বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"বিভ্রান্তি"
-সাচৌ
=========
"বই মেলা-২০১৪, শুধুই গল্প সংকলন-০১ এ প্রকাশিত।"
--------------------------------------------------------------
১
চট্টগ্রামের খাতুন গঞ্জের এক চালের আড়তে বসে বাঙ্গালীর সময় জ্ঞানের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করছি মনে মনে । কোন দুঃখে যে এই ব্যবসায় নামলাম সবার নিষেধ না শুনে ! এক মাসেই ঘেন্না ধরে গিয়েছে চালের ব্যবসার উপর । শেষ ভরসা হিসেবে জামসেদ সাহেবের এখানে আসা । চারিদিকে ব্যস্ত হৈহল্লা, তাও ভাগ্যভাল জামসেদ সাহেবের এই আড়তটা একটু নিরিবিলি । মাথার ঠিক উপরে পাকিস্তান আমলের একটা জং ধরা চার ডানা বিশিষ্ট ফ্যান ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে নাকি ঘুরছে আল্লাহ মালুম । আড়তের চারদেয়ালে প্রায় ডজন খানেক সাদাকালো ছবি টাঙানো । ছবির লোকটা নিশ্চিত জামসেদ সাহেব, তাহলে তো পাশের মহিলাটা তার স্ত্রীই হবেন । ছবিগুলো একটু ভালো করে দেখলেই স্ত্রীর প্রতি তার গভীর মমতা বোঝা যায় । কিন্তু একটা চালের আড়তে এমন করে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের লোক তার স্ত্রীর সাথে তোলা ছবি টাঙিয়ে রাখতে পারে বিশ্বাস করা কঠিন ।
আমাকে আরও ঘন্টাখানেক বাঙ্গালীর চরিত্র বিশ্লেষণের সুযোগ দিয়ে জামসেদ সাহেব হাজির হলেন । লোকটাকে দেখে আমি এমন ধাক্কা খেলাম যে আর একটু হলেই বিস্ময় প্রকাশ করে ফেলেছিলাম । কোথায় ছবির রাজপুত্র আর কোথায় পান খেয়ে খেয়ে দাঁত কালো হয়ে যাওয়া একটা সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরা মানুষ । তার উপর আবার একটু পরপর পিচ-পিচ করে পানের পিক ফেলছেন চায়ের কাপে । একটু আগেই এই কাপে আমাকে চা খেতে দিয়েছিল এই আড়তেরই এক কর্মচারী, গা গুলিয়ে উঠল। কোনমতে ব্যবসার আলাপটা শেষ করে এখান থেকে বের হতে পারলেই বাঁচি ।
-ওয়া ছায়েদ, কিছু মনে ন কইজ্জ, তুই চিটাইঙ্গা ভাষা বুঝনি? ন বুঝিলে আরে কইতে শরম ন পাইয়ো!
আমি বোয়াল মাছের মত হা করে জামসেদ সাহেবের কালো দাঁতগুলোর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললামঃ না মানে, আপনি কি বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
-হা হা হা! ঠিক আমি যা ভাবছিলাম তাই, তোমার গ্রামের বাড়ি কই? বহু এলাকার মানুষের সাথে কথা চালাতে হয় । তাই সব বুলিই কমবেশি জানি । হা হা! হাসির সাথে জামসেদ সাহেবের বিশাল ভুঁড়িটাও হেলেদুলে নাচছে তাল মিলিয়ে ।
-গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর, ওখানেই বড় হয়েছি।আব্বা একটা ছোট জায়গা কিনেছিলেন এখানে বহু আগে,ছোট একটা টিনের ঘর তুলে আমি সেখানেই থাকি এখন । খানিকটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলাম । ব্যবসার আলাপের সাথে গ্রামের কি সম্পর্ক? আর এতক্ষন দেরী করে এসেও লোকটার কোন অনুশোচনাও নেই, একবার দুঃখও প্রকাশ করল না ।
-বিবি বাল বাচ্চা কয়জন? তিনি আর একটা পান মুখে ঢুকিয়ে জানতে চাইলেন ।
আরে প্রশ্ন করার ধরণটা দেখ, বাচ্চা কয়েকজন হতেই পারে, কিন্তু বিবি কয়জন কেমন ধরনের প্রশ্ন?
-জ্বী বিয়ে করি নি এখনও ।
-ওমা, তুমি তো দেখি কচি পোলা ! আমার বড় পোলার ছোট মেয়েরই এখন তিন সন্তান । তা হঠাৎ এই ব্যবসায়? পারবা সামাল দিতে ? আবারো সেই ভুঁড়ি দোলান হাসি !
