বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
ঢাকা শহরের সেই সকালে, সূর্যটা যেন একটু বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল। অফিসগামী মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে সে তাকিয়ে ছিল আরেকটা অদ্ভুত মিছিলের দিকে—থালা-বাটি হাতে, পাঞ্জাবি পরা, চশমা চোখে, মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে হাঁটছেন একদল মানুষ। কারও হাতে “ন্যায্য দাবি চাই” লেখা প্ল্যাকার্ড, কারও হাতে ঢাকনাওয়ালা হাঁড়ি, কেউ কেউ তো “ভূখা মিছিল” লিখে বালিশের খোলের ভেতরে লাঠি ঢুকিয়ে সেটা পতাকা বানিয়ে ফেলেছেন।
এরা কারা?
ওরা শিক্ষক। দেশের জ্ঞানকারিগর।
আজ তাঁরা রাস্তায়, হাতে বই নয়, হাতে থালা।
শিক্ষা ভবনের দিকে রওনা হয়েছেন সকাল থেকে।
এই মিছিলকে নাম দেওয়া হয়েছে— “ভূখা মিছিল”।
তবে তা শুনে যেন কেউ ভুল না বোঝে—এরা কেউ সত্যিকারের খিদে মেটাতে বের হননি। এদের খিদে জ্ঞানের, মর্যাদার, ন্যায্য প্রাপ্যের।
________________________________________
অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব, মাথায় সাদা টুপি পরে সামনের সারিতে হাঁটছেন। হাতে তাঁর থালা, তাতে বড় করে লেখা—“শিক্ষকের পেটও রাষ্ট্রের অংশ।”
পাশে দাঁড়ানো রশিদ স্যার হাঁসি চেপে বললেন,
—“স্যার, এই থালার ব্র্যান্ড তো 'স্টিল কিং'! এই নামে মিছিল করলে সরকার ভাববে আমরা বিজ্ঞাপনের শুটিং করতে এসেছি।”
আজিজী স্যার চোখ টিপে উত্তর দিলেন,
—“দেখো, যেভাবেই হোক বার্তা পৌঁছাতে হবে। আজ যদি এই স্টিল থালা শব্দ তোলে, আগামীকাল রাষ্ট্রের কাচের জানালা কেঁপে উঠবে!”
রশিদ স্যার হাঁসি সামলাতে না পেরে বললেন,
—“তবে আমাদের স্কুলে ‘কাচের জানালা’ নেই, সব কাঠের, তাই ভাবছিলাম আন্দোলনটা একটু বেশি বাস্তবধর্মী করা যায় কিনা।”
পাশে দাঁড়ানো খাদিজা ম্যাডাম, যিনি বাংলা পড়ান, বললেন,
—“আমি আজ ছন্দে হাঁটব।
‘ভাত নাই, মাছ নাই,
ভাতা বাড়াও, বাঁচাই।’”
তাঁর উচ্চারণে সবাই একসাথে হেসে উঠল।
পাশের সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন,
—“ম্যাডাম, এটা কি আন্দোলনের কবিতা?”
তিনি চোখ টিপে বললেন,
—“না, এটা আমাদের জাতীয় পাঠ্যক্রমের বাইরে নেওয়া অ্যাকটিভ লার্নিং।”
________________________________________
বেলা বাড়তে থাকল। শিক্ষকরা একে একে শিক্ষা ভবনের সামনে এসে জমা হচ্ছেন। কেউ চট বিছিয়ে বসেছেন, কেউ প্লাস্টিকের চেয়ার এনেছেন, কেউ শুধু ব্যানারকে বালিশ বানিয়ে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন।
এক শিক্ষক হাতে থালা নিয়ে বললেন,
—“আমি তো ভাবছি, এই থালাটায় আগামী বছর পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করব। খাতা খোলা আর ভাত খাওয়ার মাঝে পার্থক্য কোথায় বলুন তো?”
