বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ফাগুনের ছোঁয়া!
(১০) আপনাকে আজ চারুকলার বকুলতলায় মুখ গোমড়া করে বসে থাকতে দেখলাম। আপনার সঙ্গে মুখ গোমড়া ব্যাপারটা না কোনোভাবেই যায় না। পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্মই হয় যাদের মুখে সব সময় হাসির ঝিলিক লেগে থাকে। আপনিও তাঁদের মধ্যে একজন।
আপনার মুখে হাসি দেখলে আপনার আশপাশের মানুষগুলোও আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে শরতের এক চিলতে রোদের আভাস দেখতে পায়। আচ্ছা, কতবার বলেছি নীল পাড়ের গোলাপি শাড়িতে আপনাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। তবু কেন আপনি সব সময় থ্রিপিস পরে ক্যাম্পাসে আসেন?
আচ্ছা, আপনাকে না বলেছি, চোখে কালো সানগ্লাস পরতে; পরেন না কেন? আপনার বাড়াবাড়ি রকমের মায়াবী চোখ আমি ছাড়া অন্য কেউ দেখুক তা আমি চাই না। বড্ড হিংসে হয় আমার। আপনার দুই চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো পলক না ফেলেই আমি এক যুগ কাটিয়ে দিতে পারব, তা কি আপনি জানেন?
আপনার দুই চোখের দিকে তাকিয়ে আমি একটি স্বচ্ছ সমুদ্র দেখতে পাই, যার তীরে কয়েকটা কাঠগোলাপের গাছ আছে, ক্লান্ত হয়ে গেলে কাঠগোলাপের তলায় বসে বিশ্রাম নিতে পারব। জানেন তো, কাঠগোলাপের একটা মোহ ধরা ঘ্রাণ আছে।
আপনি এখন থেকে কপালের ঠিক মাঝখানটায় ছোট্ট কালো টিপ পরবেন। কালো টিপে আপনাকে খুব মানাবে। সেদিন টিএসসিতে দেখলাম আপনি ডিপার্টমেন্টের শাওন ভাইয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছিলেন। শাওন ভাইয়ের সঙ্গে আপনি আর একদম কথা বলবেন না কিন্তু! শাওন ভাই দেখতে স্মার্ট আর ভালো একটা চাকরি করলে কী হবে, মানুষ হিসেবে কিন্তু খুব একটা সুবিধার না!
আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আমার মতো আপনিও কি প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমার কথা ভাবেন? আমার কি হয়েছে জানেন? প্রতি রাতে আপনার কথা না ভাবলে, আপনাকে নিয়ে সুখস্বপ্ন না দেখলে আমার না ঘুমই আসে না।
আচ্ছা শুনুন, আপনাকে আগেই বলে রাখছি বিয়ের পর আপনাকে কিন্তু প্রতি সপ্তাহে দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে যেতে পারব না। তবে বৃষ্টির দিনে নিজ হাতে হাঁসের মাংস আর খিচুড়ি রান্না করে খাওয়াতে পারব। হয়তো দামি গিফট দিতে পারব না, তবে মাঠ থেকে শরতের কাশফুল এনে আপনার খোঁপায় গেঁথে দিতে পারব।
হয়তো দামি গাড়িতে করে আপনাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যেতে পারব না। তবে প্রতি বিকেলে আপনার হাতে হাত রেখে ফুলার রোড, কার্জন হল এলাকায় রিকশায় ঘুরতে যাব! পারবেন তো এত কষ্ট সহ্য করে আমাকে ভালোবাসতে?
চিঠির উত্তর দেবেন।
মায়া!
(১১) মায়ের চিৎকারে সাগরের ঘুম ভেঙে গেল। প্রতিদিনের মতোই মা বাবাকে বকাঝকা করছেন, ‘তোমার সংসারে এসে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। আমার বাবা যে কেন এমন অকর্মণ্য লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল! এই রাবণের বংশকে টানতে টানতে ঠিকমতো খাওয়া-ঘুমানোর সময় পাই না।’সাগর আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়ে। আজকে সে একদম মন খারাপ করবে না। আজকের দিনটা তার জন্য একটা বিশেষ দিন।
সাগর অভ্যাসমতো দাদুর ঘরে উঁকি মারে। ঘরে ঢুকতেই বিশ্রী গন্ধ নাকে আসে। সাগর চোখ-মুখ কুঁচকে বলে, ‘দাদু, আজকেও তুমি বিছানায় বাথরুম করেছ! বাথরুম পেলে তুমি মাকে ডাকতে পারো না!’
