বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তন্দ্রালয়
১.
দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে চৈতী ৷ তার হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা ৷ অনেকখন ধরে চিৎকার করে তার গলা একদমই ভেঙে গেছে ৷ গায়ে সামান্য শক্তিও নেই ৷
ক্লান্ত চোখ টিপটিপিয়ে চারপাশে তাকালো ৷ অদ্ভুত এক ঘরে বন্দি সে ৷ এমন ঘর আগে কখনো দেখেনি ৷ ক্লান্ত মস্তিষ্কের সাথে বিস্ময়তা যোগ হলো ৷
ঘরের দেয়াল তৈরি কাঁচ দিয়ে ৷ চারপাশটা লাল কাঁচ দিয়ে ঘেরা ৷ মাথার উপরের ছাদটাও কাঁচের ৷ তবে সেটা হলুদ রঙের ৷ এমন বিচিত্রময় ঘর সে তার গোটা জীবনেও দেখেনি ৷ চোখের সামনে, ডানে-বামে— সব দিকেই নিজের ক্লান্ত ছবি দেখতে পাচ্ছে চৈতী ৷
এই ঘরে সে এলো কি করে ৷ সেটিও তার মনে পড়ছে না ৷ নিজের শরীরের দিকে খেয়াল করে বুঝতে পারলো, পড়নের জামা অনেকাংশ ছেড়া ৷ বুকের উপরের জামার অংশটুকু নেই বললেই চলে ৷ চৈতী ধারনা করলো তাকে ধর্ষনের উদ্দেশ্যে এখানে বন্দি করা হয়েছে ৷
এমনটা ভাবতেই তার কানে টং টং করে আওয়াজ ভেসে এলো ৷ ব্যস্ত ভাবে সে চারপাশে চোখ ঘুরাতে লাগলো শব্দের উৎসটি কোথায় তা জানার জন্য৷
কয়েক সেকেন্ড পরেই বুঝতে পারলো তার মাথার উপর থেকে দড়ির মত সরু কি যেন নেমে আসছে ৷ একটা, দুটো না ৷ প্রায় বিশটির মত হবে ৷ জিনিসটা চোখের সামনে নামতেই বুঝতে পারলো সেগুলো পাইপ৷
চৈতী আর্তনাদের স্বরে — না! না! করতে লাগলো ৷ কিন্তু তার গলা দিয়ে আওয়াজটি তেমন জোরের সাথে বের হলো না ৷ সেই অদ্ভুত পাইপগুলো থেকে—শিস! শব্দ হয়ে গ্যাস বের হতে লাগলো ৷
চৈতীর ভয়ার্ত ডাগর চোখ, ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হয়ে গেল ৷ অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লো কাঁচের তৈরি মেঝের উপর৷....
২.
গত তিন দিন চৈতীর কোন খোঁজ না পেয়ে উন্মাদের মত হয়ে গেছে মুহিত ৷ হন্য হয়ে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে খোঁজ করেনি সে ৷ চৈতীর আপন মানুষ থেকে শুরু করে দূরের মানুষ ৷ সবার দরবারেই খোঁজ করেছে৷
মেয়েটি নিখোঁজ হওয়ায় মুহিতের এমন উন্মাদনার কারন স্রেফ— ভালোবাসা ৷ সাড়ে চার বছরের সম্পর্ক তাদের ৷ সম্পর্কের ব্যাপারটা দুই পরিবারই জানে৷
দিন তিনেক আগে তাদের ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল মাওয়া ফেরিঘাটে ৷ সকালে চৈতীর নাম্বারে ফোন দিলে সেটি বন্ধ আবিষ্কার করে মুহিত ৷ দুপুর অবধি ফোন বন্ধ পেয়ে সোজা চলে গেল মেয়েটির বাসায় ৷ চৈতীর ছোট বোন নিশি—মুহিতকে দেখে খানিকটা অবাকের স্বরেই বলে, ‘কি ব্যাপার ভাইয়া? আপনি!’
মুহিত বলে, ‘হ্যা৷ তুমি কেমন আছো?’
—‘ভালো আছি ৷ কিন্তু হটাৎ আপনি এখানে ! আপু কোথায়?’
