বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখক:সত্যজিৎ রায়
কৈলাসে ফিরে এসে ফেলুদা প্রথমে অরুণবাবুর অনুমতি নিয়ে একটা টেলিফোন করল, কাকে জানি না। তারপর বৈঠকখানায় এল, যেখানে আমরা সবাই বসেছি। নীলিমা দেবী চা পাঠিয়ে দিয়েছেন। ওঁরা তিনজনে কালই কলকাতা ফিরে যাচ্ছেন; মহেশবাবুর শ্ৰাদ্ধ কলকাতাতেই হবে। অখিলবাবুকে বাঘের খবরটা দেওয়াতে তিনি ঘটনাটা দেখতে পেলেন। না বলে খুব আপশোস করলেন।
আমিও ভাবছি। কালই বেরিয়ে পড়ব, বললেন অরুণবাবু, অবিশ্যি যদি আপনার তদন্ত শেষ হয়ে থাকে।
ফেলুদা জানাল সব শেষ। -আপনার পিতৃদেবের শেষ ইচ্ছা পালনেও কোনও বাধা নেই। সে ব্যবস্থাও হয়ে গেছে।
অরুণবাবু চায়ের কাপ থেকে দৃষ্টি তুললেন।
সে কী, বীরেনের খোঁজ পেয়ে গেছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার বাবা ঠিকই অনুমান করেছিলেন।
মানে?
তিনি এখানেই আছেন।
হাজারিবাগে?
হাজারিবাগে।
খুবই আশ্চর্য লাগছে আপনার কথাটা শুনে।
আশ্চর্য লাগার সঙ্গে যে একটা অবিশ্বাসের ভাবও মিশে আছে সেটা অরুণবাবুর কথার সুরেই বোঝা গেল। ফেলুদা বলল, আশ্চর্য তো হবারই কথা, কিন্তু আপনারও এরকম একটা সন্দেহ হয়েছিল, তাই নয় কি?
অরুণবাবু চায়ের কাপটা নামিয়ে সোজা ফেলুদার দিকে চাইলেন।
শুধু তাই নয়, ফেলুদা বলে চলল, আপনার মনে এমনও ভয় ঢুকেছিল যে মহেশবাবু হয়তো আবার নতুন উইল করে আপনাকে বাদ দিয়ে বীরেনকে তাঁর সম্পত্তির ভাগ দেবেন।
ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব। লালমোহনবাবু আমার পাশে বসে সোফার একটা কুশান খামচে ধরেছেন। প্রীতীনবাবুর মাথায় হাত। অরুণবাবু উঠে দাঁড়িয়েছেন—তাঁর চোখ লাল, তাঁর কপালের রগ ফুলে উঠেছে।
শুনুন মিঃ মিত্তির, গৰ্জিয়ে উঠলেন অরুণবাবু, আপনি নিজেকে যত বড়ই গোয়েন্দা ভাবুন না কেন, আপনার কাছ থেকে এমন মিথ্যে, অমূলক, ভিত্তিহীন অভিযোগ আমি বরদাস্ত করব না। –জগৎ সিং!
পিছনের দরজা দিয়ে বেয়ারা এসে দাঁড়াল।
আর একটি পা এগোবে না। তুমি!-ফেলুদার হাতে রিভলবার, সেটার লক্ষ্য অরুণবাবুর পিছনে জগৎ সিং-এর দিকে। —ওর মাথার একগাছা চুল কাল রাত্রে আমার হাতে উঠে এসেছিল। আমি জানি ও আপনারই আজ্ঞা পালন করতে এসেছিল আমার ঘরে। ওর মাথার খুলি উড়ে যাবে। যদি ও এক পা এগোয় আমার দিকে!
জগৎ সিং পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
অরুণবাবু কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন সোফাতে।
আ-আপনি কী বলতে চাইছেন?
