বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ভোর হতে না হতেই পলক বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয় নি তার।শেষরাতের দিকে একটু ঘুম আসলেও মশাদের পেট ভরানো উৎসবে জেগে থাকতে হয় তাকে।একটু এগিয়ে গিয়ে দক্ষিন দিকের জানালা খুলে দিতেই মৃদু ঠান্ডা বাতাসে পুলকিত হয়ে গেল সে।আনমনেই বলে উঠল "কী সুন্দর সকাল!"
পলক দেখল সামনের জামরুল গাছের পাখির বাসাটায় দুটি বাচ্চা কিচকিচ করছে। কদিন আগে টুনটুনি পাখি ওখানে বাসা বানিয়েছে।
"বাবা পলক! আজ তো বেশ সকাল সকাল উঠেছো" পলকের মা তাকে জিজ্ঞেস করলো।তিনি প্রায়মারি স্কুলের শিক্ষক। খুব ভোরে ওঠা অভ্যাস তার। কিন্তুু তার দুই ছেলে পলক আর রিয়াদকে কখোনোই সকাল আটটার আগে ওঠাতে পারেন নি।
"জি আম্মা, এখন থেকে ভোরে ওঠার নিয়ম করব "
"থাক, আমাকে আর মিথ্যা বলতে হবে না।তুমি যে মামাবাড়ি যাওয়ার ঘোরে উঠে পড়েছো তা বুঝতে আমার আর বাকি নেই। ব্যাগ গুছিয়েছো?
জি আম্মা কাল ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি।
"বেশ, ট্রেন ছাড়বে কখন?
"৮ টা ৩০ এর দিকে।
আচ্ছা, আমি নাস্তা তৈরী করছি তুমি ব্যাগ চেক করে দেখো প্রয়োজনীয় সব নিয়েছো কীনা।
আচ্ছা বলেই পলক টেবিলের ওপর রাখা ব্যাগের কাছে গিয়ে দ্রুত চিন্তা করতে লাগলো কিছু বাদ পড়েছে কীনা।আনমনেই বলে উঠল " এখন মনে না পড়লেও ট্রেনে ওঠার পর মনে পড়বে।গতবার তো ডাইরি টাই নিতে ভুলে গিয়েছিলাম" বলেই ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। তার আবার ডায়েরি লেখা অভ্যাস। এইতো দুমাস আগে তার এস এস সি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনে তার A+ পাওয়া উপলক্ষে একুশটি মিষ্টি সে একাই খেয়েছিল। সেটাও তারিখ দিয়ে ডায়েরিতে লিখে রেখেছে।
নাস্তা খেয়েই মাকে বলে চুপি চুপি বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল পলক।ছোটভাইকে না জানিয়েই মামাবাড়ি যাচ্ছে। ও জানতে পারলে সঙ্গে না নেওয়া অব্দি ছাড়বে না।
সকাল ৯ টা ১৫। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে পলক। মুদি দোকানগুলো একে একে খুলছে। চায়ের দোকানগুলোতে বেশ ভিড় জমেছে।
"আপনার কাছে কী খাওয়ার পানি হবে?"
পলককে উদ্দেশ্য করে তার সামনে বসা লোকটি বলে উঠল।
লোকটি দৌড়ে ট্রেনে উঠেছে। এতক্ষণ হাঁপাচ্ছিলো।
জি হবে বলেই তার ব্যাগে থাকা পানির বোতলটি তার দিকে এগিয়ে দিলো।
পলক লক্ষ্য করলো গরমেও কালো কোট পরেছে লোকটি, কালো রং এর সানগ্লাসও পরেছে।ট্রেনের ভেতরে সানগ্লাস পরে থাকার কোনো কারণ সে খুজে পেল না।
"আপনি যাবেন কোথায়," পলক বলে উঠল।
"ঢাকা যাবো "বলেই লোকটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।"ওখানের একটি ফার্মেসিতে আমি ঔষধ বিক্রি করি।"
"ওও।আমি সিলেট যাবো।আমার মামার বাড়ি ওখানে। "
পলক লক্ষ্য করল লোকটি একটু মনমরা হয়ে বসে আছে। তার কারন হয়তো তার ছুটি শেষ হওয়া নয় বরং পরিবারকে এক জায়গায় রেখে অন্যত্র থাকার মধ্যে বিদ্যামান।সে আর কথা বাড়ালো না। ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে পাতা ওল্টানো শুরু করলো।
"করিম চাচার অপকর্ম"শিরোনামটি দেখে পলকের নিজের জন্যই নিজের গর্ব হতে লাগল।ঘটনাটি পড়তে পড়তে সে অতীতে ফিরে গেল।
এস এস সি এর টেস্ট পরিক্ষার প্রথম দিন।১০টায় পরিক্ষা শুরু।৯টা বাজতে না বাজতেই পলক আর তার কতিপয় বন্ধু চলে এসেছে। বাটুল এতো আগে আসতে চাইছিল না।পলক তাকে একরকম টেনে নিয়ে এসেছে। ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু এই বাটুল।পড়াশোনায় ভালো না হলেও চমৎকার ফুটবল খেলে।এইতো এবার তার নেতৃত্বে উপজেলা চাম্পিয়ান হয়েছে ওদের এলাকার ক্লাবটি।
"না,এত তাড়াতাড়ি আসাটা ঠিক হয়নি " বেগড়ানো মেজাজে বাটুল বলল।
"বাসায় বসেই বা কি করতাম, গত রাতেই সব রিভাইস করা হয়ে গেছে " পলকের চোখে বিরক্তি।
"তুই তো ভালো ছাত্র, আমার তো কবিতাগুলো এখনো বাকী। তুই না দেখালে কিছুই লিখতে পারবো না।"
"অত চিন্তা করিস না তো। এই রুম তো তালাবদ্ধ ,এখন কি করবি?"
