বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যকের ধন ------ (পর্ব ১৮)

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " যকের ধন " হেমেন্দ্রকুমার রায় --------------- (পর্ব ১৮) ▪▪▪অলৌকিক কাণ্ড▪▪▪ সেই সকাল থেকে আমরা ভাঙা জায়গাটার ধারে গিয়ে সরল গাছের গোড়ার উপরে ক্রমাগত কুড়লের ঘা মারছি আর মারছি। এমনভাবে আমরা গাছ কাটছি, যাতে করে পড়বার সময়ে সেটা ঠিক ভাঙা জায়গার উপরে গিয়ে পড়ে। দুপুরের সময় গাছটা পড় পড় হল। আমরা খুব সাবধানে কাজ করতে লাগলুম, কারণ আমাদের সমস্ত আশা-ভরসা এখন এই গাছটার উপরেই নির্ভর করছে—একটু এদিক-ওদিক হলেই সকলকে ধুলে-পায়েই বাড়ীর দিকে ফিরতে হবে। গাছটা পড়তে আর দেরি নেই, তার গোড়া মড়মড় করে উঠল। বিমল বললে, আর গোটাকয়েক কোপ। ব্যাস, তাহলেই কেল্লা ফতে। টিপ করে ঠিক গোড়া ঘেসে মারলুম আরো বার কয়েক কুড়লের ঘা৷ বিমল বলে উঠল, হুঁশিয়ার, সরে দাঁড়াও, গাছটা পড়ছে? আমি আর রামহরি একলাফে পাশে সরে দাঁড়ালুম। মড় মড় মড়—মড়াৎ। গাছটা হুড়মুড় করে ভাঙা জায়গাটার দিকে হেলে পড়ল। বিমল বললে, ব্যাস! দেখ কুমার, আমাদের পোল তৈরী। গাছটা ঠিক মাঝখানকার ফাঁকটার উপর দিয়ে পাহাড়ের ওপারে গিয়ে পড়েছে, তার গোড়া রইল এদিকে, আগা রইল ওদিকে। যা চেয়েছিলুম তাই... আহার আর বিশ্রাম সেরে আমরা আবার বৌদ্ধমঠের দিকে অগ্রসর হলুম। রোদ্দুরে পাহাড়ে-পথ তেতে আগুন হয়ে উঠেছিল, কিন্তু সেসব কষ্ট আমরা আজ গ্রাহের মধ্যেই আনলুম না, মনে মনে দৃঢ়পণ করলুম যে, আজ মঠে না গিয়ে কিছুতেই আর জিরোন নেই। সূর্য অস্ত যায় যায়। মঠও আর দূরে নেই। তার মেঘ-ছোয়া মন্দিরটার ভাঙা চুড়া আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে জেগে আছে। এদিকে-ওদিকে আরো কতকগুলো ছোট ছোট ভগ্নস্তুপও দূর থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আরো খানিক এগিয়ে দেখলুম, আমাদের দু-পাশে কারুকার্য করা অনেক গুহা রয়েছে। এইসব গুহায় আগে বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীরা বাস করতেন, এখন কিন্তু তাদের ভিতর জনপ্রাণীর সাড়া নেই। গুহাগুলোর মাঝখান দিয়ে পথটা হঠাৎ একদিকে বেঁকে গেছে। সেই বাঁকের মুখে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলুম আমাদের সামনেই মঠের সিংহদরজা। আমরা সকলেই একসঙ্গে প্রচণ্ড উৎসাহে জয়ধ্বনি করে উঠলুম। বাঘা আসল কারণ না বুঝেও আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল, ঘেউ ঘেউ ঘেউ। অনেকদিন পরে আবার সেই পোড়ো মন্দিরটার চারিদিক সরগরম হয়ে উঠল। বিমল দু-হাত তুলে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল, যকের ধন আজ আমাদের। আমি বললুম, চল, চল, চল। আগে