বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

টক ঝাল মিষ্টি

"স্মৃতির পাতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Suborna Akhter Zhumur (০ পয়েন্ট)

X আজ অনেকদিন পরে স্মৃতির ডালা খুলে বসেছিলাম। ছোটবড়, সাদাকালো, রঙিন অনেক স্মৃতির পাহাড় জমে আছে। সুখদুঃখ, হাসি-কান্না জড়ানো সেইসব টক*ঝাল*মিষ্টি স্মৃতিগুলো মনের মণিকোঠায় খুব যত্ন করে সাজিয়ে রাখা ছিলো। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, স্মৃতিগুলো সম্পূর্ণ অমলিনভাবে পরিপাটি অবস্থায় আছে, বিন্দুমাত্রও বদল হয়নি। শৈশব-কৈশোরের সেইসব সমস্ত দুষ্টুমিষ্টি স্মৃতির সবটুকু লিখতে গেলে হয়তো লেখাই ফুরাবেনা কিংবা পৃথিবীর সমস্ত খাতার পাতা শেষ হয়ে যাবে। তাই সবটা না লিখে অল্পকিছু টক*ঝাল*মিষ্টি স্মৃতি দিয়েই আমার লেখা শেষ করবো। তিনজন টক*ঝাল*মিষ্টি মানুষকে নিয়েই আমার আজকের লেখা। আমি সেই তিনজনের একজন। বাকি দুজনের সাথে আমার সম্পর্ক খালামণি-বোনঝির। আমি ওদের খালামণি হই। ওরা আমার চাচাতো আর ফুফাতো বোনের দুইমেয়ে। ওদের দুজনের সাথে আমার বয়সের ব্যবধান দেড়-আড়াই বছরের। শৈশব -কৈশোরের বেশিরভাগ সময় আমরা একইসাথে কাটিয়েছি। তাই আমরা তিনজন অনেকটা আপন ছিলাম। আমরা তিনজন একে-অপরের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের অবিচ্ছেদ্য সংী ছিলাম। "আপন মানে আত্মায় মিশে থাকা; আপন মানে মায়ার জড়িয়ে রাখা; আপন মানে দূরে থেকেও তুমি হৃদয় মাঝে; আপন মানেই তোমায় ভাবি সকাল-সাঝে; আপন মানে অভিমান করে সরে যাবো আমি দূরে; ভালোবেসে তোমার কাছেই ফিরবো বারেবারে।" দুজনের মধ্যে রুবা(ছদ্মনাম) আমার বড় আন্টির বাসায় থাকতো। বড় আন্টির বাসা থেকে আমাদের বাসার দূরত্ব ছিল মাত্র চার-পাচ মিনিটের। তাই আমি যখনতখন আন্টির বাসায় চলে যেতাম ওর সাথে দেখা করার জন্য আর সে চলে আসতো আমার বাসায়। হয়তো কোনো একদিন বৃষ্টি নামলেই ভিজতে ভিজতে চলে আসতো আমার বাসায় আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবে বলে। আবার আমিও এইভাবে ওদের বাসায় চলে যেতাম ওর সাথে বৃষ্টিবিলাস করতে। কোনো কোনো দিন সকালবেলা দুজনে মিলে একসাথে খাবার খেলাম আমাদের বাসার ছাদে বসে। নয়তো দুপুরবেলায় আন্টির বাসায় দুজনে একসাথে খেতাম। আর সারাটাদিন জুড়ে অন্যান্য খুনসুটি তো আছেই। আর অন্যজনের সাথে প্রতিদিন দেখা না হলেও মাঝেমাঝে দেখা হতো। যখন আমাদের দুজনের বাসায় বেড়াতে আসতো কিংবা আমরা ওদের বাসায় যেতাম তখন। ওর বাসা ছিল আমাদের বাসা থেকে আধঘণ্টার দূরত্ব। যখন লাইসা(ছদ্মনাম) আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতো তখন ওকে নিয়ে আমার আর রুবার মধ্যে টানাটানি লেগে যেত। একপ্রকার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বেধে যেত। কারণ, দুজনেই চাইতাম লাইসাকে