল।
"....কি করছেন আপনারা?" ইন্সপেক্টর চৌভেট জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওদের প্রশ্ন করলেন।
"...যিনি খুন হয়েছেন", বললেন আমেরিকান নেভি অফিসার, "তিনি আমাদের টিমে ছিলেন। এখন এঁর লাশের ভার নেওয়া N.C.I.S এর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে"।
"....কিন্তু এটা আমাদের এলাকা!" আশ্চর্যরকম কঠিন স্বরে বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "এখানে তোমাদের নিয়ম-নীতি খাটবে না"।
অবাক হয়ে গ্রীন লক্ষ্য করছিল ইন্সপেক্টর চৌভেটকে। এঁর এলাকায় এতগুলো মার্ডার হলো, অথচ এঁকে দেখে যেন মনে হচ্ছে, এই খুন'গুলোর নিয়ে এঁর যেন সামান্যতমও দায়-দায়িত্ব নেই। কোনওরকম আগ্রহ বা উৎকন্ঠা তাঁর আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে যেন কলের পুতুলের মতো কাজ সারছেন।
"....দুঃখিত, স্যার", মিনতিপূর্ণ গলায় বললেন নেভি অফিসার, "কিন্তু আমাদের অথরিটি থেকে এমনটাই পারমিশন দেওয়া হয়েছে আমাদের"।
আর কোনও উচ্চবাচ্য করলেন না ইন্সপেক্টর চৌভেট। তাঁকে দেখে মনে হলো যেন এ নিয়ে আর কোনও কথা বলতে রাজি নন তিনি। নেভি'র দুজন কর্মচারী তাদের সহকর্মীর দেহাংশের সবটুকু ব্যাগে ভরে ফেলল।
।। তদন্ত।।
কাজ শেষ করে নেভি অফিসিয়ালের সদস্যরা ফেরার জন্য ঘুরেছে, আশার গ্রীন এগিয়ে গেল ওদের দিকে।
"...এক্সকিউজ মী", নেভি টিম'কে লক্ষ্য করে বলে উঠল সে।
ওরা পেছন ফিরে ওর দিকে তাকাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে।
"...আমি একজন আমেরিকান জার্নালিস্ট", নিজের পরিচয় দিয়ে বলল গ্রীন, "এই মার্ডার কে করে থাকতে পারে বলে আপনাদের সন্দেহ হয়?"
"....'কে' নয়, বলুন 'কিসে'..", উত্তরে বললেন অফিসার, "কোনো মানুষের দ্বারা এই কাজ সম্ভব নয়। এ কোনো ওয়াইল্ড অ্যানিমালের কাজ"।
"....আপনারা কি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত?"
অফিসার বললেন, "আমরা লাশের গায়ে অনেক হিংস্র কামড়ের দাগ পেয়েছি। কোনো বিশাল চেহারার প্রাণীর কামড়। কোনো মানুষের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, ভিক্টিমের লাশের ওপর অনেক গুচ্ছ গুচ্ছ লোম পাওয়া গিয়েছে"।
"....কোন অ্যানিমালের দ্বারা এরকম কাজ করা সম্ভব বলে আপনারা মনে করেন?" প্রশ্ন করল গ্রীন, "এখানকার জঙ্গলে এমন কোন হিংস্র জন্তু থাকতে পারে?" শুধু নেভি অফিসিয়ালদের লক্ষ্য করেই নয়, পুলিশ এবং ফরেন্সিক টিম'কে লক্ষ্য করেও প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল।
জবাবটা অবশ্য নেভি অফিসারই দিলেন। আশপাশের জঙ্গলের ওপর দৃষ্টি বুলোতে বুলোতে বললেন, "মনে হয়...বুনো কুকুরের দল...বা তার চেয়েও হিংস্র কোনও জন্তু..."। মুখে কথাটা বললেও তাঁর কথায় বিশেষ জোর ছিল না।
নেভি টিম'টা সী বিচের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ওদের যন্ত্রচালিত বোট'টা নোঙর করা ছিল তীরের দিকে। বোট'টায় উঠে বসল ওরা। তারপর সাঁ করে জল কেটে তীর থেকে ক্রমে দূরে সরে যেতে লাগল। গ্রীন এবং ইন্সপেক্টর চৌভেট ওদের ফেলে যাওয়া পথের দিকে শুধু চেয়ে রইল।
"....ইন্সপেক্টর চৌভেট", দূর সমুদ্রে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে যাওয়া আমেরিকান নেভি জলযানটার গমন পথের দিকে চেয়ে কেটে কেটে বলল গ্রীন, "আপনাদের এই অঞ্চলে অতীতে আগে কখনো এমন রহস্যজনক খুনের ঘটনা ঘটেছিল?"