শালা ভাঁড় নাকি একটা ? আসলাম ব্যবসার কাজে আর এই ব্যাটা কি খেজুরে আলাপ শুরু করেছে ।
-জ্বী আপনি দোয়া করলে পারব । মুখটা খুব কষ্টে হাসি হাসি করে জবাব দিলাম।
-বাহ পোলায় কথা জানে দেখি ! আইজকা প্রথম দিন কি আর ব্যবসার কথা আলাপ করবা, ব্যবসার প্রথম শর্ত হইল সম্পর্ক, বুজলা। কও দেখি কিছু, তোমার ব্যাপারে শুনি ।
মাথায় আগুন ধরে গেলেও ব্যাটার কথা বার্তায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না, কৌশল জানে ভাল কথা আদায় করার ।
-আমার ব্যাপারে আর কি শুনবেন, আব্বা একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করতেন হঠাৎ মারা গেলেন । তার পাওনা সমস্ত টাকা দিয়ে এখন আমি ব্যবসার চেষ্টা করছি এখানে এসে, মা আর ছোট বোনেরা গ্রামের বাড়িতে, এই তো । এক নিঃশ্বাসে সব কথা বলে আমি দম নিচ্ছি ।
-হুম্ম , তুমি চেষ্টা করলে পারবা । সাহস আর মায়ের দোয়া আছে তোমার লগে, বুজলা। চেহারা দেখলেই বুঝা যায়, চান্দের মত চকচক করে !
বুড়োর কথা থামবে বলে মনে হয় না । আমি তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললামঃ আচ্ছা এই দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো কার ? আপনার স্ত্রীর ? বলেই নিজের জিভ কামড় দিলাম, এত বড় ভুল আমি কি করে করলাম ? বৃদ্ধ মানুষের সাথে তার সন্তান আর স্ত্রীর প্রসঙ্গে আলোচনা করতে নেই । এমনিতেই এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, আর আমি তো ইতিহাস বলার মওকা দিলাম ।
কিন্তু জামসেদ সাহেব কোন কথাই বলছেন না । পুরো ঝিম মেরে বসে আছেন । কিছুক্ষন পর বললেনঃ হ্যা ! ও পারুল, আমার স্ত্রী ।
আমি কিছুটা অবাক হলাম।
- কেমন আছেন উনি ?
- খুব ভালোই আছে , কোন সন্দেহ নেই !
ভদ্রতার খাতিরেই জানতে চাইলামঃ আপনাদের বিয়ে হয়েছিল কখন, কীভাবে ?
– হঠাৎ এই প্রশ্ন ? জামসেদ সাহেব ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে ।
- না মানে, এত সুন্দর করে বাঁধানো ছবি, তাও আবার এখানে । মনে হচ্ছে দুজনে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন। আর সেই সময়ের ভালবাসার গল্পগুলো একেবারেই অন্যরকম , তাই জানতে চাইলাম আর কি ? বলুন না আপনাদের কথা !
- এতই যেহেতু আগ্রহ , তাহলে শোন ! কিন্তু কথার মাঝখানে বাঁধা দিবা না কোন , মাঝখানে কথা বললে আমি কাহিনী গুলিয়ে ফেলি । বয়সের দোষ সব বুঝলা ।
আমি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বুড়োর প্রেম কাহিনী শোনার মানুষিক প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম । কোন সন্দেহ নেই খাল কেটে কুমির আনা বিষয়ক প্রবাদটা আমার কথা চিন্তা করেই লিখা হয়েছিল !
২
জামসেদ সাহেব মুখের পান ফেলে বলা শুরু করলেন। তিনি তার পাঁচমিশালী ভাষাতেই বলেছিলেন, আমি কিছুটা বোঝার মত করে পুরো ঘটনা বলছি ।
আমি তখন এইখানে নতুন দোকান দিয়েছি । সেইকালেও এইখানে রমরমা ব্যবসা । বছর না ঘুরতেই টাকার বস্তা নিয়ে ঘুরাফিরা করি । এর মাঝেই আব্বা মেয়ে দেখে বিয়ে ঠিক করে ফেলল । আমার কোন ইচ্ছেই ছিলনা এত অল্প বয়সে বিয়ে করার । মাত্রই তো টাকা পয়সা আসা শুরু হয়েছে,ইচ্ছে ছিল কয়দিন একটু ঘুরাফিরা করি, তারপর না হয় বিয়ে টিয়ে করব । কিন্তু আম্মা এমন জোরাজুরি শুরু করল যে রাজী না হয়ে পারলাম না । আমি মেয়ের চেহারাও দেখি নাই বাসর রাতের আগে । শুনেছিলাম পারুল না কি যেন মেয়ের নাম । আশ্বিনের কোন এক অমাবস্যার রাতে বিয়ে হয় আমাদের । বাসর রাতে ওকে দেখে আমার বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল । জানালার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে আনমনা হয়ে কি যেন দেখছিল অন্ধকার আকাশে । আমি হারিকেনের আলোয় শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম ওর শ্যামল বর্ণের কাটাকাটা চেহারার দিকে, পারুলের মাথার চুল ছিল ঠিক হাঁটুর নীচ পর্যন্ত । আমার মত এই হতভাগার কপালে এমন কিশোরী পরী কিভাবে জুটল আমি আজো বুঝতে পারি না । ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে আম্মার পায় ছুঁয়ে সালাম করে আসি । শেষ রাতের দিকে ওর গলার চঞ্চল স্বরে আমার মোহ ভাঙলঃ স্বামীজী, আপনি কি ধ্যনে বসেছেন? আমার ঘুম খুব আসছে, যদি কানের দুলগুলো একটু খুলে দিতেন ! সেই যে আপনি বলা শুরু করল আর তার মুখ দিয়ে শত চেষ্টা করেও আমি কখনো তুমি শব্দটা বের করাতে পারিনি ।
আমি তখনও বুঝতামনা ভালোবাসা কি? বিশ্বাস করতে পারতাম না এই পরীর সাথে আমার বিয়ে হয়েছে । বিয়ের ১ সপ্তাহ পর আমি ব্যবসার কাজে শহরে ফিরে আসি। ওকে একা ফেলে আসার পর আমার বুকের কোথাও প্রচণ্ড চাপা কষ্টের অনুভূতি হতে থাকে, রাতে ঘুম হত না । অজানা মাদকতায় মন ভার হয়ে থাকত সারাদিন । প্রতি সপ্তাহে বিষ্যুদবারে আমি গ্রামে যেতাম , সাথে টুকিটাকি জিনিস নিতাম । শুধু একটা চুলের ফিতা পেলেই পারুল খুশীতে আমার গলা জড়িয়ে ধরত, টুক টুক করে কত কথা বলত, এভাবেই কেটে যেত সারারাত । তোমরা আজকালকার পোলারা অজানা অচেনা মেয়েছেলের সাথে হাত ধরে রিক্সায় ঘুরাঘুরি কর, আর তখন আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়েও সবার সামনে ভুলেও কখনো হাত ধরতাম না । আমার স্ত্রীর দিকে মানুষ বাজে চোখে তাকাবে এইটা আমরা কখনই হতে দিতাম না । তোমাদের আর কি দোষ, দোষ হইল যুগের বুঝলা । অজানা অচেনা একজন মানুষের সাথে ভয়ে আর লজ্জায় সংসার শুরু করা, ধীরে ধীরে তাকে ভালবাসা, তার প্রতি মায়া লাগার যে কি সাধ তা তোমরা কোনদিনই বুঝবা না । তবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমি আর পারুল গভীর চাঁদনী রাতে হাত ধরে ধান খেতের আইলে হাটতাম। পারুল গ্রামের রাস্তায় দৌড় দিত আমিও তার পিছে পিছে ছুটতাম । বাতাসে তার খোলা চুল যখন মুখ ঢেকে দিত আমার ইচ্ছে হত চিৎকার করে বলিঃ পারুল আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি অনেক । আসলে আমরা কখনো এই শব্দটা মুখে বলতাম না । অন্তরে সত্যিকারের মায়া থাকলে দুইজনের রুহের মধ্যে সেই কথা আপনাই জানান দেয় । বাড়ির সামনের পুস্কুনিতে ডুবাডুবিও খেলতাম মাঝেসাঝে । শুক্রবার শেষ রাতে পারুল আমাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে থাকত, তার চোখের পানিতে আমার বুক ভেসে যেত । চোখে কত মিনতি থাকত আর একটা দিন বেশী কাছে থাকার । পরেরদিন আড়তে বসে সারাদিন আমি ঝিমাইতাম । আশেপাশের ব্যাপারিরা আমারে নিয়া ঠাট্টা করত খুব । আগে প্রতি বিষ্যুদবার রাতে আড়তে আড্ডা জমত, বিরানি পাকাইতাম আমরা, সারারাত তাস খেলতাম । আমি বিয়া করার পর থেকে তাদের সেই আড্ডা বন্ধ । মাস দেড় মাস না যাইতেই সবাই আমারে বউ পাগলা উপাধি দিল । আমি সেইসব আমলে নিতাম না।
জামসেদ সাহেবের চোখ ভিজে আসছে, তিনি এর মাঝেই কয়েকবার চোখ মুছেলেন লুঙ্গির কোনা দিয়ে । আমি বুঝতে পারছি না তার কান্নার কারন টা কি ? উনি কথা বলতে নিষেধ করায় জিজ্ঞেসও করতে পারছি না, মুখ কাচুমাচু করে বসে আছি । বেচারা চোখের পানি মুছছেন তো মুছছেন ই ! শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে মিন মিন করে নিজেকে সার্টিফিকেট বিহীন বেকুব প্রমাণ করে বললামঃ উনি কি আপনাকে তালাক দিয়েছেন ?