পাশ থেকে অন্যজন বললেন,
—“খাতায় উত্তর থাকে, থালায় থাকে প্রতিশ্রুতি। পার্থক্য শুধু তা বাস্তবায়নের।”
শিক্ষকদের মাঝে হাসি-তামাশা চলছে, তবুও চোখের কোণে একরাশ ক্লান্তি। তবুও তাঁদের রসবোধ থেমে নেই।
এক শিক্ষক মাইকে ঘোষণা দিলেন,
—“প্রিয় সহকর্মীরা, আজকের আন্দোলনের মধ্যাহ্ন বিরতিতে আমরা খাব না—শুধু থালা বাজিয়ে ‘রিং’ সাউন্ড করব। এতে সরকারি কর্মকর্তাদের কানে ‘রিং টোন’ বাজবে, তারা যেন একটু সাড়া দেন।”
সবাই তালি দিয়ে হেসে উঠল।
এমনকি সাংবাদিকরাও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না।
________________________________________
তবে এই হাসির মাঝেও ছিল দৃঢ়তার সুর।
সন্ধ্যার আলো যখন ঢাকায় নেমে এল, তখনও তারা বসে। কেউ থালার ওপর কবিতা লিখছেন—
“শিক্ষক যদি না খায়, জ্ঞানও তো শুকায়।”
কেউ আবার মোবাইল দিয়ে লাইভ দিচ্ছেন—“দেখুন, দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো আজ রাজপথে, তবুও তাঁরা হাসতে জানেন।”
একটু দূরে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো এক তরুণ শিক্ষক বললেন,
—“দেখুন ভাই, আমাদের দাবি অযৌক্তিক নয়। ১০০০ টাকায় এখন এক কাপ কফিও মেলে না, আর আমরা ১০০০ টাকায় বাসা ভাড়া দিই? এটা তো রাষ্ট্রীয় কমেডি!”
এক বৃদ্ধ শিক্ষক, যিনি গত ত্রিশ বছর ধরে পড়াচ্ছেন, মৃদু হেসে বললেন,
—“এই যে তোমরা এত হাসো, এটাই আমাদের জ্বালানি। যে জাতি হাসতে পারে, সে জাতি বাঁচে।”
________________________________________
রাত বাড়ে, শহীদ মিনারের পাশে বাতাসে ভেসে আসে সাউন্ড গ্রেনেডের ধোঁয়া, কিন্তু তাদের চোখে ভয় নেই। কেউ বললেন,
—“আমরা তো ভয়কে ক্লাসে ফেল করেছি, এখন পরীক্ষায় নাম লিখিয়েছে রাষ্ট্র।”
অন্যজন বললেন,
—“আমাদের সিলেবাসে অন্যায়ের জন্য কোনো নম্বর নেই।”
তখনই এক মহিলা শিক্ষক হালকা গলায় গান ধরলেন,
“এই পথ যদি না শেষ হয়…”
আর বাকিরা তালি দিলেন।
মজার বিষয়, সেই রাতে পুলিশ লাঠি না তুললেও, শিক্ষকদের থালা-বাটি বাজনার শব্দে গোটা শাহবাগ যেন এক অদ্ভুত সুরে ভরে উঠল। কেউ বলল—
—“এটা তো নতুন বাদ্যযন্ত্র, নাম রাখা যায় ‘থালাফোনি’। রাষ্ট্রের কানে বাজুক।”
________________________________________
পরদিন সকালে, কিছু দোকানদার এসে শিক্ষকদের চা, পাউরুটি আর কলা দিলেন।
তারা হাসলেন—
“আমরা তো নাম দিয়েছিলাম ভূখা মিছিল, এখন দেখো, মিছিলেই নাস্তা।”
আজিজী স্যার চা খেতে খেতে বললেন,
—“এই যে দেখছো, এটা ঐক্যের চা। এই দেশ বদলাবে, যদি চা-এর মতো সবাই একটু করে উষ্ণ হয়।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now