বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"পানুতান্ত্রিকের প্রায়শ্চিত্ত"
জ য় দী প চ ক্র ব র্তী
-----------------------
কালীপুরের মানুষ বিপদে পড়লে বা বিষাদে থাকলে পানুতান্ত্রিকের পোয়া বারো। ঝাড়ফুক, তন্ত্র মন্ত্র, মারণ, উচাটন কিছু একটা করে চটজলদি সমাধান সে ঠিক বের করে দেবেই। সবসময় তার ফন্দিফিকিরে যে ষোলো আনা কাজ হয় তা নয়, কিন্তু কালীপুরের মানুষ তাতেই খুশি৷ যুক্তিটুক্তি দিয়ে কষে ভেবে তার বিরুদ্ধে দু’কথা বলবার মতো ফুরসত বা সাহস কোনওটাই তাদের নেই। পানুতান্ত্রিক ডাকসাইটে মানুষ। অসমের গভীর জঙ্গলে কঠিন সাধনা করে অনেক সিদ্ধাইটিদ্ধাই জড়ো করে রেখেছে সে। ভূতপ্রেতের দল মেনি বেড়ালের মতন দিন-রাত্তির পায়ে-পায়ে ঘুরে বেড়ায় তার।
পানুতান্ত্রিকের হুকুম কে আগে তামিল করবে। এই নিয়ে তাদের মধ্যে নাকি রীতিমতন প্রতিযোগিতা এখন। কাজেই এ মানুষকে চটানোর মতো আহাম্মাকি কে করবে? অতএব পানু সকলেরই নমস্যা। মানুষের মন থেকে এই বিশ্বাসটা যাতে ফিকে হয়ে মিলিয়ে না যায় তার জন্যে সবসময় সতর্কও থাকতে হয় তাকে। মাথার লম্বা জটাটায় উকুন বাসা বেঁধেছে অনেকদিন। সারাদিন বেজায় চুলকোয়। তবু জটাটা কাটতে পারে না সে।
কালীপুরের মানুষ জানে জটাই তার শক্তি। ওই জটার চুল ঘরে রাখলে অপদেবতার ভয় থাকে না। প্রতি অমাবস্যায় গঞ্জ ছাড়িয়ে শহর থেকেও ভক্তেরা আসে মোটা প্ৰণামীর বিনিময়ে সেই জটার চুল নেওয়ার জন্যে। তা ছাড়া হাত গুনে গ্ৰহদোষ বিচার করে গ্রহশান্তির মাদুলি দেওয়ার ব্যবসাটা তো পানুর আছেই। আজকের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। কাজটা ঝুঁকির, তবু দায়িত্বটা ঘাড়ে নিয়েছে পানু। ফন্দিটা কাজে লেগে গেলে এলাকায় প্রতিপত্তি বাড়বে। তা ছাড়া কাজের বিনিময়ে শোকগ্ৰস্ত লোকটার থেকে যে টাকাটা বাগিয়ে নিতে পারবে তা দিয়ে কয়েক মাস পায়ের উপরে পা তুলে বসে খেতে পারবে পানু আর ফড়িং। ফড়িং পানুর নিত্য সহচর। ভারী ভক্তি করে তাকে। এক রকম গুরু বলেই মানে। ছেলেটার বয়েস কম, কিন্তু বেশ করিতকর্মা। সত্যি বলতে কী, আজকের এই ক্লায়েন্ট ফড়িংয়ের হাতযশেই ছুটে আসছে পানুর কাছে। ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলার সঙ্গে ফরিংয়ের দেখা হয়েছিল গত শুক্কুরবার শহরে সন্তাপহারিণী মন্দিরের চাতালে।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দু’জনেই তখন আকুল হয়ে বিলাপ করছিলেন বিগ্রহের সামনে। বারবার বলছিলেন, “ছেলেটা কোথায় যে হারিয়ে গেল... একটিবারও যদি আবার দেখা হত তার সঙ্গে...” ফড়িং এই সুযোগটা লুফে নিয়েছিল একেবারে। মন্দির চত্বর থেকে একটু দুরে সরিয়ে নিয়ে বলেছিল তাঁদের পানুতান্ত্রিকের কথা। যতটা সম্ভব বাড়িয়েই বলেছিল। দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেছিল, ‘ওঁর সম্পর্কে কী-ই বা বলি বলুন। যাই বলি কম বলা হবে। মৃত্যুর ওপারের জগৎটা বলতে গেলে আজকাল উনি একা হাতেই সামাল দিচ্ছেন। সকলের সঙ্গেই নিবিড় যোগাযোগ তাঁর। বডড স্নেহ করেন তো আমায়। কথায়-কথায় মুখ ফসকে একদিন বলে ফেলেছিলেন। অবশ্য পইপই করে বারণও করে দিয়েছেন যাতে কথাটা আমি পাঁচকান না করি।