শুনুন সেটা মন দিয়ে, বলল ফেলুদা, আপনি উইল চেঞ্জ করার রাস্তা বন্ধ করার জন্য আপনার বাবার চাবি লুকিয়ে রেখেছিলেন। বিবি দেখেছিল মহেশবাবুকে চাবি খুঁজতে। মহেশবাবু হেঁয়ালি করে তাঁর নাতনিকে বলেছিলেন তিনি কী হারিয়েছেন, কী খুঁজছেন। এই কী হল Key–অর্থাৎ চাবি। কিন্তু চাবি সরিয়েও আপনি নিশ্চিন্ত হননি। তাই আপনি সেদিন রাজরাপ্লায় সুযোগ পেয়ে আপনার মোক্ষম অস্ত্রটি প্রয়োগ করেন। আপনার বাবার উপর। আপনি জানতেন সেই অস্ত্ৰে মৃত্যু হতে পারে–এবং সেটা হলেই আপনার কার্যসিদ্ধি হবে।–
পাগলের প্রলাপ! পাগলের প্রলাপ বকছেন আপনি!
সাক্ষী আছে, অরুণবাবু-একজন নয়, তিনজন—যদিও তাঁরা কেউই সাহস করে সেটা প্রকাশ করেননি। আপনার ভাই সাক্ষী–অখিলবাবুসাক্ষী–শঙ্করলাল সাক্ষী।
সাক্ষী যেখানে নির্বাক, সেখানে আপনার অভিষোগ প্রমাণ করছেন কী করে, মিঃ মিত্তির?
উপায় আছে, অরুণবাবু। তিনজন ছাড়াও আরেকজন আছে যে নির্দ্বিধায় সমস্ত সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করবে।
কৈলাসের বৈঠকখানায় পাখির ডাক কেন? জলপ্রপাতের শব্দ কেন?
অবাক হয়ে দেখলাম ফেলুদা তার কোটের পকেট থেকে প্রীতীনবাবুর ক্যাসেট রেকর্ডার বার করেছে।
সেদিন একটি ঘটনা দেখে এবং কয়েকটি কথা শুনে বিহ্বল হয়ে প্রীতীনবাবু হাত থেকে এই যন্ত্রটা ফেলে দেন। নীলিমা দেবী এটা কুড়িয়ে নেন। এই যন্ত্রতে পাখির ডাক ছাড়াও আরও অনেক কিছু রেকর্ড হয়ে গেছে, অরুণবাবু।
এইবারে দেখলাম অরুণবাবুর মুখ ক্ৰমে লাল থেকে ফ্যাকাসের দিকে চলেছে। ফেলুদার ডান হাতে রিভলবার, বা হাতে টেপ রেকর্ডার।
পাখির শব্দ ছাপিয়ে মানুষের গলা শোনা যাচ্ছে। ক্রমে এগিয়ে আসছে গলার স্বর, স্পষ্ট হয়ে আসছে। অরুণবাবুর গলা–
বাবা, বীরু ফিরে এসেছে। এ ধারণা তোমার হল কী করে?
তারপর মহেশবাবুর উত্তর—
বুড়ো বাপের যদি তেমন ধারণা হয়েই থাকে, তাতে তোমার কী?
তোমার এ বিশ্বাস মন থেকে দূর করতে হবে। আমি জানি সে আসেনি, আসতে পারে না। অসম্ভব।
আমার বিশ্বাসেও তুমি হস্তক্ষেপ করবে?
হ্যাঁ, করব। কারণ বিশ্বাসের বশে একটা অন্যায় কিছু ঘটে যায় সেটা আমি চাই না।
কী অন্যায়?
আমার যা পাওনা তা থেকে বঞ্চিত করতে দেব না তোমাকে আমি।
কী বলছি তুমি!