নিজের কাছে রাখতে। একপ্রকার বাধ্য হয়েই আপু(লাইসার আম্মু) দুই বাসার থাকার জন্য সমান সমান দিন ঠিক করেই আসতো। মানে, কোনো বাসায় একদিন বেশিও না কমও না। কিন্তু তবুও কার বাসায় আগে যাবে আর কার বাসায় পরে সেটা নিয়েও সমস্যার শেষ ছিলনা। তাই একবার আমাদের বাসায় আগে থাকলে পরেরবার রুবাদের বাসায় আগে যেত। কিন্তু তাতেও কি আর মন ভরে!! তাই যেই কদিন লাইসা রুবাদের বাসায় থাকতো সেই প্রতিরাতেই আমি রুবাদের বাসায় চলে যেতাম। তিনজন একসাথে ঘুমিয়ে থাকতাম। আর আমাদের বাসায় লাইসারা চলে এলে রুবাও একইভাবে রাতে আমাদের বাসায় আমাদের দুজনের সাথেই থাকতো। আর দিনে তো একসাথেই থাকতাম। আর লাইসা চলে যাওয়ার সময় আমি আর রুবা মিলে ওদের ব্যাগসহ যাবতীয় অনেককিছু লুকিয়ে রাখতাম যাতে না যেতে পারে। এইভাবে আরো দুয়েকদিন রেখে দিতাম। লাইসাও আমরা গেলে একই কাজ করতো। আর লাইসাদের বাসায় গেলে আমি আর রুবা একইসাথে যেতাম। নয়তো কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগতো। যখনই আমরা একসাথে থাকতাম তখনই আমরা নানান খুনসুটিতে মেতে থাকতাম। নাওয়াখাওয়া, ঘুম একেবারেই ভুলে যেতাম। একবার আমার আর রুবার স্কুল দশদিনের জন্য ছুটি দিয়ে দিলো। দুজনেই লাইসার বাসার যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলাম। আর লাইসাও বারবার অনুরোধ করছে যাওয়ার জন্য। অবশেষে চলেই গেলাম। আব্বু আমাদের দুজনকে নিয়ে গেল। গিয়ে শুনলাম মহারানী বাসার পেছনের বাগানে আছে। তাই খানিকটা দুষ্টুমি করার জন্য আব্বুর ফোন থেকে আপুর(লাইসার আম্মু) ফোনে কল করে আপুকে বললাম ফোন রিসিভ করে লাইসার কাছে দিয়ে আসতে আর নিষেধ করে দিলাম আমরা যে ওদের বাসায় এসেছি সেই ব্যাপারে জানাতে। আপু ওর কাছে ফোন দিয়ে বললো, "তোর খালামণি তোর সাথে কথা বলতে চায়।" কথা শুরু হলো-- লাইসা-- হ্যালো, খালামণি। কেমন আছো তুমি?? আমি-- স্কুল ছুটি দিয়েছে ভালোই তো থাকার কথা! লাইসা-- তোমাকে আর রুবাকে তো আমাদের বাসায় আসতে বলেছিলাম। আসছো না কেন?? আমি-- কি দরকার!! লাইসা-- মানেটা কি? তোমার কি আমার কথা একটুও মনে পড়েনা!! আমি-- মনে পড়ার কি আছে! (মনেমনে তখন হাসছি) লাইসা-- তাইতো, আমি তোমার কে? আমার কথা কেন মনে পড়তে যাবে!! (বেশ অভিমানী সুরে)। কি করছো এখন? আমি-- এইতো,,,রুবার সাথে আজকে পিকনিক করবো তো তাই আয়োজন করছিলাম। লাইসা-- ভালোই তো দিন কাটছে রুবার সাথে! (একটু হিংসা হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে) আমি-- তাতো কাটবেই। আমরা এখন একসাথেই সবসময়ই থাকি, অনেক মজা করি। লাইসা-- তাহলে আমায় ফোন করলে কেন?? তোমরা কতোটা মজা করছো সেটা আমাকে শোনানোর জন্যে?? আমি-- এই হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল..... লাইসা-- থাক,, কষ্ট করা আমায় আর মনে করতে হবেনা। ফোন রাখছি (বেশ রেগে