বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ট্রেন

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Nira anam (০ পয়েন্ট)

X আমি দীপঙ্কর দাস।ভালবেসে বাড়িতে সবাই আমাকে দীপ বলেই ডাকে।বাড়িতে মা,বাবা ও এক বোন নিয়ে আমাদের পরিবার।বাবা একটা ছোটোখাটো কারখানাতে কাজ করে যে কটা টাকা রোজগার করে, তা পুরোটাই সংসারের কাজে চলে যায়।মা লোকের বাড়ি বাড়ি সারাদিন কাজ করে আমার আর আমার বোনের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছে।বোন এ বছর নবম শ্রেনীতে উঠবে। মাসখানেক হল আমি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছি।তাই ইচ্ছে ছিল এরপর সংসারের দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নেবো।পড়াশোনার মাঝে মাঝে আমি কর্মসংস্থান থেকে কাজের নানারকমের চাকরি খোঁজ রাখতাম।এমনকি ফোন করেও জানতে চেষ্টা করেছি যে, চাকরির জন্য কোনো পদ খালি আছে কিনা কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।পরে যখন ইন্টারভিউ দিতে যেতাম তারপর আর কি ওখানেই ইতি। একবার চাকরির পরীক্ষার জন্য ফরম-ফিলিপ করেছিলাম। আর তারপরেই বাড়িতে চিঠি আসে।চিঠি লেখা ছিল আমার পরীক্ষার পোস্ট শিলিগুড়িতে পড়েছে।পরীক্ষার এক সপ্তাহের আগে আমি ভালো করে পুরো বই পড়ে নিয়ে ছিলাম।দিনরাত খাটছি কারণ চাকরিটা আমার খুব প্রয়োজন।চাকরিটা পেলে আমার পরিবার একটু সুখের মুখ দেখবে।বোনও আরও অনেকদূর পড়াশোনা করতে পারবে।সে যাইহোক, ভগবানের আশীর্বাদ থাকলে ঠিক একটা না একটা ভাল কিছু ঘটবে আমাদের জীবনে। দেখতে দেখতে পরীক্ষা খুব কাছে চলে এলো প্রায়।আজ শনিবার আগামী সোমবার আমার চাকরির পরীক্ষা।টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে বই পড়ছিলাম আমি।রাত তখন প্রায় ন'টা বাজতে চলল।হাতের সামনে রাখা মোবাইলটা নিয়ে আগামীকালের ট্রেন বুক করার লিস্ট খোঁজ করছিলাম, এবং তা সঙ্গে সঙ্গে পেয়েও গেলাম।রাত দশটার ট্রেন শিয়ালদহ থেকে শিলিগুড়ি।তারপরেই বুক করে দিলাম ওই সময়টা। পরদিন..... রাত আট'টা বাজে দেওয়াল ঘড়িতে।মা তখন রান্নাঘরে আমার জন্য রাতের খাবার বানাচ্ছিল।আমি সেই সময় জামা-প্যাণ্ট পরিধান করছিলাম।এমন সময় মা এসে বলল,নে দীপ তোর জন্য রাতের খাবারটা ব্যাগের মধ্যে দিয়ে দিলাম, মনে করে খেয়ে নিস।নে" নে" আর দেরী করিস না!এরপরে রাতের ট্রেনটা আর পাবি না!একটা হালকা ধমকের সুরে মা বলে উঠল আমাকে।হ্যাঁ! হ্যাঁ! হয়ে গেছে বলে আমি জানান দিলাম।তারপর কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে মা-বাবাকে প্রনাম করে আসছি বলে বিদায় জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম।আমাদের বাড়ি থেকে কিছুটা গেলে তারপর একটা বড় রাস্তা পরে, সেখান থেকে কিছুটা অপেক্ষা করে একটা শিয়ালদহ-এর বাস ধরে সোজা নামলাম শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে। কিছুটা এগোতেই সামনেই দেখতে পেলাম বড় বড় করে লেখা রয়েছে শিয়ালদহ স্টেশন।সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়লাম স্টেশনের ভেতর।স্টেশনটা তে তখন তেমন একটা ভীড় দেখতে পেলাম না।দশ'কুড়ি জন মানুষ এদিক-ওদিক করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।বেশ একটা শান্ত মত লাগছিল স্টেশনটা।চারিদিকে মানুষজন বেশ হালকাভাবে চলাফেরা করছে।একে অপরের সাথে কথা বলাবলি করছে। দূরে একটা মানসিক ভারসাম্যহীন মহিলাকে বসে থাকতে দেখা গেল। গায়ে নোংরা জামাকাপড় আর মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আনমনে কি যেন একটা গুনগুন করে গান গাইছে।স্টেশনের ধারে দু'একটা দোকানপাটও চোখে পড়ল।সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ বিড়িতে টান দিয়ে দিয়ে ক্রমাগত ধোঁয়া উড়িয়ে চলেছে। কিছুটা দুরে একটা খালি বেঞ্চ দেখে আমি সেখানে এসে বসলাম।তারপর কাঁধ থেকে ব্যাগটা বার করে সামনে নিয়ে একটা বই বার করে কিছুটা চোখ বুলালাম।এই সময় পাশ থেকে কে যেন গম্ভীর গলায় বলে উঠল, আচ্ছা দাদা বলছি পরের ট্রেনটা কখন আসবে একটু বলতে পারবেন? আমি বই থেকে মুখ তুলে সামনের দিকে দৃষ্টি ফেললাম, দেখলাম একজন ব্যক্তি বয়স এই প্রায় সাতাশ-আটাশ হবে, পরনে একটা খয়েরি রঙের জামা আর একটা ছাই রঙের প্যান্ট পড়ে আগ্রহবশত আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি একটু হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললাম,এখন সবে সাড়ে ন'টা ট্রেন আসতে এখনও আধঘন্টা বাকি আছে!ওও বলে মুখ থেকে একটা হালকা শব্দ বার করে ভদ্রলোক গিয়ে বসলেন পাশের আর এক বেঞ্চ এ। একটু পরেই একটা ঘোষনা শোনা গেল স্টেশনের মাইক থেকে। একটি ঘোষণা! পরবর্তী ট্রেন এখুনি আসতে চলেছে ! কথাটা কানে আসতেই আমি তড়িঘড়ি বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালাম।কিছুক্ষন পরেই রাত দশটার ট্রেন এসে আমাদের সামনে উপস্থিত হল।তারপর আমি বইটা ব্যাগে ঢুকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের কাছে চলে এলাম।যে যেখানে ছিল এক এক করে সবাই ছটফট ট্রেনে উঠে পড়ল।আমি সবার শেষেই উঠলাম, কারন ঔই ঠেলাঠেলি করে ওঠা আমার ঠিক পোষায় না।তার চেয়ে বাবা আরাম করে বেশ শান্তভাবে উঠব সেটাই ভাল। ট্রেনে উঠে দেখলাম, ট্রেনটা সেরকমটা ভীড় নেই।দশ-পাচঁ জন লোক পুরো ট্রেন জুড়ে ছড়িয়ে বসে আছে।একদম শেষের সিটগুলোতে চারজন।মাঝখানে কয়েকটা আর গেটের সামনে তিনজন ব্যস!এই যা।আমার জায়গাটা ট্রেনের মাঝের কামরায়।একটা লম্বা স্লিপার সিট।প্রত্যেকের জন্য একটা করে।রাতে যদি ঘুম পায় আরাম করে শোওয়ার ব্যবস্থা।দুপাশের স্লিপার সিটের মাঝে লম্বা রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে জানলার ধারে বসে পড়লাম নিজের সিটে।