সেই জায়গাট খুজে বার করি। সিংহদরজার ভিতর দিয়ে আমরা মন্দিরের আঙিনায় গিয়ে পড়লুম। প্রকাও আঙিন—চারিদিকে চকবন্দী ঘর, কিন্তু এখন আর তাদের কোন শ্ৰী-ছাদ নেই। বুনো চার-গাছে আর জঙ্গলে পা ফেলে চলা দায়, এখানে-ওখানে ভাঙা পাথর ও নানারকম মূর্তি পড়ে রয়েছে, স্থানে স্থানে জীবজন্তুর রাশি রাশি হাড়ও দেখলুম। বোধ হয় হিংস্র পশুরা এখন সন্ন্যাসীদের ঘরের ভিতর আস্তানা গেড়ে বসেছে, বাইরে থেকে শিকার ধরে এনে এখানে বসে নিশ্চিন্তভাবে পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে নেয়। আমি বললুম, বিমল, মড়ার মাথাটা এইবার বার কর, সঙ্কেত দেখে পথ ঠিক করতে হবে। বিমল বললে, তার জন্য ভাবনা কি, সঙ্কেতের কথাগুলো আমার মুখস্থই আছে। এই বলে সে আউড়ে গেল –ভাঙা দেউলের পিছনে সরল গাছ। মূলদেশ থেকে পূর্বদিকে দশ গজ এগিয়ে থামবে। ডাইনে আট গজ এগিয়ে বুদ্ধদেব। বামে ছয় গজ এগিয়ে তিনখানা পাথর। তার তলায় সাত হাত জমি খুড়লে পথ পাবে। আমি বললুম, তাহলে আগে আমাদের ভাঙা দেউল খুজে বার করতে হবে। বিমল বললে, খুজতে হবে কেন? দেউল বলতে এখানে নিশ্চয় বোঝাচ্ছে ঐ প্রধান মন্দিরকে। ও মন্দিরটাও তো ভাঙা। আচ্ছা, দেখাই যাক না। আমরা বড় মন্দিরের পিছনের দিকে গিয়ে উপস্থিত হলুম। রামহরি বললে ‘বাহঃ, ঠিক কথাই যে! মন্দিরের পিছনে ঐ যে সরল গাছ। তাই বটে। মন্দিরের পিছনে অনেকটা খোলা জায়গা, আর তার; মধ্যে সরল গাছ আছে মাত্র একটি, কিছু ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। চারিদিকে মাঝে মাঝে ছোট-বড় অনেকগুলো বুদ্ধদেবের মূর্তি রয়েছে,—কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। ভাঙা, আভাঙা পাথরও পড়ে আছে অগুন্তি। বিমল বললে, এরি মধ্যে কোন একটি মূর্তির কাছে আমাদের যকের ধন আছে। আচ্ছ, সরল গাছ থেকে পুবদিকে এই দশ গজ এগিয়ে থামলুম। তারপর ডাইনে আট গজ,—হুঁ, এই যে বুদ্ধদেব। বাঁয়ে ছয় গজ –কুমার, দেখ দেখ, ঠিক তিনখানাই পাথর পরে পরে সাজানো রয়েছে। মড়ার মাথার সঙ্কেত তাহলে মিথ্যে নয়। আহ্লাদে বুক আমার দশখানা হয়ে উঠল—মনের আবেগ আর সহ্য করতে না পেরে আমি সেই পাথরগুলোর উপরে ধুপ করে বসে পড়লুম। বিমল বললে, ওঠ – ওঠ। এখন দেখতে হবে, পাথরের তলায় সত্যি সত্যিই কিছু আছে কি না? আমরা তিনজনে মিলে তখনি কোমর বেঁধে পাথর সরিয়ে মাটি খুড়তে লেগে গেলুম। প্রায় হাত-সাতেক খোড়ার পরেই কুড়ুলের মুখে মুখে কি-একটা শক্ত জিনিস ঠক্ ঠক্‌ করে লাগতে লাগল। মাটি সরিয়ে দেখা গেল, আর একখানা বড় পাথর। অল্প চেষ্টাতেই পাথরখানা তুলে ফেলা গেল—সঙ্গে সঙ্গে দেখলুম গর্তের মধ্যে সত্য-সত্যই একটা বাঁধানো সুড়ঙ্গ-পথ রয়েছে। আমাদের তখনকার মনের ভাব লেখায় খুলে বলা যাবে না। আমরা