"....ঘটেছিল", একইরকমভাবে কেটে কেটে উত্তরে বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "যে গ্রামে আমি জন্মেছি, সেই গ্রামের জঙ্গলে একবার আমার এক বন্ধুকে এরকম বীভৎসরকমভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তারও শরীরটা ছিল আধখাওয়া। এখনকার এই ভিক্টিমদের মতো"। শেষ কথাটা বলার সময় অজান্তেই বোধহয় ইন্সপেক্টরের শরীরটা কেঁপে উঠল। অথচ এই দিনের বেলায়, চড়া রোদে শীত শীত ভাবটা তেমন অনুভূত হচ্ছে না। ইন্সপেক্টর চৌভেট হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটা শুরু করলেন।
"....কি হলো?" পেছন থেকেই জিজ্ঞেস করল গ্রীন।
"...এই বনের মধ্যে অনেক আগে একটা কুটিরে একজন লোক বাস করত, একাকী। একদিন গ্রামের লোক দলবেঁধে এসে ওকে আক্রমণ করে এবং হত্যা করে। গাছের ডালের সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে। তারপর থেকে এ অঞ্চলে এইধরনের খুনখারাপি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল"।
গ্রীন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছিল ইন্সপেক্টর চৌভেটকে। এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে চৌভেটের কাঁধে একটা হাত রেখে সহানুভূতির স্বরে বলল, "আপনার কাছ থেকে আমার কিছু জিনিস জানার আছে। দয়া করে আমায় ভুল বুঝবেন না।"
ইন্সপেক্টর কিছু না বলে শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন গ্রীনের দিকে।
গ্রীন বলল, "আপনি কি সত্যিই মনে করেন, এসব'ই 'জে-রাউজ' বা ওয়্যারউলফের কাজ?"
গ্রীনের এই প্রশ্নে স্মিত হাসলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট। বললেন, "আমি একবারও বলেছি কি এই কাজ অন্য যেকোনও প্রাণীর দ্বারা সম্ভব?"
"....কিন্তু এই যে মিস্টিরিয়াস ব্রুটাল মার্ডার'গুলো...এগুলো কি জে-রাউজের লেজেন্ডের সঙ্গে খাপ খায়? আপনি কি মনে করেন?"
ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট। বললেন, "জে-রাউজ আসলে খুব ভীতু জিনিস, বুঝলেন তো! মানুষ মারার পর কয়েকদিনের জন্য আত্মগোপন করে ফেলে, তারপর আবার বের হয় শিকারের সন্ধানে। ও তখনিই আপনাকে আক্রমণ করবে, যখন আপনি একা থাকবেন। জে-রাউজ মানুষের অসহায় এবং একাকী অবস্থার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে"।
গ্রীন দু-এক মূহুর্ত কি যেন ভাবল। তারপর বলল, "তাহলে তো দেখছি, সমস্যা আরও বাড়ল"।
"....কি সমস্যা?" বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "কোন সমস্যার কথা বলতে চাইছেন?"
"....যদি সত্যিই এগুলো কোনো ওয়্যারউলফের কাজ হয়, তাহলে এখন যা দেখেশুনে বুঝছি, তার খিদে ক্রমশ বাড়ছে। সেজন্য শিকার ধরার সংখ্যাও বাড়ছে তার"।
গ্রীন লক্ষ্য করল, ইন্সপেক্টরের মুখে একটা আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। ওরা আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গাড়ির ভেতর পড়ে থাকা মহিলার লাশটিকে নিয়ে ততক্ষণে ফরেন্সিক টিম চলে গিয়েছে। গ্রীন এবং ইন্সপেক্টর চৌভেট পায়ে পায়ে পাহাড়ি পথ ধরে চলেছে।
"....আচ্ছা, ওই ড্রাগ ব্যবসায়ী", হঠাৎ ফের বলে উঠল গ্রীন, "যার বডি আজ সকালে শহরের ভেতর রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে, তার ব্যাপারে আপনারা কতদূর জানেন?"
"...ওকে চিনতাম আমরা", হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "আমাদের কালো খাতায় ওর নাম ছিল, ড্রাগ চোরাচালানকারী হিসেবে। লেস ডায়াব্লেস নামে একটা ক্রিমিনাল সংস্থার বহুদিনের সদস্য ছিল ওই ম্যাথিউ লন্ড্রি। ওই সংস্থা ড্রাগ সহ অনেক বেআইনী জিনিস পাচারের কাজে নিযুক্ত। বছর দুই আগে আমরা ওই ম্যাথিউ সহ বেশ কয়েকজনকে পাকড়াও করেছিলাম। পরে ওদের আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম এই শর্তের বিনিময়ে যে, মুক্তি পাবার পর ওরা ওদের নেতাকে আমাদের হেফাজতে তুলে দেবে। ওদের নেতা ছিল হেনরী ক্রিস্টোফার। ওই লোকটা পরে আমাদের হাতে ধরা পড়েছিল"।
"....হেনরী ক্রিস্টোফার!" নিজের মনেই বিড়বিড় করল আশার গ্রীন, "নামটা খুব চেনা চেনা ঠেকছে।"
"...স্বাভাবিক ", বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "হেনরী ক্রিস্টোফার ছিলেন একদা এ দেশের শাসক। এদেশে একটা রিভল্যুশন হয়েছিল আর তার পরেই হেনরী ক্রিস্টোফার এদেশের শাসকের মসনদে বসেছিলেন। তিনি-ই আজকের সিটাডল গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু আমি যে হেনরী ক্রিস্টোফারের কথা বলছি, এ আলাদা ব্যক্তি। নিজের পরিচয় বাড়াতে এই লোকটা অতীতের ওই নামজাদা শাসকের নাম ভাঁড়িয়েছিল। সে-ই ওই 'লেস ডায়াব্লেস' নামে ওই ক্রিমিনাল সংস্থা গড়ে তুলেছিল। সে-ই ছিল এই ম্যাথিউ লন্ড্রি'দের লীডার"।
"....তারপর.... আপনাদের হাতে ধরা পড়ার পর তার কি হলো?" কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল গ্রীন।
"....কি আবার হবে? আমরা ওকে অ্যারেস্ট করে জেলে পুরে দিলাম"।
"...এখনও কি বেঁচে আছে লোকটা?"
