বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সন্ধ্যা নামে

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান স্নিগ্ধা আফসানা রোশনী (০ পয়েন্ট)

X সন্ধ্যা নামে শীতের বিকেলগুলো খুব ছোট হয়।দুপুর গড়িয়ে বিকেল শুরু হতে না হতেই শেষ।নীল বা ধূসরপাহাড়ে যেমন ঝপ করে সন্ধ্যা নামে,আচমকা প্রকৃতির বুক খালি করে হারিয়ে যায়, শীতকালের বিকেলগুলোও পাহাড়ি এলাকার মতো হয়। চুনির মতো লালচে আলোর বিকেলটা উপভোগের সময়ই দেয়না তেমন।নোটিশ-টোটিশ না দিয়ে হুট করে সন্ধ্যা চলে আসে।শীতের আদুরে বিকেলটা চট করে একফালি স্মৃতি হয়ে যায়। অনেকদিন পর মিলি আজ তাদের ছাদে এসেছে।খুব সুন্দর করা সাজানো তাদের ছাদ।দেখেই মনে হয় অনেক যত্নে করা।আসলেই যত্নে করা।তার বাবা ছাদে একটা বাগানের মতো করেছেন।অসংখ্য টবে কত ধরনের যে গাছ।দেশী-বিদেশী সব ধরনের।তার বাবার আগে গাছের শখ ছিলনা।ইদানীং হয়েছে।তিনি প্রচুর টব আর গাছ দিয়ে ছাদ ভরিয়ে ফেলেছেন।এখানে এলেই কেমন যেন সব কিছু ভালো লাগতে শুরু করে। শীতের ঝপ করে আঁধার নেমে আসার আগে মিলি বিকেলটাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে চায়।হাতের মুঠোয় আবছা রোদের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে চায়।ঘর থেকে কয়েক সিড়ি উপরে উঠে গেলেই তো ছাদ।তবু কেন যেন আসা হয়না।আগে খুব উঠতো।তার বিকেল কেটে যেত খুব অদ্ভুতভাবে।যতক্ষন না কেউ এসে ডেকে নিচে নামিয়ে নিত ততক্ষন মিলির চমতকার সময় কেটে যেত।আকাশে রঙের খেলা দেখে সময় কাটানো অপূর্ব একটা ব্যাপার।অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ ভালো লাগা ছড়িয়ে থাকে শেষ বিকেলের রোদে। মিলি দুপুর থেকেই ছাদে হাঁটাহাঁটি করছে।ছাদে দুপুরের রোদ।গাছের ঝরে পড়া পাতার দলের সাথে যেন হাওয়ার এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব।পাতারা উড়ে বেড়াচ্ছে।এই দুপুরেও হু হু করা ঠান্ডা বাতাস।হাড়ে কেমন কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।একদম ভেতরে যেয়ে লাগে।রোদ আর মেঘের ছায়া আকাশে।এমন একটা সময়ে মন শরীরের মাঝে থাকতে চায়না।মন অনেক দূরে নিয়ে যায়।দূর মানে দূরে।অনেক দূরে এবং অনেক অনেক দূরে। তাদের বাড়ির সামনে বিশাল এক মাঠ।গাঢ় সবুজ ঘাসে ঢাকা।কোন কোন জোছনা রাতে দেখতে খুব অদ্ভুত লাগে।পুরো মাঠে চাঁদের আলো থইথই করছে।যেন চাঁদ থেকে কেউ আলো এনে পাটির মতো বিছিয়ে দিয়েছে মাঠে।রূপকথার প্রান্তর মনে হয় তখন মাঠটাকে।এখনই যেন রুপালী ঘোড়া ছুটিয়ে রাজকুমার বিশাল প্রান্তর পাড়ি দেবে তার রাজকন্যার খোঁজে।ছাদের কার্নিশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে মিলির ভালোই লাগে। অপূর্ব বিকেল নামছে।রোদ্দুর নরম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা মাঠে।কাচা সোনার মতো।হাত বাড়ালেই যেন ছুঁয়ে ফেলা যাবে।মুঠোয় করে তুলে আনা যাবে।ঠান্ডা লাগছে মিলির।গায়ের লাল শালটা আরো ভালো করে গায়ে জড়ালো ও।কেন যেন মনে হচ্ছে এসব আর দেখা হবেনা তার।কাজেই আজ এত সহজে ছাদ থেকে নামবেনা সে। সকালবেলা নাস্তার টেবিলে মেয়ের হাসিমুখ না দেখতে পেলে আফজাল হোসেনের দিন ভাল যায়না।