বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মিশর কাহিনি ১

"গোয়েন্দা কাহিনি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত (০ পয়েন্ট)

X এক রাত দশটা।গুলশানের একটি দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল কালো রঙের একটি মার্সিডিজ।গাড়ি থেকে নামল দীর্ঘদেহী এক যুবক। সুদর্শন।উজ্জ্বল শ্যাম বর্নের যুবকটির উচ্চতা ঝাড়া ছয়ফুট।পরনের কালো জিন্স আর সাদা টি-শার্টে চমৎকার মানিয়েছে তাকে।নাম সাইফ হাসান।এক সময় বাংলাদেশ আর্মির একজন মেজর ছিল। দুর্দান্ত সাহস আর দেশপ্রেম,প্রচন্ ড আত্মবিশ্বাস ওকে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সেই মেজরের আসনে বসিয়েছিল।ওর বাবা একজন নামকরা শিল্পপতি ছিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে ওরও ব্যাবসায় নামার কথা,কিন্তু ছোটবেলা থেকেই গায়ে জলপাই রঙ্গের ইউনিফর্ম চড়ানোর অদম্য ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল ওর মধ্যে।এর পেছনে একজন মানুষের অবদান আছে।কর্ণেল আজহার চৌধুরী।ওর বাবার ঘনিষ্ট বন্ধু। প্রায়ই ওদের বাসাতে আসতেন তিনি।এবং বেশিরিভাগ সময়ই ইউনিফর্ম পরেই।তখন থেকেই ইউনিফর্মটার প্রতি এক ধরনের ফ্যাসিনেশন তৈরি হয় সাইফের মধ্যে।তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাসিনেশনের জায়গায় স্থান করে নেয় অদম্য স্পৃহা। নিজের যোগ্যতায় আর্মিতে আসন বানিয়ে নেয় সাইফ। তবে মেজর হবার কিছুদিন পরই লক্ষ্য করে,আর্মির কিছু পদস্থ অফিসার ডিফেন্স বিভাগের টপ সিক্রেট কিছু ইনফর্মেশন পাচার করছে পাশের দেশে। সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বসে সাইফ। ফলাফল,চাকরিটা হারাতে হয় ওকে। চেষ্টা করলে হয়ত চাকরিটা বাঁচাতে পারত,কিন্তু এটাকে ও চাকরি হিসেবে কখনই দেখেনি।রক্ষকই যেখানে ভক্ষক সেখানে নিজের দক্ষতা নিষ্ঠা আর ভালবাসা ঢেলে দেবার কোনো মানে খুঁজে পায়নি সাইফ।বলতে গেলে নিজেই একরকম ইস্তফা দিয়ে দেয়। তবে সাইফ জন্মগতভাবে গোঁয়ার টাইপের! উঠে পড়ে লাগে এই কূচক্রের পেছনে।এবং এক পর্যায়ে সফলও হয় এদের মুখোশ খুলে দিতে।এই কাজেও ও সাহায্য পেয়েছিল কর্নেল আজহার চৌধুরীর।তিনি বর্তমানে রিটায়ার্ড। এই মুহুর্তে তাঁর কাছেই এসেছে ও।আজ সন্ধ্যায় হুট করেই তলব।এই মানুষটার যেকোনো আদেশই শিরোধার্য সাইফের কাছে। গাড়ী থেকে নেমে সদর দরজার দিকে এগোলো সাইফ দৃঢ় পদক্ষেপে। দরজায় নক করতেই কর্নেল আজহার চৌধুরীর পরিচারক জাফর দরজা খুলে দিল। মধ্যবয়সী মানুষটা সাইফকে ভালমতই চেনে। ‘স্যার,আপনার জন্য দোতলায় অপেক্ষা করছে।’ কর্নেলের সাথে থাকতে থাকতে জাফরেরও ভূমিকাহীন কথা বলা অভ্যেস হয়ে গেছে।