দাদু ধমকে ওঠেন, ‘ব্যাটা বুরবক, আমি বিছানায় বাথরুম করব কেন! তুই প্রতিদিন বিছানায় বাথরুম করিস। তোকে আমি এই হাতের তালুতে করে মানুষ করেছি, আমি জানি। তুই বিছানায় পেশাব করতে করতে এত বড় দামড়া হয়েছিস।’
দাদুর কথায় সাগর হেসে ফেলে। চারপাশের এই মানুষগুলোর ভালোবাসা উপেক্ষা করা যায় না বলেই আরও অনেক দিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে।
বাইরে আসতেই বাবার সঙ্গে দেখা হয় সাগরের, ‘কিরে ব্যাটা, আজকে এমন উদাস হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন? অফিসে যাবি না?’
সাগর হেসে বলে, ‘না বাবা, আজকে সারা দিন বাসায় থাকব। তোমাদের সবাইকে বিরক্ত করব। আজকে জাগতিক সব কাজ থেকে আমার ছুটি।’
বাবা হাসেন, ‘চল তাহলে, আজকে বাপ-ব্যাটা দুজন মিলে বাজারে যাই।’
সাগরের মনে পড়ে অনেক ছোটবেলায় সে বাবার হাত ধরে বাজারে যেত। কত দিন বাবার সঙ্গে কোথাও যাওয়া হয় না!
সাগর ভেবে রেখেছে আজ সারা দিন সে মন খারাপ করবে না। আজ তার আনন্দে থাকার দিন। প্রতিদিন যে বাচ্চাগুলো বল মেরে তার জানালার কাচ ভাঙে, আজ সে তাদের ঝাড়ি দেবে না। প্রতিদিন যে কাজের ছেলেটা ভুল করে চিনি ছাড়া চা দেয়, আজ সে তাকেও ধমকাবে না।
আজ সে সন্ধ্যায় কাউকে ফোন করে বলবে না, ‘আমি বাসায় এসেছি। দয়া করে এবার আমার জন্য চিন্তা করা বন্ধ করো। আর আগামী কয়েক ঘণ্টা একদম বিরক্ত করবে না। আমি এখন ঘুমাব।’
সন্ধ্যায় সাগরের অস্থির লাগে। বাসায় যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। আনন্দে থাকার পরিকল্পনা কাজ করছে না। আচ্ছা, হলুদ পাঞ্জাবি পরে মহুয়ার গায়ে হলুদে চলে গেলে কেমন হয়! কিংবা কাল বরযাত্রীর সঙ্গে মহুয়ার বিয়ের প্যান্ডেলে ঢুকে গেলে! ছেলেমানুষি চিন্তাগুলো মাথায় আসায় সাগরের হাসি পেল।
পায়চারি করতে করতে সে মা-বাবার ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। মা-বাবা গুটুর গুটুর করে কথা বলছেন। সারা দিনের ঝগড়া-বিবাদ সব গায়েব! সাগর নিজের মনে হাসে। মায়া অদ্ভুত এক জিনিস। দেখা যায় না, অথচ বোঝা যায় সে আছে। এই টানটা আছে বলেই মানুষ কখনো সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে বিবাগি হয়ে যেতে পারে না।
হাঁটতে হাঁটতে সাগর বারান্দায় চলে আসে। আকাশের দিকে তাকিয়ে রাগে তার গা জ্বলে গেল। জোছনায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। সে অন্ধকার চেয়েছিল। প্রকৃতি চায় না সে অন্ধকারে থাকুক। প্রকৃতির কাছে তার ইচ্ছার কোন দাম নেই। বারান্দায় বসে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে নিজেও জানে না।
খাঁচায় রাখা পাখিগুলোর কিচিরমিচিরে তার ঘুম ভাঙে। সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে খাঁচা খুলে পাখিগুলো আকাশে উড়িয়ে দিল। মা বারান্দায় এসে অবাক হয়ে যান, ‘তোর এত শখের পাখিগুলো ছেড়ে দিলি কেন!’
সাগর হাসে, ‘মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই মা। মায়া খুব খারাপ জিনিস। একবার মায়া বাঁধিয়ে ফেললে যুগ যুগ সে জিনিসটার ভেতরে আটকে পড়ে থাকতে হয়।’
মা ধমকে ওঠেন, ‘এসব আবোলতাবোল কী বলছিস? সারা রাত এখানে বসে ছিলি?’