মেয়ে পাশে বসে খাবে,কাপে চা ঢেলে দিতে দিতে হাসবে এটা তাদের ডাইনিং টেবিলের রোজকার দৃশয়।মেয়ের মন ভালো আছে এটা নিশ্চিত হয়ে তবে তিনি অফিসে রওনা দেবেন।নয়ত না।সংসারে মা না থাকলে বাবাকেই তো মা-বাবা দুজনই হতে হয়। আজ সকালটা দেখা গেল অন্যদিনের সকালের মতো না।একটু অন্যরকম।বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে ঘরের।নাস্তার টেবিলে মিলিকে দেখে তিনি চমকে গেলেন।ছোটখাট চমক না।বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলেন আফজাল সাহেব।মেয়েটার কি হয়েছে?সে কি কোন চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে?চোখ লাল,মুখ কেমন ফোলা ফোলা লাগছে।মনে হচ্ছে চোখে জল টলমল করেছে।সামান্য টোকা দিয়েই টপটপ করে জল ঝরে যাবে।চোখের নিচে কালিও দেখা যাচ্ছে!গতকালই তো মেয়েকে ঠিক দেখেছেন।হাসিখুশি উজ্জ্বল চেহারার এক তরুনী।তবে কি মিলি কিছু গোপন করছে তার কাছ থেকে?কিন্তু তিনি তো তার মেয়ের বন্ধু।তারা দুজন নিজেদের মাঝে সব কথা শেয়ার করেন।কি এমন ঘটেছে যে একরাতে তাঁর হাসিখুশি মেয়েটার এমন আমূল পরিবর্তন! মেয়ের দিকে ভালো করে তাকালেন আফজাল হোসেন।মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে একরাতের মাঝে।ফর্সা মুখটা কেমন লালচে লাগছে।আচ্ছা জ্বর-টর আসেনিতো?তাহলে তো ডাক্তারকে ফোন করা দরকার।মেয়ে তার অসুখ-বিসুখের কথা কোনদিন মুখ ফুটে বলবেনা।তাকেই বুঝে নিতে হবে।মিলির ছোটবেলায় এমন হয়েছে,রাতে মেয়ের কান্না শুনে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেছে।দেখেন মেয়ে আস্তে আস্তে কুনকুন করে কাঁদছে।একটু পর পর নাক টানছে।কি হয়েছে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা।অনেক আদর করার পর বলল তার পেটে ব্যথা।কাজেই এই মেয়ে বড় হয়েও তার সমস্যা বলবে আশা করা যায়না।বাবা হিসেবে এটা তাঁর উচিৎ মেয়ের কি হয়েছে তা খুঁজে বের করা।সমস্যা হলে সমাধান করা। অন্যদিন মেয়ে খেতে খেতে কত গল্প করে আজ কেমন চুপচাপ হয়ে আছে।তিনি কি কিছু জিজ্ঞেস করবেন?এখনই নাকি অফিস থেকে এসে।কিন্তু মেয়ের শুকনো মুখ দেখে অফিসে গেলে সারাদিন তাঁর আর কিছুই ভাল লাগবেনা।অবশ্য কিছু সমস্যা থাকে যা মেয়েরা তাদের বাবার থেকে মায়ের সাথে বেশি সহজ করে কথা বলে।ছোট ছোট ঘটনাও মা-মেয়ে মিলে গুজগুজ করে সারাদিন হাসাহাসি করে।কিন্তু সেটা মিলির জন্য সম্ভব নয়।মেয়ের কি মায়ের জন্য মন কেমন করছে? আফজাল হোসেন ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেললেন।নাহ,রেহানার ব্যাপারে এখন কথা না বলাই ভালো।মেয়েটা কেঁদে কেটে একটা কান্ড করে।তিনি নিজেই খুব একটা মনে করার চেষ্টা করেননা।করলেই সারাটাদিন স্ত্রীর কথা মনে পড়বে।এগারো বছর আগে চলে যাওয়া মানুষটা আবার নতুন করে জীবিত হয়ে উঠে যেন। মামনি?আফজাল হোসেন কোমল গলায় মেয়েকে ডাকলেন। জ্বি বাবা। মিলি বাবার দিকে তাকালোনা।ব্যাপারটা খেয়াল করলেন আফজাল সাহেব।মেয়ে তাঁর দিকে তাকালনা কেন?বাবার চোখে চোখ রাখতে পারছে কেন সে? মামনির কি মন খারাপ নাকি? মিলি সামান্য হাসল।বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,না তো বাবা।