কাঁধ ঝাঁকালেন ইন্সপেক্টর চৌভেট। বললেন, "কে জানে! তারপরেই ওই ভূমিকম্প হলো। আমাদের সব কারাগার ভেঙে ধ্বসে পড়েছিল, অন্যান্য কয়েদীদের সঙ্গে ক্রিস্টোফার'ও কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল!"
ইন্সপেক্টর, গ্রীন এবং কোকো - তিনজনেই গাড়িতে গিয়ে উঠল। ইন্সপেক্টর চৌভেট বলতে লাগলেন, "এখন লোকটা কোথায় আছে, জানি না। আর ওই সিডাউ মার্চ্যান্ড - যাকে ক'দিন আগে ওয়্যারউলফ সন্দেহে মেরে ফেলা হলো, সে-ও ছিল ওই 'লেস ডায়াব্লেস' ক্রিমিনাল সংস্থার মেম্বার। ওদের আরেকজন মেম্বারকেও চিনি, আই মীন চিনতাম - হেনরী।"
এ কথায় গ্রীন এবং কোকো - দুজনেই বিস্মিত হলো। 'সিডাউ মার্চ্যান্ডও ছিল ওই দলে!'
গ্রীন বলল, "তাহলে ব্যাপারটা এরকম হতে পারে কি, যে ওদের সেই নেতা ক্রিস্টোফার কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে থেকে এভাবে একের পর এক প্রতিশোধ নিচ্ছে?"
".....হতে পারে",নির্বিকার ভাবে বললেন ইন্সপেক্টর, "তবে নিজের কানেই তো শুনলেন একটু আগে আমেরিকান নেভি টিম কি বলে গেল! এই খুনগুলো কোনও মানুষের কাজ নয়, কোনও ওয়াইল্ড অ্যানিম্যালের কাজ"।
ক্রিস্টোফার এবং ওয়্যারউলফ নিয়ে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর গ্রীন এবং কোকো অন্যদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দিল। ফের এসে পৌঁছল বন্দরে। সমুদ্রকে এখন আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। দিগন্তের দিকে কতক্ষণ চেয়ে রইল গ্রীন। ওর মাথায় ঘুরছে ইন্সপেক্টরের সাথে ওর একটু আগের কথোপকথনগুলো। ওখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে কোকো ওকে নিয়ে গেল আরেকটা জায়গায়। ওর কাজিন ব্রাদারের বাড়িতে। জায়গাটা এয়ারপোর্টের পাশেই। একটা মাঝারি আকারের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামাল কোকো। গাড়ির শব্দে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রোগা ছিপছিপে চেহারার একটি অল্পবয়সী অথচ বেশ ফিটফাট একটি ছেলে। কোকো'কে দেখে সোল্লাসে হাত নাড়ল সে। কোকো গ্রীনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ছেলেটির। জানা গেল, এই ছেলেটিই কোকো'র কাজিন। নাম তার সেইন্ট-ফোর্ট। গ্রীনের সাথে পরিচিত হয়ে ওর সাথে হাত মেলাল ছেলেটি অর্থাৎ সেইন্ট-ফোর্ট। তারপর গ্রীন আর কোকো'কে নিয়ে বাড়ির ভেতর এসে ঢুকল সেইন্ট-ফোর্ড। স্ন্যাকস আর পানীয় সহযোগে আড্ডা জমে উঠল ওদের মধ্যে। অবশ্যই ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইদানীং হাইতিতে ঘটে যাওয়া ব্রুটাল মার্ডারগুলো নিয়ে। সেইসঙ্গে আবশ্যিক সংযোজন হিসেবে যোগ হলো ওয়্যারউলফের প্রসঙ্গও। এরই মধ্যে গ্রীন সুকৌশলে লেস ডায়াব্লেস এবং তার লিডার ক্রিস্টোফার, হেনরী এবং সিডাউ মার্চ্যান্ডের প্রসঙ্গও যোগ করে দিল। দেখা গেল, কোকো'র কাজিন, এই সেইন্ট-ফোর্ট নামের ছেলেটি এসব ব্যাপারে বেশ খোঁজখবর রাখে। ধীরেধীরে ওদের আলোচনা জমে উঠতে লাগল।
।। তদন্ত।।
কথায় কথায় অনেক কিছুই জানতে পারল গ্রীন। লেস ডায়াব্লেস নামে সেই ক্রিমিনাল সংস্থাটি স্মাগলিং, রাহাজানি এরকম অনেক রকম অসৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত। ক্রিস্টোফারের সঙ্গী হেনরী ছিল এরকমই একজন। ওই লোকটাও একটা আস্ত শয়তান। প্রথম জীবনে রাস্তায় গুণ্ডামি করত, পরে 'লেস ডায়াব্লেসে'র সাথে যুক্ত হয়।
"....ওই লোকটা কি এখনও আছে?" কফির মগে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল গ্রীন।
"....আছে হয়তো। ঠিক জানি না।" বলল সেইন্ট-ফোর্ট।
"....এরকম কারোর নাম জানো, যার সাথে হেনরীর পরিচিতি আছে? আই মীন, হেনরীর সঙ্গে চেনাজানা আছে?"
মাথা ঝাঁকিয়ে সেইন্ট-ফোর্ট বলল, "ওর সঙ্গে দুশমনি আছে, এরকম একজনকে চিনি, সে সিটেসলেইল এলাকায় থাকে।"
"...কোথায় ওটা?"