প্রশ্নটা শুনে আমার দিকে এমন অবিশ্বাসের চোখে তিনি তাকালেন যেন সাক্ষাত গিনিপিগ বসে আছে তার সামনে, শেষে মাথা নেড়ে হতাশ দীর্ঘশাস ছেড়ে বললেনঃ নাহ! আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর দিনেই সে মারা যায় । বলেই আবার চুপ হয়ে গেলেন তিনি ।
মাথায় যেন কেউ লাঠি দিয়ে সজোরে একটা বাড়ি দিল আমার । হাত পা অবশ হয়ে আসছে, এমন উত্তর শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না । বেশভাল মতই বুঝতে পারলাম কেন আমাকে দিয়ে কোন ব্যবসা হয় না । নিজের মাথায় ধূসর বর্ণের কোন পদার্থ আছে কিনা সেটা নিয়েই বিরাট একটা টেনশানে পরে গেলাম, আমার বন্ধু ডাঃ আলমের ঐখানে গিয়ে কালই একবার পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হতে হবে !
চারিদিকে এত কোলাহলের মাঝেও আড়তটাকে খুব বেশী নীরব মনে হচ্ছে । আমি জামসেদ সাহেবের চেহারায় একজন বিষণ্ণ যুবককে আবিস্কার করলাম, যার চোখের কোণে মৃত স্ত্রীর জন্য এতবছর পরেও পানি জমে। তাকে দেখে আমার নিজেরই কষ্ট হচ্ছে । ভেবেছিলাম আর কিছু জানতে চাইব না কিন্তু প্রবল কৌতূহলের কাছে আবারো পরাজিত হলাম ।
-আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমাকে কি বলা যায় কিভাবে উনি মারা গেলেন?
-আমি নিজেও জানি না ! ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি ।
-মানে? আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম ।
-মানে বললে তুমি বিশ্বাস করবা না। তোমরা আজকালকার ছাওয়াল, পরে এগুলো নিয়ে হাসাহাসি করবা। আমার পারুলের আত্মা কষ্ট পাইব তাইলে ।
-আপনি আমার বাবার বয়সী,কি বলব বুঝতে পারছি না । আসলে আপনাদের দুজনের ছবি দেখে আমি কল্পনাও করতে পারিনি, উনি বেঁচে নেই ।
-তুমি মিয়া চালাক আদমি । মায়া লাগাইতে জান, শুন তাইলে! আবারো বলি কথার মাঝে বাঁধা দিবা না ।
আমি এইবার আগ্রহের সাথেই মাথা নাড়ালাম ।
৩
পারুল যেইদিন মারা যায় সেইদিনটা ছিল মঙ্গলবার, আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী । আব্বাজান, মানে পারুলের আব্বা ছিলেন শৌখিন মানুষ । তিনি বিবাহ বার্ষিকী পালন করবেন বলে ঠিক করলেন, ৩ মেয়ে আর মেয়ের জামাইদেরকে দাওয়াত দিলেন এই উপলক্ষে তার ঘরে মেহমান হওয়ার জন্য । সবাই আমার আগেই হাজির হল । মেঝ আপা আর পারুলের দুলাভাই আগের দিন এসেছিল, বড় আপা তার জামাইকে নিয়ে সেদিন সকালেই হাজির হয়েছিলেন । আমার শাশুড়ি একলা মানুষ এতজনের রান্না একা করতে পারবেন না তাই ।
ব্যবসার কারনে ওদের গ্রামে পৌছাতে আমার প্রায় রাত ৮ টার মত বেজে গেল । রিক্সায় বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমি পারুলের জন্য কেনা টিয়া রঙের শাড়ির প্যাকেটটা দেখছিলাম । অবশ্য আমার কাপড় চোপড় কিনার রুচি নিয়ে সে সুযোগ পেলেই মস্করা করত । রিক্সাটা বাজারে ঢুকতেই আমি অবাক হলাম, মানুষ গিজগিজ করছে । সেই সময় গ্রামের বাজারে এত রাত পর্যন্ত মানুষ থাকত না । আমি রিক্সাওয়ালার পিঠে হাত দিয়ে ইশারা করতেই সে রিক্সার গতি কমিয়ে দিল । একজন মাঝ বয়সি মানুষের কাছে আমি জানতে চাইলামঃ চাচা ঘটনাটা কি, গ্রামে ইলেকশান নাকি?
-মিয়া কেয়ামত হয়ে গেল, আর তুমি জিগাও ঘটনা কি? সীরাজ পাটোয়ারির ছোট মাইয়ার লাশ পুকুরের পানিতে ভাইসা উঠছে । জানাজা দিতে পারতাছে না, মাইয়ার জামাই রওনা দিছে, এখনও পথে! আহারে জীবন, গত আশ্বিনে বিয়া হইছিল মাইয়াটার, হলুদের দাগ ঠিকমত মুছে নাই আইজও!
