বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

তেপান্তরেও বীর

"যুদ্ধের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X রাতের খাবার খেয়ে রাইফেল পরিষ্কার করতে বসল আলতাফ। যখন সেনাবাহিনীর ট্রেনিঙে ছিল তখন বুলির মতো আওড়ে মুখস্থ করে দেয়া হয়েছিল “ রাইফেল আপনার বাপ,রাইফেলই আপনার মা”। সেই ট্রেনিং এর সময় আর নেই,বেশ অনেক দিন আগেই পার হয়ে গিয়েছে, তবে কথাটা মাথায় গেঁথে আছে এখনও। সারি সারি টিনের ছাউনিতে সৈনিকদের বসবাস। জাতিসংঘ মিশনে আলতাফ এসেছে সেই এক বছর আগে। ইউনিটের অনেকগুলো মুখ অচেনা ছিল প্রথম প্রথম,আস্তে আস্তে সবার সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে নিমিষেই। পাশের বিছানায় থাকে সোহেল খন্দকার,তার পাশে মাসুদ উদ্দিন,বিপরীত বিছানায় আলি আবেদ। বিভিন্ন কোর,বিভিন্ন ইউনিট থেকে এসেছে সবাই। আজকে আলি আবেদ এর ডিউটি,সে আপাতত নেই ছাউনিতে,সে আছে উচু করে তৈরি করা টাওয়ারে,সাথে সার্চলাইটের দায়িত্তে আছে করিম। আজ রাতে দক্ষিন টাওয়ার এর ডিউটিতে এরা দুই জন। কঙ্গোতে আসার পর কিছু জিনিসে অভ্যস্ত হতে হয়েছে আলতাফের। এই যেমন দিনের বেলা বসে থাকলেও মশারি এর মধ্যে বসে থাকা,রাতে ঘুমালেও মশারির মধ্যে ঘুমানো,দলছুট না হওয়া, যেকোন সময়ে ইউনিটের সাথে ঝাপিয়ে পড়া। তবে মশারির বিশয়টাই আলতাফের সবচে মজা লাগে। ম্যালেরিয়া মশার স্বর্গ বলা চলে কঙ্গোকে,সেই সাথে আরও ভয়ঙ্কর কীট বীজানুর কথা না হয় তুলেই রাখা হোল। মাঝে মাঝে সন্ত্রাসী পক্ষদের গোলাগুলি হয় ক্যাম্প থেকে অনেক দুরের গ্রামগুলোতে। তখন ডিউটি করতে যেতে হয় সেখানে,মাঝে পার হয়ে যেতে হয় রেইন ফরেস্ট। এই রেইন ফরেস্ট আর এক বিষাক্ত ফাঁদ,কয়েক প্রজাতির মাছি যারা কিনা সরাসরি মানুষের চামড়া ফুটো করে রক্ত চোষে,আর গুরুদক্ষিনা হিসাবে রেখে যায় কৃমি। এই কৃমি শেষ পর্জন্ত চোখের মনিতে গিয়ে পৌছায়,অন্ধ করে দেয় মানুষকে। এই এত এত মরণফাঁদ,এত কষ্ট তবু খারাপ লাগে না আলতাফের। সকালের প্যারেডে যখন সটান হয়ে বাংলাদেশের পতাকা সমীপে স্যালুট মারে,তখন সব কষ্ট দুঃখ গলে পানি হয়ে বেড়িয়ে যায়। যখন সারাদিন চোখের সামনে পত পত করে ওড়ে বাংলাদেশের পতাকা,সেই পতাকার সামনে জান দিতেও প্রস্তুত আলতাফ। দেশের মানুষের একটা বদ্ধমূল ধারনা,হয়ত মিশনে এসে সৈনিকেরা অনেক টাকা কামাই করে,ফুর্তি করে। আলতাফ মনে মনে হাসে,এরা কি কখনও ভেবে দেখছে আফ্রিকার মানুষের শান্তি রক্ষায় নিজের জীবন বাজি রেখে লড়ে চলছে এই সব সৈনিকেরা। দেশ থেকে দূরে,পরিবার থেকে দূরে,প্রিয়তমা থেকে দূরে। হাহ,টাকা দিয়ে কি হয়,মনে মনে ভাবে আলতাফ,ওর চাই এডভেঞ্চার। এই তো সেদিন কোথা থেকে ক্যাম্পে ঢুকে পড়ল এক নিরীহ বেজি,সৈনিকেরা সবাই মিলে বেজিকে ঘিরে ফেলল,কয়েকজন বন্দুক নিয়ে তৈরি,গুলি করে কতল করা হবে বেয়াদপ বেজিকে। সবাইকে সরিয়ে আলতাফ বেজিটাকে তাড়িয়ে দিল দেয়ালের বাইরে। হাসি মুখে সবাইকে বলল “ আপনার আমার যেমন প্রান,বেজিরও প্রান,আমাদের ক্ষতি করতে তো সে আসে নাই,ভুল করে চলে এসেছে,এইবারের মতো মাফ করে দেন বেজিটাকে। সাহসী সৈনিক হিসাবে সুনাম আছে আলতাফের,সাথে বিচক্ষন হিসেবেও। অনেক সময় তার ইউনিটের অফিসাররা ছোটখাট সমস্যা গুলো আলতাফের হাতেই ছেড়ে দেন। সেই সাথে খুব ভালো বিরিয়ানী রান্না করে আলতাফ,পিছনে নাকি অফিসারেরা তাকে বিরিয়ানী আলতাফ ডাকে মজা করে,আলতাফ অবশ্য কিছু মনে করে না,মিটি মিটি হাসে। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর আলতাফের অফ ডিউটি,অলিখিত নিয়ম। সেই সময়ে আলতাফ বিরিয়ানী পাকায়,তারপর বিকেলের দিকে সবার প্লেটে প্লেটে উঠিয়ে দেয় বিরিয়ানী। অফিসার আর সৈনিক এর পার্থক্য থাকে না একফোটাও তখন,সবাই এক সারিতে বসে খায়,তৃপ্তি করে। আলতাফের বড্ড ভালো লাগে এই দৃশ্য দেখতে। আলতাফের একটা গোপন বিষয় আছে ক্যাম্পে। খুব কাছের কয়েকজন ছাড়া ঘটনা কেউ জানে না। ক্যাম্পের ঠিক বাইরে একটা কুকুর আছে আলতাফের। ঠিক আলতাফের না,আবার আলতাফরেই। একমাত্র আলতাফের শিশেই সে বেড়িয়ে আসে। ইয়া বড় এক ধাড়ি কুকুর। প্রথম প্রথম কুকুরটা চোখ কুকচে আলতাফের দিকে তাকিয়ে থাকতো,পরে একদিন আলতাফ খাবার সাধলে জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে আসে কুকুরটা,সেই থেকেই আলতাফের কুকুর। আলতাফ ওর নাম দিয়েছে কালা। দেখতে কুচকুচে কালো হওয়াতেই এই নাম। প্রতিদিন খাবার শেষে আলতাফ সযত্নে হাড্ডি,আর উচ্ছিষ্ট মাংস নিয়ে খাইয়ে আসে কালাকে। কালা চেটে দেয় আলতাফের হাত,আর লেজ নাড়ে। জংলি এই কালা কিভাবে আলতাফের পোষ মানল অনেকের কাছেই সেটা এখনও রহস্য। রাইফেল পরিষ্কার শেষ করে আলতাফ,বড় একটা হাই তোলে,ঘড়িতে এলার্ম সেট করে রাত ৩ টার,তখন তার নাইট ডিউটি। - কি মিয়ারা ঘুম যাবেন না? - কেন আলতাফ ভাই,আপনার ঘুম ধরছে নাকি? -আমার তো ভাই ডিউটি আছে। একটু আগে ঘুম যাওয়া দরকার। -আপনে তাইলে শুয়ে পড়েন,আমরা একটু পরে শুই। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে পরে আলতাফ,ঘুম ভেঙে আসে দুই চোখে। ঘুম ঘুম চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রামের বাড়ির পথ,পুকুর আর বট গাছ। মায়ের তৈরি করা পুই শাকের মাচা,ছোট বোনের শুকাতে দেয়া ফ্রক,আমের আচারের গন্ধ লাগে নাকে,স্কুলের ঘণ্টার ধাতব শব্দ বাধে কানে, সোঁদা মাটির গন্ধ পায় আলতাফ। পাশের বাসার নতুন বউয়ের নুপুর বাজে আস্তে আস্তে। শব্দ,গন্ধ আস্তে আস্তে মিলিয়ে আসে,ঘুমের কোলে ঢলে পরে আলতাফ। কর্কশ কুকুরের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে আলতাফের,কুচকুচে কালো অন্ধকার চারপাশে,অন্য সৈনিকেরা ঘুমিয়ে পড়েছে,অজান্তেই রাইফেলে হাত চলে যায় আলতাফের। একটানা কুকুরের ডাক চলছে,এই ডাক একমাত্র কালার,না হয়ে যায়ই না। দ্রুত,বুট পরে রাইফেল হাতে বেড়িয়ে আসে,ক্যাম্পের পেছনের ছোট খিড়কি খুলে শিস বাজায় আলতাফ,কুকুরের ডাক থেমে যায়,একটু পরেই দেখা যায় কালাকে,মুখে তার রক্তের দাগ। আলতাফের ট্রাঊযার কামড়ে টানতে থাকে কালা,এমন কখনও হয়নি আগে,কোন সৈনিক কি বিপদে পড়ল,মনে মনে ভাবে আলতাফ,কালা আবার গর্জন করা শুরু করেছে,আলতাফ অনুসরন করে কালাকে,ঝোপের পিছনে দেখতে পায় একটা লম্বা পোশাকের,নিমিষেই বুঝতে পারে, এটা কোন গ্রামের মেয়ের পোশাক। রক্তে ভিজে আছে পোশাকটা,কালার মুখের রক্তের দাগের উৎস বুঝতে পারে আলতাফ, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় কালার,কালা সামনে এগিয়ে যেতে থাকে,অনুসরন করে আলতাফ,প্রায় ২০০ মিটার পথ পার হবার পর ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পায় সে,ঝোপের পিছনে পজিশন নেয়,মাথা উচু করলে দেখতে পায় একটা জিপ গাড়ি দাড়া করানো,আর তার