ঠিকই বলছি। একবার উইল বদল করেছ, তুমি বীরু আসবে না ভেবে। তার পর আবার–
উইল আমি এমনিও চেঞ্জ করতাম।—মহেশবাবুর গলার স্বর চড়ে গেছে; তাঁর পুরনো রাগ যেন আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তিনি বলে চলেছেন–
তুমি আমার সম্পত্তির ভাগ পাবার আশা করা কী করে? তুমি অসৎ, তুমি জুয়াড়ি, তুমি চোর –লজ্জা করে না? আমার আলমারি থেকে দোরাবাজীর দেওয়া স্ট্যাম্প অ্যালবাম–
মহেশবাবুর বাকি কথা অরুণবাবুর কথায় ঢাকা পড়ে গেল। তিনি উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠেছেন–
আর তুমি? আমি যদি চোর হই। তবে তুমি কী? তুমি কি ভেবেছ আমি জানি না? দীনদয়ালের কী হয়েছিল। আমি জানি না? তোমার চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সব দেখেছিলাম আমি পদার ফাঁক দিয়ে। পঁয়ত্রিশ বছর আমি মুখ বন্ধ রেখেছি। তুমি দীনদয়ালের মাথায় বাড়ি মেরেছিলে পিতলের বুদ্ধমূর্তি দিয়ে। দীনদয়াল মরে যায়। তারপর নূর মহম্মদ আর ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়িতে করে তার লাশ–
এর পরেই একটা ঝুপ শব্দ, আর কথা বন্ধ। তার পর শুধু পাখির ডাক আর জলের শব্দ।
টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে সেটা প্রীতীনবাবুকে ফেরত দিয়ে দিল ফেলুদা।
মিনিটখানেক সকলেই চুপ, আর সকলেই কাঠ, এক ফেলুদা ছাড়া।
ফেলুদা রিভলবার চালান দিল পকেটে। তার পর বলল, আপনার বাবা গৰ্হিত কাজ করেছিলেন, সাংঘাতিক অন্যায় করেছিলেন, সেটা ঠিক, কিন্তু তার জন্য তিনি পঁয়ত্ৰিশ বছর যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, যত রকমে পেরেছেন প্ৰায়শ্চিত্ত করেছেন; তবুও তিনি শান্তি পাননি। যেদিন সেই ঘটনা ঘটে, সেইদিন থেকেই তাঁর ধারণা হয়েছে যে, তাঁর জীবনটা অভিশপ্ত, তাঁর অন্যায়ের শাস্তি তাঁকে একদিন না এক’দিন পেতেই হবে। অবিশ্যি সেই শাস্তি এভাবে তাঁর নিজের ছেলের হাত থেকে আসবে, সেটা তিনি ভেবেছিলেন কি না জানি না। অরুণবাবু, পাথরের মতো বসে আছেন মেঝের বাঘছালটার দিকে একদৃষ্টি চেয়ে। যখন কথা বললেন, তখন মনে হল তাঁর গলার স্বরটা আসছে অনেক দূর থেকে।
একটা কুকুর ছিল; আইরিশ টেরিয়ার। বাবার খুব প্রিয়। দীনদয়ালকে দেখতে পারত। না কুকুরটা। এক’দিন কামড়াতে যায়। দীনদয়াল লাঠির বাড়ি মারে। কুকুরটা জখম হয়। বাবা ফেরেন রাত্তিরে-পার্টি থেকে। কুকুরটা ওঁর ঘরেই অপেক্ষা করত। সেদিন ছিল না। নূর মহম্মদ ঘটনাটা বলে। বাবা দীনদয়ালকে ডেকে পাঠান। রাগলে বাবা আর মানুষ থাকতেন না…
ফেলুদার সঙ্গে আমরাও উঠে পড়লাম। অখিলবাবুও উঠছেন দেখে ফেলুদা বলল, আপনি একটু আমাদের সঙ্গে আসতে পারেন। কি? কাজ ছিল।
