বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভুল মেসেজের আলো

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। বৃষ্টি থেমেছে মাত্র। গ্রামের আকাশে তখনো ঝুলে আছে মেঘের ছায়া, বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধ। সরলা, বছর পঁইত্রিশের এক বিধবা নারী, বারান্দায় বসে ছিলেন শূন্য চোখে। গতকালই তিনি স্বামী অরুণকে হারিয়েছেন। হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিঃশ্বাস থেমে গেল। সরলার পৃথিবী যেন মুহূর্তেই ভেঙে গেল। চারপাশে অনেক মানুষ, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—সবাই সান্ত্বনা দিতে এলেও তার বুকের শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারছিল না। ঠিক সেই সময় মোবাইল ফোনে একটি শব্দ ভেসে এলো। সরলা অবাক হয়ে দেখলেন—একটি মেসেজ এসেছে। হাতে তুলে নিতেই চোখ কাঁপতে লাগল। মেসেজে লেখা— “আমার প্রিয় বউ! আমি ঠিকঠাক মতোই পৌঁছেছি! আমি জানি তুমি আমার কাছ থেকে মেসেজ আশা করোনি। এখানেও আজকাল মোবাইল ফোন এসে পড়েছে! আমি আসার সাথে সাথে তারা আমাকে একটি মোবাইল ফোন গিফট করেছে! সেই মোবাইল থেকেই তোমাকে মেসেজ পাঠালাম! তুমি জেনে খুশি হবে যে, তারা সবাই এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে! আশা করা যায় কাল-পরশুর মধ্যেই তুমিও চলে আসবে! আশা করি তোমার যাত্রাও হবে আমার মতো সুখের! তোমার অপেক্ষায় রইলাম!—ইতি, তোমার প্রিয় স্বামী।” এক মুহূর্তে সরলার দুনিয়া ঘুরে গেল। তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। পাশের ঘরে থাকা তার ছোট ভাইপো রাহাত দৌড়ে এলো। তাকে জ্ঞান ফিরিয়ে দেওয়ার পর সরলা অশ্রুসজল চোখে কেবল বলছিলেন—“দাদা! অরুণ কি সত্যি মেসেজ পাঠিয়েছে?” রাহাত দ্রুত ফোন হাতে নিল। কিছুটা খোঁজখবর নিয়েই বোঝা গেল—এটি ভুলবশত পাঠানো একটি বার্তা। এক লোক তার স্ত্রীকে পাঠাতে গিয়ে ভুল করে সরলার নম্বরে পাঠিয়েছে। প্রথমে সরলার মনে হলো—এ কেমন নিষ্ঠুর খেলা! কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি অনুভব করলেন, হয়তো এই মেসেজই তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে। যদি সত্যিই অরুণ অন্য কোথাও ভালো থাকে, তবে কি তার নিজেরও নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করা উচিত নয়? সেই রাতটা সরলা নির্ঘুম কাটালেন। অরুণের স্মৃতি, শেষ আলাপ, চোখের ভাসা হাসি—সব একে একে ফিরে এল। কিন্তু এর মাঝেই মনের ভেতর জন্ম নিল এক নতুন চিন্তা। যদি জীবন সত্যিই চলমান হয়, তবে কি তিনি কেবল অন্ধকারে ডুবে থাকবেন? পরদিন সকালে গ্রামের স্কুল থেকে খবর এলো—সরকারি সহায়তায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু দরিদ্র শিশুর জন্য একজন শিক্ষিকা দরকার। খবর শুনে সরলা থমকে গেলেন। তিনি একসময় কলেজে পড়ালেখায় ভালো ছিলেন, কিন্তু সংসারের টানে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। স্বামী চলে যাওয়ার পর জীবন যেন থেমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হলো—এই সুযোগই হয়তো তাকে আবার দাঁড়াতে সাহায্য করবে। তিনি স্কুলে গেলেন। হেডমাস্টার প্রথমে অবাক হলেও তার আন্তরিকতা দেখে তাঁকে দায়িত্ব দিলেন। সরলার প্রথম দিনেই ক্লাসে ঢোকার সময় শিশুদের কোলাহল থেমে গেল। শিশুরা অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। সরলা ধীরে ধীরে বই খুলে বললেন—“শিক্ষা মানে শুধু মুখস্থ করা নয়, শিক্ষা মানে জীবনকে নতুন করে বাঁচতে শেখা।” সেই মুহূর্ত থেকে সরলার জীবনে যেন এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল। প্রতিদিন সকালবেলা তিনি স্কুলে যেতেন, শিশুদের পড়াতেন। তাদের চোখে যখন আনন্দের ঝিলিক দেখতেন, তখন মনে হতো—অরুণের দেওয়া মেসেজটি হয়তো তাকে এই পথেই ঠেলে দিয়েছে। গ্রামের মানুষও ধীরে ধীরে সরলাকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করল। যাকে সবাই ভেবেছিল সারাজীবন একা কাঁদবে, সেই সরলাই এখন শিশুদের ভবিষ্যতের আলো হয়ে উঠেছে। রাহাত একদিন খালাকে জিজ্ঞেস করল—“খালা, তুমি কি এখনো দুলাভাইকে খুব মিস করো?” সরলা হেসে বললেন—“হ্যাঁ রে, মিস তো করি। তবে জানিস, আমি মনে করি, ও হয়তো আমাকে সেই মেসেজের মাধ্যমে বলতে চেয়েছিল—আমি যেন আর থেমে না থাকি। জীবনকে নতুন করে শুরু করি।” বছর ঘুরে গেল। সরলার স্কুল থেকে অনেক শিশু মাধ্যমিকে ভর্তি হলো। কেউ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখল, কেউ শিক্ষক হওয়ার। গ্রামের মেয়েরাও সরলাকে দেখে অনুপ্রাণিত হলো। আগে যারা পড়াশোনার কথা ভাবত না, তারাও এখন বই হাতে নিয়ে স্কুলে ছুটে আসে। একদিন সরকারি এক কর্মকর্তা গ্রামে এলো। সরলার কাজ দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। তিনি বললেন—“মহিলা, আপনি শুধু গ্রামের শিশুদেরই নয়, পুরো সমাজের আলো হয়ে উঠেছেন।” সরলার চোখ ভিজে গেল। মনে হলো অরুণ যেন দূর থেকে তাকিয়ে আছে, হাসছে, বলছে—“দেখো, তুমি থেমে যাওনি। তুমি আলো ছড়াচ্ছ।” সন্ধ্যা নামছিল। সরলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। বাতাসে আবার মেঘ জমছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন—“অরুণ, তুমি হয়তো দূরে আছো, কিন্তু তোমার সেই ভুল মেসেজই আমাকে নতুন জীবনের পথ দেখিয়েছে। আমি বেঁচে থাকব শিশুদের মাঝে, শিক্ষার আলোয়।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ভুল মেসেজের আলো

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now