" আমি জানি না "
"চল লাইব্রেরি গিয়ে বসি,ওখানে থেকে তুই কবিতা একটু রিভাইস করে নিস।"
বাটুল কিছু না বলে ওর সাথে হাটা শুরু করলো।
"দরজা এভাবে চাপানো কেন?।একটু কাছে গিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে পলক বলল, ভিতরে কারা যেন কথা বলছে"।
দাড়া আড়াল থেকে দেখতে হবে বলেই দরজার কাছে গিয়ে আড়াল থেকে উঁকি দিল বাটুল।
"কারা কথা বলছে রে ওখানে?"
বাটুল ফিসফিস করে বলল "আরে করিম চাচা নজরুল আঙ্কেলকে কি যেন বলছে"
করিম চাচা ওদের স্কুলের দপ্তরি।অসম্ভব ধুর্ত। সারাক্ষণ পান চিবাতে থাকে। ঠোঁটের কোনে তার লাল পিক লেগে থাকে।
বাটুলের মাথার উপর দিয়ে উকি দিয়ে ভেতরে একনজর দেখে পলক বলে উঠল "এই নজরুল আঙ্কেলটা আবার কে?
বাটুল অবাক।" নজরুল আঙ্কেলকে তুই চিনিস না? আামাদের বাচাল শাওনের বাবা"
ওদের ক্লাসের সবচেয়ে অঘা ছাত্র শাওন।কিছু পারুক আর না পারুক সমানে মুখ চালাতে পারে। ওরা একদিন মোনালিসা'র চিত্র নিয়ে আলোচনা করছিল। তখন শাওন এসে মোনালিসা'র কথা শুনে ওদের বলে, "আরে তোরা কি জানিস এই মোনালিসা কে?ওদের জবাবের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বলে , "বিখ্যাত এক শিল্পী তিনি।তিনিই নিজেই তার ঐ ছবিটি এঁকেছিলেন"।
উপস্থিত সকলে সেদিন হো হো করে হেসে উঠেছিলো তার ওই কথায়।
"শাওনের বাবা কি করছে ওখানে?"
