বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বাতাস ছোঁয়া ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম বাতাকান্দি । চারপাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত, দুপুরের রোদে সোনালি হয়ে ওঠা গাছপালা, আর মাঝে মাঝে ভেসে আসা কাকের ডাক—সব মিলিয়ে শান্ত, নির্মল এক গ্রাম। গ্রামের মাঝখানে একটি স্কুল, “বাতাকান্দি সরকার সাহেব আলী আবুল হোসেন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়।” স্কুলটির ইমারত হয়তো শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো বিশাল নয়, কিন্তু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারে এটি গর্বিত।
এই স্কুলে সম্প্রতি চালু হয়েছে এক অভিনব ব্যবস্থা—“সততা স্টোর।” দোকান বললে যা বোঝায়, তেমন দোকান নয় এটি। এখানে নেই কোনো দোকানদার, নেই দামদর করার ঝক্কি, নেই ক্রেতা-বিক্রেতার ঠেলাঠেলি। শ্রেণিকক্ষের পাশেই একটি ছোট্ট কক্ষে সাজানো থাকে খাতা, কলম, পেন্সিল, স্কেল, চকোলেট, বিস্কুট আর চিপসের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস। প্রতিটি পণ্যের গায়ে সযত্নে লেখা দাম। পাশে রাখা একটি কাঠের বাক্স—তার উপরে ছোট্ট ছিদ্র, যেন সঞ্চয়পত্র জমা দেওয়ার মতো। সেই বাক্সের নামই “ক্যাশ বক্স।”
স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভ স্যার প্রথম উদ্যোগ নিলেন এটি চালুর। অনেক ভেবেচিন্তে, নানা জায়গায় দেখে এসে তিনি একদিন শিক্ষক মিটিংয়ে বললেন—
“আমরা পড়াই সততা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধের কথা। কিন্তু আমাদের ছাত্ররা কেবল বইয়ে পড়েই শিখবে, নাকি জীবনেও অনুশীলন করবে? আমি চাই, আমাদের স্কুলে একটা ‘সততা স্টোর’ হোক। যেখানে কোনো বিক্রেতা থাকবে না। ছাত্ররা নিজেরা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনবে, দাম পরিশোধ করবে, ভাংতি নেবে—সব নিজেরাই করবে।”
শুরুতে অনেক শিক্ষক সন্দিহান ছিলেন। বাংলা শিক্ষক রওশন আরা ম্যাডাম মৃদু হেসে বললেন,
“স্যার, এভাবে কি সম্ভব? ওরা তো ছোট্ট ছেলে-মেয়ে। কেউ যদি টাকা না দেয়, কেউ যদি ভাংতি বেশি নিয়ে নেয়—তাহলে কী হবে?”
হুমায়ুন স্যার শান্তভাবে বললেন,
“তাহলে না হয় চুরি করুক। কিন্তু চুরি করলেই তো তার অন্তরে একটা কাঁটা বিঁধে থাকবে। আমি চাই সেই কাঁটাটা অনুভব করুক ওরা। সেই অনুভবই একদিন ওদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে।”
অবশেষে ঠিক হলো, “সততা স্টোর” খোলা হবে। ছোট্ট কক্ষে সাজানো হলো কয়েকটা কাঠের তাক। স্থানীয় দোকানদার থেকে খাতা-কলম, বিস্কুট-চিপস আনা হলো। প্রথম দিনেই লিখে দেওয়া হলো—
‘এখানে কোনো বিক্রেতা নেই। সততার সাথে কেনাকাটা করুন।’
________________________________________
প্রথম দিনেই ছাত্রদের ভিড় জমে গেল দোকানটার সামনে। অষ্টম শ্রেণির সুমন প্রথম এগিয়ে এলো। সে কিনতে চাইল একটি কলম। কলমের গায়ে লেখা দাম—দশ টাকা। সুমনের হাতে একটি বিশ টাকার নোট। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল, তারপর ক্যাশ বক্সে টাকাটা ঢুকিয়ে ভেতরে রাখা ভাংতি থেকে দশ টাকা নিয়ে নিল। বন্ধুরা তাকিয়ে দেখছিল। কেউ ফিসফিস করে বলল,
“কেউ যদি টাকা না দেয়, কেউই তো ধরতে পারবে না!”
সুমন একটু লজ্জা পেল। তারপর দৃঢ় স্বরে বলল,
“দোষ করলে শিক্ষক না দেখলেও আল্লাহ দেখেন। আর এই দোকানটা তো আমাদেরই জন্য। যদি আমরা অসততা করি, তবে আমাদেরই ক্ষতি।”
কথাটা শুনে অনেকেই চুপ হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে স্কুলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এই নতুন ব্যবস্থার কথা। সপ্তম শ্রেণির মিষ্টি মেয়ে রাইসা প্রায়ই খাতা কিনত এখান থেকে। একদিন সে ভুলে বেশি টাকা দিয়ে চলে গেল। বাড়ি গিয়ে যখন বুঝল, তখন আবার পরদিন এসে শিক্ষকদের জানাল,
“স্যার, আমি গতকাল খাতার জন্য পাঁচ টাকা বেশি দিয়ে ফেলেছি। আমি কি নিতে পারি?”
