বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
________________________________________
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল সুদীপ্তা। তার চোখে-মুখে ক্লান্তি, তবুও একরকম তৃপ্তি যেন ঘিরে আছে তাকে। আজ অনেকদিন পর সে আবার নিজের মুখোমুখি হয়েছে। ঠোঁটের কোনে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে বলল নিজেকেই, “তুই তো ভালো অভিনেত্রী, তবে বোধহয় ভালো স্ত্রী হতে পারলি না।”
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল আটটা ছুঁই ছুঁই করছে। জানালার ফাঁক গলে হায়দ্রাবাদের রোদ এসে বিছানায় ছড়িয়ে পড়েছে। এককালে এই শহরটা ছিল অচেনা, আজ সেটাই ঠাঁই হয়ে গেছে। চেনা শহর কলকাতা আর চেনা মানুষগুলোর চেয়ে আজ হায়দ্রাবাদ অনেক শান্ত, অনেক নির্জন।
________________________________________
প্রথম পরিচয় শৈবালের সঙ্গে হয়েছিল এক থিয়েটারের রিহার্সালে। সুদীপ্তা তখন সদ্য কলেজ শেষ করে অভিনয়ের জগতে পা রাখছে। আর শৈবাল একটু পুরনো খেলোয়াড়। মঞ্চে তাঁর দাঁড়ানো, সংলাপ বলা—সবকিছুই ছিল মুগ্ধ করার মতো। সুদীপ্তার মুগ্ধতা যেন একটা ঝড়ের মতো তাকে প্রেমে টেনে নিয়ে গেল।
“তুই আর আমি—একই গল্পের চরিত্র। যা হোক, একসাথে করলেই না!”
এই সংলাপটা বলেই একদিন হঠাৎ বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল শৈবাল।
তিন মাসের মধ্যেই বিয়ে। কেউ কিছু বোঝার আগেই দুই জীবনের মেলবন্ধন। কিন্তু দুই শিল্পীর অভিমান আর স্বপ্নের সংঘর্ষে টিকল না সে সম্পর্ক। যখন মঞ্চে অভিনয়ের সময় ভুল সংলাপে একে অপরকে কষ্ট দিত, তখনই বুঝেছিল সুদীপ্তা—সব অভিনয় দর্শকের জন্য নয়, কিছু কিছু বাস্তবেও রক্ত ঝরায়।
বিয়েটা একবছর টিকেছিল। তারপর দুজন দুই প্রান্তে।
________________________________________
তারপর চন্দন সেন। বয়সে বড়, অভিজ্ঞ, গম্ভীর চেহারার পেছনে এক দরদী মানুষ। অভিনয়ের আঙিনায় বারবার দেখা হতে হতে একসময় বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আর সেই বন্ধুত্বই গড়িয়ে গেল দাম্পত্যে।
চন্দনের সঙ্গে জীবনটা শুরুটা স্বপ্নময় ছিল। রাতে শুটিং শেষ করে একসাথে চা খাওয়া, সকালবেলা একে অপরের সংলাপ মুখস্থ করিয়ে দেওয়া—সবই ছিল নিখাদ ভালোবাসার মতো। কিন্তু চন্দনের জীবনে একটি অদৃশ্য দেয়াল ছিল—একটা অতীত, যা কোনোদিনই পুরোপুরি মুছেনি।
সুদীপ্তা সেই দেয়ালে বারবার ধাক্কা খেয়েছে। কখনো বিশ্বাস করে, কখনো সন্দেহে। ভালোবাসা ছিল ঠিকই, কিন্তু বিশ্বাস ছিল না। একসময় চন্দনের মুখেও বেরিয়ে আসে, “তুই ভালো অভিনেত্রী হয়তো, কিন্তু আমার সংসারে তুই মনের শান্তি আনতে পারিস না।”
সেদিন রাতে কান্না থামেনি। পরদিন সকালে সুদীপ্তা সব গুছিয়ে বেরিয়ে যায়—চুপচাপ, বিনা শব্দে।
________________________________________
তৃতীয়বার সে প্রেমে পড়ল না, প্রেম তাকে জড়িয়ে ধরল। এক রেস্টুরেন্টে বিজ্ঞাপনের মিটিংয়ে পরিচয় হয় অরুণাভর সঙ্গে। নন-ফিল্মি মানুষ, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সুস্থধারার জীবনের স্বপ্ন দেখে।