একটা ধিক" ধিক" শব্দে ট্রেনটা চলতে শুরু করল নিজের গতিপথে...!! এই প্রথমবার ট্রেনে চড়ছি আমি।এর আগে ট্রামে ওঠা হয়েছে আমার।তাই বারবার চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকিয়ে পুরো কামরা'টা চাক্ষুষ করে নিচ্ছিলাম একবার।আমার সামনের সিটে ওই ভদ্রলোককে দেখা গেল।ওই যে যিনি আমার কাছ থেকে ট্রেনের সময় জানতে চেয়েছিলেন তিনি।ভদ্রলোক বোধহয় সকালে ভাল করে ঘুমান নি।দেখলাম আসামাত্রই নিজের স্লিপার সিটে মাথার ওপর ব্যাগটা রেখে শুয়ে পড়লেন।অবশ্য অনেকের আবার তাড়াতাড়ি শোবার অভ্যাস আছে।আমার বাবা এত তাড়াতাড়ি ঘুমই আসে না।বাড়িতে থাকলে এ সময় আমার গল্পের বই পড়ার অভ্যাস আছে।ভুতের গল্প আমার সবথেকে ভাল লাগে।রাতে ভুতের বই পড়ার মজাই আলাদা।কিন্তু পরীক্ষার চাপ থাকলে গল্পের বই আমি দশহাত দূরে রাখি।তাই আজ আর ব্যাগে কোনো গল্পের বই রাখেনি। পড়ার কথা বলতে মনে পড়ল বই-এর কথা।ব্যাগ থেকে বইটা বার করে শর্ট প্রশ্নগুলো ভাল করে একবার রিভিশন দিয়ে নিলাম।পড়ার মাঝে মাঝে জানলার বাইরেটা দেখতে লাগলাম।সত্যি অসাধারণ লাগছে রাতের অন্ধকারের আকাশটা কে।একটা সুন্দর পূর্ণিমা চাঁদের আলো পুরো বাইরেটা কে একটা নীলভ আলোর চাদরে ঢেকে রেখেছে।সেই আকাশের নীচে ঘরবাড়ি,গাছপালা,মানুষজন যেন ট্রেনের সাথে একই গতিতে ধেয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে একটা হালকা শীতলম বাতাশ আমার গায়ে এসে মিশছে।এই গরমকালে বেশ ভাল লাগছে হাওয়াটা।কোথাও কোথাও অন্ধকারে জোনাকিরা তাদের নিজস্ব আলোর বাতি জ্বালিয়ে এক অপরূপ মনরমের দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।অথচ এইসব মনোরম দৃশ্য আমি বেশিক্ষণ চাক্ষুষ করতে পারলাম না পড়ার কারনে।তাই জানলা থেকে চোখ সরিয়ে পড়ায় মন দিলাম। কিছুক্ষণ পর ট্রেনটা একটা স্টেশনে থামল।দেখলাম কিছু লোক এই স্টেশনে নেমে পড়ল।ট্রেনটা বেশ ফাঁকাই হয়ে এলো প্রায়।দু'তিনজন ছাড়া সবাই নেমে গেছে। তারপর ট্রেনে আবার চলতে শুরু করল ধিকিধিকি করে।আবার দেখলাম, পরের স্টেশনের লোক নেমে পড়ল।কিন্তু এবার আর কেউ থাকল না আমার যাত্রা পথে,পুরো ট্রেন খালি হয়ে গেল।আমি এখন ফাঁকা ট্রেনের মধ্যে ভুতের মত বসে আছি। হাতঘড়িটাতে চোখ বুলাতে, দেখলাম রাত এখন বারোটা বাজে।কামরাটা একদম খালি বলে গা'টা বেশ একটা ছমছম করে উঠল।চারিদিকটা একদম নিস্তব্ধ শুধু ট্রেনের ধিকিধিকি শব্দ ছাড়া।এই অবস্থায় জানি না, পেটে ছুঁচো ডাকতে শুরু করল আমার।সেই কখন ঘর থেকে বেরোনোর আগে একটু চপ আর মুড়ি খেয়েছি, কিন্তু সে আর কতক্ষণ পেটে থাকে মানুষের।একটু ভারী কিছু না খেলে পেট ভরে!তাই মায়ের দেওয়া খাবার রুটি আর মাংসের কষা ব্যাগ থেকে বার করে গোগ্রাসের মত খেতে লাগলাম।খাবার সাথে সাথে পিপাসাটা বেশ জোরে পেয়েছিল।