"....হেল জায়গা", চোখ গোল গোল করে ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে বলে উঠল সেইন্ট-ফোর্ট, "দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্যতম বস্তি। সরি, এটা আমার কথা নয়। গোটা ইউনাইটেড নেশনে জায়গাটার কুখ্যাতি আছে"।
"....তোমায় আমি পঞ্চাশ আমেরিকান ডলার দেব", কৌতূহলী গ্রীন বলে উঠল, "যদি ওখানে আমায় নিয়ে যাও"।
এবার হাসল সেইন্ট-ফোর্ট। বলল, "বেশ। পঞ্চাশ আমেরিকান ডলার দেবে যখন বলছ, তাহলে আমি নরকে যেতেও রাজি"।
"...তাহলে এখনই চলো", গ্রীন একটু অধৈর্য হয়েই বলে উঠল।
"...না, এখন না। একটু পরেই সন্ধে নেমে আসবে। কাল সকালে যাব আমরা"।
"....আগামীকাল সকালে তাহলে ক'টায় বেরোচ্ছি আমরা?" জিজ্ঞেস করল কোকো।
"...সকাল ন'টায়", বলল সেইন্ট-ফোর্ট, তারপরেই কোকোর দিকে চেয়ে গোল গোল চোখে চেয়ে বলল, "তবে তোমাকে নিয়ে আমরা যাব না। ওখানে কোনো ভদ্র ঘরের মেয়ে যায় না। গেলে তার আর ইজ্জত আব্রু থাকে না"।
তাকে ওরা সঙ্গে নিয়ে যাবে না শুনে ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল কোকো। গ্রীন সেটা লক্ষ্য করে ব্যাপারটা ওকে বোঝাতে গিয়ে বলল, "তোমার কাজিন ব্রাদার ঠিকই বলছে। নোংরা জায়গায় ভদ্র মেয়েদের যেতে নেই"।
কোকো ভেতরে ভেতরে দমে গেল বটে কিন্তু ওদের মুখের ওপর কিছু বলতেও পারল না।
আধঘণ্টা পর, সেইন্ট-ফোর্টের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে গ্রীন রওনা দিল নিজের হোটেল অলোফসনের দিকে। গত কাল সকাল থেকে সে আজ এতক্ষণ পর্যন্ত সে টানা বাইরে কাটিয়েছে। এবার হোটেলে না ফিরলেই নয়। কোকো'ই ওকে গাড়িতে পৌঁছে দিল হোটেল অলোফসনে। গ্রীন'কে হোটেলের সামনে ড্রপ করে দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল কোকো, কিন্তু ওকে বাধা দিল গ্রীন। বলল, "তোমার হাতে কি এখন কিছু সময় হবে?"
"...কেন?" ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল কোকো।
"....আসলে হোটেলের ঘরে ঢুকলেই বড্ড 'একা..একা' লাগে। একা একা ডিনার খেতে খুব 'বোরিং' ফিল করি। আজ আমার সাথে ডিনারে আসবে, কোকো?"
"....তা কি করে হয়? আমি তো তোমার একজন গাইড মাত্র। আমি কি তোমার সাথে ডিনার খেতে পারি?"
"....না, গাইড শুধু আগে ছিল। এখন তো আমরা বন্ধু হয়ে গিয়েছি। প্লিজ..."
গ্রীনের অনুরোধ আর ফেলতে পারল না কোকো। হোটেলের ড্রাইভওয়েতে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে সে গ্রীনের সঙ্গে গিয়ে ঢুকল ওর হোটেলের ঘরে। ঘরে ঢুকেই গ্রীন দেয়ালে ঝোলানো বিশাল এলইডি টিভি'টা অন করে দিল। কোকো'কে বলল, "তুমি এখানে বসে যত ইচ্ছা প্রোগ্রাম দেখো। আমি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসছি"।
বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো গ্রীন। পরনে দুধেধোয়া সাদা গেঞ্জি আর ট্রাউজার্স। কোকো'কে সঙ্গে নিয়ে নিচে ডিনারে যাবে, এইসময় বেজে উঠল ঘরের ফোনটা। এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে 'হ্যালো' বলতেই ওপ্রান্ত থেকে একটা কচি গলা শোনা গেল, "হ্যালো, পাপা!"
ওপ্রান্ত থেকে লেসলীর কণ্ঠস্বর পেয়ে মূহুর্তে সকালের রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল গ্রীন। সে'ও দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, "হাই বেবী! দিদু'র সঙ্গে কেমন কাটছে তোমার উইকেন্ড?"
"...দারুণ, পাপা! একটু আগে আমরা দিদু'র সঙ্গে বরফের ওপর স্কি করে এলাম! আমি আর ভাই দারুণ এনজয় করেছি!"
শুনে খুব ভালো লাগছিল গ্রীনের। যাক, ওর বাচ্চারা যে আনন্দে উইকেন্ড কাটাচ্ছে, এটা শুনেই ও শান্তি পাচ্ছে। শুধু একটাই দুঃখ, ও ওদের সঙ্গ দিতে পারছে না।
"....তুমি এখন কোথায় আছ, পাপা?" ওপ্রান্ত থেকে কচি গলায় জানতে চাইল লেসলী।
"...আমি হাইতির একটা দ্বীপে আছি, সোনা। দারুণ জায়গা। একবার এখানে এলে আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। আমি এখানে একটা আর্টিকেল কভার করছি"।
"...তা-ই!" ওপ্রান্ত থেকে সোল্লাসে বলে উঠল লেসলী, "আমাদেরও নিয়ে যাবে!"