আমি লাফ দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে উন্মাদের মত দৌড় দিলাম, আমার পারুল লাশের খাটিয়ায় শুয়ে ছিল সাদা কাপড় পরে । তার গোলাপি ঠোঁট নীল হয়ে গিয়েছিল মৃত্যু যন্ত্রণায়, আধখোলা চোখগুলোতে কেমন যেন ভয় আর অবিশ্বাসের ছাপ ছিল । আমি তার কাফনের কাপড় ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছিলাম পাগলের মত । শেষ পর্যন্ত ইমাম সাহেবর কথায় টিয়া রঙের শাড়িটা তার কাফনের উপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল । মনে হয় বছরখানেক উন্মাদ ছিলাম, সারাদিন কবরের কাছে বসে থাকতাম আর ফিসফিস করে পারুল আর আমার খোকার সাথে কথা বলতে চাইতাম । খোকার বয়স তখন মাত্র দেড় মাস । পারুল বলত তার ছেলেই হবে, অবশ্য আমি চাইতাম মেয়ে হোক। ঘরের প্রথম সন্তান মেয়ে হলে সংসারে সুখের নূর লাগে । আমরা কাউকে জানাইনি । ভেবেছিলাম ওইদিনই সবাইকে চমকে দিব । এরপর মা আমাকে তার বোনের মেয়ের সাথে বিয়ে দেয় । আবার সংসার শুরু করি আমি, জীবনটা কোনমতে পার করা আরকি, আমার জানতো কবজ হয়েছে পারুলের সাথেই!
আমি আমার মস্তিষ্কের বিয়ারিং গুলোকে সজোরে একটা ঝাঁকি দিয়ে আবার একটা প্রশ্ন করলামঃ আচ্ছা উনি কি সাঁতার জানতেন না?
-তুমি দেখি আজিব কিসিমের প্রশ্ন কর, গ্রামের মাইয়া সাঁতরাইতে জানবে না মানে ? পারুল যদি সুযোগ পেত তাহলে ডাকাতিয়া নদী পার করত সাঁতার কেটে !
- তাইলে কি আত্নহত্যা ? গাধার মত প্রশ্নটা করেই উনার চেহারার দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম এখুনি উঠে একটা দৌড় লাগাব দরজার দিকে ।
- অসম্বভ, আমার পারুল কক্ষন এমন করবে না ! পারুলের ঘাড় মটকানো ছিল,লম্বা চুল পেঁচিয়ে তার শ্বাসরোধ করা হয়েছিল । তার গলায় আর বুকে বড় নখের দাগ পাওয়া গিয়েছিল! জামশেদ সাহেব ক্রোধে ফেটে পড়ছেন ।
- আপনারা থানা পুলিশ করেন নি ?
- ওদের বাড়ির লোকজন পুলিশে খবর দিতে দেয় নি, বংশের সুনাম নষ্টের অজুহাতে !
- তাহলে এত বড় একটা ঘটনা ধামাচাপা পড়ল কীভাবে?
- গ্রামের লোকজন রটিয়ে দিল তাকে জ্বীনভূত গোত্রের কেউ হত্যা করেছে । গ্রামের লোকজনের কাছে চন্দ্রে যাওয়া অসম্ভব হলেও জ্বীনভুতে মানুষ মারতে পারে, এমন কল্পনা অসম্ভব কিছু না । নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে জবাব দিলেন জামসেদ সাহেব ।
আমি কাশির শব্দে হাসি চাপা দিয়ে জানতে চাইলামঃ এমন গুজব ছড়ানোর কারন?
- শুনেছি আমার শ্বশুর মহাশয়ের দুইটা পোষা জ্বীন ছিল। তারা আবার সম্পর্কে নানা-নাতি! ওই নাতি জ্বীনটা নাকি পারুলকে খুব পছন্দ করত, বিয়ে করতে চাইত ! তার নাম ছিল বাহার টুংকা, বয়সঃ ৩০০ বছর আর নানার নাম ছিল চান টুংকা তার বয়সঃ ৭০০ বছর ! শ্বশুর মহাশয় বলতেন টুংকা বিশেষ সম্মানিত বংশের জ্বীন প্রজাতি । এরা মানুষের বেশে আহার, নিদ্রা, বিয়ে, সব করে । এদের কেউ কেউ আবার স্কুল কলেজেও পড়ে !
