বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
|| থ্রিলার গল্প : নরক ||
- শুভাগত দীপ
পর্ব - ৫
টাইলসওয়ালা মাঝারি সাইজের ঘরটিতে একটা খয়েরি চামড়ায় মোড়া ডিভান আছে। সেখানে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে ডাক্তার শায়লা। কিছুটা দূর থেকে দেখলে মনে হবে সে ঘুমাচ্ছে। আসলে ঘুমাচ্ছেনা। সেটা বোঝা যাচ্ছে মাঝে মাঝে তার কেঁপে ওঠা পিঠ দেখে। কাঁদছে শায়লা। প্রবল কান্নায় ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে ওর ভেতরটা।
শায়লার ভেজা চোখদুটো একটা স্মার্টফোনের সারে পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিণের দিকে নিবদ্ধ। সেই স্ক্রিণে একটা আপাত সাধারণ ফ্যামিলি ফোটো দেখা যাচ্ছে। ছবির বামপাশে দাঁড়িয়ে আছে সুদর্শন ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শ্যামলা একজন যুবক। ডানপাশে গোলাপী-সাদা জামদানী পরিহিতা শায়লা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের মাঝখানে দেবশিশুর মত দেখতে বছর সাতেক বয়সের একটা ছেলে। বাচ্চা ছেলেটার নিষ্পাপ কৌতুহলী দৃষ্টি ক্যামেরার লেন্সের দিকে না, বরং মাটির দিকে। কে জানে তখন সে নিচের মাটিতে কি দেখতে পেয়েছিলো!
ছবিরর সুদর্শন যুবকটি শায়লার স্বামী ড. ইন্তেখাব আহমেদ। আর মাঝের বাচ্চাটি ওদের ছেলে আদনান আহমেদ রিমনের। স্বর্গীয় সুখের চিহ্ন এই ছবির প্রথম দুটো মানুষের একজন আজ শুধুই স্মৃতি। আরেকজন ভয়াবহ দুঃস্বপ্নসম জীবন টেনে নিয়ে চলেছে। এমন একটা জগতে সে বাস করছে, যেখানে বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভালো। আর বেঁচে আছে শায়লা। কিন্তু একে কেমন ধরণের বাঁচা বলে! প্রতিটা দিন যার সকাল শুরু হয় ভয়াবহ প্রতিশোধ স্পৃহা দিয়ে, তার জীবনে তখন ওটার দেখা পাওয়াই প্রধান মৌলিক চাহিদা হয়ে দাঁড়ায়। আহত বাঘিনী নামটি এক্ষেত্রে অনেক পুরোনো শোনালেও, শায়লাকে এই নামে ডাকলে নামটির প্রতি কোন অবিচার করা হবেনা।
শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলো শায়লা। পরনের শাড়ির আঁচলটা দিয়ে নিজের ভেজা চোখদুটো মুছলো। ঘরটির দক্ষিণ দিকের সাদা দেয়ালে শোভা পাওয়া অজন্তা ক্লকটার দিকে তাকালো সে। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজছে। নরকের বন্দী জানোয়ারটাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেতে দিতে হবে। তা না হলে হুট করেই পটল তুলে বসবে। ওর মৃত্যুটা এত সহজে হোক, তা মোটেও চায়না শায়লা। ধীর পায়ে হেঁটে কম্পিউটার কনসোল বসানো ডেস্কটার সামনে চলে এলো সে। যে মনিটরে নরকের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সেখানে চোখ রাখলো। আসলেই, জায়গাটাকে নরকের মতই দেখাচ্ছে।
গত কয়েকদিনে বন্দী লোকটা অনেক শুকিয়ে গেছে। ভঙ্গুর স্বাস্থ্য আর কোটরে ঢোকা দুই চোখ দেখলে তাকে মাদকাসক্ত বলে ভ্রম হয়। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে খুব কষ্টে বেঁচে আছে সে। এই মুহূর্তে সে সচেতন কিনা তা একেবারেই বুঝতে পারছেনা ডেস্কের সামনে দাঁড়ানো শায়লা। হঠাৎ-ই যেন ওর মাথায় একটা দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেলো। ডেস্কের পাশের একটা সুইচবোর্ডের নির্দিষ্ট একটা সুইচ অফ করে দিলো সে। কালো অন্ধকারে ডুবে গেলো কম্পিউটারের স্ক্রিণটা।