সতর্ক হয়ে উঠল এবার গ্রীন। লেসলী জানে না, ওর বাবা এই মূহুর্তে কি চরম এক বিপজ্জনক জায়গায় রয়েছে। তাই নিজেকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে বলল, "সে পরে তোমাদের নিয়ে আসব, সোনা। কেমন? আপাতত আমি এখানকার কাজটা সেরে ফেলি!"
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর ফোন ছেড়ে দিল দু-প্রান্তে দুজনেই। এদিকে ফিরে দেখল, কোকো কিরকম অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে গ্রীনের দিকে। ওর দিকে চেয়ে জোর করে সামান্য হাসবার চেষ্টা করল গ্রীন। বলল, "কোকো, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি... আমি একজন ডিভোর্সি... আমার দুই সন্তান আছে...লেসলী...আমার মেয়ে...তার সাথে কথা হচ্ছিল"।
"....বোধহয় বলেছিলে"।
"....যাকে বিয়ে করেছিলাম, তার সঙ্গে আট বছর ঘর করেছিলাম। খুব ইচ্ছে ছিল, এত সুন্দর দেশটায় বাচ্চাদুটোকে নিয়ে আসব। ওদের ভালো লাগবে। কিন্তু....এখন ভাবছি, ভাগ্যিস নিয়ে আসিনি! বাই দ্য ওয়ে, চলো, নিচে ডিনারে যাই"।
"...কেন, এখানে খাওয়া যায় না?" বলল কোকো।
"...যাবে না কেন? কিন্তু এই হোটেলের রেস্টুরেন্ট'টাও দারুণ জায়গা। ভিড়-টিড়ের বালাই নেই। যাবে তো চলো"।
"....না, তোমার ঘরের বারান্দাটা দেখছি চমৎকার! " বারান্দায় বেরিয়ে এসে মুক্ত হাওয়ায় দু-হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল কোকো, "এখানে টেবিল-চেয়ার পাতাই আছে। এখানেই ডিনারের অর্ডার দাও না, কেন?"
আর কথা বাড়াল না গ্রীন। রুম সার্ভিসে ফোন করে আজকের রাতের মেনু জেনে নিয়ে সেইমতো ডিশের অর্ডার দিল। সঙ্গে প্রিয় ব্রান্ডের ওয়াইন। আধঘন্টার ভেতরেই খাবারের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল ওয়েট্রেস। সে চলে গেলে দুজনে বারান্দার টেবিলে বসে খেতে খেতে গল্প করতে লাগল।
"....হাইতিতে আসা ইস্তক তুমি আমাকে এ দেশটার ব্যাপারে অনেক কিছুই বলেছ", ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল গ্রীন, "যার মধ্যে কয়েকটা ব্যাপার আবার সুপারন্যাচরাল বিষয়কে নিয়ে। আমি জানতে চাই, তুমি নিজের জীবনে এরকম অলৌকিক কিছু দেখেছ?"
ওয়াইনের গ্লাসে দুটো সিপ দিয়ে খানিকক্ষণ নিচে বাগানের অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল কোকো। তাকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। একসময় কেটে কেটে বলতে লাগল, "একবার, তখন আমি ছোট একটা মেয়ে, সাত বছর বয়স আমার - বাবার সাথে গ্রামের দিকে যাচ্ছিলাম। গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন বাবা। হঠাৎ পথের এক জায়গায় বাবা সজোরে ব্রেক কষতে বাধ্য হলেন। দেখি, সামনে দুটো লোক একটা দুই চাকার গরুর গাড়ি নিয়ে রাস্তা ক্রশ করছে। গাড়িটার মধ্যে মনে হলো ভারী কিছু আছে। বাবা চেঁচালেন লোকদুটিকে উদ্দেশ্য করে, রাস্তা ছেড়ে দেবার জন্য...কিন্তু লোকদুটো বাবার কথা গ্রাহ্যও করল না, এমনকি ঘুরেও তাকাল না একবারের জন্যও। একসময় একদিকে একটু ফাঁক পেয়ে বাবা সাঁ করে জোরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। " এই পর্যন্ত বলার পর কোকোর ঠোঁটদুটো সামান্য কেঁপে উঠল উত্তেজনায়, যেন সাঙ্ঘাতিক কোনও একটা ঘটনা মনে করার চেষ্টা করছে।
"...তারপর? " প্রশ্ন করল গ্রীন।
"...তারপর... মাইলখানেক চলার পর আমাদের পথ আবার আটকে গেল। ফের ব্রেক কষতে বাধ্য হলেন বাবা। এবার দেখি, পথের ওপর আড়াআড়িভাবে পড়ে রয়েছে একটা বিশাল গাছ। মহা ঝামেলায় পড়লাম আমরা। এখন এই গাছটাকে সরিয়ে যাই কি করে? বাবা অবশ্য কোনওকিছুর পরোয়া করেন না। তিনি গাড়ি থেকে নেমে গাছটিকে সরাবার চেষ্টা করতে লাগলেন কিন্তু গাছটি এতই বিশাল এবং ভারী যে সামান্যতমও নড়ানো গেল না। কি করি, করি ভাবছি যখন...ঠিক সেইসময় ফের দেখতে পেলাম সেই লোকদুটোকে। দু-চাকার গরুগাড়িটাকে নিয়ে এগিয়ে আসছে এদিকেই। আমরা বেশ অবাক হয়ে গেলাম। লোকদুটোকে ফেলে এসেছি কম সময় হয়নি, তার মধ্যে এতটা রাস্তা এত অল্প সময়ে লোকদুটো এলো কেমন করে! গরুর গাড়ির তো গতি কচ্ছপের চেয়েও শ্লথ! ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল আমাদের। যাই হোক, লক্ষ্য করলাম, লোকদুটো এবারেও যেন আমাদের দেখেও দেখল না। যেন পাত্তাই দিল না। আমরা দেখতে লাগলাম, ওরা এরপর কি করে। কিন্তু এরপর যা দেখলাম, তা মনে পড়লে এখনও আমার গায়ের রোম খাড়া হয়ে ওঠে।"