—‘ ও বাড়িতে নেই!.. আমি তো ওকেই নিতে এলাম ৷ চৈতীর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে৷’
—‘আপু তো সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আপনার ফোন পেয়েই বেরিয়েছে ৷ যাবার আগে বলেছে, ফিরতে সন্ধ্যা হবে৷’
নিশির এমন কথা শোনে মুহিতের বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠেছিলো ৷ নিশ্বাস নিতেই বুক ভারী ঠেকছিলো ৷ ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে মুহিত বলেছে, ‘মজা করছো নিশি৷’
—‘না ভাইয়া৷ বিশ্বাস না হয় আম্মুকে জিজ্ঞাসা করুন৷’
—‘থাক, তার আর দরকার নেই৷’
মুহিত ভালো করেই জানে নিশি মেয়েটি মজা করার পাত্রী না ৷ খুব সিরিয়াস মেয়ে সে ৷ সেদিন চৈতীদের তিন তালা বাসায় যেই হাসি নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠেছিলো মুহিত ৷ সন্ধ্যার আকাশে মেঘ জমার মত বিদঘুটে অন্ধকার নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলো ৷
তার মুখের সেই অন্ধকার আর জমা মেঘ এখন পর্যন্ত পরিষ্কার হয়নি ৷ এই তিনদিন ধরে চৈতীর পরিবারের উপর যতটা দুশ্চিন্তার বৃষ্টি ঝরেছে ৷ মুহিতের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝড় ৷
চৈতীর বাবা আবুল হোসেন তো মুহিতের বাসায় এসে শাসিয়ে গেছে যে মেয়েকে না পেলে সবার কপালে খারাবী আছে ৷
আবুল হোসেনের হুমকি ধমকিতে অবশ্য মুহিতের কিছুই যায় আসে না ৷ তার সর্ব চিন্তা কেবল চৈতীকে নিয়ে ৷ কারন ইদানিং পত্রিকায় বেশ চোখে পড়ার মত একটি খবর ছাপা হচ্ছে— মেয়ে উধাও ৷ বিশ বছরের উপর বালিকাদের অপহরণের খবর পত্রিকার ফ্রন্ট পেইজে দেখা মিলছে ৷ পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থারা অবশ্য এই রহস্য উদঘাটনের পেছনে উঠে পড়ে লেগেছে ৷
এমনটি ভাবতেই মুহিতের শরীর অবশ হয়ে আসছে ৷ তার বিশ্বাস এমন কিছু ঘটেনি ৷
অনেক জায়গা খোঁজ করে ব্যর্থ হওয়ায়, হাল ছেড়ে দিয়ে চৈতীদের বাড়িতে গেল সে ৷ উদ্দেশ্য ছিল আবুল হোসেন এর অনুমতি নিয়ে পুলিশকে জানাবে ৷
কিন্তু সেখানে পৌছেই দেখলো পুলিশের উপস্থিতি৷ মুহিতকে দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে সবাই তার দিকে আড় চোখে তাকালো ৷ নিশি দৌড়িয়ে এসে তার হাত ধরে ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘পুলিশ এসেছে একজন ৷ গোয়েন্দা বিভাগের লোক ৷ উনাকে নাকি কে ফোন করে জানিয়েছে এই বাড়ির মেয়ে তিন দিন ধরে গায়েব ৷ এই কথার সত্যতা কতটুকু তা জানার জন্যই এসেছে ৷
বাবাও চাচ্ছিলেন পুলিশকে জানাবে ৷ যখন দেখল নিজ থেকেই পুলিশ এসেছে তখন আর কোন কিছু ধামা চাপা না দিয়ে গোটা ব্যাপারটা খুলে বলেছে ৷ আর তা শুনে সেই পুলিশ ভদ্রলোক আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছেন ৷ ভালো সময়ে এসেছেন ৷ যান বসার ঘরে, ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলুন ৷’
বসার ঘরে যাওয়ার আগে নিশিকে মুহিত বলল,‘কোন কি খোঁজ খবর পেলে?’
চোখের কোণে পানি এনে, না বোধক অর্থে দু’পাশে মাথা ঝাকালো নিশি ৷
৩.