যে পুরোনো ও পরিত্যক্ত গুদামঘরটিকে নরকে রূপান্তর করেছে শায়লা, সেখানকার লাইট নিজের কন্ট্রোল ডেস্ক থেকেই অন-অফ করার ব্যবস্থা রেখেছে। কিছুক্ষণ আগে যখন ও সুইচটা অফ করলো, অন্ধকার নেমে এলো নরকে। তাতে অবশ্য সেখানকার দৃশ্যপট দেখতে শায়লার কোন সমস্যা হলোনা। কারণ, ওখানে যে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে, তাতে নাইট ভিশন মোড আছে। প্রবল অন্ধকারেও ওটা চলনসই ছবি পাঠাতে পারে। কিন্তু নরকে বন্দী লোকটা এই মুহূর্তে পুরোপুরি অন্ধ। এই অবস্থায় সে কি করে, সেটাই দেখতে চায় শায়লা।
গুদামঘরটা ওর মরহুম বাবার ছিলো। তিনি দেশের নামজাদা পাট ব্যবসায়ী ছিলেন। উনার মৃত্যুর পর সেটা তাঁর একমাত্র মেয়ে শায়লার নামে হয়ে যায়। বাবার ব্যবসার কোন কিছুই কখনো বোঝেনি শায়লা। আগ্রহও ছিলোনা। তাই বাবার মৃত্যুর পর বন্ধই পড়ে ছিলো গুদামটা। আজ ওটাকে শায়লা নিজের প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার জন্য নরকে পরিণত করেছে। ভয়ঙ্কর নরক। ওর মরহুম বাবা কি জানেন, তাঁর মেয়ে তাঁর সাধের গুদামঘরটিকে কি কাজে ব্যবহার করছে? জানলে তিনি আবারো হার্টফেল করেছেন - কথাটা মনে হতেই শব্দ করে হেসে উঠলো শায়লা। মাঝারি ঘরটির দেয়ালে দেয়ালে সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হলো বেশ অনেকক্ষণ। আশেপাশে কেউ নেই শায়লার হাসি শোনার মত। কেউ যদি শুনতে পেতো, বুঝতে পারতো, মেয়েটার হাসি মোটেও স্বাভাবিক না। এমন ভয়ঙ্কর অট্টহাসি কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারেনা।
নরকের নোংরা মেঝেতে নিজের মল মূত্রের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা লোকটার হঠাৎ-ই মনে হলো, কোনকিছু ঘটেছে এই ঘরের মধ্যে। বহু কষ্টে সে মাথা তুলে তাকালো। অন্ধকার... চারপাশে ভয়াবহ অন্ধকার। অসীম কালো শূন্যতা যেন গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে। এখন আর এই ঘরে অন্ধকার অংশ বা আলোকিত অংশ বলে আলাদা কিছু নেই। যা আছে তা শুধুই আদি ও অকৃত্রিম অন্ধকার। শেকলের শব্দ ও ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলো লোকটা। শেকলবন্দী প্রাণীটাও হয়তো নিকষ অন্ধকারে দিশাহারা বোধ করছে - ভাবলো সে। আচ্ছা, আজকে যেন শেকলের শব্দ একটু বেশিই হচ্ছে। কেন? সেই ঝনঝন শব্দে কেমন যেন অস্বস্তিমাখা অস্থিরতা মেশানো।
এই নরকের বন্দী হিসেবে লোকটা বেশ কয়েকদিন কাটিয়ে দিয়েছে। দিনে মাত্র একবার খাবার আর পানি আসে। সেই পানিতে অবধারিতভাবেই মেশানো থাকে ঘুমের ওষুধ। সে যখন প্রবল ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন মনে হয় ডাইনীটা এখানে আসে। ওর টিনের থালা আর খালি হওয়া বোতলটা নিয়ে যায়। একবার লোকটা ভেবেছিলো ঘুমের ওষুধ মেশানো পানিটা খাবেনা। ঘুমের ভান করে পড়ে থাকবে। তারপর ডাইনীটা এলে ওকে কাবু করে এই নরক থেকে বেরোনোর পথ খুঁজবে। ডাইনীটা কি করে যেন ওর মতলব টের পেয়ে গেছিলো। তখনই ও আবিষ্কার করে, ওকে সবসময় লক্ষ্য করা হয়। এই নরকেও একটা সিসি ক্যামেরা আছে। পানি না খেয়ে কোথাও ফেলে দিলে ডাইনীটা ঠিকই বুঝতে পারবে। আসলে, লোকটার অবস্থাও তথৈবচ। সারা দিন পর একবারই খাবার আর পানি পায় ও। সেই পরিস্থিতিতে সামনে পেয়েও পানি না খেয়ে থাকা ভয়াবহ কষ্টের।
