বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম, তখন আমার
একজন বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। তার নাম ছিল আব্দুল
কাইয়ুম মুকুট। তাকে আমরা মুকুট বলেই ডাকতাম।
আমরা বলতে ক্লাসের সবাই। স্কুলে আমি আর মুকুট
দুজনে পাশাপাশি বসতাম। যেদিন আমি আগে
যেতাম, সেদিন আমি আমার বইগুলোকে দুইভাগ
করে সামনের টেবিলে রেখে দিতাম। যাতে মুকুট
আসলে ওকে আমার পাশে বসাতে পারি। আমরা
পাশাপাশি বসতাম। অনেক দুষ্টামি করতাম।
ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত আমার রোলনং
ছিল এক। অবশ্য ক্লাস ফাইভে আমার রোলনং এক
নিয়ে ছোট্ট একটা মজার কাহিনী ঘটেছিল। ক্লাস
ফোরে মুকুটের রোলনং দুই ছিল। ক্লাস ফোরের
বার্ষিক পরীক্ষা শেষে দেখা গেল, মুকুট আর
আমার মোট নম্বর সমান! তখন স্যাররা মুকুটের
রোলনং এক আর আমার দুই করে দিয়েছিল। কারণ,
স্যাররা চেয়েছিল আমাদের ব্যাচের ক্লাস
ফাইভে অন্তত নতুন মুখ আসুক রোলনং ১ এ। আমার
মা বিষয়টা জানতে পেরে স্কুলে গিয়েছিল এবং
প্রধান শিক্ষককে ধমক দিয়ে বলেছিল, ক্লাস
ওয়ান থেকে আমার ছেলের রোলনং এক। সর্বাধিক
নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও ক্লাস ফাইভে এসে রোলনং
দুই হয় কী করে? এটা অন্যায়। আমি এটা মানতে
পারছিনা। আমার ছেলের টি.সি দিয়ে দিন।
আপনাদের স্কুলে আমার ছেলেকে পড়াবো না।
.
আমার মায়ের হুমকি শুনে প্রধান শিক্ষক মহাশয়
ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন বোধহয়। তখনই আমার
রোলনং এক আর মুকুটের রোলনং দুই হয়ে গেল!
.
ক্লাস ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষার পরে মুকুট
শহরের কোন একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। আর
আমি আমাদের গ্রামের স্কুলে সিক্সে ভর্তি হই।
কারণ, আমাদের আমাদের ফ্যামিলি কন্ডিশন খুব
খারাপ ছিলো। মুকুট শহরের স্কুলে যাবার সময়
আমাকে বলেও যায়নি। সিক্সে ভর্তি হবার পর
আমি নতুন ক্লাসে গিয়ে মুকুটকে খুঁজে বেড়াই।
কিন্তু দেখিনা। মনমরা হয়ে ক্লাস করি। সেজন্য
সিক্সে আমার পড়ালেখায় দারুণ প্রভাব
পড়েছিল। প্রায় আড়াইশ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে
ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে সিক্সে আমার
রোলনং ছিলো চৌদ্দ। ক্লাস সেভেনে এসে
রোলনং চৌদ্দ থেকে একুশ হয়ে গেল! তার কারণ,
সিক্সের ওই বছরটাতে আমার মনে মুকুটের বিরহী
প্রভাব। এই বিরহ বন্ধুত্বের। সিক্সের ওই বছরটাতে
আমি শুধু ভাবতাম, হায়! মুকুট! চলে গেলি, বলে
গেলিনা কেনো? ঠিকানাটাওতো দিতে পারতি!
চিঠি লিখতাম তোকে। কারণ, তখন মোবাইল
নামক যন্ত্রটা এত হাতের নাগালে আসেনি।
যাহোক, কেটে গেলো পাঁচ পাঁচটি বছর। তার মধ্যে
মুকুটের কোন সাক্ষাৎ পাইনি।
.
আমি যখন ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে পড়ি, তখন হঠাৎ
একদিন বাজারে মুকুটকে দেখতে পাই। মুকুটও
আমাকে দেখতে পায়। ফেসটা কেমন করে জানি
চিনে ফেলি। পাঁচ বছরে ফেসটা অনেক পরিবর্তন
হবার কথা। কিন্তু কেন জানিনা, অতটা
পরিবর্তিত মনে হলোনা! কিভাবে যেন চিনে
ফেলি! আর মুকুটও যেন কিভাবে চিনে ফেলে
আমাকে!
আমি একটু লাজুক স্বভাবের। খুব অভিমাণীও বটে।
পাঁচ বছর পরে শৈশবের বন্ধুর দেখা পেয়ে
কিভাবে কথা শুরু করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম
না। ভাবতে থাকি, পাঁচ বছরে ফেস অতটা
পরিবর্তন না হলেও শৈশবের দূরন্তপনা স্বভাবটা
পরিবর্তন হলোনাতো? কিংবা আগের মত বন্ধুসুলভ
স্বভাবটা আছেতো? আমি ডুবে যাই এরকম শত
ভাবনার মধ্যে। হঠাৎ মুকুট বলে উঠলো, কেমন
আছিস?
প্রশ্নটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে
উঠলো। অনেক কষ্টে চাপা কষ্ট চেপে রেখে মুখে
ম্লান হাসি দিয়ে বললাম, ভালোরে। তুই কেমন
আছিস?