সাইফ মাথা ঝাঁকিয়ে দোতলার সিড়ির দিকে এগোলো। রুম চেনাই আছে। মৃদু টোকা দিতেই ভেতর থেকে কর্নেলের কন্ঠ ভেসে এল,‘কাম ইন।’ রুমে ঢুকেই অনেকটা হকচকিয়ে গেল সাইফ। কর্নেল যেন খাচায় বন্দি বাঘ একটা। অস্থিরভাবে পায়চারী করছেন।আর্মি অফিসাররা বিচলিত হলে ধরে নিতে হবে ঘটনা গুরুতর। ‘কী খবর,মেজর?’ ক্ষণিকের জন্য থেমে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন কর্নেল।দীর্ঘদিন ের সামরিক অভ্যেসে এখনো সাইফকে মেজর বলেই ডাকেন কর্নেল। ‘জী,স্যার ভাল।’ খানিক বিরতি দিয়ে বলল,‘এনিথিং রং,স্যার?’ ‘বোসো।’ বলে আবারও পায়চারী করতে লাগলেন কর্নেল। সাইফ বসে বসে বাচ্চাদের মত ঘাড় ঘুরিয়ে রুমের আসবাবপত্র পর্যবেক্ষন করছিল,এমন সময় কর্নেলের আচমকা প্রশ্ন,‘নাসের বিন ইউসুফ নামটার সাথে কি তুমি পরিচিতি?’ ‘জী স্যার।’একমুহুর্ ত না ভেবেই উত্তর দিল সাইফ।পরিচিত না হবার কোনো কারণ নেই।গত কয়েকদিন ধরে সারা বিশ্বেই নামটা খুবই আলোচিত। নাসের বিন ইউসুফ হলেন মিশরের একজন ধনকুবের।সপ্তাহখ ানেক আগে ভদ্রলোক মারা যান।মৃত্যুর আগে তিনি তার বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি দান করে যান একটা জনকল্যাণমূলক ট্রাস্টে।মৃত্যু র আগে যার নামও মানুষ শোনেনি,মৃত্যুর পর তিনিই হিরো বনে যান পৃথিবীর মানুষের কাছে। ‘নাসের আমার বন্ধু ছিল।’ কথাটা এমনভাবে বললেন কর্নেল,সাইফের কয়েকমুহুর্ত লেগে গেল কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে। ‘কি করে,স্যার?’ ‘সে অনেক কথা। সংক্ষেপে বলতে গেলে,আমি একবার সেনাবাহিনীর একটা টিমের সাথে তিনমাসের জন্য মিশর গিয়েছিলাম একটা ট্রেনিং-এ। অনেকবছর আগের কথা।সেখানেই নাসেরের সাথে পরিচয়। তখনও ও এতটা ধনী ছিল না।পৈত্রিক ব্যবসায় সবেমাত্র ঢুকেছে।কিভাবে কিভাবে যেন ওর সাথে আমার একটা বন্ধুত্ব হয়ে যায়।অবসরে প্রায়ই ওর বাড়িতে যেতাম।গল্প করতাম দুজনে মিলে।আমি দেশে ফিরে আসার পর নাসেরের বিয়েতে ওর আমন্ত্রণ রক্ষার জন্যই মিশর গিয়েছিলাম একবার। সেও অনেক আগের কথা।যোগাযোগে মাঝে মধ্যে ভাটা পড়লেও একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়নি কখনও। আমি একবার কথায় কথায় আমার একটা গোপন স্বপ্নের কথা বলেছিলাম ওকে।আজ তোমাকে সেই স্বপ্নটার কথা বলার জন্যই ডেকেছি। সাইফ যথেষ্ঠ অবাক হল।একজন মিশরীয় ধনকুবের আর কর্নেলের স্বপ্নের মধ্যে ওর ভূমিকাটা ঠিক কোথায়?চুপ করে রইল।খানিকবাদেই জানা যাবে। ‘একজন আর্মি অফিসার হিসেবে নিশ্চয়ই এসপিওনাজ সম্পর্কে ভাল ধারনা রাখো তুমি। সিআইএ,এমআই সিক্স,র,আইএসআই, এদের ক্ষমতার কথাও অজানা নয় তোমার। অঘটনঘটন পটীয়সী এরা।বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের অঘটন ঘটানো এদের কাছে ডালভাত। বিশ্বের প্রায় সব পলিটিক্যাল মার্ডারের পেছনে এদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ হাত আছে। সুপার পাওয়ারগুলো মূলত চলছেই এসব এসপিওনাজ এজেন্সির কাধে ভর দিয়ে।এই সিক্রেট সার্ভিস না থাকলে মুখ থুবড়ে পড়বে তাদের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের এই দেশ এখনো এসপিওনাজ জগতে হামাগুড়ি দিচ্ছে বললেও বেশি বলা হয়ে যাবে।তাদের সাথে টেক্কা দেয়া তো দুরে থাক,আমাদের আভন্তরীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ডিজিএফআই,এনএসআই কিংবা সিআইডির পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।আর সত্যিকার অর্থে এগুলো এসপিওনাজ এজেন্সীও নয়।স্বীকার করছি,উন্নয়নশীল একটা দেশ হিসেবে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরকার চাইলেও বিভিন্ন কারনেই এ ধরনের সিক্রেট সার্ভিস চালু করা সম্ভব নয়।তবে কেউ যদি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির ছদ্মাবরণে বাংলাদেশের হয়ে এসপিওনাজ কার্যক্রম পরিচালনা করে তবে কার কি বলার থাকতে পারে?’ শেষের কথাটা বলার সময় এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল কর্নেলের। ‘খুবই ভালো আইডিয়া। কিন্তু স্যার...।’ সাইফকে থামিয়ে দিলেন কর্নেল।‘জানি,কী বলবে।এতে কত বিপুল পরিমাণ টাকার প্রয়োজন সেটাই বলতে চাচ্ছো তো?’ সাইফ চুপ করে রইল। কর্নেল ওর প্রশ্নটা ধরতে পেররেছেন। ‘নাসের মারা যাবার পর আমার আমার অ্যাড্রেসে একটা মেইল আসে।নাসেরই পাঠিয়েছে।’ প্রশ্নটা হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে,এরপরও না করে পারল না সাইফ,‘স্যার,মৃত ্যুর পর কিভাবে ইমেইল করলেন উনি?!’ সাইফের বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন কর্নেল।‘ও মৃত্যুর আগে একজনকে বলে গিয়েছিল।তার ব্যাপারে পরে জানতে পারবে।তো,সেই মেইলের মাধ্যমে আমি জানতে পারলাম,সেই কবে বলা আমার স্বপ্নের কথাটা নাসের আমৃত্যু মনে রেখেছিল।এবং শুধু মনেই রাখেনি,স্বপ্নটা বাস্তবায়নের পথও বাতলে দিয়ে গেছে। যদিও সেই পথটায় তোমাকেই হাঁটতে হবে।’ ‘সরি,স্যার?’ কর্নেল কিছু না বলে একটা প্রিন্ট আউট বাড়িয়ে ধরলেন সাইফের দিকে।‘পড়ে দেখো।’সাইফ হাত বাড়িয়ে প্রিন্ট আউটটা নিয়ে পড়া শুরু করল। “কর্নেল,কেমন আছো। আমার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয়।ডাক্তাররা এক প্রকার আশা ছেড়েই দিয়েছে।লিভার প্রায় অকেজো।হয়ত আর কোনোদিন দেখা হবে না।কারণ,এই চিঠিটা যখন তুমি পড়বে,তখন ধরে নিয়ো আমি আর নেই।সেভাবেই বলে গেলাম,আমার ভাই,আমার বন্ধু শেইখ সালাহউদ্দিনকে।শ েইখ সালাহউদ্দিন আমার দুঃসম্পর্কের ভাই।কিন্তু এতটা বছরে আমার আপন ভাইয়ের থেকেও আপন হয়ে গেছে।সালাহউদ্দি ন আমার ম্যানেজারও। তুমি তো জানো,আমার কোনো উত্তরাধিকার নেই।