বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

উপকূলে সংঘর্ষ ১১শ পর্ব

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আর.এচ জাহেদ হাসান (০ পয়েন্ট)

X কালবিলম্ব না করে আইয়ুবীর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের ছুটি চাইলেন তিনি। কয়েক বছর দেশে যাননি বলে সহজেই তার ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেল। তিনি তাঁর দেশ তুরস্কে যাওয়ার কথা বলে দামেস্ক ত্যাগ করলেন। কিন্তু দামেস্ক থেকে বেরিয়েই তিনি সোজা চললেন কায়রোর অভিমুখে। সুলতান আইয়ুবীর দরবারে গিয়ে হাজির হলেন তিনি। মোস্তফা জুদাত ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক সেনা অফিসার। তার কাছে নূরুদ্দিন জঙ্গীর পরে সুলতান আইয়ুবী ছাড়া ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখায় উপযুক্ত সেনাপতি আর কেউ ছিল না। তাঁর ধারণা, জঙ্গীর অবর্তমানে মিল্লাতের যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে আইয়ুবী তা পুরোপুরি অবহিত নন। এ জন্য তিনি দেশে না গিয়ে সুলতান আইয়ুবীকে সামগ্রিক অবস্থা জানানোর কায়রো ছুটে আসেন। ‘আর সেনাবাহিনী এখন কি অবস্থায় আছে?’ সুলতান আইয়ুবী জিজ্ঞেস করলেন। ‘মুহতারাম, সুলতান জঙ্গী সেনাবাহিনীতে যে আবেগ ও প্রেরণা সৃষ্টি করে গেছেন, সে প্রেরণা এখনও টিকে আছে। কিন্তু এই আবেগ আর বেশীদিন টিকে থাকবে বলে মনে হয়না। আপনি ভাল মতই জানেন, খৃস্টানদের প্লাবন বাঁধের মত ঠেকিয়ে রেখেছে শুধু সেনাবাহিনী। মুহতারাম জঙ্গীর সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা সবই ছিল সামরিক বাহিনীর পরামর্শের ভিত্তিতে। কিন্তু এই পদক্ষেপ বর্তমান খেলাফতের কার্যবিধির পরিপন্থী। আমরা এখন আমাদের নিজ সিদ্ধান্তে কোন কিছু করতে পারিনা। খলিফা যদি আমাদের যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে রাখে তবে সামরিক বাহিনীর কিছুই করার নেই। খৃস্টানরা ভালমতই জানে, মুসলমান আমীরদের মধ্যে সে চেতনাবোধই নেই, যে চেতনা থাকলে মানুষ জেহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ে। জনগণ কার পেছনে দাঁড়িয়ে কিসের প্রেরণায় জীবন কোরবানী করবে? খৃস্টানরা মুসলিম শাসক ও আমীরদের ক্রয় করে নিয়েছে। এখন তারা সেনাপতিদের পিছনে লেগেছে। সেনাপতি ও কমান্ডারদের ক্রয় করার জন্য হেন চেষ্টা নেই যা তারা করছে না। তাদের এ অপতৎপড়তা আমাদের সামরিক বিভাগ ও জাতীয় জীবনকে বিষিয়ে তুলবে। যদি অচিরেই এসব বন্ধ করা না যায়, তবে খৃস্টানরা সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই মুসলিম জাহানের মালিক হয়ে যাবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের আমীরদের আর সঠিক পথে আনা সম্ভব নয়। তারা খৃস্টানদের মদের নেশায় ডুবে আছে। এইসব আমীরদের পিছনে এখন আর তারা মেয়েও লেলিয়ে দিয়েছে। আপনি শুনে অবাক হবেন, খৃস্টান সুন্দরী ললনারা এখন আমীরদের বাসায় বাসায় আস্তানা গেড়ে বসেছে। তাদের চাহিদা মত মহলে আনন্দ উৎসব হয়। সে উৎসব বিশিষ্ট সামরিক অফিসারদের দাওয়াত করা হয়। আর তাদেরকে এই মেয়েরা ফাঁদে ফেলে বিনষ্ট করার চেষ্টা চালায়।’ থামলেন মোস্তফা জুদাত। ‘তারপর কি হবে আমি বলছি।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন ‘সৈন্যদের নেশাগ্রস্থ ও ব্যভিচারে অভ্যস্ত বানানো হবে।’ ‘এলরেডী বানানো হচ্ছে!’ মোস্তফা বললেন, ‘এখন তাদের নিয়মিত হাশিস সরবরাহ করা হয়। শুধু তাই নয়, এরপরও যে সব সেনাপতি ও কমান্ডার খৃস্টানদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করবে, আর জিহাদের প্রেরণা ধরে রাখবে অন্তরে, তাদেরকে পেশাদার খুনী দিয়ে গোপনে হত্যা করার পরিকল্পনাও আছে তাদের।’ মোস্তফা সুলতান আইয়ুবীকে আরো বললেন, ‘যে সব আমীররা খেলাফতের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে শাসন চালানোর জন্য স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, খৃস্টান গোয়েন্দারা তাদের মনে বুনে দিচ্ছে উচ্চাশার বীজ। ইন্ধন জোগাচ্ছে পার্শ্ববর্তী রাজ্য আক্রমণের। আশ্বাস দিচ্ছে সাহায্য সহযোগিতার। ফলে এক আমীর অন্য আমীরকে শত্রু ভাবতে শুরু করেছে। একে অন্যের বিরুদ্ধে সৈন্য বাহিনী গড়ে তুলছে। খৃস্টানরা এই বিভেদ বাড়িয়ে তোলার জন্য ঠিক মত হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ভাইয়ে ভাইয়ে কামড়াকামড়ি শুরু হলে সাহায্যের বাহানায় সৈন্য পাঠিয়ে এক সময় অবলীলায় সুযোগ বুঝে গ্রাস করে নেবে উভয়ের এলাকা। এমনি নানা কূটকৌশল ও চক্রান্তে মেতে উঠেছে খৃস্টানরা। ফলে অবস্থা খুবই নাজুক।’ ‘আমাকে সঠিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে আপনি খুব সময়োচিত উপকার করেছেন।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘আপনি না এলে এসব সঠিক তথ্য থেকে আমি বঞ্চিত থাকতাম।’ ‘তথ্য পাওয়াটাই বড় কথা নয় সুলতান! এখন প্রয়োজন দ্রুত একশান। যদি আপনি ত্বরিত কোন পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন, তবে মনে করে রাখবেন, ইসলামী সামাজ্যের সূর্য ডুবে যাবে আপনার চোখের সামনে। সুলতান! নিরব দর্শকের ভূমিকা পালনের কোন অবকাশ নেই এখন। এখন প্রয়োজন, জঙ্গীর মত দুঃসাহসী পদক্ষেপের।’ সুলতান আইয়ুবীর কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো একরাশ বেদনামাখা দীর্ঘশ্বাস, ‘হায়! আমাকে এমন দিনও দেখতে হলো, ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা চিন্তা করতে হচ্ছে! আমার শুধু ভয়, আমার মৃত্যুর পর বিশ্বাসঘাতকরা ইতিহাসের পাতায় না লিখে রাখে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গৃহযুদ্ধের অপরাধে অপরাধী।’ ‘যদি আপনি এই ভয়ে কায়রোতে বসে থাকেন, তবে ইতিহাস আপনার ওপর এই অভিযোগ পেশ করবে যে, সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যুর খবর শুনে সুলতান আইয়ুবীও পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। তার শিরায় যে রক্ত প্রবাহিত হতো তা পানি হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যু হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুর অধিক নির্জীব হয়ে গিয়েছিলেন। মিশরের উপরে কর্তৃত্ব বজায় রাখতে গিয়ে ইসলামী সামাজ্যকে কোরবানী দিতেও প্রাণে বাঁধেনি তার।’ ‘হ্যাঁ! তুমি ঠিকই বলেছো মোস্তফা।’ সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘এই অভিযোগটি হবে অতিশয় নিকৃষ্ট ও লজ্জাকর। আমি চিন্তা করে দেখলাম, আল্লাহর পথে জিহাদ করতে বের হয়ে এটা দেখার বিষয় নয় যে, আমার ঘোড়ার পদতলে আল্লাহর কোন দুশমন পিষ্ট হলো। আমার দৃষ্টিতে কালেমা পড়া দুশমন কাফেরের চেয়েও জঘন্য। আর কালেমা পড়া দুশমন তারাই, যারা নিজের স্বার্থে কাফেরের সাথে বন্ধুত্ব রাখে।’ সুলতান আইয়ুবী মোস্তফা জুদাতকে বললেন, ‘আপনি আবার দামেস্ক ফিরে যান। সেখানে আমি আলী বিন সুফিয়ানকে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মনে রাখবেন, তিনি সেখানে গোয়েন্দা বেশে গিয়েছেন। সেখানে কেউ জানতে অয়ারবে না, আলী বিন সুফিয়ান তাদের মাঝে ঘোরাফেরা করছে ও সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। সেখানে কেমন তৎপরতা চালানো উচিত সবই সে লক্ষ্য করছে। আপনি গিয়ে খোঁজ নিন, কোন কোন সেনাপতি ও কমান্ডার সন্দেহজনক। আমি এরই মধ্যে সকল আমীরদের কাছে