বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সময়টা শীতের প্রায় শেষের দিকে। আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের জোয়ার ভয়ংকর জ্বর বাধিয়ে আমাকে বিছানাগত করে রেখেছে টানা তিনদিন।
সারাদিন কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকি, কমলালেবু খাই।
মাঝেমাঝে পাশের বাসার পিচ্চি শন্তুটা এসে কাঁথা ধরে টানাটানি করে। আমার কোনো নড়াচড়া করতে ইচ্ছে করেনা। শন্তু তখন আমার পাশে উঠে শুয়েপড়ে। আমি মিটমিট চোখে ওর দিকে তাকাই। ও আমার মুখে হাত বুলাতে বুলাতে বলে "আকাত ভাইয়া, আর একতা কমলালেবু খাবা?"
আমি পলিব্যাগ থেকে একটা কমলা বেরকরে শন্তুর পকেটে রেখে দেই। তারপর ওর ছোটছোট হাতদুটো আমার ফ্যাকাশে মুখের ওপর চেপে ধরে আবার চোখ বুজি।
.
শন্তুর বয়স এবার আশ্বিনে ছয় বছর হলো।
এখান থেকে চারবছর আগে একটা বাস এক্সিডেন্টে শন্তুর মা মারাযায় আর ওর বাবা চিরদিনের জন্য দুইটা পা-ই হারিয়ে ফ্যালে।
এর প্রায় একসপ্তাহ পরে এক সন্ধ্যেবেলা আমার রমিজ আঙ্কেল আর তার স্ত্রী আছিয়া খালা এই মায়াবী বাচ্চাটাকে যখন দত্তক নিয়ে বাড়ি ফেরে তখন আমি চেয়ার নিয়ে জানালার সামনে বসে ছিলাম।
রমিজ আঙ্কেল আমার বাবাকে ডেকে বলে "আফজাল ভাই, আর আমাদের কোনো দুঃখ নাই। আল্লা আমাদের একটা পুলা দিছে। আপনি আমার পুলাডার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করে দেন ভাই।"
আমি সেই সন্ধ্যার আলোয় রমিজ আঙ্কেলের চোখেমুখে এই ছেলেটার জন্য একটা অপার্থিক ভালবাসা দেখেছিলাম।
জানালা দিয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকাতেই মনেহয়েছিল এই ভালোবাসার কোনো শেষনেই, কোনো সীমানা নেই।
.
শন্তুর বাবা এখন স্টেশনের ধারে হুইলচেয়ারে বসে ভিক্ষা করে। মাঝেসাঝে হাওয়াইমিঠায় নিয়ে শন্তুরে দেখতে আসে।
শন্তুর গায়ে-মাথায় হাত বুলায়, চুমু খায়,
বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে "বেঁচে থাকো বাজান, অনেক বড়হও বাজান।"
শন্তু তখন ছলছল চোখ নিয়ে ওর বাবার দাড়িতে হাত বুলায়, ছেড়া জামাতে হাত বুলায়। অসহায়ের মতো একবার আমার দিকে আর একবার রমিজ আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে বলে "আব্বু, এই কাকু'কে একটা নতুন জামা কিনে দিবা?"
আমার দু'চোখে তখন জল ভরে ওঠে।
এটা ভেবে খুব খারাপ লাগে যে, এই ছোট্ট বাচ্চাটা হয়তো কখনো তার আসল বাবাকে "আব্বু" বলে ডাকতে পারবেনা।
সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি শুধু এই কামনা করি,
রমিজ আঙ্কেল আর আছিয়া খালা যে স্নেহমাখা ভালোবাসায় এই ছেলেটাকে আগলে রেখেছে তা যেন এর জীবনের আকাশ থেকে সবটুকু দুঃখময় অন্ধকার দুর করে আলোয় আলোকিত করে রাখে।
দুপুরের একটু পরেই আমার বড়বোন নিতু জাহান আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। ভেজা কাপড় দিয়ে হাতমুখ মুছে দিয়ে কপালে জলপট্টি দেয়।
আমি তখন আমার মাথার কাছে শন্তুকে খুঁজতে থাকি।
আপু চামচ দিয়ে আমাকে সূজি খাওয়াতে খাওয়াতে বলে "রমিজ আঙ্কেল আর শন্তু দুই বাপবেটা মিলে মেলায় গেছে। নে হা কর। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে এখনো।"
.
