বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প- উদ্ধার।
লেখক-Fahim Ahasan
=================
আমরা দুজন যখন পলেস্তারা খসা রুমটায় ঢুকলাম
তখনো মাথায় উপরে একমাত্র ফ্যানটা ঘড়ঘড়
শব্দে ঘুরছিল। পুরনো ক্যালেন্ডারের না
বদলানো পাতা বাতাসে এদিক সেদিক উড়ছিল। তারপর
অচল দেয়ালঘড়িটার গা বেয়ে ধীরে ধীরে
নেমে এলো একটা টিকটিকি। সম্ভাষণ জানিয়ে
হয়তোবা বলে উঠলো, টিক টিক টিক।
ভ্যাপসা গন্ধময় রুমটায় ঢুকে উপলব্ধি হলো,
ঘরের একমাত্র উচ্চ বুদ্ধিমত্তার প্রাণীটির কাছে
আমাদের ততটুকুও অস্তিত্ব নেই, যতটুকু টেবিলে
স্তূপ করে ফেলে রাখা ধুলোমাখা ফাইলগুলোর
আছে। কিংবা আধ-খাওয়া চায়ের কাপে ডুবে ডুবে
ভাসা অর্ধমৃত মাছিটার আছে। নিরেট কাঠের
চেয়ারটাকে নরম গদির আরামকেদারা বানিয়ে
রীতিমত জাঁকিয়ে বসা হয়েছে। উপবিষ্ট
ভদ্রলোক এইমাত্র লাঞ্চ সেরে মুখে মিষ্টি
জর্দার একটা পান লাগিয়েছেন। ডান হাতের কড়ে
আঙুলটা নাকের ফুটোর কাছে নিয়ে খুঁচিয়ে
চলেছেন, যেন পৃথিবীর ইতিহাসে এরচেয়ে
জরুরী কোন কাজ ছিল না কোনদিন।
বাবা আমার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটা শব্দ করলেন।
স্যার !
চেহারায় যথেষ্ট বিরক্তির ছাপ নিয়ে ভদ্রলোক
আধবোজা চোখদুটো খুললেন। পান লাল মুখে
অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন- কে ? কি
চাই ?
আমরা স্যার চুরির বিষয়ে এসেছিলাম।
ও, কে পাঠিয়েছে ?
সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব। আমাদের মধ্যে বাবা
একাই বলে যাচ্ছেন।
ভদ্রলোক চোখ পিট পিট করে আমাদের দিকে
তাকালেন। মনে হলো চোখের পলক ফেলার
সময়টুকুর মধ্যে জলজে ধ্যানমগ্ন কোন বক তার
আরাধনার মাছ ঠোঁটে চাপিয়ে নিয়েছে, ভর
দুপুরে ভাতঘুম শেষে বালকের দল প্রান্তরে
হারিয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ঘাসফড়িঙের ডানায় সময়
একদম স্থির, অথচ নদী বয়ে যাচ্ছে, বয়ে
যাচ্ছে।
কি চুরি ? ভদ্রলোক চশমা এঁটে বসিয়ে বাবাকে
জিজ্ঞেস করলেন।
মটর সাইকেল। বাবার পাশ থেকে আমি উত্তর দিলাম।
সাইকেল ? লিস্টের কাগজটা খোঁজা শেষ, লাল
কালির কলম চষে বেড়াচ্ছে কাগজের উপর
থেকে নিচ পর্যন্ত।
না না, মটর সাইকেল। বাবা শুধরে দিলেন।
মানে হোন্ডা তো ?
জি। ওই একই কথা হোন্ডাই।
থানায় মটর সাইকেল আর হোন্ডা এক জিনিষ না।
সাইকেলে মটর লাগালে সেটাও মটর সাইকেল
হতে পারে। ঠিক কিনা ? ভদ্রলোক আমার দিকে
ফিরলেন। যেন আমার কাছেই জানতে চাইলেন।
আমি কিছুটা ঘাবড়ে গেছি। জবাবে কি বলবো, কথা
হারিয়ে ফেলেছি।
বাবা আমায় ধমক লাগালেন। এই ব্যাটা, ওসি সাহেব কি
জিজ্ঞেস করলেন শুনতে পাস নি ?
