বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার পূর্ব দিকে বিস্তীর্ণ ধানের খেত, মাঝে মাঝে শিউলি আর কাশবন ভেদ করে চলে যাওয়া সরু মাটির পথ। পাখির ডাক আর সকালের শিশির মিলে এক প্রশান্ত পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। সেই গ্রামের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট টিনশেড মসজিদ। মসজিদটি খুব বড় নয়, তবে গ্রামের মানুষের আস্থা আর ভালোবাসায় ভরপুর। এখানেই ইমাম হাফেজ আবদুল মালেক প্রতিদিন নামাজ পড়ান। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, তবে মুখে শান্তির ছাপ স্পষ্ট। মানুষ তাঁকে শুধু ইমাম হিসেবেই নয়, একজন অভিভাবক হিসেবেও মানে।
শুক্রবারে মসজিদে মানুষের ঢল নামে। সেই দিন গ্রামের লোকেরা একটু বেশি করে আসে, নামাজ পড়ে তারপর আড্ডা দেয়। ওই দিন ইমাম মালেক খুতবায় এমন এক প্রসঙ্গ তুললেন যা গ্রামের লোকজনকে চমকে দিল। তিনি বললেন, “ভাইয়েরা, আমরা অনেক সময় ধরে ভুল পথে চলছি। আমরা মনে করি সংসারের কাজ কেবল মেয়েদের দায়িত্ব। অথচ আমাদের নবীজি (সা.) নিজ হাতে কাপড় সেলাই করতেন, গৃহস্থালির কাজে সহায়তা করতেন। স্ত্রীর পাশে না দাঁড়ালে, সাহায্য না করলে কেউ ভালো মুসলিম হতে পারে না।”
কথাটা শোনার পর মসজিদে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এমন কথা গ্রামের লোকেরা আগে খুব কম শুনেছে। কড়ই গাছতলায় আড্ডায় বসা এক যুবক বন্ধুকে কানে কানে বলল, “ইমাম সাহেবের কথাগুলো কেমন অদ্ভুত না?” পাশে বসা আরেকজন ধীর গলায় বলল, “অদ্ভুত নয়, সত্যি কথা। তবে মানতে কষ্ট হয়।”
মসজিদের পেছনের সারিতে বসে ছিলেন রশিদ মিয়া। বয়স পঁচানব্বই, চুলের রঙ সাদা, শরীর ঝুঁকে পড়েছে। তাঁর সংসার বড়—তিন ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে শহরে চাকরি করে, মাঝের ছেলে বিদেশে, আর ছোট ছেলে জাহিদ গ্রামেই থাকে। জাহিদের স্ত্রী তখন গর্ভবতী। পরিবারে আলোচনা হচ্ছিল সন্তান জন্ম কোথায় হবে। জাহিদ বলল, “বাড়িতেই দাই দিয়ে করানো যাক, খরচ কম হবে।”
রশিদ মিয়ার মনে তখন ইমাম মালেকের কথাগুলো ভাসছিল। তিনি নীরবে ছেলেকে ডেকে নিলেন। কণ্ঠে কোমলতা, চোখে দৃঢ়তা—“বাবা, খরচের কথা ভেবো না। তোমার বউ আর নাতি-নাতনির জীবন তার চেয়ে দামি। হাসপাতালে নিয়ে যাও।”
জাহিদ একটু বিরক্ত মুখে বলল, “আব্বা, হাসপাতালে গেলে অনেক খরচ হবে।”
রশিদ শান্তভাবে বললেন, “খরচ যা হয় হোক, আমি দেব। আল্লাহর কসম, এই কাজই আমাদের জন্য সওয়াব।”
শেষ পর্যন্ত বাবার জেদের কাছে জাহিদ হার মানল। হাসপাতালে ডেলিভারি হলো। সুস্থ সন্তানের কান্না শুনে পরিবারে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। বাড়ি ফেরার পর জাহিদ বাবার হাত ধরে বলল, “আব্বা, আপনি না বললে আমি হয়তো বুঝতেই পারতাম না স্ত্রীর জীবনের মূল্য কতটা।” সেই মুহূর্তে রশিদের বুক ভরে গেল অদ্ভুত এক শান্তিতে।
কিছুদিন পরেই গ্রামের মাদ্রাসার আঙিনায় শুরু হলো নতুন উদ্যোগ—“ভালো স্বামীর পাঠশালা।” স্থানীয় এক এনজিও জাতিসংঘের সহায়তায় এই প্রকল্প চালু করল। গ্রামের মানুষ প্রথমে ভেবেছিল অদ্ভুত কিছু হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝল এ এক আলোর দিশা।