গেছে)। আমার আর তোমাদেরকে প্রয়োজন নেই। আমি কিছু বলতে যাবো এরমধ্যেই ফোন কেটে দিয়েছে। কথা বলতে বলতে আমরা দুজনেই ওর কাছাকাছি চলে এসেছি। পিছন থেকে রুবা বলে উঠলো, "আপুর তো আমাদেরকে প্রয়োজন নেই। তাহলে চলো আমরা দুজন ফিরে যাই বাসায়।" কথার আওয়াজ শুনে লাইসা পিছন ফিরে আমাদেরকে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরলো। ঠাট্টা করে বললাম, "আমরা দুজন তাহলে চলেই যাই!" লাইসা হেসে বললো, "একদমই না। আমি না চাইলে তোমরা একপাও যেতে পারবেনা।" তবে ফোনে কথা বলে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য জরিমানা হিসেবে দুপুরবেলা লাইসাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতে হয়েছিল। সারাদিন নানা খুনসুটিতে কেটে গেল। রাতে তিনজন মিলে রাত্র প্রায় তিনটা পর্যন্ত ভৌতিক সিনেমা দেখে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম। পরদিন সন্ধ্যেবেলায়, আপু লাইসার হাতে একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললো, "জানি, তোরা তিনজন একসাথে থাকলে পড়ালেখা মাথায় ওঠে তবুও সামান্য কিছু পড়া দিলাম। মুখস্থ করে রাখবি।" বই দেখে ওর মুখটা শুকিয়ে গেল এক নিমিষেই। লাইসা কিছুক্ষণ মিছিমিছি বইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো আর আমরা দুজনে গল্পের বই পড়তে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরে লোডশেডিং হয়ে গেল। রুমে থাকা ইমারজেন্সি লাইটটা জ্বালিয়ে দিলাম। কিন্তু লাইসা আর রুবা বায়না ধরলো এখন আর পড়বেনা, ঘুরতে যাবে। অবশেষে তিনজন চুপিচুপি আপুর চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ওদের পুরনো বাড়িটা ছিল একটু ভেতরের দিকে তাই লোক চলাচল নেই তখন। চাঁদনিরাতে তিনজন মিলে ওদের আশেপাশের কিছু জায়গা আর "কমলার দীঘি" থেকে ঘুরে বাড়ি ফেরার পথে একটা দোকান থেকে চিপস, চকোলেট, ইত্যাদি অনেককিছু কিনে নিলাম, টাকা নিয়েই গিয়েছিলাম। বাসার সামনের রুম পর্যন্ত পৌছে শুনতে পেলাম আপু তার বাসার কাজের মহিলাকে বলছে, "কি ব্যাপার? ওরা তিনজন একসাথে থাকলে তো এতোটা চুপচাপ থাকার কথা না। নিশ্চয়ই কিছু একটা করছে তিনজন মিলে। গিয়ে দেখতে হবে।" আপুর আসার কথা শুনে লাইসা তড়িঘড়ি করে রুমের মধ্যে যেতে গিয়ে পা পিছলে পরে গেল। আর ওর হাতে থাকা খাবারের প্যাকেটগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। আর সেই প্যাকেটে পা পিছলে রুবাও পড়ে গেল। আর রুবার পায়ের সাথে আমার পা জড়িয়ে যাওয়ায় আমিও পড়ে গেলাম। তিনজনের পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে আপু এসে তিনজনের অবস্থা দেখে হেসে ফেললো। বললো, "এই তোদের পড়ালেখার নমুনা? সেইজন্যেই তো বলি এতোটা চুপচাপ কি করে আছিস!!" এইভাবে বিভিন্ন খুনসুটিতে কেটে গেল দুইদিন। এরপরের দিন সন্ধ্যায় ভাইয়া (লাইসার আব্বু) গল্প বলতে লাগলো। আর আমরা তিনজন আর লাইসাদের বাসার কাজের মহিলার ছোট নাতি এই চারজন ছিলাম শ্রোতা। গল্পটা ছিল এরকম --- "এক রাজা ছিলেন খুবই অত্যাচারী আর শৌখিন। তিনি প্রতিদিন আলাদা আলাদা ডিজাইনের নতুন পোষাক পড়তেন। তার জন্য নিয়োজিত ছিল একাধিক দর্জি। কিন্তু এইভাবে প্রতিদিন আলাদা ডিজাইনের নতুন পোষাক তৈরি করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। কিন্তু প্রতিদিন নতুন পোষাক না পেলে তো রাজামশাই কঠিন শাস্তি দিতেন। একপর্যায়ে তারা রাজার বিরুদ্ধে ফন্দী আটে। একদিন সকালে তারা রাজাকে জানায়, আজ তারা রাজার জন্য এমন একটা পোষাক বানিয়েছেন যা আগে কখনোই কোনো রাজা পরিধান করেনি। আর পোষাকটির বিশেষত্ব হচ্ছে, ভন্ড বা দুশ্চরিত্র লোকেরা এই পোষাক দেখতে পাবেনা। এই বলে তারা রাজাকে একটা ছেঁড়া, ময়লা জামা পড়িয়ে দিলো। রাজা ভীষন রেগে বললেন, "একী!! তোমরা আমায় এসব কি পড়িয়েছো??" দর্জিরা বললো, "কেন মহারাজ? এই পোষাকটি তো অত্যন্ত সুন্দর, মণিমুক্তা খচিত। আপনি কি এসব দেখতে পাচ্ছেননা? কিন্তু এই পোষাক তো ভন্ড কিংবা দুশ্চরিত্র লোকদের দেখার কথা নয়! তাহলে আপনি কেন দেখতে পাচ্ছেননা?" রাজা অপমানিত বোধ করে তৎক্ষণাৎ বললো, "আমি তো দেখতেই পাচ্ছি। আমি খুবই খুশি হয়েছি।" কারণ, রাজা যদি সত্যি কথা বলে তাহলে তো তিনি সবার কাছে ভন্ডরাজা হিসেবে প্রমাণিত হবেন। এরপর থেকে তিনি আর কখনোই এতোটা বিলাসিতা করেননি।" গল্প শুনে ইমরান বললো, "তার মানে রাজা সত্যিই ভন্ড আছিল। তাই দেখবার পায় নাই।" দর্জিরা যে রাজাকে বোকা বানানোর জন্য এসব বলেছে সেটা তার মাথায়ই ঢোকেনি। আমরা ওর কথা শুনে হাসতে লাগলাম। প্রায় দশমিনিট পরে ভাইয়া বললো, "ইমরান,,,,তোকে তোর মা ডাকছে।" আমরা চারজনই ভীষন অবাক হয়ে গেলাম। কারণ, কারোর ডাকার আওয়াজ আসেনি। ইমরান বাইরে গেল দেখতে। ভাইয়া আমাদেরকে চুপ করে থাকার ইশারা করলেন। বুঝলাম যে, ভাইয়া কিছু একটা প্ল্যান করেছে। এরইমধ্যে ছেলেটা ফিরে এসে বললো, "কিছুই তো দেখলাম না! আপনে মিছাকথা কইলেন ক্যান? মায় তো আসে নাই।" ভাইয়া চোখ বড়বড় করে অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, "ইমরান তোকে তো সহজসরল ছেলে ভাবতাম। আর তুই এরকম!!!" ইমরান হতভম্ব হয়ে বললো, "আমি আবার কি করলাম!! কিছুই তো বুঝতে পারতাছিনা!" তখন ভাইয়া বললো, "তুই নিশ্চয়ই ঐ রাজার মতোই ভন্ড না হলে তোর মাকে দেখতে পেলিনা কেন??" এবার বেশ দ্বিধায় পড়ে গেল ইমরান। ভাইয়া যে ওর সাথে মজা করছে সেটা বুঝতেই পারেনি। আমাদের সামনে কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেল। পরে আবার সামনে গিয়ে দেখে এলো। এসে মাথা খাটিয়ে বললো, "মায়রে দেখছি। মায় আইসা আবার চইলা গ্যাছে। আমারে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাইতে কইছে।" আমরা