মন খারাপ হবে কেন? বাবার কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল ও।চায়ের কাপে চুমুক দিলেন আফজাল হোসেন।মেয়ের হাতের চা যে কি অসাধারন হয়।রেহানাও ঠিক এমনই চা বানাতো।মেয়েটার সব কাজ কেমন যেন তার মায়ের মত।দেখতেও হয়েছে মায়ের ছাপের।বড় বড় ভাসা চোখ,হাসি সব তাকে রেহানার কথা মনে করিয়ে দেয়। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হয়েছিল গো মা? মিলি খানিকক্ষন চুপ করে থাকল।ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,ইদানীং ঘুম-টুম তেমন হচ্ছেনা বাবা। কেন গো মা?শরীর খারাপ করেছে নাকি?কাছে আয় তো দেখি। বলতে বলতে আফজাল হোসেনের চোখ ভিজে উঠল।মেয়েটার সামান্য কিছু হলেই তার এমন লাগে।গলার কাছে মনে হয় কিছু দলা পাকিয়ে আছে।চোখদুটো কেমন জ্বালা করছে। মিলি মাথা এগিয়ে দিল।মেয়ের কপালে হাত রাখলেন আফজাল সাহেব।নাহ,গা গরম না।বরং একটু বেশিই ঠান্ডা বলে মনে হচ্ছে।শরীর এমন ঠান্ডা হয়ে আছে কেন?অন্য কোন অসুখ করেনি তো? বাবার হাত ধরল মিলি।বাবা আমার কিচ্ছু হয়নি।সামনে ফাইনাল পরীক্ষা।সারারাত বই নিয়ে বসে আছি কিন্তু পড়া হচ্ছেনা কিছু।এবার একটা বড়সড় গোল্লা পাব বলে মনে হয়। বলেই হেসে ফেলল ও।কি চমৎকার সে হাসি। মেয়ের হাসি দেখে বাবারও মুখে হাসি ফুটল।নাহ,হাসি দেখে মনে হচ্ছে এই তো তার মেয়ে।বুক থেকে যেন বিশাল এক পাথর নেমে গেল তাঁর।ঘটনা তো তাহলে ঠিকই আছে।মেয়ের ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনায় মন।সারারাত জেগে পড়েছে।আগে তিনি পাশে বসে থাকতেন।ঢুলুঢুলু চোখে মেয়ের পড়া শুনতেন।এখন মেয়ে বড় হয়েছে,নিজের ভালো সে বুঝতে পারে। আফজাল হোসেন হাসতে হাসতে বললেন,একটা পরীক্ষায় খারাপ হলে কিছু হয়না।জীবনে সব পরীক্ষা ফার্স্ট হতে হয়না বুঝলি,তাহলে অহংকার বেড়ে যায়।অহংকার না বাড়াই ভালো। খুব খুশি হলে আফজাল হোসেন মেয়েকে তুই করে বলেন।এবার তিনি অফিসে যেতে পারেন নিশ্চিন্ত মনে।তাঁর আদরের কন্যা ঠিক আছে।হাসিমুখে টেবিল ছাড়লেন তিনি।বাবার গমনপথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলল মিলি।বাবার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে তার। একদিন আগের কথা, খুব ভোরে দরজা ধাক্কানোর শব্দে তুহিনের ঘুম ভাঙ্গলো।ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।তার প্লান ছিল আজ সারাদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমাবে।ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নিজেকে ক্লান্ত করে ফেলবে। কিন্তু প্লান করে যে কোন কাজ ঠিকমতো হতে চায়না,কথা সত্যি। এই সময়ে তার কাছে তো কারো আসার কথাও না।লুঙ্গিতে কোন রকম একটা গিট লাগিয়ে দরজা খুলতে উঠল সে।এত রাগ লাগছে তার।ভিখারী-টিখারী হলে আজ খবর আছে। দরজা খুলে তুহিন এত অবাক হয়ে গেল যা বলার মতোনা।মিলি দাঁড়িয়ে আছে।এই সাত-সকালে!তার থেকেও বড় কথা এই মেয়ে তার মেসের ঠিকানা জোগাড় করল কেমন করে!নতুন এই মেসে ঠিকানা সে কাউকে দেয়নি।ভেবেছিল বেঁচে গেছে।কেউ বিরক্ত করবেনা।কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বেঁচে তো যায়নি বরং মরার সময় হাজির। মিলির পরনে হালকা হলুদ রঙের একটা শাড়ি।