ড্রয়িং রুমে হাজির হলো মুহিত ৷ সেখানে বাড়ির সকলেই অবস্থান করছে ৷ সবার মুখ দুশ্চিন্তার মেঘে ঢাকা ৷ কেউ কেউ ফুসফুসিয়ে কাঁদছে ৷ তার মধ্যে এক জনের চেহারা বিচিত্র ৷ সেই চেহারায় খেলা করছে মৃদু হাসি ৷
লোকটি উত্তর পাশে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে মুহিতের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ হাতে সিগারেট জ্বলছে ৷ মাথায় কাচা পাকা চুলের মিশ্রন ৷ গালে খোচা খোচা দাড়ি ৷ গফটা খুব ঘন ৷ মোটামুটি স্বাস্থ্যের অধিকারী তবে উচ্চতা মাঝারি ৷ লোকটির বয়স আনুমানিক চল্লিশ ছুই ছুই ৷ পড়নে ঘিয়ে রঙের শার্ট এবং জিন্স ৷
ভদ্রলোককে আগে কখনো দেখেনি মুহিত ৷ হয়তো ইনি সেই গোয়েন্দা পুলিশ ৷ তবে মুহিতের কাছে কেন যেন লোকটিকে পুলিশ বলে মনে হচ্ছে না ৷
সে একটি চেয়ার টেনে বসলে লোকটি সরাসরি মুহতকে বললেন, ‘আমার নাম শাহেদ ৷ ডিবি পুলিশ ৷’ পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে মুহিতকে দেখালেন ৷ তারপর বললেন, ‘‘ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা আমার পছন্দ না ৷ সোজাসুজি বলছি ৷ আশা করছি উত্তরটা সরাসরি পাবো ৷ আপনাদের সম্পর্কের কথা ইনাদের কাছ থেকে শুনেছি ৷ কাজেই সে দিকটায় আর যাবো না ৷ এবার সত্য করে বলুন— সেদিন আপনি মেয়েটির সাথে দেখা করেন নি?’
অবাক হওয়ার স্বরে বলল, ‘অবশ্যই না ৷ দেখা হলে কি আর বাসায় এসে খোঁজ নিতাম ৷’
পুরু গোফ বাকিয়ে এক হাসি হাসলেন শাহেদ ৷ সেই হাসির অর্থ বোঝার জন্য অনেকখন তার দিকে তাকিয়ে রইলো মুহিত ৷ একে অপরের দিক থেকে চোখ সরাচ্ছে না কেউ ৷
রীতিমতো যেন এক দৃষ্টি যুদ্ধ ৷ যে চোখ সরাবে, সেই হেরে যাবে ৷ শাহেদের চোখে সন্দেহ চাহনি ৷ অতঃপর সেই সন্দেহ চাহনি নিজ থেকে নামিয়ে নিয়ে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন ৷ তারপর বললেন, ‘আপনারা চিন্তা করবেন না ৷ আমি খোঁজ নিচ্ছি...বলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুহিতের দিকে তাকিয়ে বললেন— আবার দেখা হবে৷’
এই কথাটিতে মুহিতের চোখের কোণে কেমন এক অদ্ভুত ভয় দেখতে পেল পাশেই দাঁড়ানো নিশি৷...
৪.
আরো দু’দিন পার হয়েছে ৷ চৈতীর কোন প্রকার খোঁজ মেলেনি ৷ মুহিত নিজের মত করে কিছুটা অনুসন্ধান চালিয়ে এখন পুরদ্দমে বাসায় চিন্তামগ্ন ৷
তার খাটের উপর পত্রিকা পড়ে রয়েছে ৷ ফ্যানের বাতাসে পত্রিকার পাতা খস খস শব্দে উল্টে যাচ্ছে ৷ খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে সিগারেটে লম্বা ধোয়া ছেড়ে সে তাকিয়ে আছে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে৷ এখন তার কি করণীয় সেটা বুঝে উঠতে পারছে না৷
মস্তিষ্কে চৈতীর ব্যাপরটি বাদেও শাহেদ ভদ্রলোকটি কে নিয়ে ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে ৷ কেন যেন তাকে গোয়েন্দা পুলিশ বলে এখনো মনে ধরছে না ৷
হটাৎ-ই দেয়াল ঘড়ি থেকে চোখ সরিয়ে পত্রিকাটি হাতে নিল ৷ সেই অপহরণের বিষয়ে র্যাবের অধিনায়ক বলেছেন, ‘এটি খুব বুদ্ধিমান কোন গ্যাং এর কাজ ৷ যার কারনে প্রশাসনকে এই অপারশনে সফল হতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে ৷ তবে আমরা কিছুটা বুঝতে পারছি যারা এই অপহরণের সাথে জড়িত ৷ তারা হয়তো মেয়েগুলোর চেনা জানা বা ফেমেলির পরিচিত এমন কেউ ৷ যার জন্য পাক্কা প্রমান আমাদের হাতে আসছে না ৷’
খবরটা পড়ে কিছুখন নিজ মনে ঘটনার বিশ্লেষণ চালাতেই তার ফোনে রিং বেজে উঠলো ৷ অপরিচিত এক নাম্বার ৷ ধরতেই ওপাশ থেকে দারাজ গলায় বলল,‘আমি শাহেদ বলছি ৷ আপনি কোথায় আছেন?’