পাঠশালার প্রথম ক্লাসে উপস্থিত হলো গ্রামের কৃষক, দোকানি, হাটের ব্যবসায়ী, তরুণ ছাত্র এমনকি বয়স্ক মানুষও। খোলা আঙিনায় পাটের মাদুর পেতে সবাই বসল। সামনে দাঁড়িয়ে ইমাম মালেক শান্ত কণ্ঠে বললেন, “ভাইয়েরা, আপনারা যদি স্ত্রীর পাশে দাঁড়ান, তবে পরিবারে শান্তি আসবে। আর পরিবারে শান্তি মানে সমাজে শান্তি। আপনারা যদি বউকে সম্মান দেন, সন্তানরাও শিখবে নারীদের সম্মান করতে।”
একজন কৃষক হাত তুলে প্রশ্ন করল, “ইমাম সাহেব, আমি যদি রান্নাঘরে ঢুকে ভাত দিই, লোকে হাসাহাসি করবে না?”
ইমাম মালেক হেসে বললেন, “লোক যা খুশি বলুক। নবীজি (সা.) রান্নাঘরে ঢুকেছেন, কাপড় সেলাই করেছেন। তাহলে হাসাহাসি করলে তারা কারো সাথে হাসাহাসি করছে জানেন? নবীজির সাথে।”
কথাটা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। কৃষকের চোখে পানি চলে এলো।
দিন গড়াতে লাগল। কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রামে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। আগে যেখানে নারীরা একা হেঁসেলে ব্যস্ত থাকতেন, এখন দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী মিলে রান্না করছেন। বাজারে যাওয়ার আগে স্বামীরা স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করছেন। অনেক বাবা নিজের হাতে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন। সন্ধ্যায় আড্ডার টেবিলে হাসাহাসির বিষয় বদলে গেল। এখন আলোচনায় উঠে আসে—কে কীভাবে স্ত্রীর পাশে দাঁড়াচ্ছে, সন্তানকে কেমন সময় দিচ্ছে।
ফাতেমা নামের এক গৃহবধূ আনন্দে বললেন, “আগে আমার স্বামী আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করত না। এখন সে বাজারে কী কিনবে, কোন জমি লিজ নেবে—সবই আমার সাথে আলোচনা করে। আমার জীবন যেনো নতুন হয়ে গেছে।”
গ্রামের অন্য নারীরাও যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল। আগে তারা যেখানে চুপচাপ সবকিছু মেনে নিত, এখন তারা নিজেদের মতামত জানানোর সাহস পেল। স্বামীদের চোখেও তারা আর শুধু ঘরের কাজের মানুষ নয়, তারা হয়ে উঠল প্রকৃত সঙ্গী।
এক বিকেলে মসজিদের আঙিনায় ইমাম মালেক বসেছিলেন কয়েকজন যুবকের সাথে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। যুবকরা উচ্ছ্বাস ভরে বলছিল, “হুজুর, এখন আমরা বুঝেছি, স্বামী হওয়া মানে শুধু কর্তৃত্ব করা নয়। আসল স্বামী সে-ই, যে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায়।”
ইমাম মালেক মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হলো অন্ধকার আকাশের ভেতর দিয়ে যেন আলো ঝলমল করছে। তিনি মনের ভেতর প্রার্থনা করলেন, “যদি বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এমন পাঠশালা হয়, তবে সমাজটা বদলে যাবে। পুরুষ আর নারী মিলেই হবে প্রকৃত সংসার, প্রকৃত শান্তি।”
সেই সন্ধ্যায় গ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়াল পরিবর্তনের গান। শিশুর হাসি, নারীর মুখে তৃপ্তির আলো আর পুরুষের চোখে দায়িত্বের দীপ্তি—সব মিলিয়ে তিতাসের গ্রাম যেন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now