তো ওর মিথ্যেটা ধরতে পেরে মিটিমিটি করে হাসছি। তবে এরপর যা ঘটলো সেটা মনে এলে এখনো হাসি পায়। কারণ, সেই ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমরানের মা লাইসাদের বাসায় আসে। আসার সাথে সাথেই ভাইয়া বললো, "আপনি নাকি একটু আগে এসে ইমরানের সাথে কথা বলে চলে গিয়েছিলেন? তাহলে বাসার ভিতরে ঢুকলেন না কেন?" কথাটা শুনে ইমরানের মা বেশ অবাক হয়ে গেলেন। তারপর ছেলেকে নানানরকমের প্রশ্ন করতে লাগলেন। তিনি ধরেই নিয়েছেন যে, তার ছেলেকে নিশ্চয়ই কোনো ভূতপ্রেত জাতীয় কিছু একটা ধরেছে। সেই ভূত বা পেত্নীর সাথেই ছেলে কথা বলেছে। ইমরান যতোই তাকে বোঝাতে চায় তিনি কিছুতেই বুঝতে চাননা। পরেরদিন সকালে ইমরান যখন লাইসাদের বাসায় এলো তখন তার গলায়, হাতে তাবিজ ভরা। তাবিজের ভারে ওর বেহাল দশা। এরপর ভাইয়া যখন জিজ্ঞেস করলো, "আবার গল্প শুনবি?" ইমরান তখন বললো, "আমি আর আপনের গল্প শুনুম না। একবার শুইনা আমার অবস্থা টাইট।" পরেরদিন সারাদিন সিনেমা দেখে, গল্পের বই পড়ে আর হাসিঠাট্টা করে কাটানোর পরে রাতেরবেলা একটা ভৌতিক সিনেমা দেখলাম। ইমরানের দাদী যাকে আমরা বুবু বলে ডাকি তিনিও দেখছিলেন। দেখতে দেখতে রাত প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। বুবু অনেকটা ভয় পেয়েছে। ওনার বাড়ি ছিল কাছাকাছি। একাই সবসময় যাতায়াত করতেন। কিন্তু সেদিন যেহেতু অনেক দেরি হয়ে গেছে তাই তিনি ভয়ে ভয়েই বাড়ির পথে রওনা দিলেন। একটু সময়ের পরেই দেখি উনি ফিরে এসেছেন হাপাতে হাপাতে। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে। আমরা জানতে চাইলাম, কি হয়েছে? তিনি বললেন যে, তার মনে হচ্ছিল কেউ তার পিছুপিছু হাটছিল কিন্তু পেছনে ফিরে কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলেন না। আর তার ধারণা সিনেমায় দেখা সেই পেত্নীটা তার পিছু নিয়েছে। তাই সে রাতটা এই বাসাতেই থাকবে। আজ আর বাড়ি ফিরবেন না। বুবুর কথা শুনে আমরা হেসে কুটিকুটি। অতঃপর, আমাদের রুমেই থাকা আরেকটা বিছানায় তার ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। আর আমরা তখনও বিভিন্ন কথা নিয়ে হাসাহাসি করছি। একপর্যায়ে আমাদের হাসির শব্দ শুনে বুবু জেগে গেলেন। কিন্তু আমরা যেহেতু কাথামুড়ি দিয়ে শুয়েছি তাই তিনি বুঝতে পারেননি যে, আমরাই হাসছি। তিনি তখন ভয়ে জোরেজোরে দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করলেন। আর তার সেই দোয়াদরুদ পড়ার কারণটা বুঝতে পেরে আমাদের হাসির মাত্রা বেড়ে গেল। এইবার তার একটু সন্দেহ হলো বোধহয়। তাই তিনি আমাদের বিছানার কাছে এলেন পরীক্ষা করার জন্য। আর তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে আমরা ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। কেউ কেউ আবার হালকা নাকডাকার শব্দও করলাম। বুবু এইবারের ধরেই