সাগর মুচকি হাসে, ‘আজকে মহুয়ার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে মা। মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য প্রকৃতি কত রকম আয়োজন করে রেখেছে। তাই আমি চিন্তা করেছি আমি প্রকৃতির এই নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব।
আমাকে কষ্ট দিতে চাইলেও আমি কষ্ট পাব না। আমি আজ জোর করে হলেও আনন্দে থাকার চেষ্টা করব।’
বলতে বলতে সাগর মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
প্রেমিকার মনে ভয় ছিল!
(১২) মেয়ে, তোমাকে আমি ভালোবাসি, কথাটা তোমার জানা দরকার।
-বাদল ভাই! আপনার ভয় নেই?
-ভালোবাসায় কিসের ভয়?
-আমার তো শুনেই ভয় করছে। আব্বা জানলে তো আমি শেষ!
-এখনই তোমার আব্বা জানবে কেমন করে? তুমি না বললেই হলো।
-কী বলেন? আব্বা তো আমার মুখ দেখেই বুঝে ফেলবে আপনি আমাকে প্রেম-ভালোবাসার কথা বলেছেন।
-তোমার আব্বার কথা পরে, তুমি আমাকে ভালোবাস কি না বলো?
-ভালো তো আমি সেই কবে থেকেই বাসি।
শিফাতের সহজ উত্তরের পর। গোলাপি পাখায় ভর করে উড়ছি। পরদিন আবার আমাদের দেখা হলো।
-শিফাত, তুমি আমাকে প্রতিদিন একটি করে চিঠি লিখবে, কেমন?
-কী বলেন? ভয়েই আমি কলম ধরতে পারব না, লেখা তো পরে...। আর আব্বা যদি...
-ঠিক আছে, চিঠি বাদ। বিকেলে আমরা পার্কে বেড়াতে যাব।
-ওরে বাবা, আমি যাব না। আব্বা যদি জেনে যায়?
-তুমি না বললে জানবে কী করে?
-ভয়ের চোটে আমার মুখ থেকে বের হয়ে যাবে।
আমরা মুখে আর কথা আসে না। তৃতীয় দিন শিফাতকে কলেজের রাস্তায় পেয়ে বলে ফেললাম:
-তোমাকে বিয়ে করতে চাই, বাসায় প্রস্তাব নিয়ে যাব?
-না না, আপনাকে বলতে হবে না। আমি বড় আপুকে আপনার কথা বলব। আপুই আব্বাকে বলবে। রাতে শিফাতকে ফোনে পেলাম। খুশির খবর শুনে লাফিয়ে উঠলাম। শেষে শিফাত বলল, বাসার সবাই রাজি। আমার কাছে আব্বা সরাসরি শুনতে চেয়েছে...
-হ্যালো শিফাত, চুপ করে আছো কেন?
-আব্বা আমাকে বলেছে, আমি কলেজে গিয়ে প্রেম-ভালোবাসা করলাম কখন? আবার কোন সাহসে নিজের বিয়ের কথা নিজেই বলছি। আমার কি কোনো লজ্জা নেই?
-তারপর?
-আমার কাছে জানতে চেয়েছে, আমি বিয়েতে রাজি কি না?
-তুমি কী বললা?
-আমি কোনো কথা বলিনি। চুপ করে ছিলাম। আব্বা মেজাজ খারাপ করে ফেললেন। এখন কেন কথা বলছি না দেখে মারতে এলেন।
শেষে কী হলো?
-আমি বলেছি, আমি বিয়ে করব না।
ফোনের লাইনটা কেটে যায়। পরে শুনি, ভয়ে নাকি অমনটা বলেছিল।
তারপর একদিন শিফাতের সঙ্গে দেখা:
-শিফাত তুমি আমার সঙ্গে ফাজলামি করলা কেন?
-ও মা, ফাজলামি করলাম কখন? আমি তো আব্বার ভয়েই...। তাই পড়াশোনা শেষ করেই বিয়ে করব। আপনাকে তত দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। করবেন না অপেক্ষা?
-না।
সেদিনের ঘটনার পর একটি বছর পেরিয়ে গেছে। একদিন পথে যেতে দেখি, শিফাত একটি ছেলের পাশাপাশি হাঁটছে। ছেলেটা তার বাঁ হাত দিয়ে শিফাতের ডান হাতটা ধরছে। একটু পর আবার হাতটা ছাড়িয়েও নিচ্ছে। বুঝতে পারছি না, লোকটা ভয়ে হাত ছেড়ে দিচ্ছে? নাকি শিফাতই ভয়ে হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now