মাথা নাড়লাম। দেখে ওসি সাহেব বাবাকে ডাকলেন,
আপনার ছেলে বুঝি ?
জি স্যার।
ও আচ্ছা। ছোট মানুষ তাই এসব মেকানিক্যাল
কথাবার্তা বুঝতে পারবে না। তারচেয়ে আপনি বলুন,
কি হোন্ডা ছিল ?
ইয়ামাহা। জাপানি ব্র্যান্ড।
আচ্ছা। ওসি সাহেবের চোখ আবার কাগজের
লিস্টে ডুবে গেল। কত সিসি ?
ফিফটি।
হাহাহা। বিকট শব্দে ওসি সাহেব হেসে উঠলেন।
মাত্র ফিফটি সিসি ? সেদিন আমরা একটা চোরাই
হোন্ডা উদ্ধার করলাম, দেড়শ সিসির। আজকাল
একশ-একশ বিশের নিচে হোন্ডাই পাওয়া যায় না
শুনেছি।
জি স্যার। অনেক পুরনো। ওর বয়সের চেয়েও
বড়। ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে বাবা বললেন।
ও আচ্ছা। বিয়েতে যৌতুক পেয়েছিলেন বুঝি ?
কথাটার জন্য বাবা আমি কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। বাবা
নিজের সদ্য কৈশোর পার করা ছেলের দিকে
আড়চোখে তাকালেন। আমি ভ্যাবাচ্যাকা মেরে
দাঁড়িয়ে আছি, দেখে আশ্বস্ত হলেন।
রঙ কি ছিল ?
লাল। বাবার মুখ ইতিমধ্যেই লাল হয়ে গেছে।
হুম। কেমন লাল, ডীপ নাকি লাইট ? ওসি সাহেব
তখনো কাগজের উপর থেকে মুখ তুলে
তাকাননি।
আগে ডীপ রেড ছিল। রঙ উঠে গেছে
ট্যাঙ্কের কিছু জায়গায়। এখন তাই লাইট। আমি বলে
উঠি। বলার কারণ ছিলো, কয়েকদিন আগেই
ট্যাঙ্কের রঙ উঠে যাওয়া জায়গাগুলোতে যত্ন
করে মায়ের লাল নেল পালিশ লাগিয়ে দিয়েছি আমি।
স্ট্যান্ডে রাখা অবস্থায় খালি চোখে ধরা পড়ে,
লাল হলেও রঙে রঙে খাপ খায়নি।
ওসি সাহেব মুখ তুললেন এবার। সোজা বাবার দিকে
তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, এমন হোন্ডা কে চুরি
করতে পারে বলে আপনার ধারনা ?
বাবা কিছুক্ষণ ভাবলেন। স্যার, কারো চুরি করার কথা
না। চুরি করলেও ওটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।
কেন ? ওসি সাহেব কিছুটা অবাক হয়ে গেছেন।
ওটার স্টাটার নষ্ট। ম্যানুয়ালি স্টার্ট দিতে হয়, যেটা
আমি ছাড়া কেউ পারে না।
তারপরেও যদি স্টার্ট নেয় কেউ ?
তাহলে স্যার, চালাতে চোরের ঘাম ছুটে যাওয়ার
কথা। আমারই ছুটে যায়।
হাহাহ। ওসি সাহেব খুব মজা পেয়ে গেছেন। বিকট
শব্দে আবার হেসে ফেলেন। দেখে বাবাও
হেসে ফেলেন। বাবার দেখাদেখি আমিও।
আচ্ছা বেশ। হাসি থামিয়ে বলেন ওসি সাহেব।
জি স্যার ? বাবা শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করেন।
কিভাবে চুরি গেছিলো জানি, লেখা আছে
জিডিতে, তবুও আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম।
সন্ধ্যা থেকে বাসার সামনে রাখা ছিল স্যার। ঐদিন কি
ভেবে তালা দিইনি। রাতে বের হতে গিয়ে দেখি
নেই।
আশেপাশে দেখেছিলেন ?