- এইটা কেমনে সম্ভব? জ্বীন, তাও পালা, আবার সে বিয়াও করতে চায় ! আচ্ছা যাই হোক, সবাই কেমনে জানলো এই ইচ্ছার কথা ? নাতিটা কি নীল রঙের গোলাপ ফুল নিয়ে আসত পারুলের জন্য ? আমি হালকা তামাশা জামসেদ সাহেব ধরতে পারলেন না ।
- আরে, তুমি তো দেখি রামছাগল! জ্বীন আবার আসে কেমনে ? সে আমার শ্বশুরের শরীরে নিজে এসে ভর করত শনিবার আর মঙ্গলবার রাতে । জ্বীন আসার সময় পুরা ঘর কাঁপত, উনি দাতে দাঁত চেপে অজ্ঞান হয়ে যেতেন। এরপর যখন জ্ঞান আসত তখন তার গলার স্বর অন্যরকম হয়ে যেত । ঘ্যাশঘ্যাষা স্বরে কথা বলতেন তিনি। সেই সময় যে যা জানতে চাইত সব কথারই উত্তর দিত ওই সবজান্তা জ্বীনের নাতি । সেই রকমি এক রাতে নাকি জানিয়েছিল জ্বীনের নাতি তার আজন্ম বাসনা !
মনের অজান্তেই আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলঃ খাইছেরে ! আপনিও কি এইগুলো বিশ্বাস করেছেন ?
জামসেদ সাহেব একটু করে সুপারি মুখে ঢুকিয়ে বললেনঃ দেখ, এইগুলা সব গ্রামের মানুষের মুখে শুনেছি আমি । তারা নাকি বাস্তব চাক্ষুস সাক্ষী এই ঘটনা গুলোর !
- আপনি আপনার শশুরকে জিজ্ঞেস করলেই পারতেন সত্য-মিথ্যা?
জামসেদ সাহেব আফসোস করে বললেনঃ পারুলের মৃত্যুর পর জ্বীনের নাতি বাহার টুংকা আর কখনো আসেনি আমার শ্বশুরের কাছে !
আমি খুব গভীর ভাবে জামসেদ সাহেবের চোখে তাকালাম, সেখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কোন ছায়া নেই !
কিছুক্ষন এদিক সেদিক তাকিয়ে, কথাটা বৃদ্ধকে বলব না ভাবতে ভাবতেই বলে ফেললামঃ আমার কি মনে হয় জানেন? আপনার স্ত্রীকে খুব পরিচিত কেউ খুন করেছে!
- কেন মনে হচ্ছে এমন কথা? জামসেদ সাহেব চমকে উঠলেন !
- গ্রামের পুকুর গুলো সাধারনত ভিটার খুব কাছাকাছি হয়, অপরিচিত কেউ হলে নিশ্চিত উনি চিৎকার দিতেন অথবা পানিতে ধস্তাধস্তির শব্দ পাওয়া যেত কোন ! তার উপর উনাকে মারা হয়েছে ঠিক মাগরিবের পরপর, সেই সময় তো গ্রামের পুকুরে কেউ না কেউ অজু করতে আসবেই ।
- হুম্ম তোমার কথায় যুক্তি আছে । একটা বিষয়ে আমিও অবাক হয়েছিলাম, পারুলদের পুকুরে তখন হাঁটু পানি ছিল,মাছ ধরার জন্য পানি সেঁচে ফেলা হয়েছিল। কোন ভাবেই এই পানিতে কাউকে চুবিয়ে মারা সম্ভব না। তার উপর ওর লাশ পাওয়া গিয়েছিল কাঠের ঘাটলার ঠিক নিচে মাথা ঢুকান অবস্থায় । আমারও মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় এমন কিছুই হয়েছে ।
- আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন ?
- নাহ আমি যা জানি সব লোকমুখেই শুনেছি পারুল মারা যাওয়ার পর । তাও তোমাকে বলি কিছু বিষয় । ওসমান নামে পারুলের এক খালাত ভাই ওকে খুব পছন্দ করত, পাশের গ্রামেই থাকত সে। হুমকি দিয়েছিল পারুলকে বিয়ে না দিলে তুলে নিয়ে যাবে ! খুব অল্প কিছু ঘনিষ্ট আত্মীয়ের মতে সে ও হত্যাকারী হতে পারে।
আমার কাছে এখন কিছুটা স্বস্তি লাগছে, যাক একটা কারন না হয় বের করা গেল। টুংকা বংশের অতি নগন্য জ্বীনের নাতি আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ মেরে ফেলবে এটা কেমন যেন আরব্য রজনীর কেচ্ছার মত লাগছিল শুনতে।
- আপনার কি মনে হয়?
- উনি ঢাকায় চাকরী করতেন কিন্তু, পারুল যেদিন মারা যায় সেদিন গ্রামেই ছিলেন । আমি পৌছানোর আগেই ওসমান সাহেব পারুলের খালাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল ! আমার এখন স্পষ্ট মনে আছে তার রবারের জুতোয় কাদা লেগে ছিল । তবে সে হাউমাউ করে কান্না করছিল ।
- এটা তো অস্বাভাবিক কিছু না, গ্রামের রাস্তায় কাদা থাকতেই পারে, আর ঢাকায় চাকরী করলে যে গ্রামে আসা যাবে না এটা কেমন কথা ?
