বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
" যকের ধন "
হেমেন্দ্রকুমার রায়
----------------
(পর্ব ১৯)
▪▪▪ধনাগার▪▪▪
জীবনে এমন বুক-দমানে হাসি শুনিনি,—সে হাসি শুনলে কবরের ভিতরে মড়াও যেন চমকে জেগে শিউরে ওঠে।
হাসির তরঙ্গে সমস্ত সুড়ঙ্গ কাঁপতে লাগল।
আমার মনে হল বহুকাল পরে সুড়ঙ্গের মধ্যে মানুষের গন্ধ পেয়ে যক আজ প্রাণের আনন্দে হাসতে সুরু করেছে – কতকাল অনাহারের পর আজ তার হাতের কাছে খোরাক গিয়ে আপনি উপস্থিত!
উপরে গর্তের মুখ বন্ধ—ভিতরে এই কাণ্ড! এ জীবনে আর যে কখনো চন্দ্র-সূর্যের মুখ দেখতে পাব না, তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই! হাসির আওয়াজ ক্রমে দূরে গিয়ে ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে গেল— কেবল তার প্রতিধ্বনিটা সুড়ঙ্গের মধ্যে গম গম করতে লাগল।
আর কোন বাঙালীর ছেলে নিশ্চয়ই আমাদের মতন অবস্থায় কখনো পড়েনি! আমরা যে এখনো পাগল হয়ে যাইনি, এইটেই আশ্চর্য!
তিনজনে স্তম্ভিতের মত বসে বসে পরস্পরের.মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলুম –কারুর মুখে আর বাক্য সরছে না।
বিমলের মুখে আজ প্রথম এই দুর্ভাবনার ছাপ দেখলুম। সে ভয় পেয়েছে কিনা বুঝতে পারলুম না, কিন্তু আমার মনে হল আজ সে বিলক্ষণ দমে গিয়েছে।...আর না দমে করে কি, এতেও যে দমবে না, নিশ্চয়ই সে মানুষ নয়!
প্রথম কথা কইলে রামহরি। আমাকে হাত ধরে টেনে তুলে বললে, বাবু, আর এ রকম করে বসে থাকলে কি হবে, একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো?
আমি বললুম, ব্যবস্থা আর করব ছাই। যতক্ষণ প্রাণটা আছে, নাচার হয়ে নিঃশ্বাস ফেলি এস?
বিমল বললে, কিন্তু গর্তের মুখ বন্ধ করলে কে?
আমি বললুম, যক।
বিমল মুখ ভেঙিয়ে বললে, যকের নিকুচি করেছে। আমি ওসব মানি না?
—না মেনে উপায় কি? ভেবে দেখ বিমল, যে গর্তের কথা কাকপক্ষী জানে না, সেই গর্তেরই মুখ হঠাৎ এমন বন্ধ হয়ে গেল কি করে?
বিমল চিন্তিতের মতন বললে, হ্যাঁ, সেও একটা কথা বটে।
—মনে আছে তো, কাল এই গর্তের ভিতর থেকে হু-হু করে ধোঁয়া বেরুচ্ছিল?
—মনে আছে।
—আর এই বিশ্রী হাসি।
বিমল একেবারে চুপ।
হঠাৎ রামহরি চেঁচিয়ে উঠল—খোকাবাবু, দেখ—দেখ?
ও কী ব্যাপার। আমরা সকলেই স্পষ্ট দেখলুম, খানিক তফাতে সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে সে করে একটা আগুন চলে গেল।
আমি সরে এসে পাথর-চাপা গর্তের মুখে পাগলের মতন ধাক্কা মারতে লাগলুম–কিন্তু গর্তের মুখ একটুও খুলল না।
বিমল বললে, কুমার। বিজলী-মশালটা জ্বেলে আমার সঙ্গে এস। রামহরি, তুমি সকলের পিছনে থাক। আমি দেখতে চাই, ও আগুনটা কিসের!
