বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ওরা তিনজন
সামনে একটা নদী। সে নদী পেরিয়ে একটা ছোট্ট গ্রাম। সে গ্রামের শেষটা যে কোথায় কেউ জানে না। অমি মাঝেমধ্যেই ‘ছোট’ শব্দটা ব্যবহারে আপত্তি জানাতো।
“যে গ্রামের শেষ নেই তাকে ছোট্ বলিস কি করে ?”
আমি ঘাসের উপর থেকে মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকাতাম।“তুই এত অমানুষ কেন রে?সবকিছুতেই খালি ভুল ধরিস কেন?”
“বারে,ভুল যদি না শুধরাই তাহলে তো ভুল থেকেই যাবে।সে ভুল প্রতিদিনই বাড়বে।তারপর একদিন সে ভুল…”
এবার বাবু মাথা ওঠায়।“এই শালা হাফ লেডিস।চুপ!”
আমি হো হো করে অকারণেই হেসে উঠি ।এ ধরনের হাসি মূলত অমিকে বিব্রত করার জন্যেই।
“আমি কোন দিক দিয়ে লেডিস?”মিনমিন করে অমি।
“নামটাই তো লেডিস,শালা।”
অমি এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়।সে কথা বলেই যায়।আমি আর বাবু দুকানে আঙ্গুল দিয়ে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ি।বিশাল আকাশে মুক্ত মেঘমালা,দেখে মুগ্ধ হই।
অমিকে হাফ লেডিস ডাকার শুরুটা মাসুম ভাইয়ের বদৌলতে।তখন ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিক।চারপাশে যেন আমরা উঠতি তারকা।আজ এখানে ডাক তো কাল ওখানে,পরিচিতির নাম করে বিনোদিত হওয়া যাকে বলে আর কি।
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়ারা।”মিন মিন করে অমি বলে ওঠে।
মাসুম ভাইয়া চোখ তুলে তাকান।“নাম কি রে?”
অমি পুরো নামটা বলে।
“ডাক নাম?”
“অমি।”
“এই তুই লেডিস নাকি রে।লেডিস নাম কেন?”মাসুম ভাই হো হো করে হেসে ওঠেন, সঙ্গে সাথে থাকা ভাইগুলোও।
সেদিন রাতে অমির সাথে যা ইচ্ছে করে ছাড়েন মাসুম ভাই। রুমে ফিরে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে অমি, যখন ফিরে আসে স্পষ্ট দেখতে পাই ওর চোখজোড়া লাল,টকটকে লাল।আমি চমকে উঠি।
ধীরে ধীরে অমি আমাদের থেকে একটু আলাদা হয়ে যায়।পড়া পাগল ছেলেটা, বাবুর ভাষায় আঁতেল।প্রথম চার সেমিস্টারে প্রথম ছিল সেই,আমরা আদর করে ডাকতাম অমি ম্যাডাম। চোখগুলো বড় বড় করে ছেলেটা আমাদের দিকে তাকাতো,আমরা আরো বেশি করে খেপাতাম। পঞ্চম সেমিস্টারে এসে অমি কেমন যেন হয়ে গেলো।দিন রাত সিগারেট ফুঁকে,আর দিন শেষে ভার্সিটির মাঠটায় শুয়ে আকাশ দেখে,সেই কালো আকাশে অসংখ্য তারা;বুঝতে পারি অমির চোখে এক ফোঁটা অশ্রু। সব কিছু পরিষ্কার হয় যখন সুধার সাথে এক বড় ভাইকে দেখতে পাই আর সে পথের দিকে চেয়ে থাকা অমির শূন্য দৃষ্টি।
“তোর মনটা কি বড্ড খারাপ?”আমি প্রশ্ন করি।
মাথা এদিক ওদিক করে অমি।“শুভ বল তো প্রেম করার জন্যে কি কি লাগে?”
“কি?”আমি পাল্টা প্রশ্ন করি।
“ক্ষমতা রে ক্ষমতা।”
“আর বিয়ে করতে?”
“ক্ষমতা আর টাকা।”বলেই হো হো করে হেসে ওঠে অমি।
“যদি ব্যাতিক্রম ঘটে?”
