বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
" যকের ধন "
হেমেন্দ্রকুমার রায়
----------------
(পর্ব ১১)
▪▪▪ছাতকে▪▪▪
আজ আমরা শ্রীহট্টে এসে পৌছেছি।
বিমল বললে, কুমার, এই সেই শ্রীহট্ট।
আমি বললুম, হ্যাঁ, এই হচ্ছে সেই কমলালেবুর বিখ্যাত জন্মভূমি?
বিমল বললে, উঁহু, কমলালেবু ঠিক শ্রীহট্ট শহরে তো জন্মায় না, তবে এখানকার প্রধান নদী সুরমা দিয়েই নৌকায় চড়ে কমলালেবু কলকাতায় যাত্রা করে বটে। খালি কমলালেবু নয়, এখানকার কমলামধুও যেমন উপকারী, তেমনি উপাদেয়।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ও অঞ্চলে আরো কি পাওয়া যায়?
—‘পাওয়া যায় অনেক জিনিস, যেমন আলু, কুমড়ো, শশা, আনারস, তুলো, আখ, তেজপাতা, লঙ্কা, মরিচ, ডালচিনি আর চূণ প্রভৃতি। এসব মাল এ অঞ্চল থেকেই রপ্তানি হয়। কিন্তু এখানকার পান-সুপারির কথা শুনলে তুমি অবাক হবে!
—অবাক হব? কেন?
—বাংলা দেশের মত এখানে পানের চাষ হয় না, কিন্তু এদেশে পানের সঙ্গে সুপারির বড় ভাব। বনের ভেতরে প্রায়ই দেখবে, সুপারি-কুঞ্জেই পান জন্মেছে, সুপারি গাছের দেহ জড়িয়ে পানের লতা উপরে উঠেছে। তাছাড়া, এখানকার “সফলাং” আর একটি বিখ্যাত জিনিস।
—সফলাং ! সে আবার কি?
—কেশুরের মত একরকম মূল। খাসিয়ারা খেতে বড় ভালবাসে।
সারাদিন আমরা শ্রীহট্টেই রইলুম। এখান থেকে আমাদের গন্তব্যস্থান খাসিয়া পাহাড়কে দেখতে পেলুম। মনে হল, এর বিশাল বুকের ভিতরে না জানি কত রহস্যই লুকানো আছে, সে রহস্যের মধ্যে ডুব দিলে আর থই পাব কিনা, তাই বা কে বলতে পারে? এ তো আর কলকাতার রাস্তার কোন নম্বর-জানা বাড়ীর খোঁজে যাচ্ছি না, এই অশেষ পাহাড়-বন-জঙ্গলের মধ্যে কোথায় আছে যকের ধন, কি করে আমরা তা টের পাব? এখন পর্যন্ত করালী বা তার কোন চরের টিকিট পর্যন্ত দেখতে না পেয়ে আমরা তবু অনেকটা আশ্বস্ত হলুম। বুঝলুম, জাল মড়ার মাথা পেয়ে করালী এতটা খুসি হয়েছে যে, আমাদের উপরে আর পাহারা দেওয়া দরকার মনে করছে না ! বাঁচা গেছে। এখন করালীর এই ভ্রমটা কিছুদিন স্থায়ী হলেই মঙ্গল। কারণ তার মধ্যেই আমরা কেল্লা ফতে করে নিশ্চয় দেশে ফিরে যেতে পারব।
মাঝ-রাত্রে স্টীমারে চড়ে, সুরমা নদী দিয়ে পরদিন সকালে ছাতকে গিয়ে পৌছলুম।
সুরমা হচ্ছে শ্রীহট্টের প্রধান নদী। ছাতকও এই নদীর তীরে অবস্থিত। কলকাতায় ছাতকের চূণের নাম আমরা আগেই শুনেছিলুম। তবে এ চুণের উৎপত্তি ছাতকে নয়, চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে খাসিয়া পাহাড়ে এই চূণ জন্মে, সেখান থেকে রেলে করে ও নৌক৷ বোঝাই হয়ে ছাতকে আসে এবং ছাতক থেকে আরো নানা জায়গায় রপ্তানি হয়। চেরাপুঞ্জিতে খালি চূণ নয়, আগে সেখানে লোহার খনি থেকে অনেক লোহা পাওয়া যেত, সেই সব লোহায় প্রায় আড়াইশো বছর আগে বড় বড় কামান তৈরি হত। কিন্তু বিলাতী লোহার উপদ্রবে খাসিয়া পাহাড়ের লোহার কথা এখন আর কেউ ভুলেও ভাবে না। চূণ ও লোহা ছাড়া কয়লার জন্যেও খাসিয়া পাহাড় নামজাদা। কিন্তু পাঠাবার ভালো বন্দোবস্ত না থাকার দরুণ, এখানকার কয়লা দেশ-দেশান্তরে যায় না।
ছাতক জায়গাটি মন্দ নয়। এখানে থানা, ডাক্তারখানা, পোস্টআপিস, বাজার ও মাইনর ইস্কুল—কিছুরই অভাব নেই। একটি ডাক-বাংলোও আছে, আমরা সেইখানে গিয়েই আশ্রয় নিলুম। বিমলের মুখে শুনলুম, এখানে পিয়াইন নামে একটি নদী আছে, সেই নদী দিয়েই আমাদের নৌকায় চড়ে ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত যেতে হবে—এ সময়ে নদীর জল কম বলে নৌকো তার বেশী আর চলবে না। কাজেই ভোলাগঞ্জ থেকে মাইল-দেড়েক হেঁটে আমরা থারিয়াঘাটে যাব, তারপর পাথর-বাধানে রাস্তা ধরে খাসিয়া পাহাড়ে উঠব। আজ ডাক-বাংলোয় বিশ্রাম করে কাল থেকে আমাদের যাত্রা আরম্ভ।
ছাতক থেকে খাসিয়া পাহাড়ের দৃশ্য কি চমৎকার! নীলরঙের প্রকাণ্ড মেঘের মত, দৃষ্টি-সীমা জুড়ে আকাশের খানিকট ঢেকে খাসিয়া পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, যতদূর নজর চলে—পাহাড়ের যেন আর শেষ নেই! পাহাড়ের কথা আমি কেতাবে পড়ে হলুম, কিন্তু চোখে কখনো দেখিনি, পাহাড় যে এত সুন্দর তা আমি জানতুম না; আমার মনে হতে লাগল, খাসিয়া পাহাড় যেন আমাকে ইসারা করে কাছে ডাকছে—ইচ্ছে হল তখনি এক ছুটে তার কোলে গিয়ে পড়ি।
সন্ধ্যার সময় খানিক গল্পগুজব করে আমরা শুয়ে পড়লুম। বেশ একটু শীতের আমেজ দিয়েছিল, লেপের ভিতরে ঢুকে কি আরামই পেলুম!
বিমলও তার লেপের ভিতরে ঢুকে বললে, ঘুমিয়ে নাও ভাই, নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে নাও। কাল এমন সময়ে আমরা খাসিয়া পাহাড়ে, এত আরামের ঘুম আর হয়তে হবে না?
আমি বললুম, কিন্তু আমরা তো ঘুমবো, পাহার দেবে কে?
বিমল বললে, সে ব্যবস্থা আমি করেছি। দরজার বাইরে বারান্দায় রামহরি আর বাঘা শুয়ে আছে। তার ওপরে দরজাজানলাগুলোও ভেতর থেকে আমি বন্ধ করে দিয়েছি।
আমার উদ্বেগ দূর হল। যদিও শত্রুর দেখা নেই, তবু সাবধানে থাকাই ভালো
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now