- হুম্ম তা ঠিক, তবে পারুলদের পাশের ঘরের বুড়ী নানীটা বলছিলেন উনি কোন একজন পুরুষ মানুষকে আজানের পর ওই পুকুর ঘাট থেকে খুব দ্রুত উঠে যেতে দেখেছেন ।
- জামসেদ সাহেব, এটা কোন ঘটনা হতে পারে না, বুড়ো মানুষ এমনিতেই চোখে কম দেখে, তার উপর সেটা ছিল মাগরিবের সময় । তখন দ্রুতই অজু করে মানুষ । ঘটনা যা শুনলাম তাতে একটা ব্যাপার নিশ্চিত উনাকে অন্যকোথাও মেরে পুকুর ঘাটের নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ।
ঠিক এমন সময় ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল । সন্ধ্যা হয়ে আসছে, সেই দুপুরে এসেছিলাম এখানে। পেটের মধ্যে গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে খিধায় । কিন্তু এমন আলোচনা ছেড়ে চলে যেতেও ইচ্ছে হচ্ছে না । জামসেদ সাহেব চুপচাপ সিলিং ফ্যানের থেমে যাওয়া দেখলেন। তারপর বললেনঃ আমি আসলে কি কারনে বেঁচে আছি জান ?
আমি আস্তে করে মাথা নেড়ে বোঝালাম জানি না । অবশ্য জোরে মাথা নাড়ানোর শক্তিও নেই ।
- পারুল বাসর রাতেই আমাকে বলেছিল, ‘আপনাকে একটা কথা বলব আমি, শুনে আমাকে ভুল বুঝবেন না তো?’ আসলে আমি খুব ভীতু ছিলাম । ভাবতাম পারুল কি না কি বলে আবার । তাই বলতাম, ‘ বলার কোন প্রয়োজন নেই, আমি কখনই তোমাকে ভুল বুঝব না ।’ এরপর যতবারই পারুল এই প্রসঙ্গ তুলত আমি কথা ঘুরিয়ে দিতাম অন্যদিকে । হয়ত সেই রাতেই জানতে চাইতাম ও কি বলতে চায়। পারুলের লাশ দেখার সাথে সাথেই আমার মনে হল এই কথার সাথে তার মারা যাওয়ার কোন না কোন সম্পর্ক আছে । হয়ত কোন একদিন স্বপ্নে পারুল এসে আমাকে না বলা কথাটা বলবে । এখনও পারুল ঠিকই আসে কিন্তু আমি ওই প্রসঙ্গে কথা তুলতেই কেন যেন এড়িয়ে যায় ।
পারুল মারা যাওয়ার প্রায় ৯ বছর পর ওর বড় বোন রেললাইনে আত্নহত্যা করে । এরপরই শুনেছিলাম ওর বড় দুলাভাই লোকটার স্বভাব ভালো ছিল না, কথায় কথায় নাকি বড় আপাকে হুমকি দিত তাকে তালাক দিয়ে পারুলকে বিয়ে করবেন । পারুল যেই দিন মারা যায় সেইদিন ও নাকি তুমুল ঝগড়া হয়েছিল স্বামী-স্ত্রীর মাঝে । তখনও সেই লোক বলছিলঃ ‘তোরে ছাইড়া পারুলে বিয়া করলেই ভাল হইত’ ! আমার শ্বশুর মহাশয় বড় মেয়ের সংসার টেকানোর জন্য পারুলকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়েছিলেন , কিন্তু পারলেন না শেষ পর্যন্ত । ওই লোকটা ঠিকই আর একটা বিয়ে করে নতুন বউ ঘরে উঠায় । আপা এটা সহ্য করতে পারেন নি । জামশেদ সাহেবের কপাল চিকচিক করছে মোমের আলোয় । এতই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে এর মাঝেই কেউ এসে মোমবাতি জ্বালিয়ে সামনে বেলা বিস্কিট আর চা রেখে গিয়েছে খেয়ালই করিনি।
- কিন্তু এর সাথে হত্যাকাণ্ডের কি সম্পর্ক ? আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে !
- হত্যাকাণ্ডের দিন পারুলের বড় দুলাভাই ঘরেই ছিলেন ! জামসেদ সাহেবের শ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি ।
- আপনি কি উল্টা-পাল্টা কিছু হয়েছিল ভাবছেন ? আমার গলা শুকিয়ে কাঠ , হাতের তালু ঘেমে গিয়েছে ।
- খবরদার ,খবরদার ! আমার পারুলের নামে উল্টা-পাল্টা কিছু বলবা না, লাশ ফেলে দিব তাহলে । আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল জামসেদ সাহেবের চিৎকার শুনে !