শায়লা এক দৃষ্টিতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। নাইট ভিশন ইফেক্টে লোকটার নড়াচড়া ধরা পড়লো ওর চোখে। কম্পিউটার কনসোলের স্পিকারের ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে দিলো ও। নরকের বন্দীর গালাগালি ভেসে এলো ওর কানে। পৈশাচিক রাগে শরীরটা কেঁপে উঠলো শায়লার। দ্রুতপায়ে ডিভানের ওপরে শুয়ে থাকা নিজের স্মার্টফোনটা তুলে এনে আবারো ডেস্কের সামনে দাঁড়ালো ও। কল করলো নরকের বন্দীকে দেয়া মোবাইল ফোনে।
বামহাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে বসে থাকা লোকটা চমকে উঠলো ওর থেকে হাত কয়েক দূরে মেঝেতে পড়ে থাকা মোবাইলের ভাইব্রেশনে। এতক্ষণ ডাইনীটাকে মনের ঝাল মিটিয়ে গালাগালি করছিলো, সেটায় হঠাৎ ছেদ পড়ায় যেন কিছুটা বিরক্ত হলো সে। হামাগুড়ি দিয়ে কাঁপতে থাকা মোবাইলের দিকে এগোলো সে। এই নিকষ অন্ধকারে মোবাইলটার স্ক্রিণের সবুজ আলো লোকটার কাছে দারুন অপার্থিব বলে মনে হলো। মোবাইলটা হাতে তুলে নিলো ও। রিসিভ ককরলো Death Angel নামের ডাইনীটার কল। ওপাশ থেকে ডাইনীটাই প্রথম কথা বলে উঠলো।
- খুব গালি দিচ্ছিস আমাকে?
- শালী... তোকে...
- লিয়াকত... তোর নাম লিয়াকত, তাইনা?
ডাইনীটার মুখে এই প্রথম নিজের নামটা শুনে চমকে উঠলো লিয়াকত নামের লোকটা। বেশ কিছুদিন ধরে সে এই নরকের বাসিন্দা। কিন্তু আজকেই প্রথম ডাইনীটা ওর নাম ধরে ডাকলো। কাঁপাকাঁপা গলায় সে কথা বলার চেষ্টা করলো।
- তুই... আপনি আমার নাম জানেন?
- বোকার মত প্রশ্ন হয়ে গেলো এটা। আমি তোর নাড়িনক্ষত্র সব জানি।
- আমাকে...
- থাম লিয়াকত। ভালো করে শোন।
প্রবল ভয়ে লিয়াকতের মেরুদণ্ড যেন জমে গেলো। শেকলের ঝনঝন শব্দ যেন আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্রমাগত শেকল নেড়েই চলেছে নরকের পশুটা। যেন শেকল ছিঁড়ে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছে। একটা পিশাচ যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে নিজের গণ্ডী ছেড়ে! জানোয়ারটার ভারী ও অ্যাজমা আক্রান্ত রোগীর মত খশখশে শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ আতঙ্কে বিবশ করে দিলো লিয়াকতকে। নিজের অজান্তেই ডুকরে কেঁদে উঠলো ও।
- প্লিজ... আমাকে বলেন ওটা কিসের শব্দ? ওখানে কি আছে?
- হা হা হা! খুব শীঘ্রই দেখতে পাবি, ওখানে কি আছে।
- প্লিজ... আমাকে এখান থেকে বের করুন... আমি...
- শ... চুপ! এভাবে নাকিকান্না কেঁদে শেকলধারীকে আর উতলা করিসনা। বেচারা ক্ষুধায় পাগল হয়ে গেছে। গত দুইদিন ওকে কিছু খেতে দেইনি তো...
- ওটা... কি ওটা?
- চুপ!
আচমকাই চুপ হয়ে গেলো লিয়াকত। বোবা শিশুর মত নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো। পাগল হয়ে যাচ্ছেনা কেন ও! বারবার এই একই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো তার।
- লিয়াকত...
- ব... বলেন...
- তোর আপাতত কোন ভয় নেই। শেকলটা যথেষ্ট মজবুত। ও সহজে ওটা ছিঁড়তে পারবেনা। তবে ওকে খেতে দিতে হবে। সেজন্য তোকে আমার বড় দরকার।
- শোনেন...
কলটা কেটে গেলো। সেই সাথে জ্বলে উঠলো নরকের একমাত্র লাইট। আচমকা ওটা জ্বলে ওঠায় সাময়িক অন্ধত্ব পেয়ে বসলো লিয়াকতকে। লাইটটা জ্বললেও ওপাশের অন্ধকার আগের মতই থেকে গেলো। সেই সাথে চলমান থাকলো শেকলের পৈশাচিক ঝনঝনানি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now