কোনো সন্তানও আল্লাহ আমাকে দেননি।এজন্য আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি দান করে গেলাম একটা ট্রাস্টিতে।তোমা র মনে আছে,তুমি অনেক আগে আমাকে একটা স্বপ্নের কথা বলেছিলে?বলেছিলে ,তোমার ছোট্ট দেশটার জন্য তুমি কিছু করতে চাও।কথাটা তখনই আমার বুকে গিয়ে লেগেছিল।আমি তোমার দেশ কখনো দেখিনি।কিন্তু তোমার মুখে শুনে শুনে,সত্যি বলতে আমি তোমাদের ছোট্ট,সবুজ দেশটার প্রেমে পড়ে গেলাম। সবসময়ই ইচ্ছা হত তোমার জন্য কিছু করি।কিন্তু কাজটার ঝুঁকির কথা চিন্তা করেই বারবার ইতস্তত করেছি। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে আর ইতস্তত করার মানে হয় না।এখনও যদি কথাটা না জানাই তাহলে সারাজীবনের জন্যই হয়ত রহস্যটা মরুভূমির বালির নীচে চাপা পড়ে থাকবে। যাইহোক,গোড়া থেকেই বলি।ছোটবেলা থেকেই আমি একটু বাউন্ডুলে টাইপের ছিলাম।মাঝে মধ্যেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম মরুভূমিতে।একা একাই ঘুরে বেড়াতাম।কখনো সন্ধ্যা,আবার কখনো গভীর রাতে বাড়ি ফিরতাম।আমরা এখনকার মত না হলেও পারিবারিকভাবেই ধনী ছিলাম।বাবা মারা যাবার আগ পর্যন্ত আমাকে ব্যবসা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি। সেজন্য এই ধরনের এডভেঞ্চার ঘন ঘনই হত। এমনই একদিন আমার গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পরলাম।সত্যি বলতে,মরুভূমির নিঃসঙ্গতা আমাকে চুম্বকের মত টানত। চারদিকের শুনশান নীরবতায় ঘোর লেগে যেত।মরুভূমিতে ঢুকলেই আমি যেন ঘোরের মধ্যে চলে যেতাম।মাঝে মধ্যেই খেয়াল রাখতে পারতাম না কোথায় যাচ্ছি।ঘোর কেটে গেলে কম্পাসের সাহায্য নিয়ে অনেক ঝক্কি সহ্য করে ফিরে আসতে হত। তো,সেদিনও গাড়ি চালাতে চালাতে আমি এক সময় লক্ষ্য করে দেখলাম,জায়গাটা সম্পুর্ন অপরিচিত ঠেকছে।এর আগে কখনো আমি আসিনি এখানে।ইতিউতি তাকিয়ে ব্যাপারটা আঁচ করবার চেষ্টা করছি এমন সময় আমার সিক্সথ সেন্স বলে দিল,সামনে বিপদ! ধেয়ে আসছে মরুভূমির আতঙ্ক সাইমুম। ভয়ঙ্ককর এই বালু ঝড় আসে কোনো রকম আগাম আভাস না দিয়েই।এর স্থায়ীত্বেরও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। কখনো কয়েকমিনিট আবার কখনো লাগাতার কয়েক ঘন্টা হওয়াও বিচিত্র না।খুব দ্রুত একটা আশ্রয় নিতে হবে।ঝড়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে আগে থেকে আঁচ করা সম্ভব নয়। সাইমুম যখন বিদায় নেয়,তখন দেখা যায় এখানে ওখানে অনেক বালির ঢিবি গজিয়ে গেছে।কোনো কোনোটা ছোটখাট টিলার মত। এরকম একটা টিলা আমার মাথায় গজালে তো মুশকিল! আমার গাড়িটা ছিল একটা হুড খোলা ল্যান্ড রোভার।এটাকে আর যাই হোক,আশ্রয় ভাবার অবকাশ নেই। এদিক সেদিক তাকাতেই কিছুটা দূরে কতগুলো পাথরের স্তুপ দেখতে পেলাম।