—‘আমি বাসায়৷’
—‘আপনার বাসার নিচে আমার লোক গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ আপনি নিচে নামুন ৷ এবং তাদের সাথে করে চৈতীদের বাসায় চলে আসুন৷’ বলেই ফোন রেখে দিলো সে৷
মুহিত বাসার নিচে নেমে দেখলো গেইটের সামনে একটি পাজেরো গাড়ি দাঁড়ানো ৷ তার সামনে তিন জন যুবক ৷ তাদের দেখে কোন ভাবেই পুলিশের লোক বলে মনে হলো না৷
মেডিকেলের স্টুডেন্ট কিংবা বুয়েটের স্টুডেন্ট মনে হলো প্রথম দেখাতেই৷
মুহিতকে দেখে তারা কেউ কোন কথা বলল না ৷ তাদের মধ্যে থেকে একজন শুধু সামনে এগিয়ে জিজ্ঞাসা করলো—‘মুহিত?’
মুহিত মাথা ঝাকালো ৷ তাদের থেকে অন্য একজন গাড়ির দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য চোখ দিয়ে ইশারা করলো ৷
মুহিত গাড়ি করে যাচ্ছে ৷ তার দু’পাশে দুজন ৷ সামনে গাড়ি চালাচ্ছে একজন ৷ কেউ কোন প্রকার টু শব্দ করছে না ৷ মুহিতো কিছু বলছে না ৷ তার বুকের কাঁপুনি ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে৷ ...
৫.
চৈতীদের বাসায় সবাই উপস্থিত আছেন ৷ গোয়েন্দা শাহেদকে দেখা যাচ্ছে সেদিনকার মত পোষাক পড়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে ৷ ঠোঁটে সেই রহস্যের হাসি ৷ হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ৷
মুহিতকে দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে শাহেদের হাসি চওড়া হলো ৷ পেছনে দাঁড়ানো তিন যুবককে নির্দেশ দিল তার হাতটি শক্ত করে ধরার জন্য ৷ তাদের মধ্যে থেকে একজন সেই আদেশটি পালন করলেন৷
বসার ঘরে সবার দিকে তাকালো মুহিত ৷ তার দৃষ্টির ভাষা পরিষ্কার বলে দিচ্ছে— আমি কিছু করিনি৷
নিশির দিকে তাকালো সে ৷ ঘৃনায় চোখ সরিয়ে নিলো মেয়েটি ৷
তারপর শাহেদ গলা খাকরে পরিষ্কার করে বলে শুরু করলো, ‘মুহিত, আপনি সেদিন চৈতীর সাথে দেখা করেননি বলেছিলেন ৷ কিন্তু আমি যদি বলি আপনি দেখা করেছেন ৷ সেদিন সাড়ে ন‘টায় আপনি চৈতীকে ফোন করেছেন ৷ এরপর আপনারা দেখা করেছেন সিদ্ধেশরী কলেজের সামনে সকাল এগারোটার দিকে ৷ এর প্রমান কলেজের অপর পাশে ডিপার্টমেন্ট স্টোলের এক সিসি ক্যামারা ৷ আর সেখানেই যে আপনারা দেখা করবেন তার খবর পেয়েছি চৈতীর বান্ধবী রিতুর কাছে থেকে ৷ চৈতীর বান্ধবীর বিষয়ে জানতে চাইলে এই রিতুর ব্যাপারে জানতে পারি ৷ এবং সে তার বান্ধবীকে ঘুরতে যাওয়ার সব কিছুই বিস্তারিত বলেছে৷
সেখানে আপনাদের কোন এক বিষয় নিয়ে ভালো রকমের ঝগড়া হয় ৷ এবং আপনি ওর গায়ে হাত তুলেন ৷ তারপর সেখান থেকে আপনারা যে যার মত চলে যান ৷ এসব সিসি ফুটেজে রয়েছে৷
এখন চৈতীকে আপনি কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন বা তার সাথে কি করেছেন তা আপনাকে বিশেষ ভাবে সময় দিলেই বের হবে৷’