হুমায়ুন স্যার হাসলেন,
“অবশ্যই নিতে পারো। তবে চাইলে তুমি ওই টাকাটা স্টোরেই দান করতে পারো। তখন অন্য কোনো দরিদ্র ছাত্র তার প্রয়োজনে কিছু কিনতে পারবে।”
রাইসা কিছুক্ষণ ভেবে মাথা নাড়ল,
“তাহলে দান করে দিলাম।”
________________________________________
এই স্টোরকে ঘিরে তৈরি হতে লাগল এক অদৃশ্য নৈতিক জগৎ। ছোট ছোট বাচ্চাদের মনে জন্ম নিতে লাগল দায়িত্ববোধ আর আত্মবিশ্বাস। আগে যাদের কাছে দোকানে গিয়ে দাম চুকানো কষ্টসাধ্য মনে হতো, তারাও এখন নির্ভয়ে নিজেরাই সব করতে শিখছে।
তবে সবকিছু কি এতটাই নিখুঁত? না, একদিন ঘটল ভিন্ন ঘটনা। দশম শ্রেণির রবিউল একদিন চুপিচুপি বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে গেল, কিন্তু টাকা দিল না। তার বন্ধু জাহিদ দেখল ঘটনাটা। প্রথমে সে কিছু বলল না, কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারল না। ভোরে মসজিদের মাইকে আজানের সুর শোনার পর তার মনে হলো—এভাবে চুপ থাকা ঠিক হচ্ছে না।
পরদিন সকালে সে রবিউলকে বলল,
“তুই গতকাল টাকা না দিয়ে বিস্কুট নিয়েছিলি। জানিস, এটা চুরি। তুই চাইলে পরে টাকা দিয়ে দিতে পারিস।”
রবিউল প্রথমে রাগ করে বলল,
“তুই আমাকে দেখে ফেলেছিস, তাই এত বড় কথা বলছিস।”
কিন্তু জাহিদের চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুক কেঁপে উঠল। সে বুঝল, ভুল করেছে। পরদিন লজ্জিত মুখে ক্যাশ বক্সে দশ টাকা রেখে দিল। তারপর ধীরে ধীরে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবার সামনে বলল,
“আমি গতকাল ভুল করেছি। আমি টাকা না দিয়ে বিস্কুট নিয়েছিলাম। আজ টাকা দিয়ে দিলাম। আর কখনও করব না।”
সেই মুহূর্তে গোটা স্কুলের পরিবেশ কেমন যেন পরিবর্তিত হয়ে গেল। শিক্ষকেরা নীরবে তাকিয়ে ছিলেন। হুমায়ুন স্যার মৃদু হেসে বললেন,
“ভুল করা লজ্জার নয়। ভুল স্বীকার না করাই লজ্জার। রবিউল আমাদের দেখিয়ে দিল, সততার মানে শুধু টাকা দেওয়াই নয়—নিজের ভুল স্বীকার করাও।”
________________________________________
দিন যায়, মাস যায়। “সততা স্টোর” এখন স্কুলের প্রাণ হয়ে ওঠে। শিক্ষকেরা লক্ষ্য করলেন, শিক্ষার্থীদের আচরণেও পরিবর্তন আসছে। আগে যেখানে কেউ ক্লাসে দেরি করলে অজুহাত দিত, এখন তারা নিজেরাই বলে,
“স্যার, আমি দেরি করেছি। আমার ভুল হয়েছে।”
অন্যদিকে, স্কুলের বাইরের গ্রামবাসীরাও খবর শুনে অবাক হলো। অনেকে এসে দেখতে চাইত—কীভাবে দোকান চলে বিক্রেতাহীন! একবার পাশের গ্রামের হাট থেকে এক ব্যবসায়ী এসে অবাক হয়ে বললেন,
“এমন দোকান যদি বাজারে করি, কেউ কি টাকা দেবে?”
হুমায়ুন স্যার শান্তভাবে উত্তর দিলেন,
“সম্ভবত সবাই দেবে না। কিন্তু যদি ছোটবেলা থেকেই মানুষকে সততার অনুশীলন শেখানো যায়, তবে একদিন দেবে। আমাদের লক্ষ্য সেদিকেই।”
________________________________________
এভাবেই সততা স্টোর ধীরে ধীরে শুধু একটি দোকান নয়, এক নৈতিক পাঠশালায় রূপ নিল। ছাত্ররা শিখল—সততা মানে কেবল পরীক্ষায় নকল না করা নয়; সততা মানে জীবনের প্রতিটি কাজে দায়িত্বশীল হওয়া।
একদিন বিদায়ী অনুষ্ঠানে দশম শ্রেণির ছাত্রী শিউলি বক্তব্য রাখল। চোখে জল নিয়ে সে বলল,
“এই স্কুল শুধু আমাকে পড়াশোনাই শেখায়নি, সততার মানেও শিখিয়েছে। আমি জানি, যখন কলেজে যাব, যখন শহরে পড়তে যাব, তখন চারপাশে অনেক প্রলোভন আসবে। কিন্তু আমি চাইব, আমার মধ্যে আজকের এই অভ্যাসটা বেঁচে থাকুক।”
তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।
সেদিনের সূর্যাস্তের আলোয় স্কুলের আঙিনা লাল হয়ে উঠেছিল। ক্যাশ বক্সে তখনও জমা হচ্ছিল টাকার শব্দ—টক টক। প্রতিটি শব্দ যেন ঘোষণা করছিল—সততা আছে, সততা বেঁচে আছে। আর যতদিন এভাবে অনুশীলন চলবে, ততদিন এই সমাজেও বেঁচে থাকবে সত্য, নৈতিকতা আর আস্থা।
________________________________________
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now