স্তুপের মধ্যেই একটা গর্ত মত জায়গা।গুহা ভেবে দৌড় দিলাম সেদিকে। কাছাকাছি আসতেই লক্ষ্য করলাম,কিছু কিছু পাথরের আকৃতি অদ্ভুত।যেন যত্ন করে আকার দেয়া হয়েছে ওগুলোকে।হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে।এটা কোনো পাথরের স্তুপ নয়,একটা পিরামিডের ধ্বংসাবশেষ! স্তুপের গায়ের গর্তটা দেখতে দেখতেই আমি আরেকটা ব্যাপার বুঝে ফেললাম। পিরামিডের ইতিহাস তো জানোই।প্রাচীন মিশরে উচ্চ শ্রেণীর মানুষ মারা গেলে পিরামিড তৈরি করে তাদের সমাহিত করা হত।সেই সাথে প্রচুর ধন সম্পদ,আর দাসদাসী মেরে দিয়ে দিত।অনেকেরই ধারনা,পিরামিডের ভেতরটা বোধহয় ফাঁপা। এর ভেতরই বোধহয় সমাধি আর ধন সম্পদ থাকে।তবে আসল ব্যাপারটা হল,পিরামিড একটা নিরেট জিনিস।লাশ কিংবা ধন সম্পদও এর ভেতরে থাকে না। পিরামিডের ঠিক নীচেই একটা চেম্বার থাকে।এখানেই থাকে সব।এই চেম্বারে প্রবেশে করতে হয় একটা টানেলের মাধ্যমে।আর এই টানেলের গোপন প্রবেশ মুখটা থাকে পিরামিড থেকে কয়েকশ গজ দূরে।গর্তটা দেখেই আমি বুঝতে পারলাম কিছুটা দূরেই যে পিরামিডের ধ্বংসস্তুপ দেখতে পাচ্ছি সেটারই প্রবেশ মুখ এই গর্ত। কত বছর আগে কে জানে,একটা ভয়াবহ ভূমিকম্পে পিরামিডটা ধ্বসে পড়েছে।এখন স্রেফ এলোমেলো কতগুলো পাথরের স্তুপে পরিণত হয়েছে। তবে ভুমিকম্প একটা উপকার করেছে। পিরামিডটার গোপন প্রবেশপথটা উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছে।নইলে হয়ত কখনই বুঝতে পারতাম না,আমার পায়ের নীচেই লুকিয়ে আছে একটা পিরামিডের চেম্বার! সাইমুম চলে এসেছে। এখানে দাঁড়িয়ে আকাশ পাতাল ভাবার সময় নেই।তড়িঘড়ি করে আমি সুড়ঙ্গ দিয়ে মাথা গলিয়ে দিলাম। টানেলের প্রবেশ মুখের ঠিক নীচেই ছোট্ট একটা চেম্বার।দশ বাই দশ ফুট।এটা মূল চেম্বার নয়।মূল চেম্বার আরো ভেতরে। একদিকের দেয়ালে একটা পাথুরে দরজা দেখা যাচ্ছে।গায়ে হিজিবিজি করে কি সব লেখা।অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে সেরকমই মনে হয়। যদিও এগুলো আসলে হায়ারোগ্লিফিক।ম িশরের বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষ কিছু কিছু হায়ারোগ্লিফিক জানে।আমিও এক কালে শিখেছিলাম। সেই অপূর্ন জ্ঞান দিয়ে দরজার গায়ে কথাগুলোর মানে বের করতে চাইলাম।ভাসা ভাসা বুঝলাম,আমাকে অভিশাপ দেয়া হচ্ছে এখানে আসার জন্য! এগুলোই লেখা থাকে সব পিরামিডে।আমি লেখার পাঠোদ্ধার বাদ দিয়ে লুকনো লিভার খুঁজতে লাগলাম। জানি,এখানে একটা লুকনো লিভার থাকবে। ওটা দিয়েই এই দরজা খোলা সম্ভব।বেশ কিছুক্ষন পর দেয়ালের গায়ে একটা পাথরের ব্লক আবিষ্কার করলাম। অন্য ব্লকগুলো থেকে খানিকটা উচু। বিসমিল্লাহ বলে চাপ দিতেই যেন সাইমুম এই ছোট্ট চেম্বারটাতে ঢুকে পড়ল।