"...কি দেখলে?" জিজ্ঞেস করল গ্রীন
"...ভাবছিলাম, লোকদুটো বোধহয় এবার আমাদের সাহায্য চাইবে। কিন্তু দেখলাম, লোকদুটো আমাদের গ্রাহ্যই করল না। রাস্তায় পড়ে থাকা অত ভারী গাছটাকে এমন অনায়াস ভঙ্গিতে একহাতে ধরে একপাশে সরিয়ে ফেলে দিল যেন মনে হলো খুবই ছোট একটা জিনিসকে একপাশ থেকে অন্যপাশে রাখল। ওই শুঁটকো চেহারার লোকের গায়ে অত শক্তি কি করে এলো যে অমন প্রমাণ সাইজের বিশাল গাছের গুঁড়িটাকে অনায়াসে একপাশে তুলে সরিয়ে ফেলে দেয় , তা তখনো বুঝতে পারিনি। তারপর আমাদের হতভম্ব চোখের সামনেই ওদের গরুগাড়িটা ফের চলতে শুরু করল। কিন্তু সে চলা কি আর সাধারণ গরুরগাড়ির চলা! সে যেন কোনও লরির গতি! আমাদের চোখের সামনেই উল্কার বেগে গরুর গাড়িটা আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। চলে গেল বলতে যেন দূরে রাস্তার মোড়ের মাথায় গিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল!"
....অনেকক্ষন দম নিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিল কোকো। অনেকক্ষণ পর ফের বলতে লাগল, "যতক্ষণ পর্যন্ত এই ঘটনাটা ঘটল, আমরা কেউ টুঁ শব্দটি করতে পারিনি। বাবা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন আর মনে মনে ইষ্টনাম জপ করছিলেন। ওরা একেবারে চলে গেলে তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় আমায় বললেন, "ওরা জোম্বি ছিল। তাই দেখলি না, কি অমানুষিক শক্তি ওদের গায়ে! আর গরুগাড়িটারও কি অস্বাভাবিক গতি! ওরা মানুষ নয়, ওরা জোম্বি!"
কোকোর কাহিনী শেষ হলে গ্রীন বলল, "এইসব জোম্বি-টোম্বির অস্তিত্ব তুমি বিশ্বাস করো?"
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোকো বলল, "কি করব! ঘটনাটা যে আমার নিজের চোখের সামনে ঘটেছিল!"
এরপর অনেকক্ষণ আর দুজনের মধ্যে কোনও কথা হলো না।
"...চিকেন কারি'টা কেমন লাগল?" খাওয়ার শেষ পর্যায়ে কোকো'কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল গ্রীন।
"...ভালোই, খারাপ না", বলল কোকো, "একটা কথা জিজ্ঞেস করব, গ্রীন, কিছু মনে করবে না তো?" কোকোর মুখচোখ হঠাৎ খুব সিরিয়াস দেখাতে লাগল।
"...কি বলো?"
"...তোমার স্ত্রী'র সঙ্গে তোমার ছাড়াছাড়ি হলো কেন?" বলেই কোকো ওকে ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে বলল, "অবশ্য এটার উত্তর দেওয়া, না-দেওয়া একান্ত তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিছু মনে কোরো না"।
"....আমাদের মধ্যে ধর্মবিশ্বাসে মতপার্থক্য দেখা গিয়েছিল। আমি জাতে ইহুদি, আর ভেলেরি - আমার ওয়াইফ ধর্ম-টর্ম মানত না। একেবারেই না। একদিন জানলাম, সে কালাযাদু, ওই কিসব ব্ল্যাক ম্যাজিক-ট্যাজিকের প্রতি বেশী আগ্রহী। বিয়ের আগে অথচ এসব আমি কিছুই জানতাম না। কিন্তু তখন আর জেনে কি হবে। আমাদের সংসারে দু-দুটো সন্তান এসে গিয়েছে। তাই ভেলেরিকে ডিভোর্স দিলেও বাচ্চাদুটোর মুখ চেয়েই ওর সাথে এখনো আমায় যোগাযোগ রাখতে হয়"। একটু থেমে গ্রীন ফের বলতে লাগল, "ভেলেরিকে বিয়ে করি, আমার মা এটা মোটেও চান'নি। মায়ের অমতেই একপ্রকার আমি বিয়ে করেছিলাম ওকে আর তার ফলও আমায় হাতেনাতে ভুগতে হলো"।
"....বাই দ্য ওয়ে", অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল কোকো, "তোমার ছেলেমেয়ে'দের নাম কি?"