শন্তুর ওপর আমার এত মায়া হওয়ার একটা কারণ আছে অবশ্য। কারণটা হলো ওর মতো আমারও মা নেই।
আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম।
উত্তরী হাওয়া বদলের এক সন্ধ্যেবেলা মা আমাকে পড়াতে পড়াতে হঠাৎ হাত-পা টানটান করে বারান্দায় বিছানো মাদুরের ওপর শুয়ে পড়ে। আমি তখন অঙ্ক কষছিলাম।
মায়ের অবস্থা দেখে আমি যখন জোরেজোরে কাঁদতে থাকি তখন বাড়ির সকলে এসে মা'কে উঠিয়ে বসায়, মুখে পানির ছিটা দেয়।
কিন্তু মা আর চোখ খোলেনি, তারপরে মা আর কোনোদিন চোখ খোলেনি।
মা মারা যাওয়ার পর টানা দু'সপ্তাহ আমি হাসপাতালে ছিলাম। সেসময় কখনো আমার জ্ঞান থাকতো, কখনো থাকতো না।
অবচেতন মনে হঠাৎ হঠাৎ শুধু "মাগো" "মাগো" বলে চিৎকার করতাম।
একদিন খুব ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর দেখি আপু আমার মাথার কাছে বসে আছে। আমি আপুর হাত জড়িয়ে ধরে বলি "আপু, আমাদের মা আর নাই? মা'কে আমরা আর কোনোদিন দেখতে পাবোনা??"
আপু আমার হাত দু'টো মুখের সাথে চেপেধরে কাঁদতে থাকে, আমিও কাঁদতে থাকি।
.
সেই দুঃসহ দিনগুলতে যে মানুষটা আমাদেরকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তিনি আমার "বাবা"।
মাঝরাতে আমার যখন ঘুম ভেঙে যেত তখন বুঝতে পারতাম বাবা আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
অন্ধকারে বাবার মুখটা আমি দেখতে পেতামনা ঠিকই কিন্তু অনুভব করতে পারতাম তার হাতের ছোঁয়ায় কতটা মমতা মেখে আছে।
আমার ভীষন কান্না পেত তখন। মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতো।
কেনজানি মনেহতো আমাদের ছেড়ে বাবাও একদিন হারিয়ে যাবে।
অনেক দূরে হারিয়ে যাবে।
মায়ের মতো বাবাকেও আর কোনোদিন দেখতে পাবোনা।
তারপর আর কিছুই ভাবতে পারতাম না আমি। শুধু বাবাকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরতাম।
বাবা কি বুঝতেন জানিনা। কিন্তু তখন তিনি ঘরে আলো জ্বেলেদিয়ে আমাকে গল্প শুনাতেন।
তার ছেলেবেলার গল্প, বড়হওয়ার গল্প, ঝুম বৃষ্টির পরে হঠাৎ এলোমেলো বাতাসের গল্প।
আমি সেসব গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম।
এভাবেই একসময় কান্না ভুলতে শিখেছি, বড় হতে শিখেছি।
আমাদের দু'ভাইবোনের যেটুকু পূর্ণতা, যেটুকু অর্জন তার সবটুকু কৃতিত্ব শুধু আমার বাবার।
তিনি যে ভালোবাসা, যে প্রেরণা আমাদেরকে দিয়েছেন তার তুলনায় এই ভূবনের সবকিছু আমার কাছে মুল্যহীন।
.
বিকাল পাঁচটার একটু পরেই বাবা অফিস থেকে ফিরে আসেন। আমি তখন বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে বাদাম খাচ্ছিলাম।
বাবা আমার পাশে এসে জিজ্ঞেস করেন "জ্বর কেমন? ভার্সিটির ক্লাস কবে থেকে শুরু?"
আমি হাসিমুখে বলি "মোটামুটি সুস্থ এখন। ক্লাস সামনের সপ্তাহে। দুইদিন পরেই চলে যাব।"
বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বলেন "ভালোকরে পড়, অনেক বড় মনের মানুষ হও।"
আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।
বাবা ধিরেধিরে আমার পাশ থেকে ঘরে চলে যায়। আমি চুপ করে বসে আকাশের দিকে তাকাই।
আমি অনুভব করি, এই মানুষটার বুকের ভীতর যে মমতাময় ভালোবাসার নদীটা বয়ে গেছে তা পৃথিবীর সবগুলো নদীর চেয়ে গভীর, সবগুলো নদীর চেয়ে শীতল আর প্রশস্ত...।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now