.
এভাবে কুশল বিনিময় হলো মাত্র। তাড়াহুড়ো
করে চলে গেলো মুকুট। খুব কষ্ট পেলাম তখন। এরপর
দু একবার দেখা হয়েছিল তার সাথে মাঝে মাঝে
গ্রামের বাড়িতে আসতো বলে। কারণ সিক্সের
পর থেকে সে ও তার ফ্যামিলি ঢাকায় থাকে।
.
মুকুটের সাথে শেষ দেখা হবার পর কেটে গেলো
আরো তিনটা বছর। সে তিনবছরের মধ্যে তার
সাথে একটাবার দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। হঠাৎ
একদিন ফেসবুকে সে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট
পাঠালো। আমি দেখামাত্রই সাথে সাথেই গ্রহণ
করি। কিন্তু তাকে ম্যাসেজ দেইনি। কারণ আমি
খুব অভিমাণী। আমি চেয়েছিলাম সে আগে
ম্যাসেজ দিক। কিন্তু সে ম্যাসেজ দেয়নি।
একদিন তার প্রোফাইলের ছবিতে কমেন্ট করি।
রিপ্লাই দেখে বুঝলাম সে আমাকে চিনতে
পেরেছে। তারপর তার ম্যাসেজের অপেক্ষা
করতে করতে নিজেই বিরক্ত হয়ে যাই। অতঃপর
আমিই তাকে ম্যাসেজ করি প্রথমে। কিন্তু সে
রিপ্লাই দেয়নি এমনকি আমার ম্যাসেজটা
দেখেওনি! খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। আমার
মনের মধ্যে তখন নানা রকম ভাবনা আসতে
থাকে। কেন রিপ্লাই দিসনা? কেন ম্যাসেজটা
দেখিস না? ভুলে গেলি? আমি একটা গ্রাম্য
ক্ষেত বলে? অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা নিম্ন
শ্রেণীর বলে? এরকম নানা রকম ভাবনা আসতে
থাকে প্রচন্ড অভিমাণে।
.
তারপর তাকে কয়েকদিন পর পর ম্যাসেজ করতাম।
কিন্তু সে রিপ্লাই দিতোনা, এমনকি
ম্যাসেজগুলো দেখতোও না! খুব কষ্ট পেতাম তার
এমন আচরণে। তারপর একসময় ভাবলাম, দরকার নেই
তোর মত বন্ধু। ভালো থাকিস। এটা ভেবেই একদিন
তাকে ব্লক করে দেই। যেদিন তাকে ব্লক
করেছিলাম, সেদিন আমার চোখের কোণে দু
ফোঁটা জল এসে গিয়েছিল। আমার সেটা স্পষ্ট
মনে আছে এখনো। সেই থেকে মুকুট আজো আমার
ব্লকলিস্টে।
.
আজো মাঝে মাঝে মুকুটকে মনে পড়ে আমার।
আমি যখন সায়ান-এর এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধু
গানটা শুনি তখন আমার দু চোখ ভিজে যায়
অশ্রুতে। ভীষণ মনে পড়ে শৈশবে একটা গ্রাম্য
স্কুলে তার সাথে কাটানো মধ্যদুপুরগুলোর কথা।
.
"কেন বাড়লে বয়স ছোট্ট বেলার বন্ধু হারিয়ে
যায়,
কেন হারাচ্ছে সব? বাড়াচ্ছে ভিড়? হারানোর
তালিকায়?"
সত্যি, আমার জীবনে হারানোর তালিকাটা
অনেক বড়। হয়ত আমার প্রত্যাশাটা খুব বেশি
বলে। হয়ত আমি প্রচন্ড অভিমাণী আর লাজুক
স্বভাবের বলে। কী আর করবো? আমিতো আমার
নিজেকে পাল্টাতে পারিনা। আমি যদি আমার
নিজেকে পাল্টাই, তাহলে আমার অস্তিত্ব
বলেতো কিছু থাকবেনা! আমার স্বত্ত্বা বলেতো
কিছু থাকবেনা! এ কারণে পাল্টাতে পারিনা
নিজেকে।
.
"কোন শত্রুরও যেন প্রাণের বন্ধু এমন দূরে না যায়,
শুনো বন্ধু কখনো কোন বন্ধুকে বলোনা যেন
বিদায়।"
সত্যিই তাই। আমার শত্রুর কোন বন্ধুও যেন এতটা
দূরে না যায়। আর আমি হয়ত মুকুটের অনেক দূরে
আছি, স্মৃতি বিস্মৃতির অতলতলে হারিয়ে গেছি।
কিন্তু মুকুট আমার স্মৃতি বিস্মৃতির অতলতলে
হারিয়ে যায়নি। আজো আমার শৈশবের সেরা
বন্ধু মুকুটকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে। তখন একটা
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। চোখে দু ফোটা জলও আসে
সায়ানের গানটা শুনলে। কী আর করতে পারি
আমি? শুধু সবসময় শুভকামনা ছাড়া। যেথায়
থাকিস, ভালো থাকিস মুকুট। আর আমাকে মনে
না রাখলেও চলবে। আমি কারো স্মৃতি বিস্মৃতির
মাঝে থেকে কারো কষ্টের কারণ হতে চাইনা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now