বাসার সামনে দিয়ে রোড গেছে একেবারে
বাজার পর্যন্ত। গোটা রোডে থেমে থেমে
সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি। কেউ দেখেনি।
ও আচ্ছা। মাথা দোলালেন ওসি সাহেব।
স্যার। বাবা আবার ডাকলেন।
জি বলেন।
একটা ব্যবস্থা হবে শুনে এসেছি আজকে।
আচ্ছা, আমি এখন একটু ভিতরে যাবো, আপনারা
আরো কিছুক্ষণ বসেন।
একটু দয়া স্যার। বাবা কাতর কণ্ঠে বলে উঠেন।
আমি নিজেই আপনার বিষয়টা দেখছি। ওসি সাহেব
উঠে দাঁড়ান।
অনেকক্ষণ কেটে গেছে। রুমের একমাত্র
টুলটায় বাবা আর আমি বসে আছি। বললাম, এমন
অনেকেই তো মটর সাইকেল হারিয়ে জিডি
করে, ওসি সাহেব নিশ্চয়ই সবার কেসটা দেখেন,
কিন্তু সবাই যদি সমাধান পেত তাহলে নতুন করে
সমস্যার সৃষ্টি হতোনা। শুনে বাবা আরো গম্ভীর
হয়ে গেলেন। অন্যসময় আমাকে উড়িয়ে
দিলেও এবার বললেন, ভালো বলেছিস।
তাহলে ?
কনস্টেবল জানালো ওরা আজ একটা মটর সাইকেল
উদ্ধার করেছে। এসে দেখে যেতে
বলল আমারটা কিনা।
তারপর ?
যদি আমারটা হয় তবে তো ভালোই। নিয়ে
গেলাম। নাহলে নেই।
আরেকবার খোঁচা মারলাম, দ্যাখো যা গেছে তা
গেছে। পুরনোটা আর কত ?
তার মানে ? বাবা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
বলছিলাম, যদি না পাও তাহলে নতুন একটা কিনে
ফেলনা কেন ?
কি হয় আগে দেখি। খুঁজেও তো পেতে পারি।
ওসি সাহেব ভালো মানুষ। আমার বিষয়টা সিরিয়াসলি
নিয়েছেন।
যদি না পাও ?
তাহলে তোর কথাই, নতুন একটার কথা ভাবতে
হবে।
বাবার ইয়ামাহা ফিফটি সিসি নিয়ে আমাকে বন্ধু মহলে
কম কথা শুনতে হয় নি। তারেক বলতো, কচ্ছপ
নাকি ওটার সাথে রেস দিতে পারবে। মঞ্জু
উপদেশ দিয়েছিল ভেঙে কেজি হিসেবে বিক্রি
করে দিতে। শামীম সবসময় একধাপ এগিয়ে। সে
বলতো, যা ব্যাটা লাথি মেরে নদীতে ফেলে
দে। তাই আমি বাবার এমন সিদ্ধান্তে কিছুটা
রোমাঞ্চিত হই। বাইরে ভেজা গলায় বলি, দ্যাখো
কি হয়। আমার ভিতরটা তখন তীব্র আকুতি আর
প্রার্থনা করছে, উদ্ধার করা হোন্ডাটা যেন
আমাদের না হয়।
এরমধ্যেই কনস্টেবল আসে। ওসি সাহেব
ডেকে পাঠান। আমরা কনস্টেবলের পিছন পিছন
স্টোর রুমটায় ঢুকি। এখানে অনেকগুলো মটর
সাইকেল সারি করে রাখা হয়েছে। সারির শেষ মাথায়
দাঁড়িয়ে থাকা ওসি সাহেব দরজায় বাবাকে দেখতে
পেয়ে হাঁক দেন। এদিকে আসুন ভাইসাহেব। একটু
দেখে যান।
বাবা এগিয়ে যান। সাথে আমি। আমার ভিতরে বাইরের
দুই সত্ত্বা কেঁপে কেঁপে উঠে। নিজের
অজান্তে মধ্যমা ভর দেয় তর্জনীর গায়ে, ফিঙার