তাই বোতল থেকে অনেকটা জল মুখ দিয়ে এক নিমেষে খেয়ে নিলাম। আহ!বলে একটা বড় ঢেকুর তুললাম।তারপর আবার সিটে হেলান দিয়ে বইটা পড়তে শুরু করলাম।ঘর থেকে ঠিক করেই এসেছিলাম যে সারারাত বই পড়েই কাটিয়ে দেবো কিন্তু সেটা আর হল না।পড়তে পড়তে বেশ কয়েকবার মুখ থেকে হাই বেরল।আর তার পরমুহূর্তে কখন যে চোখে তন্দ্রা নেমে এলে বুঝতেই পারলাম না। খুব জোরে ট্রেনের থেমে যাওয়ায় আমার কাঁচা ঘুমটা গেল ভেঙ্গে।চোখ খুলে ব্যাপারটা পরিস্কার হল।একবার জানলার দিকে দৃষ্টি ফেললাম।কলকাতা ছেড়ে অনেকটা চলে এসেছি বোধহয়।ঘড়িতে তখন মধ্যরাত। এমন সময় চোখ পড়ল কিছু মানুষের ওপর।চারজন হবে বোধহয়।সাদা প্যান্ট আর শার্ট পরনে রয়েছে তাদের।জানলা থেকে স্পষ্ট দেখলাম,ট্রেনের গেট খুলে ভেতরে ঢুকল।সত্যি বেশ একটা অস্থিরতা ছিল আমার মনে,ওরা আসতে নিজেকে আর একা মনে হচ্ছে না।ভাবলাম যাগ!একটু একাগ্রতাটা কাটবে।কিন্তু কোনো লাভ হল না লোকগুলো দেখলাম গেটের সামনের স্লিপার সিটে গিয়ে বসল।আমার দিক থেকে অবশ্য ভাল করে ওদের কে দেখা যাচ্ছে না।আমি যে দিকে বসেছি ওরা মানে আমি ডানদিকে আর ওরা বামদিকে স্লিপার সিটে।ওরা বোধহয় আমাকে ঠিক লক্ষ্য করেনি। সে যাইহোক! আমি আবার পড়াই মন দিলাম।কারণ আমার একবার কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেলে সহজে আর ঘুম আসে না।একদিক দিয়ে ভাল হয়েছে।সারারাত ভাল করে পড়া হয়ে যাবে। মনে মনে পড়তে পড়তে আমার লক্ষ্য গেল ওদের ওপর।ওরা নিজেদের মধ্যে কি সব কথা বলাবলি করছে সেগুলো আমি কিছুই ঠাউর করতে পারলাম না।কিন্তু তারপর যে ওরা চারজনে এমন বিশ্রীভাবে হেসে উঠল,তা আর কি বলব।একদম অসহ্য,যন্ত্রণাকর বিকট হাসি যে মানুষের হতে পারে , সেটা আমার আগে জানা ছিল না। তারপরেই ঘটল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য।এতক্ষণ ধরে যে মুখগুলো আমি দেখলাম সেগুলো সবই মিথ্যে।এখন যেটা দেখছি সেটা খাঁটি সত্যি।দেখলাম, প্রত্যেকের মুখগুলো কি ধরনের ভয়ানক আর বিশ্রী যা চোখে তাকিয়ে থাকা যায় না।সবার মুখে এবড়োখেবড়ো ভাবে ক্ষতের চিহ্ন।কারও কপাল থেকে নাকের চামড়া উড়ে গিয়ে সেখানকার হাড়গুলি বেরিয়ে পড়েছে।আরও একজনের দেখলাম,একচোখ ওঠে গিয়ে সেখানে একটা গভীর গর্তের সৃষ্টি করেছে।আরও যে দুজন তো আরও ভয়ানক অবস্থা।একটা জিভ বার করে সেটা আবার মাঝখান থেকে কেটে একদম শেষে সামান্য জুড়ে রয়েছে।সেখানেই কালো রক্ত জমে জায়গাটা জমাট বেঁধেছে।আর একজনের মুখ পুরো বাজে রকমভাবে থেঁতলে গিয়ে গালের চামড়াসমেত মাংস ঝুলে রয়েছে। ওফ! এটা কি দেখলাম আমি।একি তো ভয়ে হাত'পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তার ওপর গা'টা কিরকম যেন গুলিয়ে ওঠছে!!কিছুক্ষণ আগে খাওয়া মাংস,রুটি যেন পেট থেকে মুখে চলে আসতে চাইছে।নিজেকে ওদের থেকে আড়াল করে নিলাম।