"....সবচেয়ে বড়... আমার মেয়ে লেসলী...আট বছর বয়স...তারপর ক্রিস...পাঁচ বছর বয়স ছেলেটার"।
খাওয়া শেষ হলো দুজনের।
"...চলো, নিচে বলরুমে গিয়ে একটু ডান্স করবে?" কোকো'কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করল গ্রীন।
"...প্রস্তাব মন্দ নয়", অল্পক্ষণ কি যেন ভেবে নিয়ে বলল কোকো।
বলরুমটা গ্রীন যে ফ্লোরে থাকে, তার ঠিক নিচেই। এলিভেটরে নেমে একটা লম্বা করিডোর পেরিয়ে। ভেতরে মিউজিক বাজছে, ইতিমধ্যে হোটেলের কয়েকজন বোর্ডার ডান্স শুরু করেছে, কাঁচের দরজায় তারই রঙিন আলোর নাচ দেখা যাচ্ছে। বলরুমের দরজার কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে মিউজিকের শব্দ শোনা গেল। তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই জোরালো মিউজিক যেন তালা ধরিয়ে দিল গ্রীন এবং কোকো'র দুই কানে। গ্রীন এর আগে তেমনিভাবে কখনো কোনো পার্টিতে গিয়ে ডান্স করেনি, কিন্তু এখন কোকোর পাল্লায় পড়ে ওকে ওর তালে তাল রেখে ডান্স করতে হচ্ছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই গ্রীন ডান্স ব্যাপারটায় বেশ সাবলীল হয়ে উঠল। দুজনে অনেকরাত পর্যন্ত একে অপরের বাহুলগ্না হয়ে ডান্স করে চলল।
....যখন ওদের খেয়াল হলো, তখন থেমে গিয়েছে যাবতীয় মিউজিক। ডান্স ফ্লোরে একমাত্র ওরা ছাড়া আর কেউ নেই। হাতঘড়ির দিকে চোখ পড়তে সচকিত হয়ে উঠল কোকো।
"...ইশশ...অনেক রাত হয়ে গিয়েছে, এবার আমায় যেতে হচ্ছে, আশার!"
"...চলো, তবে তোমায় গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিই"।
কোকো একটু বাধা দিতে চেষ্টা করল গ্রীনকে কিন্তু গ্রীন তা কানেও তুলল না। শেষমেশ কোকো বলল, "বেশ, চলো তবে"।
কোকোর কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো একটা বুনো জন্তুর রক্তহিম করা গর্জন।
আবার সেই হাউলিং!
গর্জনটা শুনেই সচকিত হয়ে উঠল গ্রীন এবং কোকো দুজনেই।
"...শুনলে? শুনতে পেলে আবার?" ভয়ার্ত শোনালো কোকোর কন্ঠস্বর। ওর চোখদুটো যেন মনে হতে লাগল কোটর ছেড়ে এখনিই ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।
গ্রীনও উৎকর্ন হয়ে শুনছিল হাউলিং-এর শব্দটা। একসময় কেটে কেটে বলল, "শুনেছি। মনে হচ্ছে, হোটেলের আশেপাশে কোথাও থেকে নয়, অনেক দূর থেকেই ভেসে এলো শব্দটা!"
"...আমার ভয় করছে ভীষণ, আশার!" আতঙ্করুদ্ধ স্বরে বলল কোকো, "আমি বাড়ি ফিরব কেমন করে? যদি পথে কোনো বিপদ....!"
"....তুমি এই হোটেলেই থাকবে!" শান্ত স্বরে ওকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে বলল গ্রীন, "তোমাকে এখানে আজকের রাতটুকুর মতো থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।"
গ্রীনের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে একটু যেন ধাতস্থ হলো কোকো।
পোর্ট অফ প্রিন্সের রাত গভীর হলো।
উপকূল থেকে কয়েক মাইল দূরের একটা ছোট রিসর্ট।
অ্যানে শেরম্যান বিছানায় যাওয়ার তোড়জোড় করছে। হাইতিতে আজই ওর প্রথম দিন, বেড়াতে এসেছে সে। প্রথম দিনই দারুণ উপভোগ্য লাগছে তার কাছে। সে এ পর্যন্ত বিশ্বের নানা জায়গায় ভ্রমণে গিয়েছে, হাইতিতে এই প্রথমবার এসেছে। হাইতির এই আদিম অরণ্যের কোলে থাকা জায়গার খোঁজ সে পায় একটি নিউজ ম্যাগাজিন থেকে, যেখানে ভূমিকম্পের পর হাইতি কেমন আছে না আছে তার ওপর একটি প্রতিবেদন লেখা হয়েছিল। ছবি দেখেই হাইতির প্রেমে পড়ে যায় অ্যানে শেরম্যান। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে, হাইতির হোটেলভাড়া বা ভ্রমণের খরচখরচাও খুব একটা বেশী নয়। ইন্টারনেট সার্ফ করে সে অনলাইনের মাধ্যমে এই ছোট রিসর্টের একটা ঘর বুক করে ফেলে। বেশ ছিমছাম, সুন্দর ঘর। এখানে সমুদ্রের তীরে বেশ অনেকগুলি ছোট-বড় রিসর্ট রয়েছে। রিসর্টে পৌঁছে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিয়ে সে বেরিয়ে পড়েছিল সমুদ্র লাগোয়া সী-বিচের ওপর। অবাক হয়েছিল এটা লক্ষ্য করে, দুনিয়ার অন্যান্য সী-বিচের মতো এখানকার সী-বিচ বালুকাময় নয়। এখানে শুধুই নুড়িপাথরের প্রাবল্য। এই নুড়িপাথর বিছানো সী-বিচে কেন রিসর্টগুলো গড়ে তোলা হলো, এটাই ওর মনে প্রশ্ন। এইজন্যই বোধহয় এখানকার হোটেলগুলো এত সস্তা!