তিন জনেই আনন্দবিহবল হয়ে পরস্পরের মুখের পানে তাকিয়ে বসে রইলুম। কিন্তু হঠাৎ একটা ব্যাপারে বুকটা আমার চমকে উঠল। গর্তের ভেতর থেকে হু হু করে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। –বিমল, দেখ–দেখ ! বিমল সবিস্ময়ে গর্তের দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, তাই তো, কি কাণ্ড! এতদিনের বন্ধ গর্তের ভেতর থেকে ধোয়া আসছে কেমন করে? তখন সন্ধ্যা হতে আর বিলম্ব নেই—পাহাড়ের অলিগলি ঝোপঝাপের ধারে ধীরে অন্ধকার জমতে সুরু হয়েছে, চারিদিক এত স্তব্ধ যে পাখিদের সাড়া পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। গর্ত থেকে ধোঁয়া তখনও বেরুচ্ছে, আর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুরে ঘুরে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। বিমল আস্তে আস্তে বললে, সামনেই রাত্রি, আজ আর হাঙ্গামে কাজ নেই। কাল সকালে সব ব্যাপার বোঝা যাবে। এস, গর্তের মুখে আবার পাথর চাপিয়ে রাখা যাক। ▪▪▪মরণের হাসি▪▪▪ মনটা কেমন দমে গেল। অতগুলো পাথর-চাপানো বন্ধ গর্ভের মধ্যে ধোয় এল কেমন করে? আগুন না থাকলে ধোয়া হয় না, কিন্তু গর্তের ভিতর আগুনই বা কোথেকে আসবে? আগুন তো জ্বালে মানুষেরই হাত! অনেক ভেবে কিছু ঠিক করতে পারলুম না। সে রাত্রে মঠের একটা ঘরের ভিতরে আমরা আশ্রয় নিলুম। খাওয়া-দাওয়ার পর শোবার আগে বিমলকে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, হ্যাঁ, হে, তুমি যকের কথায় বিশ্বাস কর? বিমল বললে, ‘হ্যাঁ, শুনেছি যক একরকম প্রেতযোনি। তারা গুপ্তধন রক্ষা করে। কিন্তু যক আমি কখনো চোখে দেখিনি, কাজেই তার কথা আমি বিশ্বাসও করি না। আমি বললুম, তুমি ভগবানকে কখনো চোখে দেখনি, তবু ভগবানকে যখন বিশ্বাস কর, তখন যকের কথাতেও বিশ্বাস কর না কেন? বিমল বললে, হঠাৎ যকের কথা তোলবার কারণ কি কুমার? —কারণ আমার বিশ্বাস ঐ গুপ্তধনের গর্তের ভেতরে ভুতুড়ে কিছু আছে। নইলে— —নইলে-টইলের কথা যেতে দাও। ভূত-দানব যাই-ই থাক, কাল আমি গর্তের মধ্যে ঢুকবই—দৃঢ়স্বরে এই কথাগুলো বলেই বিমল শুয়ে পড়ে কম্বল মুড়ি দিলে। আমার বুকের ছমছমানি কিন্তু গেল না। রামহরির কাছ ঘেঁসে বসে বললুম, আচ্ছা রামহরি, তুমি যক বিশ্বাস কর? —করি ছোটবাবু। —তোমার কি মনে হয় না রামহরি, ঐ গর্তের ভেতরে যক আছে? —যকই থাকুক আর রাক্ষসই থাকুক, খোকাবাবু যেখানে যাবে, আমিও সেখানে যাব—এই বলে রামহরিও লম্ব হয়ে শুয়ে পড়ল। যেমন মনিব, তেমনি চাকর। দুটিতে সমান গোঁয়ার। আমি নাচার হয়ে বসে বসে পাহারা দিতে লাগলুম।. ভোরবেলায় উঠেই আমরা আবার যথাস্থানে গিয়ে হাজির। গর্তের মুখ থেকে পাথরগুলো আবার সরিয়ে ফেলা-হল। খানিকক্ষণ অপেক্ষ করেও আজ কিন্তু ধোঁয় দেখতে পাওয়া গেল না। বিমল আশ্বস্ত হয়ে বললে, বোধ হয় অনেককাল বন্ধ থাকার দরুণ গর্তের ভেতরে বাষ্প-টাষ্প কিছু জমেছিল, তাকেই আমরা ধোয় বলে ভ্রম করেছিলুম? বিমলের এই অনুমানে আমারও মন সায় দিলে। নিশ্চিন্ত হয়ে বললুম, এখন আমাদের কি করা উচিত? বিমল বললে,‘সুড়ঙ্গের ভেতরে যাব, তারপর ধন খুজে বার করব ...