“তুমি যদি অভিনয় ছাড়ো, আমি তোমায় জীবন দেব।”
এই কথাটা শুনেই সুদীপ্তার বুক কেঁপে উঠেছিল। অভিনয়? সেটা তো তার শ্বাস, তার চেতনা, তার আত্মার স্পন্দন। কিন্তু একটা স্থায়ী সম্পর্কের আশ্বাসের কাছে সেদিন হার মানে সব আবেগ।
সে একে একে আটটি ধারাবাহিকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। শেষ শুটিংয়ের দিন সবাইকে বিদায় জানিয়ে কাঁদে। চোখের জলে থেমে যায় ক্যামেরার ক্লিক।
কলকাতার আলো, শব্দ, মানুষ—সব পেছনে ফেলে চলে আসে হায়দ্রাবাদে।
প্রথম ক'টা মাস ছিল স্বপ্নের মতো। নিজের হাতে সংসার গুছিয়ে, রান্না করে, অরুণাভর অফিস ফেরার অপেক্ষায় সন্ধে কাটত।
কিন্তু কিছুদিন পর অরুণাভ বদলে যেতে শুরু করল।
“তুমি কি একটু কম কথা বলবে?”
“তোমার পুরনো শো-গুলোর গল্প কেন ঘুরে ফিরে বলো?”
“তুমি সবসময় ক্যামেরার মতো করে ভাবো!”
একদিন অরুণাভ স্পষ্ট বলে, “তুমি এত নাটকীয় কেন? একটা সাধারণ জীবন চাই আমি!”
সুদীপ্তার বুকটা হু হু করে ওঠে। সে তো চেষ্টা করেছিল সাধারণ হতে। নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিল। অভিনয় ছেড়েছিল, শহর ছেড়েছিল, সব ছেড়েছিল।
তবুও টিকল না সম্পর্কটা। একদিন ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে দেখে অরুণাভ আর নেই। রেখে গেছে একটা চিঠি—
“তুমি ভালো, কিন্তু আমি সাধারণ। হয়তো আমরা একসাথে সুখী হতে পারব না। আমি যাচ্ছি…”
________________________________________
আজ এতদিন পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সব কিছু মনে পড়ছে। একটা একটা করে ছবি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে মনে। চোখের কোনা ভিজে যাচ্ছে।
হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। পুরনো পরিচালক মিতালির ফোন।
— “সুদী, তুমি আবার স্ক্রিনে ফিরতে চাও?”
— “আমি তো অভিনয় ছেড়ে দিয়েছি…”
— “কিন্তু অভিনয় তোমায় ছাড়েনি, এটা আমি জানি। তুমিই পারবে আমাদের গল্পটায় প্রাণ আনতে।”
সুদীপ্তা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“জীবনটাই তো একটা বিশাল নাটক, মিতালি। অভিনয় ছেড়ে কোথায় যাব?”
________________________________________
রাতের আকাশে চাঁদ ফুটেছে। সুদীপ্তা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এক ফালি আলো নিজের মুখে মেখে নেয়। এবার সে আর কারো জন্য নিজেকে বিসর্জন দেবে না।
তিনবার ভেঙেছে তার সংসার, কিন্তু ভাঙেনি তার প্রাণ।
অভিনয়ের মঞ্চে আবার ফিরবে সে—নতুন চরিত্রে, নতুন আলোতে, নিজের গল্প নিয়ে।
বার্তা: ভালোবাসা থাকতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে লাগে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গ্রহণযোগ্যতা, এবং নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার অধিকার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now