ঘন এক নিঃশ্বাস ছাড়লো মুহিত ৷ লাগাতার চোখের পাপড়ি ফেলতে লাগলো ৷ মনে হচ্ছে চোখের সামনে সব অস্পষ্ট দেখছে ৷ জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজালো, তারপর হাতের কনুই দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, ‘হ্যা! ওর সাথে আমার সেদিন দেখা হয়েছে ৷ কলেজের সামনে কথাও হয়েছে ৷ কিন্তু আমি এক জরুরি কাজে আটকে যাওয়ায় তাকে বললাম—আজ আমরা যেতে পারবো না ৷ এই নিয়ে চৈতী রাগারাগি শুরু করে দেয় তখন আমি রাগের মাথায় এক চড় মেরে বসি ৷
এরপর সে চলে আসে ৷ পরবর্তীতে আমি ফোন দিলে তা বন্ধ পাওয়ায় বাসায় এসে খোঁজ নেই ৷ এর বেশি কিছু জানি না ৷ বিশ্বাস করুন৷...’
শাহেদ ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললেন, ‘ বিশেষ ব্যবস্থা নিলেই আপনার সত্য বের হবে ৷ ওকে গাড়িতে উঠাও ৷‘
তারপর চৈতীর বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না ৷ শীঘ্রই আপনার মেয়েকে পাওয়া যাবে৷..’
৬.
গাড়িতে মুহিতের চোখ বেঁধে এক বিশেষ জায়গায় নিয়ে এলো শাহেদ ৷ চোখের বাঁধন খুলে দিতে চোখের পাপড়ি মিটমিটিয়ে সামনে তাকালো সে ৷ দেখতে পেল শাহেদের সিগারেট ধরানোর বিশেষ ভঙ্গি ৷ বাকি তিন জন যুবক বুকে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে মুহিতের দিকে ৷ তারা যেন শাহেদের কোন নির্দেশের অপেক্ষা করছে ৷
তাদের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে তা ঘুরালো চারপাশে৷
মুহিতের কাছে ঘরটি ভীষণ অদ্ভুত লাগলো ৷ কোন ভাবেই এটি জেলখানা হতে পারে না ৷ বা গোয়েন্দা কার্যালয়ের কোন গোপন কক্ষও না ৷ এমন ঘর সে গোটা জীবনেও দেখেনি ৷ চারপাশটা লাল কাচের দেয়াল ৷ উপরের ছাদটি হলুদ কাচের ৷ ফ্লোরটিও কাচের তৈরি ৷
মুহিত ঝাঝালো স্বরে বলল, ‘এটা কোন জেল না ৷ তোমরা কারা?’
সিগারেটে এক ঘন ধোয়া ছেড়ে শাহেদ বলল, ‘আমরা ইতিহাস সৃষ্টিকারী ৷ ’
—‘মানে?’
—‘মানেটা বুঝিয়ে বলছি, আমি একজন বিজ্ঞানী ৷ আর ঐযে তিনজনকে দেখছেন ৷ তাদের মধ্যে দুইজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ৷ আরেক জন ডাক্তার ৷ আমরা যুবতি মেয়েদের রোবট মানবী বানাচ্ছি ৷ তাদের হৃদপিন্ডে একটি ট্রান্সমিটার বসিয়ে আরেকটি কার্ড ব্রেইনের সাথে সংযুক্ত করছি ৷
যার ফলে তারা আমাদের কথা মত কাজ করবে স্বাভাবিক মানুষের মত ৷ অন্য মানুষরা বুঝবেও না যে তারা কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ৷ কিছু মেয়ের উপর এর পরীক্ষা চালাতে গিয়ে কয়েক জন মারা গিয়েছে ৷ তবে খুব জলদি আমরা ইতিহাস তৈরি করতে সক্ষম হবো ৷’
মুহিত বলল, ‘এর জন্য মেয়েরাই কেন ৷ কোন পুরুষ হলে সমস্যা কি?’