একদিন খুব বায়না করায় আমার মৃত বাপের সঙ্গে দেখাও করিয়ে দিয়েছেন আমায় গেল অমাবস্যায়। আজ পর্যন্ত এ সব কথা পেটের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছিলাম, আপনাদের দেখে আজ এত মায়া লাগল যে কথাটা আর চাপতে পারলাম না।” টোপটা নিখুঁতভাবে কাজে লেগেছিল। ভদ্রমহিলা নাছোড়বান্দার মতো ধরে বসলেন, তাঁকে মৃত ছেলের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে হবে। প্রথমটা রাজি না হবার ভান করে শেষে নিমরাজি হয়ে পানুকে ফোন করেছিল ফড়িং। পরে একটু আড়ালে সরে গিয়ে প্ল্যানটাও জানিয়েছিল সংক্ষেপে। বুদ্ধিটা মনে ধরে গিয়েছিল পানুর।
আজ তাঁরা আসছেন। রাত আটটায় টাইম দিয়েছে ফড়িং। সাতটা তেইশ মিনিটে অমাবস্যা লাগছে। আত্মা আনয়ন ক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গোছগাছে আরও আধাঘন্টাটাকা। পাক্কা আটটায় জপে বসবেন পানুতান্ত্রিক। এই সময়েই আসতে বলা হয়েছে ওঁদের। এখন আটটা বাজতে মিনিটদশেক বাকি। নিজেকে আয়নায় একবার দেখে নিল পানু। খোলা জটা, কপালে লাল সিঁদুরের টিপ, পরনে লাল টুকটুকে কাপড়, হাতে গলায় রুদ্রাক্ষের মালা... নাহ, ঠিকই আছে। একেবারে পাকা তান্ত্রিকের মতনই লাগছে তাকে। নিজেই নিজেকে তারিফ করে ওঠে পানু।
আর তখনই দরজার কড়াটা খটখট শব্দে বারতিনেক নড়ে ওঠে। বড় বাতিটা এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেয় পানু। ঘরের মধ্যে শুধুই একটা তেলের ছোট প্রদীপের আবছা! ম্যাড়মেড়ে আলো৷ ছায়া-ছায়া ঘরে তামার যজ্ঞবেদির উপরে খানকতক বেল কাঠ অল্প শিখায় জ্বলছিল। দরজা খুলে আগন্তুকদের বসতে বলে জ্বলন্ত বেলকাঠের টুকরোগুলোর উলটো দিকের আসনে বসল পানু। চোখ বন্ধ করে বিড় বিড় করে খানিক মন্ত্র পড়ল।
তারপর জলদগম্ভীর স্বরে মহিলার দিকে চেয়ে বলে উঠল, “কী চাস মা?’
“সবই তো জান বাবা,” অদ্ভুত খসখসে গলায় বিড়বিড় করে উঠলেন মহিলা। ওটুকু বলতেই গলা কেঁপে উঠল তাঁর। পানু তাকায় তাঁর দিকে। মনে-মনে হাসে। আবছা ছায়া-ছায়া আলোয় মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবু বোঝা যাচ্ছে ভয় পেয়েছেন তিনি। খুশি হয় পানু।
এ সময় ভয় পাওয়া ভারী ভাল। ভেলকি দেখাতে বেজায় সুবিধে হয় তা হলে। প্রায় নিভে আসা কাঠে একটু ধুনো ছড়িয়ে আবার বাজখাঁই গলায় সে বলে ওঠে, “ছেলেকে দেখতে চাস?’
“হু” উপর নীচ মাথা দোলান মহিলা। তাঁর পাশে বাসা ভদ্রলোকও মাথা নাড়ান নিঃশব্দে।
“তার প্রেত রূপ তোদের সহ্য হবে তো?”
“ভয় পেলে তুমি তো আছ বাবা।”
“হুঁ” আশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায় পানু, “কী নাম ছেলের?”
“অনি, অনিকেত।” ম্লান আলোয় আবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে-পড়তে যজ্ঞকুণ্ডের ওপারের মানুষদুটির মুখ পড়ার চেষ্টা করল পানু। কিন্তু ম্যাড়মেড়ে আলো আর ধুনোর ধোঁয়ায় ঠিক ঠাহর করতে পারল না। তাদের আবছা মুখদুটোর উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে নিভে আসা আগুনে আরো খানিকটা ধুনো ছড়িয়ে দিয়ে পানু বলে, “দু’জনে নাম ধরে একসঙ্গে ডাকো এবার ছেলেকে। সে ডাক যেন অন্তর থেকে উঠে আসে। খেয়াল রেখো।’
তাঁরা ডাকতে থাকেন, “অনি, সোনা আমাদের, আয় বাবা... আয়, নেমে আয়...”