যদি আমাকে এখানে দেখে নেয় তো প্রাণপাখি ফুরুত করে উড়ে পালাবে।একদম নীরব আর নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম আড়ালে।শরীরটা বেশ ঘামতে শুরু করেছে আমার।মাঝে মাঝে কপাল বেয়ে ঘাম চুইয়ে পড়ছে হাতে। কি হবে এখন!সেই বিশ্রী হাসিটা আবার কানে এলো।উফ!!কি যন্ত্রণা কর্ণপাতে হচ্ছে আমার।ভয় আর আতঙ্কে কাটছে রাতটা ট্রেনের কামরায় আমার।হঠাৎ মনে একটা বাজে চিন্তা এলো, কি হবে? যদি ওরা টের পেয়ে যায় আমি এখানে উপস্থিত আছি।আমাকে কি ওরা চারজন মিলে মেরে ফেলবে!আজ রাতেই কি আমার শেষ রাত! মনে মনে কথাটা ভাবতে না ভাবতেই সেটাই যেন সত্যি হয়ে গেল।হঠাৎ করেই আমার ফোনটা খুব জোরে বেজে উঠল।আচমকা ফোনটা বেজে ওঠাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।কি হবে এখন?ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগল।ফোনটা বন্ধ করতে গিয়ে কাঁপা হাত থেকে পড়ে গিয়ে সেটা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল।এখন পুরো নিশ্চিত আমি যে,ওরা আমার অবস্থান বুঝতে পেরে গেছে।এখন যে আমি সরাসরি মৃত্যুর মুখে সেটা বেশ বুঝতে পারছি।এখান থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। একশ শতাংশ নিশ্চিত যে,আমি মরতে চলেছি।আর কিছু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।এখুনি ওরা আমার গলাটা টিপে ধরে মেরে আমার দেহটাকে নিয়ে সারারাত ট্রেনে চারজন মিলে হ্যালোউইন পার্টি মানাবে।সামনে থেকে ব্যাগটা নিয়ে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।এই বুঝি কোনো ঠান্ডা হাত আমার গলা টিপে ধরল! বুকে প্রচন্ড রকম একটা ভয় নিয়ে একবার সিটের আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করলাম।কিন্তু না,কাউকে দেখা গেল না।সবাই যেন এক নিমেষে কোথায় যেন অদৃশ্য হল।কিছুক্ষণ চোখ বুলাবার পর খুব জোরে একটা চিৎকার করে স্লিপার সিটে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।দেখলাম, তারা ইতিমধ্যে সামনের সিট ছেড়ে কখন যে আমার কাছে চলে এসেছে, আমি সেটা খেয়ালই করেনি। চারজনের গলা থেকে একটা ঘরঘর শব্দ বার হচ্ছে শুধু।তারপরেই বিশাল একটা অট্টহাসি সবাই মিলে।ওদের মধ্যে থেকে একজন আমার দিকে হাত বাড়াল।আমি ভয়ে একদম জানলায় সেঁটে গেলাম।আর কোনো যাওয়ার জায়গা নেই।একটা চিৎকারে আমার দিকে বাড়ানো হাতটা হঠাৎ করেই সরিয়ে নিল ওই অশুভ আত্মাটা।বিষয়টা কি হল!আমার বুঝতে একটু সময় লেগে গেল। ওই অশুভ আত্মাটা যখন আমার গলা টিপতে আসছিল,তখন আমার বুকের কাছে রাখা ব্যাগের সামনের চেনে হাত পড়তেই আত্মাটা আঘাত পেল।চেনটা টেনে দেখলাম, ভেতরে একটা লাল জবা ফুল।মনে পড়ল কালকের সকালের কথা - আমাদের পাড়ায় একটা জাগ্রত কালীমন্দির আছে।সকালে গিয়েছিল মা, আমার জন্য পুজো দিতে।যাতে আমার পরীক্ষাটা ভালোই ভালোই হয় তার জন্য।