বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
|| থ্রিলার গল্প : নরক ||
- শুভাগত দীপ
পর্ব - ৩
মোবাইল ফোনটার পেছনে আটকানো কাগজটিতে লেখা আছে -
'তোমাকে তোমার কৃতকর্মের শাস্তি উপভোগ করার বিরাট সুযোগ দেয়া হয়েছে। মরলে তো তুমি এমনিতেই নরকে যেতে। কিন্তু আমরা দুজন সেটা দেখতে পেতামনা। তাই এই পৃথিবীতেই তোমার জন্য স্পেশাল নরকের ব্যবস্থা করলাম। কথা দিচ্ছি, এখানে তুমি আরো বিভৎস অনেক কিছুই দেখবে। তোমাকে যে মোবাইল ফোন পাঠানো হয়েছে, সেটাতে শুধু ইনকামিং আছে। কোন আউটগোয়িং নেই। এই ফোনের স্পিকারে তুমি শুধু আমার কণ্ঠই শুনতে পাবে। আর যখনই এটাতে আমার কোন কল আসবে, নতুন একটা হেল রাইড অপেক্ষা করবে তোমার জন্য। ভয়ানক অশুভ হোক তোমার নরকবাস।'
লেখাটুকু পড়ে স্থানুর মত হয়ে গেলো লোকটা। মোবাইল ফোনটা প্রথমে দেখে সে দারুন আশান্বিত হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু ওটার পেছনে আটকানো কাগজের লেখাটুকু পড়ে সেই আশা তো নিভে গেছেই, সেই সাথে জন্ম নিয়েছে নতুন একটা ভয়। অনিশ্চয়তা মেশানো নরক যন্ত্রণার ভয়।
প্রথমবার জ্ঞান ফিরে পেয়েই লোকটার কেন যেন মনে হয়েছিলো, সে নরকে আছে। হ্যাঁ, সে আসলেই একটা নরকে আছে। মূল নরকের সাথে এর পার্থক্য একটাই। তা হলো, এই ঘরটা আসলে মনুষ্য নির্মিত নরক। যেখানে শয়তান বা ঈশ্বরের কোন কানুন নেই। আছে শুধুই অমানবিক নিষ্ঠুরতা।
হঠাৎ নতুন একটা চিন্তা মাথায় খেলা করে গেলো লোকটার। চিরকূটটির লেখক তার লেখায় 'আমরা দুজন' কথাটা উল্লেখ করেছে। কেন? তার মানে ওকে অপহরণের পেছনে দুজন মানুষের হাত আছে! একজনের উপস্থিতি সে অপহরণের দিন ও পরে কয়েক বার টের পেয়েছে। সেটা একটা মেয়ে। আরেকজন কে? আর ঘরের ঐ অন্ধকার প্রান্তে কি আছে?
এতগুলো অমিমাংসিত প্রশ্ন ওকে পাগল করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেত, যদিনা আবারো ওর শরীরটা নিস্তেজ হয়ে না আসতো। মাথাটা হঠাৎ ভারি ভারি মনে হতে লাগলো তার। ডান হাতের ক্ষতস্থান দুটোর ভয়াবহ যন্ত্রণাও যেন হঠাৎ করেই কমে গেলো। ঘুমে যেন ঢুলছে লোকটার ক্লান্ত দুই চোখ। হঠাৎ করেই এত ঘুম পাচ্ছে কেন তার এটা তলিয়ে দেখার মতও যেন কোন মানসিক শক্তি নেই তার। শুধু মনের কোণে আবছা একটা সন্দেহ খেলে গেলো - হয়তো ওরা খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশেয়েছে।