তাঁদের আহ্বান যেন হাওয়ার মতন ফিসফিসে স্বরে বাজতেই থাকে ঘরের মধ্যে। ক্রমাগত পাক খেতে-খেতে ধ্বনিত প্ৰতিধ্বনিত হতে থাকে সেই ডাক। শব্দটা ক্রমশ পানুর শরীরকে পেঁচিয়ে ধরতে শুরু করে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে শীত করে ওঠে পানুর। শ্বাস রোধ হয়ে আসে। গা ছমছম করে ওঠে তার। ফড়িং আসছে না কেন এখনও? পিছন দিকের খোলা দরজা দিয়ে তার তো চলে আসার কথা এতক্ষণে মোক আপ নিয়ে...
হঠাৎই পানুর পাশে এসে দাঁড়ায় ফড়িং। আড়চোখে তার দিকে তাকায় পানু। তাকিয়ে চমকে ওঠে। ফড়িংকে একদম অন্য রকম লাগছে আজ। চেনাই যাচ্ছে না। ফড়িং খুব ধীর বাতাসের মতন স্বরে বলতে থাকে, “আমি এসেছি। কিন্তু এইভাবে আমার কাছে আসার কী দরকার ছিল বলো...”
“তবু তো আবার একসঙ্গে হলাম আমরা অনি...”
ধুনোর গন্ধ ছাপিয়ে একটা বিচ্ছিরি পচা-পচা গন্ধ এসে লাগছে পানুর নাকে। বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে সেই গন্ধে। ফড়িং বলেই চলেছে, “বাবা, তুমি তো এসবে বিশ্বাস করতে না। ভণ্ড প্রতারকদের ক্ষমাও করতে না কোনওদিন। তা হলে একেই বা ছাড়ব কেন আমরা? যারা পয়সার জন্যে মানুষ ঠকায়, ভণ্ড সেজে মানুষের স্নেহ, ভালবাসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তাদের শান্তি পাওয়াই উচিত...”
খুব রাগ হয়ে গেল পানুর। কী আজেবাজে কথা বকে যাচ্ছে ফড়িং? বাঁ হাত বাড়িয়ে তার পায়ে চিমটি কাটে পানু। কেটেই থতমত খেয়ে যায়। ফড়িং এর পা-টা এত ঠান্ডা কেন? তা ছাড়া চিমটি কাটার সময় তার আঙুলগুলো যেন নরম গলে যাওয়া মাংসের মধ্যে ঢুকে গেল একেবারে। সেই পচা গন্ধটাও যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল ঘরের মধ্যে। পানু আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বড় বাতিটা জ্বালিয়ে দেয়। লাল চোখে তাকায় ফড়িংয়ের দিকে। আর তাকিয়েই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠে বলে, “কে তুমি?”
“চিনতে পারলে না, আমি অনিকেত। আমাকে দেখাবে বলেই তো মিথ্যে কথা বলে আমার বাবা-মাকে ডেকে এনেছ এখানে,” বলতে-বলতেই গায়ের চাদরটা একটানে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল ছেলেটা।
মুহুর্তে মাথা ঘুরে গেল পানুতান্ত্রিকের। ফড়িং নয়, ঘরের মধ্যে যে দাঁড়িয়ে আছে তার গা থেকে পচা গলে যাওয়া মাংস খসে-খসে পড়ছে। হাড় বেরিয়ে গিয়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশে। ছেলেটির বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়েও হাড় হিম হয়ে গেল পানুর। তাদের মাথা থেকে, মুখ থেকে গড়িয়ে নামছে কালচে রক্তের স্রোত। মাথার এক দিক ফেটে ঝুলে গিয়েছে. আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করল পানু।
উদ্দেশ্যহীন। মনে হল তাকে শাস্তি দিতে পিছন-পিছন ওরাও যেন দৌড়ে আসছে। ছুটিতে-ছুটতেই দু’হাতে কান ধরে তাদের উদ্দেশ্যে প্ৰাণপণে বলে চলল পানু, “এবারের মতন মাপ করে দাও। কথা দিচ্ছি জটা কেটে ফেলব এবার। লোক ঠকানো ব্যবসার ধারও মাড়াবো না আর এ জীবনে।”
কতদূর ছুটেছিল। খেয়াল নেই। সামনে মস্ত জটলা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল পানু। খেয়াল হল বড় রাস্তায় এসে পড়েছে সে দৌড়তে-দৌড়তে। জটলার মধ্যে ফড়িংকেও চোখে পড়ে গেল। পানুকে অমন উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসতে দেখে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো সে। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে গুরু?”
হাঁফাতে-হাঁফাতে বলতে শুরু করল পানুতান্ত্রিক, “ফরিং, তোর ক্লায়েন্ট...”
“আর আসবে না,” বলে ভিড়ের দিকে হাত বাড়ায় ফড়িং, “ওই যে ওইখানে রাস্তার উপরে শুয়ে আছে। বাইকে চেপে আসছিল দু’জনে আমাদের কাছে। মাথায় হেলমেট ছিল না। লরি এসে ধাক্কা মেরে. মাথাদুটো পুরো থেঁতলে গিয়েছে... এক্কেবারে স্পট ডেড...”
(সমাপ্ত)
------------
।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now