বাড়িতে এসে উনি আমার মাথায় মা কালীর জবা ফুল ঠেকিয়ে প্রসাদ দিয়েছিল। কিন্তু কখন যে মা ফুলটি আমার ব্যাগে রেখে দিয়েছে সেটা আমি গুনক্ষরে জানতে পারিনি। আর দেরী না করে ফুলটা হাতে নিয়ে ওদের সামনে ধরলাম।দেখলাম, জবা ফুলটা দেখে ওরা আমার থেকে এক পা পিছিয়ে গেল।সেই সুযোগে আমি স্লিপার সিট থেকে লাফিয়ে দ্রুত গমন করলাম ট্রেনের গেটের সামনে।কিন্তু কি করব এখন!ট্রেন যা দ্রুত এগোচ্ছে, তাতে ঝাঁপ দিতে ভয়ও লাগছে।ঝাঁপ দিতে গিয়েও পুনরায় পিছনে এগিয়ে আসছি।ঝাঁপ দেওয়ার মত সাহসও পাচ্ছি না আমি।সামনের দিকে দেখলাম, চারজনে দ্রুত আমার দিকে তেড়ে আসছে!! নাহ, আর কোনো উপায় নেই!নিরুপায় হয়ে তাই শেষমেশ ট্রেন থেকে ঝাঁপ মারলাম।তারপর দ্রুত বেগে ট্রেন চলে গেল!!! কতক্ষণ পর আমার জ্ঞান ফিরল, সময়টা ঠিক জানা নেই।চোখ খুলে তাকাতেই একজন ডাক্তারকে দেখতে পেলাম। তারপর চারিদিকে তাকাতে বুঝতে পারলাম আমি একটা হসপিটালের বেডে শুয়ে রয়েছি।কি করে এলাম?কে নিয়ে এলো!কিছুই বুঝতে পারলাম না।শরীরটা নড়াচড়া করতে গিয়ে বুঝলাম, সারা শরীর প্রচন্ড রকমভাবে ব্যথা হয়ে রয়েছে।এরপর বেড থেকে উঠতে গিয়ে মাথায় খুব জোরে ব্যাথা করে উঠল।তখন একটা কথা কানে এলো।এই উঠবেন না,আপনার এখন শুয়ে থাকা বেশী দরকার।যা, ব্লিডিং হয়েছে মাথা থেকে, কদিন একটু বিশ্রাম না নিলে এতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। বেশ একটা হালকা ধমকের সুরে বলে উঠলেন এখানকার ডাক্তার। আমি একটু কষ্ট করে মুখে জড়তা নিয়ে ডক্টর কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি এখানে কি করে এলাম?আমাকে এখানে কে নিয়ে এলো? তারপর ডক্টর বললেন, আরে আরে! এই সময় এত কথা বলবেন না!আপনার মাথায় চাপ পড়বে! আমি ডক্টরকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,আমি ঠিক আছি!আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না!আপনি প্লিজ বলুন না, আমি এখানে কি করে এলাম? তারপরে ডক্টর আমার জেদ দেখে বললেন, আচ্ছা বলছি! এই মণিকা!একটু তেরো নম্বর পেশেন্ট-এর যে এসেছে তাকে একটু ডেকে দিন তো? একটু পরেই একজন এসে এই ঘরে ঢুকলেন।গায়ে সিকিউরিটির পোষাক।উনি ঢোকার পর ডক্টর কি একটা কাজে যেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার সামনে এসে সিকিউরিটি পোষাক পড়া লোকটা বললেন, এখন কেমন আছো?আমি বললাম, এখন একটু ভাল আছি! তারপর আগ্রহবসত জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আমায় এখানে নিয়ে এসেছেন!উনি বললেন হা! রাতে যখন কাজ করে ঘরে ফিরছি তখন, দেখলাম রেললাইনের ধারে কে যেন পড়ে আছে মনে হচ্ছে!গিয়ে দেখি তুমি! মাথা ফেটে রক্তে জামাকাপড় পুরো লাল হয়ে গিয়েছিল।মনে হয়েছিল তুমি আর বুঝি বেঁচে নেই।কিন্তু নাকে হাত দিতে বুঝতে পারলাম, এখনও হালকা নিঃশ্বাস পড়ছে।