চলুন, বললেন ভদ্রলোক, মহেশ চলে গিয়ে আমার তো এখন অখণ্ড অবসর। গাড়িতে অখিলবাবু বললেন—আমার নাম লেখা পাথরটার পাশে দাঁড়িয়েই আমি ওদের কথা শুনতে পাই। তাকে অনেক সময় জিজ্ঞেস করেছি। সে হঠাৎ হঠাৎ এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে কেন। সে ঠাট্টা করে বলত—তুমি গুনে বার করো, আমি বলব না। আশ্চৰ্য্য-তার জীবনের এত বড় একটা ঘটনা—সেটা কুষ্ঠিতে ধরা পড়ল না কেন বুঝতে পারছি না! হয়তো আমারই অক্ষমতা।
বাড়ির কাছাকাছি। যখন পৌঁছেছি তখন বুঝতে পারলাম ফেলুদা কাকে ফোন করেছিল।
ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন শঙ্করলাল মিশ্র।
আপনার মিশন সাকসেসফুল? গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
হ্যাঁ, বললেন শঙ্করলাল, বীরেন এসেছে।
আমরা বৈঠকখানায় ঢুকতে সেই গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে নমস্কার করলেন। লম্বা চুল, রুক্ষ লম্বা দাড়ি, লম্বা বলিষ্ঠ চেহারা।
বাপের শেষ ইচ্ছার কথা শুনে বীরেন। আসতে রাজি হল, বললেন শঙ্করলাল, মহেশবাবুর উপর কোনও আক্রোশ নেই ওর।
যেমন আক্রোশ নেই, তেমনি আকর্ষণও নেই বললেন বীরেন-সন্ন্যাসী।শঙ্কর এবার অনেক চেষ্টা করেছিল আমাকে ফিরিয়ে আনতে; বলেছিল-ওদের দেখলে তোমার টানটা হয়তো ফিরে আসবে। ওর কথাতেই আমি রাজরাপ্লায় গিয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু দূর থেকে দেখেই আমি বুঝেছিলাম আমার আত্মীয়দের উপর আমার কোনও টান নেই। বাবা। তবু আমাকে কিছুটা বুঝেছিলেন, তাই প্রথম প্রথম ওঁকে চিঠিও লিখেছি। কিন্তু তারপর…
কিন্তু সে চিঠি তো আপনি বিদেশ থেকে লেখেননি, বলল ফেলুদা, আমার বিশ্বাস আপনি দেশের বাইরে কোথাও যাননি কোনওদিন।
বীরেনবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ-হেসে ফেললেন। আমি হতভম্ব, কী যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।
শঙ্কর আমাকে বলেছিল। আপনার বুদ্ধির কথা বললেন বীরেনবাবু, তাই আপনাকে একটু পরীক্ষা করছিলাম।
তা হলে আর কী। খুলে ফেলুন আপনার অতিরিক্ত সাজ পোশাক। হাজারিবাগের রাস্তার লোকের পক্ষে ওটা যথেষ্ট হলেও আমার পক্ষে নয়।
বীরেনবাবু হাসতে হাসতে তাঁর দাড়ি আর পরিচুলা খুলে ফেললেন। লালমোহনবাবু আমার পাশ থেকে চাপা গলায় কান.কান.কান বলে থেমে গেলেন। আমি জানি তিনি আবার ভুল নামটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু এবার বললেও আর শুধরোতে পারতাম না, কারণ আমার মুখ দিয়েও কথা বেরোচ্ছে না। কথা বললেন অখিলবাবু, বীরেন বাইবে যায়নি মানে? ওর চিঠিগুলো তা হলে…?
বাইরে না গিয়েও বিদেশ থেকে চিঠি লেখা যায় অখিলবাবু, যদি আপনার ছেলের মতো একজন কেউ বন্ধু থাকে বিদেশে, সাহায্য করার জন্য।
আমার ছেলে!