আগুনটা তখন আর দেখা যাচ্ছিল না। বিমল বন্দুক বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেল, আমরাও তার পিছনে পিছনে চললুম। ভয়ে আমার বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল।
খানিক দূরে গিয়েই সুড়ঙ্গটা আর একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে গিয়ে পড়েছে—সেইখানেই আগুনটা জ্বলে উঠেছিল।
সেইখানে দাঁড়িয়ে আমরা সতর্কভাবে চারিদিকে চেয়ে দেখলুম।
হাতকয়েক দূরে, মাটির উপরে কি যেন একটা পড়ে রয়েছে বলে মনে হল-বাঘা ছুটে সেইখানে চলে গেল।
বিজলী-মশালের আলোটা ভালো করে তার উপরে গিয়ে পড়তেই, বিমল বলে উঠল, ও যে দেখছি একটা মানুষের দেহের মত?
রামহরি বললে, কিন্তু একটুও নড়চে না কেন?
হঠাৎ আবার কে হেসে উঠল—হি-হি-হি-হি ! কোথা থেকে কে যে সেই ভয়ানক হাসি হাসলে, আমরা কেউ তা দেখতে পেলুম না। সকলেই আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম-হাসির চোটে সমস্ত সুড়ঙ্গট আবার থর থর করে কাঁপতে লাগল!
আমি আঁতকে চেঁচিয়ে বললুম, পালিয়ে এস বিমল, পালিয়ে এস —চল আমরা গর্তের মুখে ফিরে যাই।
কিন্তু বিমল আমার কথায় কান পাতলে না—সে সামনের দিকে ছুটে এগিয়ে গেল।
সুড়ঙ্গ আবার স্তব্ধ। বিমল একেবারে সেই মামুষের দেহটার কাছে গিয়ে দাড়াল, তারপর হেঁট হয়ে তার গায়ে হাত দিয়েই বলে উঠল, কুমার, এ যে একটা মড়া!
সুড়ঙ্গের মধ্যে মানুষের মৃতদেহ। আশ্চর্য!
বিমল আবার বললে, কুমার, এদিকে এসে এর মুখের ওপরে ভালো করে আলোটা ধর তো!
আর এগুতে আমার মন চাইছিল না, কিন্তু বাধ্য হয়ে বিমলের কাছে যেতে হল।
আলোটা ভালো করে ধরতেই বিমল উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল— কুমার, কুমার, এ যে শম্ভু!
তাইতো, শম্ভুই তো বটে। চিং হয়ে তার দেহটা পড়ে রয়েছে, চোখ দুটো ভিতর থেকে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, আর তার গলার কাছটায় প্রকাণ্ড একটা ক্ষত।
বিমল হেঁট হয়ে শম্ভুর গায়ে হাত দিয়ে বললে, 'না, কোন আশা নেই—অনেকক্ষণ মরে গেছে।
আমি সেই ভয়ানক দৃশ্যের উপর থেকে আলোট সরিয়ে নিয়ে বললুম, কিন্তু-কিন্তু-শম্ভু এখানে এল কেমন করে?
বিমল চমকে উঠে বললে, তইতো, ও কথাটা তো এতক্ষণ আমার মাথায় ঢোকেনি-শম্ভু এই সুড়ঙ্গের সন্ধান পেল কোত্থেকে? আমি বললুম, শম্ভু যখন এসেছে, তখন করালীও নিশ্চয় সুড়ঙ্গের কথা জানে।
বিমল একলাফ মেরে বলে উঠল—কুমার, কুমার। আলোটা ভালো করে ধর —যকের ধন! যকের ধন কোথায় আছে, আগে তাই খুজে বার করতে হবে।
চারিদিকে আলোটা বারকতক ঘোরাতে-ফেরাতেই দেখা গেল, সুড়ঙ্গের এককোণে একটা দরজা রয়েছে।
বিমল ছুটে গিয়ে দরজাটা ঠেলে বললে, এই যে একটা ঘর! যকের ধন নিশ্চয়ই এর ভেতরে আছে।
(ক্রমশ)
--------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now