আজকের রাতের ডিনারটা ভালোই হলো, তবু কেন যেন ওর মনের মতো হলো না। এই রিসর্ট'টায় ওর সঙ্গে অন্যান্য যারা বোর্ডার আছে, বেশীরভাগই মিশনারী। কেউ কেউ এসেছে নিছক ধর্মীয় কাজে, আবার কেউ এসেছে নিছক ছুটি কাটাতে। এখন রাত। গভীর রাত। ডিনারের পাট চুকে গেছে কখন। নিজের ঘরে এসে পরবর্তী গন্তব্যস্থল কোথায় হতে পারে, তাই নিয়ে ইন্টারনেট সার্ফিং করতে বসল অ্যানে শেরম্যান। একমনে মোবাইলে নেট সার্ফিং করতে করতে এমন তন্ময় হয়ে গিয়েছিল শেরম্যান যে যখন ওর ঘরের দরজায় কোনও কিছুর আঁচরের শব্দ শোনা গেল, তখনই সে সচেতন হয়ে উঠল। বালিশে আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে নেট সার্ফিং করছিল অ্যানে শেরম্যান, দরজায় আঁচরের শব্দে ও সজাগ হয়ে উঠে বসল বিছানায়। কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে রইল দরজার দিকে। কিছু একটা বাইরে এসেছে! আঁচড়াচ্ছে দরজায়। কি হতে পারে জিনিসটা? কোনও কুকুর-টুকুর এসেছে নাকি বাইরে? হয়তো এই রিসর্টেরই কোনও বোর্ডারের কুকুর। যদিও এখানে এখনও পর্যন্ত কোনও পোষ্য নজরে পড়েনি, কারণ এই রিসর্টে পোষ্য অ্যালাউ করা হয় না। তাহলে কিসে অমন আঁচড়াচ্ছে!
বাইরে দরজার গায়ে ওদিকে আঁচরের শব্দ হয়েই চলেছে। কিছুক্ষণ শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে উঠল অ্যানে শেরম্যান। না, এ নিশ্চয়ই কুকুরেরই কাজ। নইলে এরকমভাবে কে আঁচড়াবে দরজায়? কাল সকালেই ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে হবে। ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে ফের মোবাইলের পর্দায় চোখ দিল অ্যানে শেরম্যান। বাইরে যে-ই আসুক, একসময় চলে যাবে ভেবে ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিতে চাইল শেরম্যান। ওদিকে দরজার বাইরে কুকুর বা যে প্রাণীটা এসেছে, সে কিন্তু নাছোড়বান্দা। চলে যাবার কোনও লক্ষণই তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে উঠেছে অ্যানে'র। নাঃ , এবার একটা ব্যবস্থা না করলেই নয়। কুকুর বা বেড়াল যে-ই এসে থাকুক, ওটাকে না তাড়ালেই নয়। টেবিলে রাখা জলের বোতলের দিকে নজর পড়ল অ্যানের। বেড়াল হলে ওটার গায়ে জল ছিটিয়ে দিলেই চলে যাবে, কারণ বেড়াল জল সহ্য করতে পারে না কিন্তু কুকুর কি জল দেখলে ভয় পাবে? একদমই নয়। তবু ওটাকে না তাড়ালেই নয়। বিছানা থেকে নেমে এক হাতে জলের বোতলটা নিয়ে পায়ে পায়ে দরজার দিকে এগোতে লাগল অ্যানে। তারপর একটু অপেক্ষা করে ঝট করে দরজাটা খুলে প্রাণীটাকে তাড়াতে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই জায়গাতেই জমে গেল সে। চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু চিৎকার ওর গলাতেই আটকে রইল।
বাইরে যে প্রাণিটা এসেছে, সে কুকুর না, বেড়ালও নয়, এমনকি অন্য কোনও পরিচিত প্রাণীও নয়। ধূসর সাদা লোমে ঢাকা বিশাল চেহারার কুৎসিত হিংস্রদর্শন একটা প্রাণী! দুটো চোখ ওটার লাল আগুনের মতো জ্বলছে, তাকিয়ে আছে অ্যানের দিকেই, চোখে চোখ রেখে। বিশাল গ্রীবা বিস্তার করল ওটা। ছুরির ফলার মতো দাঁতগুলো ঝিকিয়ে উঠল মুখের ভেতর। ঘরের দিকে একটা ভারী পা ফেলে একধাপ এগিয়ে এলো প্রাণীটা।
মুখে একটা হাত চাপা দিয়ে পিছু হটল অ্যানে। পিছু হটতেই লাগল ক্রমশ আর ওদিকে ভয়াবহ কুৎসিত অজানা প্রাণীটাও পায়ে পায়ে প্রবেশ করল ঘরের ভেতর। পেছনে দরজাটা লাথি মেরে বন্ধ করে দিল, অবিকল একটা মানুষের মতো।
তারপর ওটা এগোতে লাগল অ্যানের দিকে।
মাথা অনেকক্ষণ আগেই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল অ্যানের, এবার দু'চোখের সামনে নেমে এলো অন্ধকারের একটা কালো পর্দা। শুধুই অন্ধকার!
COPY
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now