ঠিকই বলেছেন মিস্টার মিত্তির, বললেন বীরেন। কারান্ডিকার, অধীর যখন ডুসেলডর্ফে, তখন ওকে চিঠি লিখে আমি বেশ কিছু ইউরোপীয় পোস্ট কার্ড আনিয়ে নিই। সেগুলোতে ঠিকানা আর যা কিছু লিখবার লিখে খামের মধ্যে ভরে ওর কাছেই পাঠাতাম, আর ও টিকিট লাগিয়ে ডাকে ফেলে দিত। অবিশ্যি অধীর দেশে ফিরে আসার পর সে সুযোগটা বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু এই লুকোচুরির প্রয়োজনটা হল কেন? জিজ্ঞেস করলেন অখিলবাবু!
কারণ আছে, বলল ফেলুদা। আমি বীরেনবাবুকে জিজ্ঞেস করতে চাই আমার অনুমান ঠিক কিনা।
বলুন।
বীরেনবাবু কর্নেল সুরেশ বিশ্বাসের জীবনী পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন, এবং তাঁর মতো হতে চেয়েছিলেন। সুরেশ বিশ্বাস ঘর ছেড়ে খালাসি হয়ে বিদেশে গিয়ে শেষে ব্ৰেজিলে যুদ্ধ করে নাম করেছিলেন সেটা আমার মনে ছিল। যেটা মনে ছিল না সেটা আমি কাল রাত্রে বাঙালির সার্কাস বলে একটা বই থেকে জেনেছি। সেটা হল এই যে সুরেশ বিশ্বাস ছিলেন প্রথম বাঙালি যিনি বাঘ সিংহ ট্রেন করে সাকৰ্গসের খেলা দেখিয়েছিলেন। তাঁর সবচেয়ে আশ্চর্য খেলা ছিল সিংহের মুখ ফাঁক করে তার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া।
এখানে লালমোহনবাবু কেন যেন ভীষণ ছটফট করে উঠলেন।
ও মশাই! ছ্যাঃ ছাঃ ছাঃ, এই সেদিন পড়লুম, তাও খেয়াল হল না, ছাঃ ছাঃ ছাঃ…
আপনি ছ্যাছ্যাটা পরে করবেন, আগে আমাকে বলতে দিন।
ফেলুদার ধমকে লালমোহনবাবু ঠাণ্ডা হলেন। ফেলুদা বলে চলল, বীরেনবাবুর অ্যাম্বিশন ছিল আসলে বাঘ সিংহ নিয়ে খেলা দেখানে। কিন্তু বাঙালি ভদ্রঘরের ছেলে আজকের দিনে ওদিকে যেতে চাইছে শুনলে কেউ কি সেটা ভাল চোখে দেখত? মহেশবাবুই কি খুশি মনে মত দিতেন? তাই বীরেনবাবুকে কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তাই নয় কি?
সম্পূর্ণ ঠিক, বললেন বীরেনবাবু।
কিন্তু আশ্চর্য এই যে, অ্যাদ্দিন পরে ছেলেকে রিং-মাস্টার হিসেবে দেখেও মহেশবাবু তাকে চিনতে পেরেছিলেন, যদিও অরুণবাবু সামনে থেকে দেখেও চিনতে পারেননি। সেটার কারণ এই যে বীরেনবাবুর নাকে প্ল্যাস্টিক সার্জারি করানো হয়েছিল, যে কারণে ছেলেবেলার ছবির সঙ্গেও নাকের মিল সামান্যই।
তাই বলুন। বলে উঠলেন অখিলবাবু, তাই ভাবছি সবাই বীরেন বীরেন করছে, অথচ আমি সঠিক চিনতে পারছি না কেন?