তারপর সঙ্গে সঙ্গে এই হসপিটালে নিয়ে এলাম।ভগবানের অনেক দয়া যে এত রক্ত বের হওয়ার পরও তুমি বেঁচে আছো!এতটা বলে লোকটি তার কথা শেষ করলেন। আমি মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিলাম ওনার।তারপর মুখের জড়তা নিয়ে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানালাম ওনাকে।আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তার পরক্ষণেই লোকটির মুখের ভঙ্গি গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর আমায় জিজ্ঞেস করল,তোমার অবস্থা কি করে হল?তুমি কি পড়ে গিয়েছিল ট্রেন থেকে!!! আমি বললাম, না! না!সে এক ভয়ঙ্কর গল্প!উনি বললেন, ভয়ঙ্কর গল্প?মানে? হা তারপর আমি ট্রেনের পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে উনাকে বললাম।তা শুনে উনি বললেন, তোমার সাথেও ঘটেছে!একটা প্রশ্নসূচক ওনার কথায় পেলাম আমি।বললাম, -আমার সাথে মানে? -কেন তুমি যেন না? -কি জানি না?তারপর উনি আমায় পুরো ঘটনাটা শোনাতে লাগলেন। -কয়েকমাসে আগে এক মধ্যরাতে ওই স্টেশন দিয়ে একটা ট্রেন যাচ্ছিল!ট্রেনের কামরাটাই তখন বেশী লোক ছিল না।ওই চারজন ব্যক্তি সফর করছিলেন তখন কামরায়।হঠাৎ ট্রেনের মাথার ওপর একটা ব্রিজ হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে।পুরো কামরাটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়।পরে যখন ওই কামরার ভেতর থেকে ওদেরকে বার করা হয় তখন ওদের অবস্থা খুবই বাজে রকম ছিল।এবড়োখেবড়ো থেতলানো বিকট আকৃতি ওদের মুখগুলো দেখতে হয়েছিল।এতটাই বাজে ভাবে ক্ষত হয়েছিল ওরা যে যারা ওনাদের বার করছিলেন তারা পর্যন্ত ভয় পেয়ে যান।কিন্তু তখন ওরা কেউই বেঁচে ছিল না। পরে অবশ্য শুনেছি,যেখান থেকে ওদের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল সেখান থেকে রাতে যখন কোনো ফাঁকা ট্রেন যায় ওই জায়গায় তখন আপনাআপনি ট্রেন থেমে যায়।তারপর ওই চারজনের আত্মা ট্রেনে উঠে পড়ে।তোমার ভাগ্য ভাল যে তুমি বেঁচে গেছো।কেউ কেউ শুনেছি এইভাবে মারাও গেছে। এর পরদিনই হসপিটাল থেকে সোজা বাড়ি চলে এলাম আমি।কিন্তু একটা আপসোস রয়ে গেল যে পরীক্ষাটা আর দেওয়া হল না।তাতে কি!জীবনের থেকে কি পরীক্ষাটা বড় হল!!! ! সমাপ্ত!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অপেক্ষিত ট্রেন-০১
→ চলন্ত ট্রেনে হঠাৎ দেখা -০৫
→ চলন্ত ট্রেনে হঠাৎ দেখা -০৪
→ চলন্ত ট্রেনে হঠাৎ দেখা -০৩
→ চলন্ত ট্রেনে হঠাৎ দেখা -০২
→ চলন্ত ট্রেনে হঠাৎ দেখা
→ শেষ ট্রেনের অপেক্ষায় ????
→ রহস্যময় ট্রেন
→ ট্রেনের কামড়ায় অচেনা সেই লোক
→ ট্রেনের কামড়া
→ ট্রেনে বসে ভাবনার জগতে একদিন
→ ট্রেন
→ শেষ রাতের ট্রেন
→ শেষ রাতের ট্রেন
→ এ জার্নি বাই ট্রেন ইন সুইজারল্যান্ড

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now