ওরা দুজন অবাক হয়ে দেখল, নজরুল আঙ্কেল পকেট থেকে টাকার একটা বান্ডিল বের করে করিম চাচার দিকে বাড়িয়ে দিতেই তিনি খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেন। আড়িপেতে তারা শুনলো,
করিম চাচা বলছে, "বাংলা পরীক্ষাটা একরকম দিক, আর আপনি এই কাগজটিতে লিখে দিন কোন কোন বিষয়ের প্রশ্ন লাগবে। আপনি দুপুরের দিকে পরীক্ষা শেষ হলে লাইব্রেরীতে এসে দেখা করবেন আমার সাথে। তখন পেয়ে যাবেন। "
"কিছু একটা করতে হবে",চিন্তিত মুখে বাটুল বলল।
"চল হেডস্যারের কাছ গিয়ে সব খুলে বলি" বলতে বলতেই সে হাটা শুরু করলো। বাটুল কিছু না বলে তার সাথে যেতে লাগলো।
ঐ দিনই করিম চাচাকে স্যার চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দিয়েছিলেন।করিম আঙ্কেল বড় মাপের ব্যাবসায়ী,তবু্ও অনেক অনুরোধ করার পরই তার ব্যাপারটা চেপে যায় সবাই।
"খাওয়া-দাওয়া করবেন না?" পলকের সামনে বসা লোকটি জিজ্ঞেসা করলো।
"জি করবো একটু পর।আপনি খেয়ে নিন।"
"আচ্ছা, বলেই লোকটি তার ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটি বের করে খুলতে লাগলো।
ঝিকঝিক করতে করতে একটি বড় ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে। আরো কিছুক্ষন ডায়েরি ঘাটাঘাটি করে পলক তার টিফিন বক্সটি বের করল।তার পছন্দের চিংড়ি মাছের তরকারি দেখে একমুহূর্ত দেরি না করে সে খাওয়ার পর্ব সারলো।
"এই যে শুনছেন,"পলক আস্তে আস্তে তাকালো। সন্ধা হয়ে গিয়েছে।খাওয়া দাওয়া শেষে কখন যে ঘুৃমিয়ে পড়েছিলো, তাই ভাবতে শুরু করলো।
" চা খান "বলেই পলকের দিকে এককাপ দুধ চা এগিয়ে দিলো লোকটি।
ট্রেনটি একটা স্টেশনে থেমেছে। কেউ বাদাম,কেউ চকলেট বিক্রি করছে ট্রেনে উঠে।
সামনে বসা লোকটি বিকট শব্দ করে চা খাচ্ছে।চোখভরা বিরক্তি নিয়ে পলক সেদিকে তাকালো।
"এটা কোন স্টেশন"পলক জিজ্ঞেসা করল?
"নবিনগর,সাভার।সামনের স্টেশনে আমি নেমে যাবো।"
বাদাম আর চকলেট বিক্রেতারা হৈ চৈ করে নেমে গেল। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। রুপালি চাঁদের আলোয় বাইরে সবকিছু দেখা যাচ্ছে। ধানখেতের উপর দিয়ে দলবেঁধে জোনাকিরা উরে বেড়াচ্ছে। ও লক্ষ্য করল দু একটি ট্রেনের ভেতরেও চলে এসেছে।
এই স্টেশন থেকে যারা উঠেছে তাদের টিকিট চেক করার জন্য চেকার আসলো। তার দিকে তাকাতেই পলক হতভম্ব হয়ে গেলো।করিম চাচা,ঐ চাকরিটা হারিয়ে তিনি টিকিট চেকারের কাজ নিয়েছেন। তিনিও পলককে দেখলেন কিন্তুু ভাবটা এমন যেন তিনি ওকে চেনেন না।
সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলতে লাগলেন,
"আগের ট্রেন চেকার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে নবিনগর স্টেশনে নামিয়ে ডাক্তার এর কাছে নেওয়া হয়েছে।যেহেতু আমি জানিনা কারা টিকিট আগেই দেখিয়েছিলেন, তাই ঐ স্টেশন সহ প্রথম থেকে যারা উঠেছেন অনুগ্রহ করে সবাই তাদের টিকিটটি দেখাবেন"।
পলকের মনে পড়ল,আগের টিকিট চেকার কিছু ছেলেকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন। তারা টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠেছিল। অনেক ছল-চাতুরি করেছিল বটে কিন্তুু কোনো লাভ হয়নি।তাদের অমন অবস্থা দেখে পলক নিজই লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তুু ওরা খুবই সহজ ভঙ্গিতে নেমে যায়, যেন কিছুই হয়নি।
করিম চাচার কথা শেষ হতে না হতেই সবাই একে একে তাদের টিকিট বের করতে থাকলো।
পলক টিকিটের জন্য প্যান্টের পকেটে হাত দিলেও দশ টাকার একটা নোট ছাড়া কিছুই পেল না।ব্যাগ চেক করেও সে যখন পেলো না তখন তার মনে পড়ে গেলো, সকালে যখন সে বাসায় বসে নাস্তা করছিল তখন হঠাৎ একটি টিকটিকি তার হাতের ওপর পড়েছিল। ঘটনাটির জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে হাত ঝাড়া দিতেই হাতে থাকা শরবত পড়ে তার পুরো প্যান্ট ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল।প্যান্ট পাল্টে ফেললেও সেটার পকেটে থাকা টিকিটটি নেওয়া হয়নি তার।
"আপনার টিকিটটি দেখান" করিম চাচা তাকে বলে উঠল।
কী করবে কিছুই বুঝতে পারলো না পলক।হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসলো তার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now