যাক গে, বলল ফেলুদা, এখন আসল কাজে আসি।
ফেলুদা পকেট থেকে মুক্তানন্দের ছবিটা বার করল। তারপর বীরেনবাবুর দিকে ফিরে বলল, আপনি বোধহয় জানেন না যে, আপনি আর ফিরবেন না ভেবে মহেশবাবু আপনাকে তাঁর উইল থেকে বাদ দিয়েছিলেন। সেই উইল আর বদল করার উপায় ছিল না। অথচ আপনি একেবারে বঞ্চিত হন সেটাও উনি চাননি। তাই এই ছবিটা আপনাকে দিয়েছেন।
ফেলুদা ছবিটা উলটে পিছনটা খুলে ফেলল। ভিতর থেকে বেরোল একটা ভাঁজ করা সেলোফেনের খাম, তার মধ্যে ছোট্ট ছোট কতগুলো রঙিন কাগজের টুকরো।
তিনটি মহাদেশের নটি দুষ্প্রাপ্য ডাক টিকিট আছে। এখানে। অ্যালবাম চুরি যেতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান স্ট্যাম্প কাটি এইভাবে লুকিয়ে রেখেছিলেন। গিবনস ক্যাটালগের হিসেবে পঁচিশ বছর আগে এই ডাক টিকিটের দাম ছিল দু হাজার পাউন্ড। আমার ধারণা আজকের দিনে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা।
বীরেন্দ্র কারান্ডিকার খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন সেটার দিকে। তারপর বললেন, সার্কাসের রিং-মাস্টারের হাতে এ জিনিস যে বড় বেমানান, মিঃ মিত্তির! আমি খুব অসহায় বোধ করছি। আমরা যাযাবর, ঘুরে ঘুরে খেলা দেখিয়ে বেড়াই, আমাদের কাছে এ জিনিস…?
বুঝতে পারছি। বলল ফেলুদা, এক কাজ করুন। ওটা আমাকেই দিন। কলকাতার কিছু স্ট্যাম্প ব্যবসায়ীর সঙ্গে চেনা আছে আমার। এর জন্য যা মূল্য পাওয়া যায় সেটা আমি আপনাকে পাঠিয়ে দেব। আমার উপর বিশ্বাস আছে তো আপনার?
সম্পূর্ণ। কিন্তু আপনার ঠিকানাটা যে আমাকে দিতে হবে।
গ্রেট ম্যাজেস্টিক সার্ক্স, বললেন বীরেনবাবু, কুট্টি বুঝেছে যে আমাকে ছাড়া তার চলবে না। আমি এখনও কিছুদিন আছি। এই সাকাঁসের সঙ্গে। আজ রাত্রে সুলতানকে নিয়ে খেলা দেখাব; আসবেন।
রাত্রে গ্রেট ম্যাজেস্টিক সাকসে সুলতানের সঙ্গে কারান্ডিকারের আশ্চর্য খেলা দেখে বেরোবার আগে আমরা বীরেনবাবুকে থ্যাঙ্ক ইউ আর গুড বাই জানাতে তাঁর তাঁবুতে গেলাম। আইডিয়াটা লালমোহনবাবুর, আর কারণটা বুঝতে পারলাম তাঁর কথায়।
আপনার নামটার মধ্যে একটা আশ্চৰ্য্য কাণ্ডকারখানা রয়েছে, বললেন জটায়ু, ডু ইউ মাইন্ড যদি আমি নামটা আমার সামনের উপন্যাসে ব্যবহার করি? সার্কাস নিয়েই গল্প, রিং-মাস্টার একটা প্রধান চরিত্র।
বীরেন্দ্রবাবু হেসে বললেন, নামটা তো আমার নিজের নয়! আপনি স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারেন।
ধন্যবাদ জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার পর ফেলুদা বলল, তা হলে ইনজেকশন বাদ?
বাদ কেন মশাই? ইনজেকশন দিচ্ছে বাঘকে। ভিলেন হচ্ছে সেকেন্ড ট্রেনার। বাঘকে নিস্তেজ করে কারান্ডিকারকে ডাউন করবে দর্শকদের সামনে।
আর ট্র্যাপিজ?
ট্র্যাপিজ ইজ নাথিং, অবজ্ঞা আর বিরক্তি মেশানো সুরে বললেন লালমোহন গাঙ্গুলী।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now