ঘড়ঘড় শব্দ,সেই সাথে কাঁপুনি। এক সময় সব থামল। দরজাটা খুলে গেছে। ভেতরটা কালিতে চোবানো।কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।একটা লাইটার অবশ্য সাথে আছে।সেটা দিয়ে আর কতটুকু কী হবে?তবে বাইরে বোধহয় সাইমুম থেমে গেছে।সুরঙ্গ পথে আসা আলোর উজ্জ্বলতা বেড়ে গেছে।সেই আলোকে সম্বল করে আরেকবার আল্লাহর নাম নিয়ে আমি দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম। কয়েক পা এগোতেই চোখে আলো সয়ে এল। বুঝতে পারলাম,আমি আরেকটা টানেলে চলে এসেছি।টানেলের শেষটা দেখা যাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই বেশ বড় হবার কথা।শেষ মাথায় আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে তাও জানি না। এডভেঞ্চারের উন্মাদনায় শরীরের রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। কতটা দূর এলাম,ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না।যতই ভেতরে এসেছি ততই আঁধার বেড়ে গেছে।প্রবেশ পথটা যেন সুদূর অতীত।শুধু আলোর একটা বিন্দু দেখা যাচ্ছে ফেলে আসা পথের মাথায়।আমি লাইটার জ্বাললাম। সামনে এখনো অনেকটা টানেল পড়ে রয়েছে। আরো খানিক এগিয়ে গেলাম।পেছনে তাকিয়ে দেখি আলোর সেই বিন্ধুটাও অদৃশ্য হয়েছে।গা টা ছমছম করে উঠল।সহস্রাব্দ প্রাচীন এক পিরামিডের কালি গোলা আঁধারে নির্ভীক দাঁড়িয়ে থাকতে যতটা সাহসের প্রয়োজন হয়,স্বীকার করতে দ্বিধা নেই,অতটা সাহসী আমি কোনোকালেই ছিলাম না। আবারও লাইটার জ্বাললাম।এবার দেখা গেল কয়েক হাত সামনেই হুবুহু আগের মত আরেকটা দরজা। কাছে গেলাম।কিছুটা আগের অভিজ্ঞতা থেকে হাতড়ে হাতড়ে আর কিছুটা লাইটারের দুর্বল আলোর সাহায্য নিয়ে বের করে ফেললাম লিভারটা। চাপ দিতেই সেই পুনরাবৃত্তি।কিছ ুক্ষন ঘড় ঘড় শব্দ,এরপর খুলে গেল দরজাটা। আমি ভেতরে ঢুকে পড়লাম।লাইটারের অপ্রতুল আলোতে বলতে গেলে কিছু দেখা যাচ্ছে না।এরপরও আঁচ করা যাচ্ছে এই চেম্বারটা বিশাল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলাম।আগুনের কাঁপাকাঁপা আলোয় সেই সময় অদ্ভুত ব্যাপারটা চোখে পড়ল।আমার কিছুটা সামনেই একটা উঁচু বেদীর মত জায়গায়।সেই বেদীটার উপর রাখা আছে একটা কফিন! সারকোফেগাস! আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতেই লাইটারের আলোর ব্যাপ্তি বেড়ে গেল।আমি আবারও অভিভূত হয়ে লক্ষ্য করলাম।উচু কফিনের দুপাশে আরো কয়েকটা কফিন রাখা আছে। এক,দুই,তিন...পা চটা! মোট পাঁচটা বাক্স। মাঝের কফিনটাই শুধু উঁচু বেদীতে রাখা। বাকিগুলো খানিকটা নীচুতে।আমি সামান্য মাথা খাটাতেই ব্যাপারটা বুঝে ফেললাম।এই সমাধি যার জন্য তৈরী করা হয়েছে,উচু কফিনটাতে রয়েছে তার মমি।আর বাকিগুলোতে...