বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

তোরণের তামাশা

"ভিন্ন খবর" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। সেলিম মতি নামের মানুষটি এক সময় ছিলেন সরকারের বড় আমলা। চাকরি জীবনে ছিলেন বেশ কড়া, হাতে ফাইল পড়লে ঝটপট সই করতেন না—যতক্ষণ না দেখে নিচ্ছেন কে পেছনে আছে, কে সামনে আছে। মানুষজন বলত, তিনি নাকি নিয়মের কড়ি। কিন্তু আসলেই কি নিয়ম? আসলে তিনি ছিলেন নিয়মের ভিতরে চামচামির কড়ি। যে সরকারের হাওয়া যেদিকে বইত, সেলিম মতি তার হাতা মেলে দিতেন ঠিক সেদিকে। অবশেষে চাকরিজীবনের ইতি টানলেন। পেনশন পেলেন, জমি-জমা দেখলেন, বাড়িঘর বানালেন। কিছুদিন ঢাকায় কাটালেন বনানীর বাসায়। কিন্তু কে আর আমলা না থাকলে মনে রাখে! নতুন অফিসাররা আসল, পুরনোদের নাম মুছে গেল, কেবল ফাইলের ধুলোয় পড়ে রইল কিছু সই। এই সময়েই তার মনে হলো—জীবনের পরবর্তী ধাপ রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু রাজনীতিতে ঢোকার আগে দরকার বড় দলের নমিনেশন। আর সেই নমিনেশনের টিকিট পেতে হলে চাই শক্তি-প্রদর্শন। নিজের ভাষায় বললেন—একটা “শো-ডাউন”। এক বিকেলে চা খেতে খেতে সেলিম মতি তার কামলা কমলাকে বললেন, —কমলা, মনে হয় শো-ডাউন না করলে নমিনেশন পাওয়া যাবে না। কমলা তখন উঠোনে বাঁশ কেটে খুঁটি বানাচ্ছিল। শুনে থেমে দাঁড়াল। বলল, —স্যার, শো-ডাউন মানে আবার কী জিনিস? হাটে গরু নামাইবেন নাকি? সেলিম মতি নাক ফুলিয়ে বললেন, —গাধা! শো-ডাউন মানে হলো, প্রচুর মানুষকে জড়ো করে দেখানো যে আমি জনপ্রিয়। কমলা হেসে মাথা চুলকাল। বলল, —জনপ্রিয় তো ভোটে প্রমাণ হয়। এতদিন আমলা ছিলেন, তখন তো চামচামী করতেন সেই সরকারের মন্ত্রী-সান্ত্রীর। তাদের কেউ কি পাশে আছে এখন? সেলিম মতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —আহা! যাদের চামচামী করেছি, তারা কেউ জেলে, কেউ বিদেশে পালিয়েছে। এলাকার ভেতরে তো আর কেউ নেই। কমলা এবার দাঁত বের করে হাসল। —তাহলে তো গরম সমস্যা। তবে স্যার, শুনেছিলাম এই এলাকার বর্তমান পার্টির সচিবকে নাকি আপনি সরকারি অনুদান দিয়েছিলেন? মতি সাহেবের চোখ ঝলমল করে উঠল। —হ্যাঁ, হ্যাঁ! সেই সচিব তো এখনো এলাকায় আছে। কমলা বলল, —তাহলেই সমাধান। তাকে ডেকে আনুন। কিছু টেন্ডারের গন্ধ দেখান, তারপর বলুন, “আমার জন্য একটা সংবর্ধনা দেন।” যে কথা সেই কাজ। সচিবকে ডাকা হলো। সচিব যখন টেন্ডারের কাগজে হাত রাখল, মনে হলো তার বুকের ভেতর থেকে সুরেলা বাঁশি বাজছে। মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, —স্যার, সংবর্ধনার ব্যবস্থা তো হবেই। তোরণ নির্মাণ শুক্রবার নির্ধারণ করা হলো মহাসমাবেশের দিন। এলাকার প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে অন্তত কয়েক শ’ মানুষ আনার ঘোষণা হলো। আর সড়কে সড়কে তৈরি হবে তোরণ। তোরণ বানানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল শ্রমিকরা। বাঁশ, কাঠ, কাপড়, রঙ—সব কিছু একসাথে মিশে এক উৎসবের আমেজ। “সেলিম মতি জিন্দাবাদ” লেখা ব্যানার, “ভবিষ্যতের এমপি” লেখা কাপড়, আর লাল-সবুজ বাতি দিয়ে সাজানো খুঁটি। এক গ্রাম্য বুড়ো পাশ থেকে দেখে বলল, —এত তোরণ বানাইতেছেন কেন রে? মনে হচ্ছে এলাকায় একশোটা বিয়ে হইতেছে! আসলেই তাই। বুধবারের মধ্যেই শ’খানেক তোরণ দাঁড়িয়ে গেল। বাজারের মাঝখান থেকে শুরু করে হাটের মোড়, স্কুলের গেট, এমনকি কবরস্থানের পাশেও তোরণ। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলল, —মৃতেরাও বুঝি ভোট দিবে! মহা-শো-ডাউন শুক্রবার সকাল থেকেই ঢোল-তবলা, বাঁশি, মাইক বাজতে লাগল। মানুষ আসতে শুরু করল ট্রাকে, ভ্যানে, কেউ হেঁটে। কেউ নিজের ইচ্ছায়, কেউ ভাতের লোভে, আবার কেউ স্রেফ কৌতূহল থেকে। সেলিম মতি মঞ্চে বসেছেন, সোনালি পাঞ্জাবি পরে। একের পর এক ফুলের মালা পড়ানো হচ্ছে। সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে ছেলেপেলেরা— “আমাদের নেতা কে? সেলিম মতি!” “আমাদের ভবিষ্যৎ এমপি! সেলিম মতি!” কিন্তু ভিড়ের মধ্যে চায়ের দোকানের আড্ডায় ফিসফাস শোনা গেল, —তোরণ বানাতে যে টাকা খরচ হলো, তা দিয়ে যদি গরিবদের ভাত দিত, তাহলে আসলেই জনপ্রিয়তা পেত। আরেকজন বলল, —জনপ্রিয়তা লাগে না ভাই, উপর মহল খুশি থাকলেই নমিনেশন! সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার সমাবেশ শেষে সাংবাদিক হবু এগিয়ে এলেন। হাতে খাতা, গলায় ক্যামেরা। তিনি কামলা কমলাকে ধরে বসলেন। —কামলা ভাই, বলুন তো, কয়টা তোরণ বানালেন আজকে? কামলা গম্ভীর গলায় বলল, —শ’খানেকের উপর হইছে। —এতোগুলো কেন? —জনগণ আমাদের নেতার পক্ষে আছে, সেটা উপর মহলকে দেখানোর জন্য। —ভোট তো জনগণ দেয়, উপর মহল না। কামলা আত্মবিশ্বাসে বলল, —ভোট দেয় ৬০% জনগণ, ৪০% উপর মহল। —তাহলে এত টাকা খরচ করার দরকার কী? —এটা ধরেন প্রথম বিনিয়োগ। —এই টাকা যদি দান খয়রাত বা কর্মসংস্থানে খরচ করতেন? —তা হলে তো গোল্লায় যেত। জনগণকে কিছু দেয়া যাবে না। তবে আশ্বাস দেয়া যাবে। —জনগণ যদি জেনে যায়? —জানবে না। ভাইরালের ঝড় কিন্তু এই সাক্ষাৎকার যে রেকর্ড হচ্ছিল, তা কমলার মাথায়ই ছিল না। হবু সেটা ফেসবুকে ছাড়ল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিও ভাইরাল। গ্রামের হাটে, শহরের মোড়ে, এমনকি ঢাকার ক্যাফেতেও মানুষ হাসতে হাসতে ভিডিও শেয়ার করছে। কেউ লিখছে, “এমন কামলা থাকলে নেতার শত্রুর দরকার নাই।” কেউ লিখছে, “তোরণ দিয়ে ভোট আসে না, পেট ভরা ভাত দিয়ে আসে।” নেতার নিঃশ্বাস রাতে সেলিম মতি বিছানায় শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চারদিকে হাসাহাসি, উপহাস। তবুও তিনি আশা ছাড়েন না। মনে মনে ভাবলেন—“উপর মহল যদি দেখে আমি জনপ্রিয়, তাহলেই নমিনেশন। জনগণ হাসুক, তাদের হাসি তো ভোটবাক্সে জমা হয় না।” কিন্তু পাশের ঘর থেকে কমলার গলা ভেসে এলো— —স্যার, ভয় নাই। মানুষ আজকে হাসবে, কালকে ভুলে যাবে। রাজনীতি তো এমনই। সেলিম মতি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শো-ডাউন হলো, তোরণ হলো, মানুষ হাসল। কিন্তু আসল প্রশ্ন থেকেই গেল—জনগণের মন না জিতে উপর মহলের চামচামি দিয়ে কতদূর আসলে নেতা হওয়া যায়?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ তোরণের তামাশা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now