আমি জড়সড় হয়ে চেয়ারের এক কোনে চুপচাপ বসে ছিলাম যেন অনন্তকাল ধরে । কথা বলার সাহস হচ্ছিল না ! আমার অবস্থা দেখেই হয়ত মায়া হল তার । অভয় দিয়ে দূর ছাই ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন, থাক বাবা তুমি খামোখা কিচ্ছু মনে করো না । আমি এরকম ভাবেই কথা বলি, আসলে পারুলের গল্প শেষ কার কাছে করেছিলাম মনে নেই, তোমাকে দেখে আপন ছেলের মনে হল তাই এত কথা বললাম ।
আমি কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে বললামঃ আমাকে যদি নিজের ছেলের মতই মনে হয় তাহলে কি বলা যায় না, আসলে কে খুন করেছে বলে মনে হয় আপনার?
- এই প্রশ্নের সব উত্তর ওই পারুলের না বলা কথার মধ্যেই ছিল ! যা আর কখনই জানা সম্ভব হবে না । তবে আমার মনে একটা খটকা আছে!
জামসেদ সাহেব আসলে কি বলতে চান? কিছুই বুঝতে পারছি না । কেমন যেন গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি আমি ।
– কি খটকা ? এমন মেয়েলি স্বরে আমি জিজ্ঞেস করলাম যে জামসেদ সাহেব শুনেছেন বলে আমার মনে হয় না।
– সেদিন পারুলের বড় আপাকে কিন্তু আমি একটুও কাঁদতে দেখিনি ! উনি চুপচাপ বসে ছিলেন পারুলের খাটিয়ার পাশে!
- হতেই পারে ! অধিক শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন হয়ত ।
- নাহ উনি কেমন যেন ভীত চোখে তাকিয়ে ছিলেন পারুলের দিকে, আর আপার পরনে ছিল একেবারে নতুন শাড়ি । সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যার দিকেই উনি গোসল করেছেন । জানো ? পারুল উনাকে খুব আদর করে আপুনি বলে ডাকত ।
এতটুকু বলে জামসেদ সাহেব এত জোরে হো হো করে খ্যাপা মানুষের মত হাসতে লাগলেন যে , তাকে আমার অপ্রকৃতস্থ একজন বৃদ্ধ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছিল না । হাসির সাথে চোখ উপচে পানি ঝরছিল তার !
৪
আমি ঘোরের মধ্যেই ঘরে ফিরে এসে খালিপেটে সোজা বিছানায় লুটিয়ে পরলাম । সারাদিনে যে ধকল গিয়েছে ব্রেনের উপর তার মাশুলেই হয়ত শোয়া মাত্র অচেতন হয়ে গেলাম।
ঠিক কি কারনে মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল বুঝতে পারছি না । স্বপ্ন-টপ্ন দেখেছি হয়ত । কিন্তু মাথাটা এখন ঠিক ঠাক কাজ করছে, পরিস্কার চিন্তা করতে পারছি সব । তাহলে কি পারুলের বড় বোনই আসল খুনি ? একজন মহিলার পক্ষে কি একলা খালি হাতে আর একজন মহিলাকে খুন করা সম্ভব ? জামসেদ সাহেবের বলা সব ঘটনাগুলো মাথায় ঘুরছে । হঠাৎ করেই বুঝতে পারলাম খুনিটা কে !
জামসেদ সাহেব কঠিন ধুরন্দর মানুষ, না হলে কি আর এত বড় চালের আড়ত সামলান ! কি অদ্ভুত, কি ভয়ানক ! একের পর এক সুন্দর কাহিনি সাজিয়ে আমাকে বোকা বানালেন । ফাঁসির আসামি হওয়ার বদলে বছর দুয়েক পাগলের অভিনয় তেমন কঠিন কিছু না । কিশোরী পারুলের জন্য আমার আফসোস হচ্ছে । বোকা মেয়েটা এই সরল সূত্রটা জানত না যে, কিছু নির্মম সত্য ভালবাসার মানুষকে জানাতে নেই, খুব তীব্র ভালবাসা আশাভঙ্গের বেদনায় যদি তীব্র ক্ষোভে পরিণত হয় তখন শয়তান আর মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকেনা । পারুলের দুলাভাই কি সত্যিই কোন অঘটন ঘটিয়েছিল? নাহয় আমি ইঙ্গিত দিতেই জামসেদ সাহেব ওভাবে রেগে গেলেন কেন ? এই গোপন কথাই পারুল তাকে বলাতে তিনি হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে খুন করে ফেলেন পারুলকে?
সকাল ১০টা ।
জামসেদ সাহেবের আড়তে বসে আছি । তার হো হো হাসির শব্দে পুরো আড়ত গমগম করছে । গতকাল রাতের উদ্ভট কল্পনাগুলো দিনের আলোতে নিজের কাছেই কেমন যেন হাস্যকর লাগছে । জামসেদ সাহেব আসলেই ভালো মানুষ , অমায়িক মিশুক লোকটাকে সবাই খুব সম্মান করে । যে মানুষটা এত প্রানখুলে হাসতে পারে, সে কি কখনও খুন করতে পারে ?
কিন্তু খুনিটা তাহলে কে ?
========
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now