যেখান থেকে অতি কষ্টে এই দরজা সংলগ্ন জায়গায় সে এসেছে, সেখানে আর ফিরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে বা শক্তি কোনটাই নেই লোকটার। ঘরের একমাত্র লাইটটা তার অবস্থানের অনেক কাছে, এটা ভেবেই আপাতত খুশি সে। মাথাটা এলিয়ে দিয়ে অনিবার্য ঘুমের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে লাইলো সে। হঠাৎ-ই ওর পাশে পড়ে থাকা মোবাইল ফোনটি তীক্ষ্ণ যান্ত্রিক শব্দে ভাইব্রেট করতে থাকলো। একটানা ভাইব্রেশন জানান দিলো, কল এসেছে। ঘুমের ওষুধের প্রভাবে প্রায় অচেতন হয়ে পড়া লোকটার অবশিষ্ট সচেতন স্নায়ুগুলোও যেন শিউড়ে উঠলো। কোনমতে বাম হাতটা বাড়িয়ে মোবাইলটা তুলে নিলো সে।
সবুজ আলোয় ভরা স্ক্রিণে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম - 'Death Angel'. কাঁপাকাঁপা আঙ্গুল ব্যবহার করে কলটা রিসিভ করলো লোকটা। প্রবল ঘুমে ওর চোখদুটো বারবার বন্ধ হয়ে আসছে। অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে সে। এখন যেন তার কিছুই আসে যায়না। কিন্তু মনের একটা অংশ বারবার তাকে সতর্ক করে চলেছে। যে সতর্কতা এই পরিস্থিতিতে একেবারেই অকেজো।
ফোনটা রিসিভ করেও চুপ করে থাকলো লোকটা। ওপাশের মানুষটাও চুপ। শুধু নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া দুই পাশে আর কিছুই নেই। ঘুমের প্রভাবে যখন লোকটার নিশ্বাস ভারি হয়ে আসছে, তখনই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কথা বলে উউঠলো একটি গম্ভীর অথচ মোলায়েম নারীকণ্ঠ। ঘুম লাগা জড়ানো গলায় মেয়েটার সাথে কথা বলার প্রস্তুতি নিলো লোকটা।
- হ্যালো...
- আপনি কে বলছেন?
- আমি কে, সেটা তোমার না জানলেও চলবে।
- আমাকে আপনারা কেন ধরে এনেছেন?
- নিজের মনকে প্রশ্ন করো। সামান্য হলেও ভয় আর অপরাধবোধ নিয়ে যে কারণে এখনো বেঁচে আছো তুমি, সেই কারণেই তোমাকে অপহরণ করা হয়েছে।
- আমার কোন অপরাধ...
- নেই বলবে তো? হুট করে কিছু বোলোনা। তোমার একটা অপরাধ আছে। ভয়াবহ অপরাধ। আর সেই অপরাধের শাস্তি ভোগ করার জন্যই আজ তুমি এই নরকে। হা হা হা!
ফোনের ওপাশের মেয়েটার হাসিতে ভয়ঙ্কর কিছু একটা আছে। যা কিছুক্ষণ আগেও ঘুমে পর্যুদস্ত হতে বসা লোকটির গায়ের সমস্ত লোম খাড়া করে দিলো। কিছুক্ষণের জন্য পুরোপুরিভাবে সচেতন হয়ে উঠলো সে।
- আমাকে ছেড়ে দিন, প্লিজ।
- নরক থেকে অত সহজে ছাড়া পেলে লোকে নরককে ভয় পাওয়া ছেড়ে দেবে।
- আপনারা কি টাকা চান? কত চান বলুন?
- তুমি একজন সামান্য ব্যবসায়ী। আমরা যত টাকা চাই, দিতে পারবে?
- কত চান, প্লিজ বলুন...
- মাছের তেলে মাছ ভাজতে চাইছো? হা হা হা! পারোও বটে।
- মানে?