পাশেই মুখ বাধা একটা মেয়ে পড়ে আছে,বাধা দেবার মতো শক্তি তার আর নেই,একজন একজন আসছে, এবং বিনা বাধায় ধর্ষণ করছে মেয়েটাকে। সারা মুখ আর পা বেয়ে রক্ত পড়ছে মেয়েটার,পজিশন নিয়েই প্রথম গুলি করে আলতাফ,জিপে লাগে গুলী,আলতাফ জিপের কারনে গুলি ছুঁড়তে পারছে না ঠিকভাবে,সেই সাথে মেয়েটার আহত হবার ভয় আছে গুলিতে। গুলির শব্দ পেয়ে এলোপাথারি গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা,ফিরতি গুলি করে আলতাফ,ততক্ষণে আলতাফের অবস্থান জেনে ফেলেছে সন্ত্রাসীরা, ঝোপ লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। গুলির শব্দ কানে গিয়েছে আবেদ আলীরও,সাথে সাথে সার্চ লাইট জালিয়ে শব্দের দিকে ঘুরিয়ে দেয় সে,সাথে করে ফাঁকা ফায়ার। দুই দিক থেকে আক্রমনে ভয় পেয়ে যায় সন্ত্রাসীরা,দ্রুত জিপে ওঠে,জিপ চালিয়ে চলে যায় জঙ্গলের গভীরে। আলতাফ উঠে দাড়ায়,একটা গরম প্রবাহ অনুভব করে পেট থেকে পা পর্জন্ত,টলতে টলতে এগিয়ে যায় মেয়েটার কাছে,অজ্ঞান হয়ে আছে মেয়েটা,কাধে তুলে নেয় মেয়েটাকে,ফিরে আসতে থাকে ক্যাম্পের রাস্তায়। প্রচণ্ড রক্ত ক্ষরণে হাঁটু কাপতে থাকে আলতাফের,তবু হাতড়ে হাতড়ে চলতে থাকে ক্যাম্পের রাস্তায়,ক্যাম্পের দেয়াল যখন দেখা যাচ্ছে তখনই পড়ে যায় আলতাফ,চোখ বন্ধ হয়ে আসে,বুঝতে পারে সে জ্ঞান হারাচ্ছে,জ্ঞান হারাবার আগেও শুনতে পায় কর্কশ শব্দে ডেকে যাচ্ছে কালা,এক নাগাড়ে,মিলিয়ে যায় শব্দ আস্তে আস্তে......... একদিন পর জ্ঞান ফেরে আলতাফের,পিট পিট করে চোখ খোলে,ক্যাম্পের হাসপাতালের বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করে সে,পুরো চোখ খুলে দেখতে পায়,সামনে ডাক্তার আর ইউনিট কম্যান্ডার। - সালাম স্যার। - আরে আস্তে,কি করেছেন,রেস্ট করুন। - স্যার মেয়েটা? - জি,মেয়েটা ভালো আছে,সুস্থ আছে,তার বাবা মাকে খবর দেয়া হয়েছে। পাশের গ্রামের মেয়ে। আপনি চিন্তা করবেন না। - স্যার,কারা ছিল? - একটা বিছিন্ন সন্ত্রাসী দল। কয়েকজনকে সনাক্ত করা হয়েছে,পুলিশ গ্রেফতার করেছে কয়েকজনকে। - ও আচ্ছা। - আপনি আমাদের গর্ব,সেনাবাহিনীর গর্ব,জাতির গর্ব। আপনার মহত্ত্ব এবং সাহসিকতার জন্য সবাই আপনাকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। আমিও ইউনিটের পক্ষ থেকে লাল সালাম জানাই। - স্যার এই পাশের টেবিলে ছোট একটা বাংলাদেশের পতাকার ব্যবস্থা করা যায়? - অবশ্যই,আপনি চিন্তা করবেন না,রেস্ট নিন,আর পিছনের জানালা দিয়ে একটু তাকিয়ে দেখুন,আমি এখন গেলাম,ভালো থাকবেন। কম্যান্ডার চলে গেলে,মাথা ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকায় আলতাফ,সেখান থেকে দেখা যায় ব্যারাকের মাঠ,মাঠে কয়েকজন সৈনিক ফুটবল খেলছে,আর তাদের পাশে পাশে সমানে দৌড়ে যাচ্ছে কালা। সূর্যের আলোতে কালার কালো পশম চিক চিক করছে। [ লেখাটা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত সকল সৈনিককে উৎসর্গ করছি,সেই সাথে ধন্যবাদ জানাই ক্যাপ্টেন মইন বায়েজিদকে ( বকক-২১),ক্যাম্প ও মিশন সম্পর্কে আমাকে একটা সম্যক ধারনা দেবার জন্য] তাওসীফ হামীম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কিসানগানি ,কঙ্গো ২০১২


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ তেপান্তরেও বীর

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now