আম ি আর আকাশ কুসুম ভাবতে চাইলাম না। হাত বাড়িয়ে একটা কফিনের ডালা ধরলাম।দুরুদুর বুকে উঁচু করতে চাইলাম।বেশ ভারী।লাইটারটা বন্ধ করে দুই হাত লাগাতে হল।এক সময় খুলে ফেললাম ডালাটা। এরপর পকেট থেকে লাইটার বের করলাম। জ্বালবার আগে কয়েকমুহুর্ত সময় নিয়েছিলাম নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে।লাইটার জ্বাললাম। ওহ মাই গড,কর্নেল! কল্পনা করতে পারছ আমি কী দেখলাম?! পুরো সারকোফেগাস ভর্তি বিপুল পরিমাণ ঐশ্বর্যে! একে একে বাকি তিনটা সারকোগফেগাসও খুলে দেখলাম,একই অবস্থা। স্বর্ণালংকার থেকে শুরু করে অমূল্য সব পাথর,কী নেই! এরপরের কাহিনি সংক্ষিপ্ত।আমি ওখান থেকে চলে আসি।এর ক’দিন পরই বাবা মারা গেলেন।এরপর বাবার পুরো ব্যবসার হাল আমাকেই ধরতে হল। নিঃশ্বাস নেবার সময় পেতাম না।মাঝে মধ্যে মনে হত ওগুলো নিয়ে আসি।কিন্তু বললেই তো আনা যায় না।এটা একটা রহস্যই বটে,মরুভূমিতে ঘোরাঘুরির ফলে আমার ব্যাপারে বাজারে গুজব ছিল- আমি নাকি গুপ্তধন পেয়েছি।সেটা এভাবে সত্যি হবে ভাবিনি। আর ওই গুজবটার কারণেই এত বিপুল সম্পদ কারো চোখে না পড়ে খরচ করা কিংবা নিজের কাছে রাখা সম্ভব নয়।তাছাড়া আমার নিজের টাকা পয়সা নেহাত কম ছিল না।তাছাড়া আমার ধারণা ছিল,নিজের কাছে রাখার চাইতে ওই প্রাচীন পিরামিডেই ওগুলো নিরাপদ থাকবে বেশি। হাজার হাজার বছর ধরেও যখন সবার অলক্ষ্যেই থেকে গেছে তখন আরো অনেকগুলো বছর নিরাপদেই থাকবে- ভাবতে দোষ নেই।মাঝে মধ্যে আবার চিন্তা করতাম সরকারকে সব জানিয়ে দেই।কিন্তু এই চিন্তাটা কখনই খুব বেশিক্ষন স্থায়ী হত না।তুমি তো জানোই আমাদের দেশের শাষন ব্যবস্থার প্রতি আমার একদমই আস্থা নেই।হয়ত কিছু ট্রেজার মিউজিয়ামে রাখা হবে,বাকি সব বারো ভূতে লুটে পুটে খাবে।তার চাইতে ওখানেই থাক,কখনো প্রয়োজন পড়লে গিয়ে নিয়ে আসা যাবে। পিরামিডটাক ে ব্যাংকের সুরক্ষিত ভল্ট হিসেবে নিয়েছিলাম। এভাবেই কেটে গেল আমার সারাটা জীবন। মরণব্যাধি লিভার ক্যান্সার এক ঝটকায় আমাকে পথের শেষ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এমন সময় তোমার সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ল।বুঝতে পারলাম,এখনই সময়। ট্রেজারগুলো নিজের কাছে এনে রাখতে হবে। এরপর সুযোগ বুঝে তোমার হাতে তুলে দেব।কিন্তু আমি হতাশ হয়ে লক্ষ্য করলাম,আজ এত বছর পর পিরামিডটার অবস্থান আমি আর মনে করতে পারছি না! অনেক চেষ্টার পর এলাকার একটা পজিশন আবছাভাবে ধারণা করতে পারলাম। আমি সেটা শেইখ সালাহউদ্দিনকে জানি গেলাম।যদিও নিশ্চিত নই অবস্থানটা পুরোপুরি সঠিক কিনা। তবে আরো কিছু ব্যাপার আছে,যেগুলো অনুসরণ করলে দুঃসাধ্য হলেও একেবারে অসম্ভব নয় সেই পিয়ামিড খুঁজে বের করা।তাছাড়া ট্রেজারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য আমি কিছু ব্যবস্থা নিয়েছি।