নিলো কাজটা আমরা করিনি। তাই ভয়ে ভয়ে নিজের বিছানায় গিয়ে দোয়াদরুদ পড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। বুবু যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন আমরা গিয়ে তার মাথার কাছে গিয়ে তিনজন অদ্ভুত শব্দ করে হেসে এলাম। বুবু আবার জেগে গিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে দোয়া পড়া শুরু করে দিলেন। এরপর আমরা আর কিছুই করিনি। কারণ, ততক্ষণে আমাদেরও ঘুমের রাজ্যে ডাক পরেছে। এইভাবেই নানান কান্ড কারখানা করতে করতে আমাদের বাসায় ফেরার সময় হয়ে গেল। কিন্তু লাইসা কিছুতেই আমাদের যেতে দেবেনা আর আমাদেরও ওকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছে। তিনজনেই কেঁদেকেটে একাকার। সবাই অনেক সাধাসাধি করছিল থাকার জন্য তবুও রওনা দিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। কারণ, স্কুল খুলে গেছে আর প্রাইভেটও পড়তে হবে। ভাইয়ার ঠিক করা রিক্সায় করে আমরা ফেরার পথ ধরলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা চিৎকার শুনে পিছন ফিরে দেখলাম লাইসা রাস্তায় পড়ে গেছে। আমাদের পিছু নিয়ে রিক্সার পেছনে দৌড়াচ্ছিল আমাদেরকে আটকাবে বলে। ওকে ওভাবে দেখে আমিও চলন্ত রিক্সা থেকে নামতে গিয়ে একটা ইটের সাথে পা জড়িয়ে যাওয়ার পরে গেলাম। বেশ খানিকটা কেটে গেল। আর রিক্সা থেকে ততক্ষণে রুবা নেমে গেছে। আপু আর ভাইয়া আমাদের অবস্থা দেখে আব্বুকে অনুরোধ করলো যাতে আমাদের আরো একটা দিন থাকতে দেয়। অবশেষে দুজনেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাসায় গেলাম। এরপরের দিন আমরা লাইসার ঘুম ভাঙার আগেই ওকে কিছু না জানিয়েই বাসায় ফিরলাম। কারণ, জানতাম লাইসা জেগে থাকা অবস্থায় গেলে আমাদের তিনজনেরই খুব কষ্ট হবে। জীবন থেকে সেইসব দিনগুলো কখন যে দূরে সরে গেল বুঝতেই পারিনা। সময়ের অভাবে, ব্যস্ততার কারণে এখন আর আগের মতো বেশিদিনের জন্য একসাথে থাকা হয়না। তবুও যখন দেখা হয় মনে হয় যেন দিনগুলো খুবই দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময়ের কাটা যেন দ্বিগুণ গতিতে ঘুরছে। দূরে দূরে থেকেও মন থেকে আলাদা হয়নি। খুব খুব খুবই মিস করি হারানো সেই দিনগুলোকে। "স্মৃতির পাতায় প্রতিনিয়ত অনেক স্মৃতি জমা হয়, কিছু থেকে যায় মনের গহীনে, কিছু আবার মুছে যায়, অম্লমধুর কিছু কিছু ক্ষণ সাজানো থাকে খুব যতনে, মনে পড়ে মেঘলা দিনে কিংবা কোনো আবেগী ক্ষণে, স্মৃতির সেই দমকা হাওয়ার এলোমেলো হয় মন তখন অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরে, অগোচরে ভেজে চোখের কোন।" SUBORNA AKHTER ZHUMUR


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ঝাল-মিষ্টি-টক এই নিয়েই স্কুল জীবন
→ টক ঝাল মিষ্টি

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now