বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বাংলা জয়নাল স্যারের কথা মনে আছে তৃণা তোর? কিভাবে তার নাম মরাচড়া স্যার হয়েছিল? প্রাইভেট পড়া শেষে ফিরার পথে লুঙ্গি পড়া স্যারকে সালাম দিতেই উনি আবৃত্তি স্বরে বলে ছিলেন "আরে তোমরা, বাজার বসে গিয়েছে এখনো বাসায় যাওনি?"
[মরাচড়া স্যার ও মাছ ওয়ালা]
-তেলাপিয়ার মূল্য কত ভাই?
-১৩০ টাকা স্যার।
- কি বলছো ! একে তো মরা, তার উপর দাম চড়া ! দেখেছো মেয়েরা।(আবৃত্তি ভঙ্গিমায়)
আমিই বলছি, আমিই হাসছি। কিন্তু যাকে হাসাতে এই স্মৃতিচারণ, সেই তৃণার মুখে হাসির রেখাটা টানতে পারছিলাম না। সেই হাসোজ্জল তৃণাকে আমি পাচ্ছিলাম না। আমরা তিনজন খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। আমি, সায়েম, তৃণা । এখনো আছি তবে সেই সময়ের মত কারণে-অকারণে যোগাযোগ আর হয় না। ভাবলাম সায়েমের কথা বলি যদি একটু প্রান খুলে হাসে। আমাদের ক্লাস পার্টিতে জয়নাল স্যারের গলা নকল করা সায়েম অভিনয় করেছিল। আমি তো মনে পড়লেই নিজে নিজে হাসি।
" বাংলা, বিহার, উড়িস্যা আমি দেখিতে চাই না, আমি ঘোমটা তুলিয়া তোমার মুখখানা দেখিতে চাই। দোহাই তোমার ওগো সোনা বউ। কে আমায় আশা দিবে, কে আমায় ভরসা দিবে। চারদিকে দূর্যোগের ঘনঘটা, তুমি লজ্জা পাইলে, আমি যাব কোথা?"
মেয়েটা কেমন যেন একেবারে ঘুটিয়ে গেছে। ডিভোর্স হয়েছে কিছুদিন আগে, এখন তৃণা ভাই-ভাবী সাথে আছে। গত বছরের আগের বছরের সেপ্টেম্বরে মাও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বুকের কষ্ট আর চোখের কোনের জল লুকানোর মত আশ্রয়টা যেন সাথে নিয়ে গেলেন। তৃণার জীবনের পরিবর্তনটাও শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। ওর দ্বিতীয় বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যায় তখন। তারপর শুরু হয় শরীর নিয়ে নানা জটিলতা। ডাক্তারের সাফ কথা " আর মা হতে পারবেন না, হলেও পরিপূর্ণ হবে না"। শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জটিলতাও। জানতে চাইলাম শাহেদ ভাই ডিভোর্সের পর যোগাযোগ করেছে কিনা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল " কাল একটা মেসেজ দিয়েছিল, আমি যেন কোন দরকারে আগে তাকেই স্মরণ করি। যার কাছে আমারই দরকার ফুরিয়ে গেছে । তাকেই আবার আমি আমার দরকার জানাবো। কলমের খোঁচায় সেই অধিকারের জায়গায় থেকে তো সে আমাকে ছেটে ফেলে দিল"।
কথার মাঝখানে ভাবী এসে পড়ে। তৃণাকে ভাইয়া ডাকছে । শাহেদ ভাই নাকি একাউন্টে কাবিনের টাকা পাঠিয়েছে। ভাইয়া এই ব্যাপারে ওর সাথে একটু কথা বলতে চায়। সে চলে যেতেই ভাবী আমাকে এক বাটি সেমাই এগিয়ে দিয়ে বলছিল-
ভাল করেছো এসে। মেয়েটা ঘুরে ঘুরে একই ভাবনা নিয়ে থাকে । বুঝি, হয়ত ভাবতে চাই না। তবু সেই সময় গুলো বার বার মনে ঊঁকি দিয়ে যাচ্ছে। কারো তো হাত নেই। কেউ যে কিছু করতে পারবে, তাও না। শরীর তো সে নিজের হাতে গড়েনি। বাচ্চা আসে আবার চলে যায়, কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বেড রেষ্ট, এমন করতে করতে মাঝখানে গ্রাজুয়েশন টাই শেষ করতে পারল না। শেষ পর্যন্ত শাহেদের সাথে সম্পর্কটাই শেষ হয়ে গেল। সারাদিন বুঝায় যেন এখন আবার শুরু করে দিয়ে, সব ভুলে থাকে। কি হবে মন মরা হয়ে থেকে। সব ছেলেই তো বংশধর চাই। তোমার কি মনে হয়, আমি যদি তার ভাইকে বাচ্চা দিতে না পারতাম । তার ভাই আমাকে নিয়ে সংসার করত? করত না। চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলাম, কথা যেন কিছু বলার নেই। কি বলব ! "খেয়ে যেও রান্না করছি আমি" বলে ভাবী চলে গেলেন।
আর আমি জানালার পাশে দাড়িয়ে আনমনে দেখছিলাম রাস্তায় কয়েকজন বান্ধবী মিলে কত মজা করে যাচ্ছে । এভাবে আমি আর তৃণা কত মজা করে কলেজে যেতাম। চোখে মুখে অনেক কিছু বুঝি আর বড় বড় ভাব এসে গেছে ওদের। কি দেখছিস সামা? পিছন থেকে এসে তৃণা জানতে চায়। বললাম -কিছু না। তুই আসছিস না দেখে ভাবীর দেয়া চা খেতে খেতে মেয়েগুলোকে দেখছিলাম।
-হুম। এখনো ওদের চাহিদা আছে। উপযোগিতাও ভরপুর আছে। কিন্তু কেউ জানে না। কার উপযোগিতা কখন আবার কমে যাবে।
-কি বলছিস এসব।
- সামা তোর মনে আছে একবার অর্থনীতি স্যার আমাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন উপযোগিতা কাকে বলে? দাম সাধ্যের ভেতর এবং যোগান থাকা সত্ত্বেও কখন চাহিদা থাকে না?