“ঘটবে না রে।”অমি ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে।“সব কিছু শেষ।”
আমি মুচকি হেসে উঠি।
অমি আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। আবারও ভালো করতে থাকে।আমরা আবারও আগ্রহী হই।
“কি রে?কাহিনী কি?”
অমি একটা লাজুক হাসি দেয়।
কোন এক বিকেলে বাবু আমায় টেনে তুলে,আমরা দৌড় দিই ক্যাম্পাসে। সাদা এপ্রণে জড়ানো এক সুন্দরী,যার ডান হাত অমির হাত শক্ত করে আগলে রেখেছে।আমরা হেসে উঠি। স্রষ্টা তোমাদের সুখী করুক।
বাবু আমাদের শিল্পী।যেই সেই শিল্পী না,ক্যাম্পাসে ঝড় তোলা শিল্পী। শোনা যায়, আমাদের ব্যাচের সবথেকে সুন্দরী মেয়েটি নাকি তাকে কোন এক কালে প্রপোজ করেছিল।বাবু নারীবিদ্বেষী, সে যতই রাজকুমারী হোক। বিয়ে যখন করবই না, মেয়ে নিয়ে ঘুরে লাভ কি রে বাপ?
ছেলেটার প্লে ব্যাক করার সেই ইচ্ছে ছিল।সিনেমায় তার গানে নায়ক নায়িকা নেচে উঠবে,বড় বড় কনসার্টে বাবু বাবু করে সবাই চিৎকার করে উঠবে।
“বাবু?”অমি বলে ওঠে।
“হ্যাঁ বাবু।কেন সমস্যা?”বাবু অমির দিকে তাকায়।
“নাহ কেমন যেন বাচ্চা বাচ্চা।নামটা একটু পরিবর্তনের দরকার আছে।”
“তা বটে।”বাবু মাথা নাড়ে।“কি নাম দেয়া যায় বল তো?”
আমরা ভাবতে থাকি।নদীর পাড়ে আঁধার নেমে আসে।
দুবছর না যেতেই বাবুর স্বপ্নগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে। কাঁধে বাজে ফলাফলের বোঝা, মলিন স্বপ্নগুলো। বাবু রাত জেগে সিগারেট ফুঁকে যায়,পড়ে থাকে ল্যাব রিপোর্টের পৃষ্ঠাগুলো। একদিন ছেলেটা কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেলো।
“ফোন করেছিস?”অমি জিজ্ঞেস করে।
“সুইচড অফ।”
তিনদিন পর বাবু আননোন নাম্বার থেকে ফোন করে।
“তুই কই রে?”অমি জিজ্ঞেস করে।
ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ।
“বাবা আর নেই রে।”
বাবু ফিরে আসে পাক্কা দশদিন পরে। রাত জেগে কি সব চিন্তা করে। আমরা তাকে বিরক্ত করি না,একাই সব গুছিয়ে উঠুক।
বাবুকে আমরা কখনো আর সিগারেট ফুঁকতে দেখি নি,দেখি নি আর কখনো গাইতেও।গিটারটা পড়ে ছিল রুমের এক কোণে, সে গিটারে ধুলো জমে ওঠে।আমরাও ভুলে যাই,বাবুও গান করতো কোন এককালে।
বাবু আর খারাপ করে নি,হতাশ হয় নি।জীবনটাকে সে আরেকটা রূপ দিয়েছিল,সে রূপে তাকে কেউ চায় নি।বাবু নিজেও না।
আমার গল্পটা ম্যাড়ম্যাড়ে। না ছিলাম আঁতেল না শিল্পী। কখনো রং তুলি হাতে বসে যেতাম কাউকে আঁকব বলে তো কখনো পড়ার টেবিলের মনযোগী ছাত্র। কিছুই হয় নি। ক্যাম্পাসে কিছু ব্যক্তিত্ব সবার অগোচরে রয়ে যায়। হঠাৎ দেখা হলে এরা মানুষের বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়-আরে এ আমাদের ব্যাচের?!ছেলেটা জুনিয়র?নাহ,চিনি না তো।
আমার অবস্থাটাকে এসব হতভাগা থেকেও বেজায় খারাপ।ক্যাম্পাসে আসার আগে একটা প্রেম করতাম।তা ভেঙ্গে যাওয়া আজও রহস্যের বিষয়। তারপর অনেকবারই কাউকে না কাউকে ভালো লেগেছিল,সেই ভালো লাগা পর্যন্তই।আর এগোনো হয় নি।কল্পনার মাঝে একটা চরিত্র সাজিয়ে নিয়েছিলাম আর অমি বাবু কিনা তাকে বাস্তব ভেবে উঠে পড়ে লেগেছিল।
“মেয়েটা কে বলবি তো?” বাবু বলে ওঠে।
“কোন মেয়ে?!” অবাক হই আমি।
“ঢং আর কত করবি?”