পয়গাম পাঠিয়েছি, হে আমীর! এই সংকটময় অবস্থায়, যখন খৃস্টানরা মাথার ওপর চড়ে আছে, তখন আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে তা প্রতিরোধ কল্পে নিজেদের মধ্যকার সব বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবধ্য হতে চেষ্ঠা করি। আমার মনে হয় না, তারা আমার চিঠিকে আমল দেবে। কিন্তু তাদেরকে সরল ও সঠিক পথে চলার শেষ সুযোগটুকু দিতে চাই আমি। যদি তারা আমার এ আবেদনে সাড়া না দেয় তবে এ নিয়ে আমি আর তাদের একটি কথাও বলব না। আতখন আমি কি পথ বেছে নেব সে কেবল আমিই জানি।’ মোস্তফা জুদাতকে বিদায় করে সুলতান আইয়ুবী তাঁর দারোয়ানকে ডেকে কয়েকজন সেনাপতি ও সভাসদের নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘তাদেরকে খুব জলদি আমার কাছে ডেকে আনো।’ এরা সবাই ছিলেন কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য। o কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ ছিলেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর দক্ষিণ হস্ত, সহকর্মী এবং বন্ধুও। তিনি মজলিশে শুরার প্রভাবশালী সদদ্য ছিলেন। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে আল্লাহতায়ালা ইস্পাত দৃঢ় চির যৌবন দান করেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব এমন সুদৃঢ় ছিল, পাহাড় সমান আঘাতও তিনি হাসিমুখে সহ্য করতে পারতেন। তিনি ছিলেন সংকল্পে দৃঢ়, দুরদর্শী এবং দুঃসাহসী। আমীর গরীব সকলকেই তিনি সমান ভাবে ভালবাসতেন, উপযুক্ত মর্যাদা দিতেন, যথাযথ সম্মান করতেন। যারা তার পাশে থাকতেন তারা সবাই তাঁর দৃঢ়তা ও ভালবাসায় সিক্ত হতেন। সেনাবাহিনী যুদ্ধের ময়দানে তাঁর দৃঢ়তা দেখে শত্রুর ওপর প্রবল বিক্রমে ঝাপিয়ে পড়তো। একদিনের ঘটনা, তাঁর এক চাকর অন্য চাকরের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে তাকে জুতা ছুঁড়ে মারলো। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তখন কামরা থেকে বেরুচ্ছিলেন, জুতা গিয়ে লাগলো তাঁর গায়ে। দুই চাকরই থর থর করে কাঁপতে লাগলো। কিন্তু সালাহউদ্দিন তাদের কিছুই না বলে অন্যদিকে মুখ করে বের হয়ে গেলেন। তাঁর এ ধরণের মহানুভবতার জন্যই কেবল বন্ধু নয় শত্রুও তার সংস্পর্শে এলে ভক্ত মুরীদ হয়ে যেতো। নূরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যু ইসলামী সালতানাত জুড়ে যে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল সেই বিপর্যয়ের সবচে ভয়ংকর দিক ছিলো, সালতানাতের গভর্ণর ও উজিররা খৃস্টানদের বন্ধু ও ইসলামের শত্রু হয়ে গিয়েছিলেন। মিশরের আভ্যন্তরীণ অবস্থাও তখন ঝুঁকি মুক্ত ছিল না। এ অবস্থায় সুলতান আইয়ুবীর পক্ষে মিশর ত্যাগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। মিশরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দাবী ছিল, ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষার চিন্তা অন্তর থেকে মুছে দিয়ে মিশরের প্রতিরক্ষার সুদৃঢ় ব্যবস্থার দিকে নজর দেয়া। কিন্তু আইয়ুবী এসব কিছুই চিন্তা করলেন না। তিনি আমার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘যদি আমি ইসলামের হেফাজতের দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নেই, তবে আমাকে কাল কেয়ামতে হাশরের ময়দানে খৃস্টানদের সাথে উঠানো হবে।’ ইসলামের হেফাজত ও উন্নতিকে তিনি আল্লাহতায়ালার আদেশ ও ফরমান মনে করতেন। তিনি নিজেকে কখনও একজন শাসক ও আমীর মনে করতেন না। আমার স্মৃতিতে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর যৌবনকাল স্পষ্টভাবে গাঁথা আছে। তখনো তিনি নিজেকে ইসলামের সেবায় নিয়োজিত করেননি। আরাম ও বিলাসিতায় পূর্ণ মাত্রায় ডুবে থাকতেন। কেউ এটা চিন্তাও করেনি, তার এ যৌবনের উন্মাদনা কয়েক বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে এবং তিনি ইসলামের এক নিঃস্বার্থ খাদেম হয়ে যাবেন। তিনি হবেন ইসলামের বিশ্ব বরেণ্য নেতা এবং শত্রুর জন্য ভয়ংকর এক তুফান। তিনি তাঁর চাচার সঙ্গে প্রথম খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করেন। এই প্রথম যুদ্ধেই তিনি সকলকে অভিভূত করে দেন। তিনি যুদ্ধ থেকে ফিরে প্রথমেই বিলাসিতা ও আনন্দ স্ফূর্তির উপকরণে পদাঘাত করলেন আর সমস্ত জীবন ইসলামের জন্য ওয়াকফ করে দিলেন। তিনি মিল্লাতে ইসলামিয়াকে বললেন, ‘এ তামাম দুনিয়া আল্লাহর। আল্লাহর এ দুনিয়ায় আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের। আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজেকে দাবী করার পর কেউ যদি এ দায়িত্ব পালন না করে তবে হিসাবের দিন আল্লাহ কাউকে ছাড়বেন না।’ তাঁর এই পরিবর্তিত অবস্থা দেখে বুঝারই উপায় ছিল না, তিনি জীবনে কখনো বিলাসপরায়ন ছিলেন। নফসের উতকর্ষ সাধনের মাঝেই নিহিত থাকে মানুষের কর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ও নৈপূণ্য। নফসের খাহেশকে কোরবানী দিয়েই মানুষ পূর্ণতা লাভ করে। মানুষ যখন নফসের দাবীকে অগ্রাহ্য করতে পারে তখনি সে হাছিল করে ইনসানিয়াত ও কামেলিয়াত। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এই কামেলিয়াত ও ইনসানিয়াত হাসিল করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর চরিত্রে পরিপক্কতা ও নৈপূণ্য এসেছিল। তিনি বন্ধু মহলে প্রায়ই বলতেন, ‘আমাকে কাফেররাই মুসলমান বানিয়েছে। যদি আমরা আমাদের যুবকদেরকে, যারা ধর্ম থেকে দূরে সরে গেছে, তাদের বিবেকের সামনে কাফেরদের ভন্ডামী ও নষ্টামী তুলে ধরতে পারি, তবে তাদের বিবেকই তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে দেবে।’ তিনি বলতেন, ‘আমি আমার জাতিকে রাসূলের সেই হাদীসটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যেখানে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি নিজেকে ভালমত চিনে নাও, তুকি কে ও কি? আর দুশমনকেও ভাল মত চিনে নাও, সে কে ও কি? এবং সে তোমার সম্পর্কে কি ধারণা রাখে?’ শত্রুরাই তাঁর কর্মের গতি ও মোড় পরিবর্তন করে দিয়েছিল। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তাঁর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং সংকল্পে শেষ পর্যন্ত নিমগ্ন ও অটুট ছিলেন। তিনি কখনো নিজেকে ইসলামী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নেতা ভাবেননি, ভাবেননি তিনি মিশরের আজীবন শাসক। জিহাদই ছিল তাঁর ধ্যান- জ্ঞান। যুদ্ধ ও সমর কৌশলে তিনি এমন উস্তাদ ছিলেন যে, খৃস্টান কমান্ডাররা সম্মিলিতভাবে তাঁর ভয়ে ভীত থাকতো। জিহাদে তিনি এমনভাবে নিমগ্ন ছিলেন, জীবনে তিনি হজ্জ করারও অবসর পাননি। জিহাদ সে সুযোগ তাঁকে দেয়নি। শেষ জীবনে তাঁর এই একটি আশা অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল যে, তিনি হজ্জ করতে যাবেন। কিন্তু তখন তাঁর কাছে হজ্জ করার মত অর্থ ছিল না। যখন তিনি ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর নিজস্ব সম্পদ ছিল মাত্র ৪৭ দেরহাম রৌপ্য আর এক টুকরো সোনা। তাঁর সম্পত্তি বলতে ছিল শুধুমাত্র একটি বাড়ি, যে বাড়িটি তিনি পৈতৃকসুত্রে পেয়েছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর বাস্তব জীবনের এ এক বিস্ময়কর সততার নমুনা। অর্থ সম্পদের মোহকে তিনি ইসলামের সৈনিকদের জন্য গযব মনে করতেন। সম্পদের কালিমা থেকে আশ্চর্যরকম ভাবে মুক্ত ছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ইসলামের জন্য স্বর্ণালী ভবিষ্যত নির্মাণ করা। সুলতান আইয়ুবী তাঁর পরিষদবর্গ, সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, সেনাবাহিনীর অফিসার ও মিশরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এক সভা আহবান করলেন। সবাই দরবার কক্ষে উপস্থিত হলে সুলতান আইয়ুবী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বন্ধুগণ! জাতির এক সংকটময় মুহূর্তে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। সুলতান জঙ্গীর অবর্তমানে ইসলামী সালতানাত আজ যে গভীর সংকটে পড়েছে সে ব্যাপারে কম বেশী আপনারা সকলেই অবগত আছেন। জাতির প্রতিটি জটিল অবস্থায় আপনারা আমার পাশে ছিলেন। সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই আমরা সকল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছি, আজও সেই আশা নিয়েই আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। বন্ধুগণ! আজ এমন এক সংকটময় অবস্থা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, যে অবস্থার মোকাবেলা করা আমার সাধ্যের বাইরে। কিন্তু আমরা যদি এই অবস্থার মোকাবেলা করতে না পারি, তবে আমাদের সকলের জন্যই দুনিয়া হবে লাঞ্ছনাময় আর আখেরাতে আল্লাহর দরবারে আমরা হবো চরম অপমানিত। ইসলামের ইতিহাস এ দুনিয়াতে আমাদের কবরের ওপর অভিশাপ দেবে, আর হাশরের দিনে শহীদগণ, যারা ইসলামের গৌরব ও ইজ্জত রক্ষার্থে জীবন কোরবানী করেছেন, তারা আমাদের লজ্জিত করবে। এখন আমাদের সামনে সেই সময় এসেছে, যখন আমদেরও জীবন কোরবানী করা ফরজ হয়ে গেছে।’ এ ভূমিকার পর তিনি সামগ্রিক অবস্থা তুলে ধরে বললেন, ‘এখন সময় দাবী করছে নিজের ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ।’ এটুকু বলে তিনি সামান্য চুপ করলেন এবং সবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। আইয়ুবীর কাছ থেকে বিশদ বর্ণনা শুনে সকলের মুখের রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেল। প্রতিটি চেহারায় খেলা করতে লাগল দৃঢ়তার অমল বিভা। কয়েকজন দাঁড়িয়ে বললো, ‘জিহাদের ময়দানে আপনি কখনো আমাদের পেছনের সারিতে পাবেন না। যতদিন আপনি ইসলামের জন্য লড়াই করবেন, ততদিন আপনি আমাদেরকে আপনার পাশে পাবেন।’ তিনি বুঝতে পারলেন উপস্থিত সকলেই সর্বাবস্থায় তাঁর সঙ্গে থাকবেন। এবার তিনি বললেন, ‘এ জন্য আমি প্রথমেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাই। কারণ কেন্দ্রীয় খেলাফতের অধীনে থেকে কোন বিপ্লবী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। সে অনুমতি কেন্দ্র আমাকে দেবে না। কিন্তু আপনাদের অনুমতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না। ভেবে দেখুন, বর্তমান খলিফা মাত্র এগারো বছরের এক বালক। তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে তিন চারজন ওমরা। আর এই ওমরারা সবাই খৃস্টানদের বন্ধু। এ কথা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, খেলাফত এখন খৃস্টানদের কোলে রয়েছে। সুতরাং এখন আমাদের প্রথম সংঘর্ষ খেলাফতের বিরুদ্ধে। যদি আমরা স্বাধীন না হই, তবে আমাদের খলিফার আদেশ ও শাসন মানতে হবে। আর এ আদেশ ইসলামী সাম্রাজ্যের জন্য হবে ধ্বংসাত্বক ব্যাপার। এ সংকটময় অবস্থায় এ পদক্ষেপই কি সঠিক নয়, প্রথমে মিশরকে খেলাফতের আওতা থেকে মুক্ত করে নেই? এরপর আমরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবো, ইসলামের স্থায়িত্বের জন্য আমরা কি করবো?’ ............ চলব.............. (বি:দ্র: কেমন লাগলো বলবেন প্লিজ)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now