-হুম । মনে আছে । তোকে উদাহরণ সহ চিত্র বোর্ডে এঁকে দেখাতে বলেছিল। তুই পারিসনি।
-জানিস, আমি এখন খুব ভাল ভাবে বুঝি উপযোগিতা কি জিনিস। ইচ্ছে করছে এখন গিয়ে স্যারকে উদাহরণ সহ ব্যাখ্যা দিয়ে আসি। জীবন থেকে নেয়া খাটি উদাহরণ।
-কি উদাহরণ?
-তোর মনে থাকার কথা। শাহেদের পরিবার বিয়ের কাবিন দিতে চেয়েছিল পাঁচ লাখ । আর আমার বাবার দাবি ছিল দশ লাখ। বাজারের দরকষাকষির মত দুই পক্ষ সাত লাখে রাজি হয়েছিল। তখন আমার চাহিদা ছিল ওদের কাছে। আর বাবা ছিল যোগানদাতা । ক্রেতা স্বরুপ পাত্র পক্ষ সেদিন আমার জন্য যে সাত লাখ দিতে রাজি হয়েছিল। সেই সাত লাখ হল চাহিদা আর যোগানের ভারসাম্য বিন্দু। আমি ছিলাম কাংখিত সেই প্রোডাক্ট। যা ঔদামে লেনদেন হয়েছিল। পাত্র পক্ষে ভেবেছে তারা জিতেছে, কনে পক্ষ ভেবেছে যাথার্থ মুল্য পাওয়া গিয়েছে। মেয়ের ভবিষ্যত সুরক্ষিত। আমি কি আসলে সুরক্ষিত?
-বাদ দে না ওসব। চল বাইরে যায়। ঘুরে আসি কোথাও থেকে। দেখি সায়েমকে ফোন করে।
-না। আগে উদাহরন শেষ করি। শুন, প্রথমে যে তারা রাজি ছিল না। তারা ভেবেছিল আরো অনেক মেয়ে পাওয়া যাবে। পরে হয়তো ওদের দেখা মেয়েদের ভেতরে আমি ছিলাম সেই, যে তাদের এবং ছেলের বৌবাহিক উপযোগিতা মিটাতে সক্ষম। তারপর আসি ওদের উপযোগিতা কি কি ছিলঃ ধর, ১) মেয়ে ফর্সা, সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে। ২) লম্বা না হলেও খাটো না। ভবিষ্যত প্রজন্ম বামন হবে না। ৩) শিক্ষিত আছে, সবাইকে বলা যাবে আবার বাচ্চা নিয়েও চিন্তা নাই। শিক্ষিত মা শিক্ষিত জাতি। ৪) সংসারের দায়িত্বগুলো ভালভাবে পালন করতে পারবে। দুঃসময়ে চাকরি করে সহযোগিতা করতে পারবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। বিয়ের সাত বছর পরও যখন কোন বংশধর আসল না। তখন তাদের কাছে আমার উপযোগিতা কমে গেল।
আমি থাকতে চাইলেও, শাহেদ থাকতে চাইলেও, তার পরিবার চাইল না। কিংবা শাহেদ নিজের কথা পরিবারকে দিয়ে বলেছে। অর্থাৎ যোগান আছে কিন্তু চাহিদা নাই। কারণ উপযোগিতা নাই। এটাই স্যারের সেই উত্তর। সে হিসেবে আমি এখন উপযোগহীন একজন প্রাণী।
-হুম' বুঝলাম। আচ্ছা মানুষ হিসেবে তোর উপযোগিতা কি শুধু মাতৃত্বে?
-বুঝি বুঝি। সমাজ কি বুঝে? আমি সফল চাকুরীজীবি হলেও, তারা ঠিকই আঙ্গুল উঁচিয়ে বলবে আমি সন্তান দিতে পারিনি। আমার নারী জীবন ব্যর্থ। আর অন্যদিকে সেটাকে পুজি করে শাহেদের জীবনে আসবে অন্য কেউ। যদি সেও আমার মত হয়। হয়ত শাহেদ আবার বিয়ে করবে। এভাবেই চলতে থাকে উপযোগিতার খেলা। আমার উপযোগিতার উদাহরণ কেমন লাগল তোর বললি না।
- আগে সচলরাই বলুক। তারপর আমি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now