বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
হবিগঞ্জ শহর থেকে দক্ষিণে যতই এগোও, শহরের কোলাহল ফিকে হয়ে আসে। রাস্তায় দুলতে থাকা তালের ছায়া আর বকের ডানায় মিশে থাকা নীরবতা মিলেমিশে যেন এক অন্য জগতে নিয়ে যায় মানুষকে। সেই জগতের মাঝখানে, প্রাচীন বটগাছের ছায়া পেরিয়ে, কাঁকরমাটির সরু পথ ধরে পৌঁছালে দেখা মেলে এক অপার্থিব দৃশ্যের—“মশাজানের দিঘী।”
দূর থেকেই মনে হয়, যেন কোনো বিশাল আয়না বিছানো আছে মাটির বুকে। বাতাস যখন হেলে পড়ে, আয়নাটা তখন তরঙ্গ তোলে, আবার শান্ত হয়ে যায়। দিঘীর জল এতটাই স্বচ্ছ যে নিচে থাকা কালো রঙের অদ্ভুত সব পাথর দেখা যায়। কেউ বলে, ওগুলো উল্কাপিণ্ড, কেউ বলে, অলৌকিক কোনো রহস্যের অংশ।
কিন্তু এই দিঘীর গল্প শুধু পাথর বা স্বচ্ছ জলের নয়—এ গল্প এক অলির প্রার্থনা, এক রাতের আলোর জন্ম, আর এক গ্রামের শ্বাসরুদ্ধ নীরব বিস্ময়ের।
শোনা যায়, বহু শত বছর আগে, এই অঞ্চল ছিল জনবসতিহীন বনভূমি। চারপাশে কেবল শেয়ালের হুক্কাহুয়া, নীলগাইয়ের ছায়া, আর ঘন কুয়াশায় ঢাকা পাথুরে টিলা। সেই বনে এসে একদিন আশ্রয় নেন এক দরবেশ—সৈয়দ গোয়াস উদ্দীন। সাদা পোশাক, মাথায় পাগড়ি, হাতে কাঠের লাঠি। তাঁর চোখে এমন এক শান্তি ছিল, যা দেখলে মানুষ নিজের অন্তরের অস্থিরতাও ভুলে যেত।
তিনি এখানে আসেন এক আধ্যাত্মিক আহ্বানে। বলেন, “এই ভূমি তৃষ্ণার্ত। এখানে জলের অভাব শুধু দেহে নয়, আত্মায়ও।”
দিনে তিনি ধ্যানে বসতেন, রাতে হাঁটতেন গাছগাছালির ভেতর। গ্রামের দিক থেকে কেউ কেউ আসত, দূর থেকে তাঁকে দেখত, আবার ফিরে যেত। কারণ তাঁর চারপাশে ছিল এক রহস্যময় নীরবতা—যেন বাতাসও তাঁকে বিরক্ত করতে ভয় পায়।
একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে আসে। তার নাতি জ্বরে পুড়ছে, আর পানি নেই আশেপাশে। “হুজুর,” সে বলে, “এই মাটিতে পানি যেন অভিশপ্ত! কূপ খুঁড়ি, জল পাই না। পাইলে তেতো হয়ে যায়। আপনি কিছু করুন।”
দরবেশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ আকাশের দিকে উঠল। “আল্লাহ,” তিনি ফিসফিস করলেন, “তুমি তো বলেছিলে, আমি যেখানে তোমার নাম উচ্চারণ করব, সেখানে করুণা নেমে আসবে। তবে এই ভূমি এখনো শুকনো কেন?”