—‘ মেয়েদের দিয়ে যেই কাজটা হাসিল হবে তা পুরুষ দিয়ে হবে না ৷ একজন যুবতি মেয়ের প্রতি দশ জন পুরুষ আকৃষ্ট হতে পারে ৷ আমরা সেটাই কাজে লাগাতে চাচ্ছি ৷ সেই মেয়েদের দ্বারা আমরা ইন্টালেজিন্সির ছেলেদের থেকে অনেক কিছু হাতিয়ে অন্য দেশে প্রাচার করবো মোটা অঙ্কে ৷’
—‘তাহলে আমাকে ধরে আনা হয়েছে কেন?’
—‘ আপনাকে ধরে আনার ফলে চৈতীর পরিবার কোন প্রকার হাঙ্গামা করবে না কেবল মেয়ে হারানো আফসোস বাদে ৷ তারা মিডিয়ার কাছেও যাবে না ৷ আর সত্যিকারের পুলিশের কাছেও না৷
—‘চৈতীসহ বাকি মেয়েরা কোথায়?’
—‘এখানেই ৷ এটাই হচ্ছে আমাদের ইতিহাস তৈরির কারখানা ৷ এই বাড়ির নাম ‘তন্দ্রালয়’ ... বলে শাহেদ উচ্চ স্বরে হাসলনে ৷ যেন এই গোটা পৃথিবীর রাজা বনে গেছেন ৷
তারপর হাসি থামিয়ে শাহেদ বললেন, ‘এখন একটি গ্যাস ছাড়া হবে ৷ তার বিশ মিনিটের মধ্যেই এই পৃথিবী ছাড়বেন আপনি ৷ খোদা হাফেজ৷’...বলে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷
মুহিত দেখলো উপর থেকে একটি পাইপ নিচে নেমে আসছে ৷ তার থেকে গ্যাস বের হতেই মুহিত অজ্ঞান হয়ে পড়লো৷....
৭.
মুহিত চোখ মেলে তাকালো ৷ গোটা ঘরে র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থার লোক ৷ কয়েক জন ডাক্তার দেখা যাচ্ছে ৷ মুহিতের পেছনে নয় জন মেয়ে ক্লান্ত অবস্থা বসে আছে ৷ তার মধ্যে চৈতীকে দেখতে পাচ্ছে সে ৷ চৈতী মুহিতকে দেখে হাসলো৷
সেই তিনজন এবং শাহেদ সামনে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ৷ চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এক পশলা মাইর হয়েছে ৷ তারপর পাশ থেকে র্যাবের অধিনায়ক বললেন, ‘ধন্যবাদ মুহিত ৷ ধন্যবাদ চৈতী৷’
শাহেদ বলে উঠলেন, ‘মানে৷’
র্যাবের অধিনায় বললেন, ‘ চৈতী ছিলো আমাদের টোপ৷ যখন দেখলাম এক সপ্তাহ পর পর মেয়ে গায়েব হচ্ছে ৷ তখন তারা দুজন আমাদের কাছে এসে এই প্লানের কথাটি বলেন ৷ যখন জানতে চাইলাম— তোমরা এমনটি কেন করবে তখন তারা বলল, ‘সখে মানুষ এভারেস্টে উঠতে পারলে আমরা এই কাজ কেন পারবো না ৷ কাজটি দেশের জন্যও মঙ্গল ৷ এরপর আমরা তাদের হেল্প নিলাম ৷ এর আগের কেইসে দেখেছি ভিক্টিম এর প্রেমিক এবং কাছের মানুষকেও গায়েব করা হয়েছে ৷
তাই আমরা মুহিতের শরীরের ছোট এক ট্রাকিং চিপ লাগিয়ে দেই ৷ যার ফলে আমরা ঠিকানা বের করি এবং আপনাদের সব কোথাও আমরা শুনতে পারি৷’
শাহেদে হতাশ হলেন ৷ দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে পড়লেন ফ্লোরে ৷ স্বপ্ন ভঙ্গের ভার যেন সইতে পারলেন না ৷
মুহিত চৈতীর দিকে তাকিয়ে হাসলো ৷ শরীর অত্যন্ত দুর্বলের কারনে একে অপরের দিকে ছুটে যেতে পারলো না ৷ তবে তাদের হাসিটি যেন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরলো ...৷ ( সমাপ্ত )
~ মাসায়েখ পনি
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now