ক্রসড।
অবশেষে তার দেখা মেলে। বিবর্তনের
সাক্ষী হয়ে যার ফুয়েল ট্যাঙ্ক গাঁড় লাল থেকে
হয়েছে হালকা লাল। নখ ভেবে যত্ন করে যার
গায়ে নেল পালিশ দিয়েছি সারা সকাল। বাবার শখের
জাপানি মটর সাইকেল। নতুন করে হেডলাইট
ভেঙেছে। ভিউ মিররের জায়গায় কেউ যেন
কংকালের দুটো চক্ষু কোটর বসিয়ে দিয়েছে।
কাঁচ ভেঙেছে। গুঁড়ো গুড়ো কাঁচের কিছু অংশ
ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
দেখেই এক নিঃশ্বাসে বাবা বলে দেন, স্যার এটাই
আমার। এবং বাবার মুখে গোলাপি আভা দেখা যায়।
আর পরমুহূর্তেই আমার সমস্ত প্রার্থনা বিসর্জনের
খাতায় লিখে ফেলেন স্রষ্টা।
ওসি সাহেবের টেবিলের উপরে একটা কাগজে
বাবা সিগনেচার দিয়েছেন। চুরি যাওয়া জিনিষ উদ্ধার
হয়েছে। ওসি সাহেব টেবিলের নিচে একটা
খামে আবার পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন। চুরির জিনিষ
উদ্ধারের পর বকশিস দিতে হয়। তারপর সব
আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে থানা থেকে বের হই।
আমরা তিনজন। আমি, বাবা, আমার সমবয়সী বাবার
জাপানি মটর সাইকেল।
থানার গেট পেরুতেই কনস্টেবলের সাথে
দেখা হয়ে যায়। বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে
কনস্টেবল জিজ্ঞেস করে, স্যার উদ্ধার করে
দিলেন তো ?
হ্যাঁ। পেয়েছি এতেই আমি খুশি। বাবা গদগদ হয়ে
উত্তর দেন।
স্যার আমার কথা কিছু বলেছেন ?
কিসের কথা ?
এই যে আপনাদের খবরটা দিলাম।সেজন্য আমাকে
চা নাস্তার খরচ দিতে বলেন নি ?
ও আচ্ছা। বাবা পকেট থেকে একশ টাকার তিনটা
নোট কনস্টেবলের হাতে ধরিয়ে দেন। তারপর
বলেন, আপনাদের নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট
হয়েছে। অনেক ধন্যবাদ।
কনস্টেবল জিব কাটে। ধন্যবাদ আমাদের নয়
চোরকে দিন।
কেন ? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।
চোরের কারণেই তো আমাদের কষ্ট করতে
হয়নি।
বুঝলাম না। বাবা মাথা নাড়েন।
আরে, চোরই তো থানার পাশে মটর সাইকেলটা
ফেলে রেখে গেছে।
আমরা অবাক হই। তাই নাকি ?
হ্যাঁ। সিটের সাথে টেপ দিয়ে বেঁধে একটা
কাগজও দিয়ে গেছে। দাঁড়ান বের করি।
কনস্টেবল পকেটে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের
করে আমাদের দেখায়। গুটি গুটি অক্ষরে কাগজে
লেখা আছে-
ভালো মটর সাইকেল কেনেন তারপর আবার চুরি
করবো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now