আমি উঠে বসি।হাতের ময়লাটা ঝাড়ার চেষ্টা করি।“আচ্ছা তোদের ক্লু দিই।বের কর।”
তারা মনযোগী ছাত্রের মত আমার দিকে ফিরে।আমি তাদের সূত্র দিই,সে সূত্র ধরে তারা বিকাল পার করে দেয়।মেয়েটাকে আর খুঁজে পায় না।আমি হতাশ চোখে দূর আকাশ দেখি,সেখানে বিশালতার মাঝে একটু সান্ত্বনা খুঁজি। মাঝে মাঝেই অনর্থক কেঁদে উঠি,আমি কি আজও তাকে একটু হলেও ভালবেসে ফেলি?
কষ্ট হলেই গল্প লিখে ফেলি,কল্পনায় খুঁজি কোন এক অপ্সরীকে। বাস্তব আর কল্পনায় বড্ড ফারাক-অপ্সরীরা বাস্তবে থাকে না।
“আজ রাতেই রওনা দেব ভাবছি।তোরা যাচ্ছিস কবে?”
অমির কথায় ঘোর ভাঙ্গে,ফিরে তাকাই।
“আমি দুদিন থাকব।বাড়ি গিয়ে করবটা কি?তোর মত তো আর চাকরী বসে নেই আমার জন্যে।”
অমি হেসে ওঠে।
“বিয়ে করছিস কবে?”
লাজুক হাসি হাসে অমি।“দু তিন মাসের মধ্যেই করব।বাবা নাছোড়বান্দা,বিয়ের ব্যাপারে দেরী করাই যাবে না।ওর পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়ে।”
“দাওয়াত দিস।”
হেসে ওঠে অমি।“তা তো অবশ্যই।”
বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।“তোরা সবাই তো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলি।আমার কি হবে বল তো?আরো বছর খানেক থাকব,মায়ের ঘাড়ে পা দিয়ে টাকা উড়াব।”হো হো করে হেসে ওঠে বাবু,আমরা কি বলব ভেবে পাই না।
দিনগুলো খুব দ্রুত কেটে যায়,সময়টা শেষ হয়ে আসে চোখের নিমিষে।হাজারও ব্যস্ততার মাঝেও গড়ে ওঠে কমপক্ষে একশত গল্প। সে গল্পে থাকে ল্যাব রিপোর্টগুলোর প্রতি বিরক্তি,খারাপ করার হতাশা কিংবা কিছু স্বপ্নের অঙ্কুরে বিনাশ হয়ে যাবার মত বেদনা।তবুও আমরা ভালবাসতে শিখি,একেকটা অবলম্বনকে ধরে এগোতে চেষ্টা করি।কখনো সফল হই তো কখনো ব্যর্থ।
জীবন তো থেমে থাকে না, বাঁক নেয় বন্ধুত্বগুলো।নিঃশব্দে হারিয়ে যায় কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবন,জীবনের গল্প থেকে।গোল এ পৃথিবীতে জীবনের কোন এক ধাপে কেউ কেউ আবার ফিরে আসে। তা সাময়িক, চিরস্থায়ী নয়। গোল বলতেই অমির আপত্তি,হেসে উঠি আমি আর বাবু।
রাত বাড়ছে,আমরা উঠে দাঁড়াই।যেতে হবে এবার।তিনজনের তিন পথ।বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সবাই নিঃসঙ্গ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now