কুমার, রামহরি, তোমরা প্রত্যেকে এক-একটা “ইলেকটিক টর্চ” নাও, কারণ মুড়ঙ্গের ভেতরটা নিশ্চয়ই অমাবস্যার রাতের মত অন্ধকার। এই বলে সে প্রথমে বাঘাকে গর্তের মধ্যে নামিয়ে দিলে, তারপর নিজেও নেমে পড়ল। আমরাও দুজনে তার অনুসরণ করলুম। উঃ, সুড়ঙ্গের ভিতরে সত্যিই কি বিষম অন্ধকার, দু-চার পা এগিয়ে আমর ভুলে গেলুম যে, বাইরে এখন সূর্যদেবের রাজ্য। ভাগ্যে এই ‘বিজলী-মশাল’ বা ইলেকটিক টর্চগুলো আমাদের সঙ্গে ছিল, নইলে ভয়ে এক পাও অগ্রসর হতে পারতুন না। আমরা হেঁট হয়ে ক্রমেই ভিতরে প্রবেশ করেছি, কারণ সুড়ঙ্গের ছাদ এত নীচু যে, মাথা তোলবার কোন উপায় নেই। আচম্বিতে পিছনে কিসের একটা শব্দ হল—সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। পিছনে ফিরে দেখলুম, সুড়ঙ্গের মুখের গর্ত দিয়ে বাইরের যে আলোটুকু আসছিল, তা আর দেখা যাচ্ছে না। আবার সেইরকম একটা শব্দ। তারপর আবার,—আবার। আমি তাড়াতাড়ি ফের সুড়ঙ্গের মুখে ছুটে এলুম। যা দেখলুম, তাতে প্রাণ আমার উড়ে গেল! সুড়ঙ্গের মুখ একেবারে বন্ধ! বিমলও এসে ব্যাপারটা দেখে স্তস্তিত হয়ে গেল। অনেকক্ষণ সবাই চুপচাপ, সকলের আগে কথা কইলে রামহরি। সে বললে, কে এ কাজ করলে? বিমল পাগলের মতন গর্তের মুখে ঠেলা মারতে লাগল, কিন্তু তার অসাধারণ শক্তিও আজ হার মানলে—গর্তের মুখ একটুও খুলল না। আমি হতাশভাবে বললুম, বিমল, আর প্রাণের আশা ছেড়ে দাও, এইখানেই জ্যান্ত আমাদের কবর হবে। আমরা কথা শেষ হতে না হতেই কাশির মত খনখনে গলায় হঠাৎ খিলখিল করে কে হেসে উঠল। সে কি ভীষণ বিশ্ৰী হাসি, আমার বুকের ভিতরটা যেন মড়ার মত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। হাসির আওয়াজ এল সুড়ঙ্গের ভিতর থেকেই। তিনজনেই বিজুলী-মশাল তুলে ধরলুম, কিন্তু কারুকেই দেখতে পেলুম না। বিমল বললে,‘কে হাসলে কুমার? আমি ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপপতে বললুম, যক, যক! সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই খিলখিল করে খনখনে হাসি। মানুষে কখনও তেমন হাসি হাসতে পারে না। বাঘা পর্যন্ত অবাক হয়ে কান খাঁড়া করে সুড়ঙ্গের ভিতরের দিকে চেয়ে রইল। পাছে আবার সেই হাসি শুনতে হয়, তাই আমি দুই হাতে সজোরে দুই কান বন্ধ করে মাটির উপর বসে পড়লুম। (ক্রমশ) --------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now