সেই রাতে আকাশ ছিল অদ্ভুত উজ্জ্বল। পূর্ণিমার চাঁদ, কিন্তু তার আলোয় এক অচেনা নীলাভ আভা মিশে ছিল। গ্রামের মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেও বনের দিক থেকে অদ্ভুত আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল—যেন কারও পায়ের শব্দ, আবার কারও ডানার ঝাপটানি।
সৈয়দ গোয়াস উদ্দীন তখন দাঁড়িয়ে আছেন মাঠের মাঝখানে। তাঁর ঠোঁটে নিরব প্রার্থনা, চোখ বন্ধ, দুই হাত আকাশের দিকে উত্থিত। আর হঠাৎ—আকাশ আলোকিত হয়ে উঠল। যেন হাজারো তারা একসাথে ফেটে পড়েছে। আলো নামছে ধীরে ধীরে, যেন রূপালি নদী নেমে আসছে আকাশ থেকে।
গ্রামের লোকজন ভয়ে দৌড়ে আসে। তারা দেখে—দরবেশের চারপাশে ফেরেশতারা নেমে এসেছে, ঝলমলে ডানায় তারা মাটি ছুঁয়ে দিচ্ছে। সেই মাটি কেঁপে উঠছে, বাতাসে ভেসে আসছে অচেনা সুবাস। কেউ পানি বলে, কেউ বলে নূরের ধারা।
এক রাতেই সেখানে সৃষ্টি হয় এক বিশাল জলাধার। সকাল হলে দেখা গেল, অজস্র কালো রঙের পাথর দিয়ে ভরা এক দীঘি। পানি এমন পরিষ্কার যে, নিজের মুখ দেখে মানুষ ভয় পায়—কারণ আয়নায় যেমন সত্য দেখা যায়, তেমনই এই পানিতে দেখা যায় অন্তরের মুখ।
যেদিন প্রথম সূর্যের আলো দীঘীর পানিতে পড়ল, গোটা মশাজান গ্রাম যেন আলোকিত হয়ে উঠল। মানুষ ছুটে এলো চারদিক থেকে। কেউ হাত ডুবিয়ে জল তুলল, কেউ শিশুকে স্নান করাল। আশ্চর্য! যে বৃদ্ধা রাতে কেঁদেছিল, সকালে তার নাতি জ্বরমুক্ত। তার মুখে হাসি, চোখে অশ্রু।
ধীরে ধীরে দীঘী হয়ে উঠল এক পবিত্র স্থান। কিন্তু যত রহস্যই হোক, এর জল কখনো নোংরা হয়নি, কখনো কচুরিপানা জন্মায়নি। কেউ কূপ খুঁড়তে গেলে দেখা যেত, পাশের মাটিও শুকনো। অথচ এই দীঘী যেন নিজের প্রাণে ভরপুর, কখনো শুকোয় না।
একবার এক পণ্ডিত এলেন দূর দেশ থেকে। তাঁর নাম ছিল হরিদাস মুখোপাধ্যায়, কলকাতার এক নামকরা ভূতত্ত্ববিদ। তিনি কৌতূহলী মানুষ, শুনেছিলেন এই দীঘীর গল্প। জল পরীক্ষা করলেন, পাথর কেটে দেখলেন। কিন্তু ফলাফল তাঁর কাছে এক রহস্যই রইল।
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, “এই পানিতে এমন কিছু আছে যা পৃথিবীর কোনো জলে নেই। হয়তো এটি আকাশের টুকরো।”
তখন গ্রামের এক বালক বলল, “চাচা, এটা আকাশের টুকরো না, এটা আল্লাহর দান। হুজুরের দোয়ায় নেমেছে।”
হরিদাস মুচকি হেসে চুপ করে গেলেন। কারণ বিজ্ঞান যা ব্যাখ্যা করতে পারে না, তা হয়তো বিশ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
বছর যায়, শতাব্দী পেরোয়। দরবেশের কবর আজো দিঘীর পশ্চিম পারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। কেউ সন্ধ্যায় সেখানে গেলে দূর থেকে এক মৃদু গুঞ্জন শুনতে পায়—যেন জলের ভেতর কেউ তসবি পড়ছে।
গ্রামের লোকেরা বলে, “দিঘীর তলদেশে আলো জ্বলে। রাতে যদি চুপচাপ তাকাও, দেখতে পাবে আলোর বিন্দু ভেসে বেড়াচ্ছে।”
একবার এক কিশোর, নাম মঈন, কৌতূহল বশে নেমে গেল দীঘীতে। সে জানতে চাইল, নিচে কী আছে। জলের নিচে নামতে নামতে হঠাৎ দেখল, কালো পাথরগুলোর ফাঁক দিয়ে আলো ছিটকে আসছে—নরম, নীলাভ আলো। যেন আকাশের প্রতিফলন নয়, আকাশ নিজেই লুকিয়ে আছে নিচে।
মঈন ফিরে এসে কিছু বলল না। শুধু বলল, “যে দীঘীতে নামবে, তার অন্তর যদি কালো হয়, সে আর ওপরে উঠতে পারবে না।”
তারপর থেকে কেউ আর গভীরে নামতে সাহস করে না। সবাই দূর থেকে দেখে, শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করে, আর মনে মনে বলে, “এ জল কেবল তৃষ্ণা মেটায় না, আত্মাও ধুয়ে দেয়।”
আজও যখন সূর্যাস্ত হয়, মশাজানের দিঘী যেন সোনালি কুয়াশায় ঢেকে যায়। পাখিরা ফিরে যায়, বাতাসে মৃদু ধ্বনি ওঠে। গ্রামের শিশুরা বলে, “দেখো, ফেরেশতারা আবার নেমেছে।”
তাদের চোখে এই দীঘী শুধু জলের নয়—এ এক আকাশের স্মৃতি, এক অলৌকিক রূপকথা, যেখানে মাটি আর স্বর্গ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
আর দিঘীর তলদেশে এখনো সেই আলো জ্বলে—নিরব, অনন্ত, অম্লান। ✨
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now