সেজন্য আশা করি এখনো নিরাপদেই আছে ট্রেজারগুলো। তবে সেগুলো খুঁজে বের করতে হলে তীক্ষ্ণ মেধাবী আর পরিশ্রমী কাউকে প্রয়োজন হবে।এমন বিশ্বস্ত কেউ যদি তোমার কাছে থেকে থাকে তবে তাকে পাঠিয়ে দিয়ো।আমি সালাহউদ্দিনকে সব বলে গেলাম,সে তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে। আর বেশি কিছু বলার নেই।এই মেইলটা লিখতে পরিশ্রমের চুড়ান্ত করতে হচ্ছে আমাকে।তোমার কাছে জীবনের শেষ অনুরোধ,ট্রেজারট া তুমি উদ্ধার করো। ইতি নাসের বিন ইউসুফ র্যামসিস,ইজিপ্ট চিঠি থেকে চিন্তিত মুখে মাথা তুলতেই সাইফ দেখতে পেল ততোধিক চিন্তিত মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন কর্নেল আজহার চৌধুরী। ‘কী বুঝলে?’ ‘অবিশ্বাস্য ব্যাপার,স্যার।’ ‘হুম,তবে ঘটনা সত্য। আজ বিকেলে শেইখ সালাহউদ্দিন ফোন করেছিলেন।জানতে চাইলেন,কাউকে পাঠাচ্ছি কিনা।আমি কাল জানাব বলেছি।’ সাইফ মাথা নীচু করে ভাবতে লাগল।সাইফ স্পষ্টই বুঝতে পারছে কর্নেল কী বলতে চান।কাজটা ঝুঁকি আছে।মারাত্মক ঝুকি।একটা দেশ থেকে সে দেশের সম্পদ বলতে গেলে চুরি করে আনতে হবে।কতদিনের ধাক্কা কে জানে?তার চাইতে বড় প্রশ্ন আদৌ সেই ট্রেজার খুঁজে পাবে কিনা সেটারও নিশ্চয়তা নেই।নাসের বিন ইউসুফ নিজেও নিশ্চিত নন জায়গাটার ব্যাপারে। আর পেলেও একেবারে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে দেশে নিয়ে আসবে,এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আনতে হবে সমুদ্রপথে। সবমিলিয়ে হয়ত প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করতে বলছেন কর্নেল। তবে কর্নেলের স্বপ্নটা ওকে নাড়া দিয়ে গেছে।ও নিজেই তো কতদিন স্বপ্ন দেখত,বাংলাদেশের সিক্রেট সার্ভিসের হয়ে কাজ করবে।যদিও আর্মির ইন্টেলিজেন্স ঊইং এর হয়ে কিছুদিন কাজ করেছে কিন্তু সেটা আসলে এসপিওনাজের মধ্যে পড়ে না।আর বর্তমান বিশ্বে এসপিওনাজের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।ট্রেজারটা উদ্ধার করা গেলে সত্যি দেশের জন্য অনেক বড় একটা কাজ হবে।আর সবচাইতে বড় কথা,সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটার কথা ও ফেলতে পারবে না। সাইফ যখন মাথা তুলল,তখন ওর চোখে ইস্পাত কঠোর দৃঢ়তা দেখতে পেলেন কর্নেল। ‘কবে যেতে হবে স্যার?’ স্বস্তির নিঃশ্বাসটা গোপন করার কোনো চেষ্টাই করলেন না কর্নেল।‘তোমার কাগজপত্র আমি তৈরি করে রেখেছি। আগামীকাল রাতেই তোমার ফ্লাইট।’ সাইফের মনে পড়ল তিন চারদিন আগে কর্নেল ওর পাসপোর্ট চেয়ে নিয়েছিলেন। বিস্মিত হয়ে সাইফ প্রশ্ন করল,‘স্যার,আপনি জানতেন,আমি রাজি হব?’ স্মিত হেসে মাথা ঝাঁকালেন কর্নেল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now