ওপাশ থেকে কোন উত্তর এলোনা। কলটা হঠাৎ করেই কেটে গেলো। মাছের তেলে মাছ ভাজা - বাক্যটা শুনে মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেলো লোকটার। তাহলে কি... রিমু'র ঘটনাটার সাথে তাকে অপহরণ করার কোন যোগাযোগ আছে! রিমু'র কথা মনে পড়তেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো লোকটার। ওফ খোদা! না! এটা যেন না হয়! - বারবার এই একই কথা ক্রমাগত বেজে চললো ভয়ার্ত লোকটার মনে। কিছুক্ষণ আগে পাওয়া মরণঘুম যেন পুরোপুরি পালিয়ে গেছে। রিমু'র মুখটা ভেসে উঠলেই ওর সবকিছু থেমে যায়। হ্যাঁ, প্রবল একটা আতঙ্ক থামিয়ে দেয় ওর চারপাশ ও ভেতরকার সমস্ত কিছু।
গলা শুকিয়ে গেছে লোকটার। প্রবল তৃষ্ণা অনুভব করছে সে। দুর্বল বাম হাতটা বাড়িয়ে থালার পাশে থাকা মুখ খোলা পানির বোতলটা তুলে নিলো সে। ঢকঢক করে গলায় ঢাললো অবশিষ্ট সবটুকু পানি। তারপর এক দৃষ্টিতে কোলের ওপর রাখা মোবাইলটার অন্ধকার স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর প্রবল আক্রোশে অকথ্য সব গালাগালি দিতে শুরু করলো ওর অজ্ঞাত অপহরণকারীদের উদ্দেশ্যে। আহত ও দুর্বল শরীরের অবশিষ্ট সমস্ত শক্তিই যেন উঠে এসে জমা হলো লোকটার গলায়। গালাগালিগুলোর ধরণ ধীরে ধীরে কুৎসিত থেকে আরো কুৎসিতের স্তরে নেমে যাচ্ছিলো। মিনিট কয়েক পর আবারো নিস্তেজ হতে শুরু করলো লোকটার পেশি। গালাগালির তুবড়িও কিছুটা কমে এলো। মাথাটা আবারো ভারি হয়ে এলো ঘুমে। এখন লোকটা এক দৃষ্টিতে পাশে গড়াগড়ি খেতে থাকা বোতলটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে ওটাকে গালি দিচ্ছে। কারণ, সে বুঝতে পেরেছে, ঘুমের ওষুধ খাবারে নয়, মেশানো হয়েছিলো ঐ বোতলের পানিতে। বিড়বিড় করতে করতেই গভীর এক অন্ধকার ঘুমে ঢলে পড়লো লোকটা।
ভারি শ্বাসপ্রশ্বাস জানান দিচ্ছে, বেঁচে আছে লোকটা। ওটা ছাড়া এক দেখাতে যে কেউ বলতো, ওটা একটা লাশ। লোকটা ঘুমিয়ে পড়ার মিনিট দশেক পর ঘরের দরজাটা খুলে গেলো। পূর্বের সেই মেয়েটা ঢুকলো। তবে পূর্বের মত তার কাছে এখন কোন পার্স দেখা যাচ্ছেনা। বরং তার ডান হাতে ঝুলছে একটা মাঝারি মাপের চটের ব্যাগ। এবার কিন্তু মেয়েটাকে তার শিকারের কাছে পৌঁছানোর জন্য বেশিদূর হাঁটতে হলোনা। কারণ, শিকার নিজেই দরজার কাছাকাছি এসে পড়ে আছে।
মেয়েটা চুপচাপ কিছুক্ষণ মেঝেতে বেহুঁশের মত ঘুমাতে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর মাটিতে নামিয়ে রাখা চটের ব্যাগটার ভেতর থেকে একটা টিনের জার বের করলো। ওটার মুখ খুলে ভেতরে একটু দেখে নিলো মেয়েটা। তারপর জারের ভেতরের আঠালো ও মিষ্টি গন্ধযুক্ত তরলটা ঢালতে শুরু করলো ঘুমন্ত লোকটার শরীরে। পুরোটা ঢালা শেষ করে নিজের দুই হাত ব্যবহার করে তরলটা ঐ লোকের সারা শরীরে ভালোভাবে মাখাতে লাগলো মেয়েটা। গুনগুন করে হারানো দিনের একটা গানের সুরও ভাঁজছে সে। লোকটা সামান্য কেঁপে উঠলেও পুরোপুরি সচেতন হতে পারলোনা। কারণ, তার শরীরে যে ঘুমের ওষুধ ক্রিয়া করছে, তা অনেক শক্তিশালী। একসময় আঠালো তরলটা ঘুমন্ত লোকটার প্রায় সারা শরীরে মাখানো শেষ করলো মেয়েটা।
ফেলে রাখা চটের ব্যাগটার গায়ে নিজের দুই হাত কোনরকমে মুছে জার আর ওটা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উল্টো ঘুরেছে, এমন সময় ঘরের অন্ধকার প্রান্তটা থেকে ভারি শেকলের শব্দটা শুরু হলো আবার। সেই সাথে জান্তব একটা নিশ্বাস ফেলার শব্দ, যা শেকলের ঝনঝনানি ও ঘরের ভৌতিক পরিবেশের সাথে মিশে একটা অপার্থিব আবহের জন্ম দিলো মেয়েটার ভেতরে। একঝলক শীতল বাতাসে যেন কেঁপে উঠলো সে। পরক্ষণেই চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিড়ে। আমি এখানে এলেই কিভাবে যেন বুঝে যায় ও - ভাবলো মেয়েটা। তারপর সব অগ্রাহ্য করে দরজার দিকে এগোতে লাগলো সে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now