ঠোঁটে লিপিস্টিক।গায়ে লাল রঙের পাতলা শাল।শীতের এই ভোরে এতে তার শীত মানছে কিনা কে জানে।মিলিকে দেখে মনে হচ্ছেনা তার কোন অসুবিধা হচ্ছে।ভোরের নরম আলো মুখে পড়ে তাকে অপরূপা দেখাচ্ছে।কিন্তু সেসব তুহিনের নজরে এলনা।তার দারুন বিরক্তি লাগছে।এই মেয়ে এখানেও হাজির! তুহিনের দিকে তাকিয়ে হাসল মিলি,বলল-কি ভেতরে ঢুকতে দেবেনা? সে দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছে,পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে মিলিকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার খুব বেশি ইচ্ছা নেই তার। দরজা ছেড়ে দিল সে।শুকনো গলায় বলল, ভেতরে এস। ঘরটা ছোট।একজন ব্যাচেলরের ঘর যতটুকু অগোছালো থাকা দরকার তার থেকেও বেশি অগোছালো। মিলি হাসিহাসি মুখে তুহিনের বিছানার কাছে যেয়ে দাঁড়ালো।মশারী তোলা হয়নি।কয়েক জায়গায় বিশাল ফুটো দেখা যাচ্ছে।এমন ফুটো থাকলে মশারী টাঙ্গানো না টাঙ্গানো একই কথা। বিছানাটাকে দেখাচ্ছে ঝড়ে বিদ্ধস্ত তাবুর মতো। মশারীটা সরিয়ে মিলি বিছানার উপর বসল।হাসিমুখে তুহিনের দিকে তাকালো।কিন্তু তুহিনের মুখে হাসি নেই।সে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে মিলির দিকে।ভাবটা এমন যে ঘটনা কি বলে বিদেয় হও। মুখে বললনা বলে তুহিনের মনের কথাটা মিলি শুনতে পেলনা।সে তুহিনের হাত ধরে তাকে পাশে বসাল।বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গেছে ওর।হাত ছাড়িয়ে নিতে চাচ্ছে সে।কিন্তু মিলি শক্ত করে হাত ধরে আছে। সে হাসিমুখে বলল,এই সাতসকালে ঘুম ভাঙ্গালাম বলে বুঝি সাহেবের মেজাজ খারাপ? তুহিন বলল,কি বলতে এসেছ বলে ফেল। তুহিনের হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিতে নিতে মিলি বলল, এই রাগ করে লাভ নেই জনাব।যে খবর দিতে এসেছি শুনলে সব মেজাজ ঠান্ডা হয়ে যাবে আপনার বুঝলেন? তার আগে বল এই মেসের ঠিকানা পেলে কোথায়? মিলির কন্ঠে দুষ্টুমি, কেন ঠিকানা বদলে পালাতে চেয়েছ বুঝি? আহ-হা,ভনিতা করনা তো।যা বলবে বল।হাত ছাড়িয়ে নিল। আহত গলায় বলল মিলি,এমন করছ কেন?শোন না ব্যাপারটা। তুহিন চুপ করে গেল।মিলি ফিসফিস করে বলল,একজন আসছে তুহিন। বিরক্তি লাগছে তুহিনের।এত প্যাঁচাতে পারে মেয়েটা। কে আসছ? আবার তুহিনের হাত ধরল ও।কোমল গলায় বলল-আমাদের সন্তান আসছে তুহিন।আমি কেবল টের পেয়েছি। বলতে বলতে আনন্দের মিলির চোখে জলে ভরে উঠল। তুহিন হা হয়ে গেল।বলে কি এই মেয়ে?এই সাতসকালে ফাযলামী করতে এসেছে নাকি? কিসের বাচ্চা? আমি প্রেগন্যান্ট তুহিন!আমার মাঝে বেড়ে উঠছে এখন আর একজন।ছোট্ট একজন মানুষ।বলতে বলতে গলা ধরে এল মিলির। এতক্ষনে ঘুম কেটেছে তুহিনের।কি শুনছে সে এইসব?গাজায় টান দিতে হবে নাকি আবার?নয়ত কিছুই মাথায় ঢুকছেনা। কড়া গলায় বলল ও, কিসব আজগুবি কথা বলছ? মিলি দুঃখিত কন্ঠে বলল, সত্যি বলছি তুহিন।দু’মাস চলছে আমার। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তুহিন।মাথা কাজ করছেনা।ঘরের ভেতর পায়চারী করতে শুরু করেছে সে।মেয়েটার কথার আগামাথা কিছুই ধরতে পারছেনা।কখন ঘটল এসব কে জানে!তার তো কিছু মনে নেই।সেদিনের ব্যাপারেই কি বলছে মিলি...সর্বনাশ। গলা খাঁকারি দিল তুহিন।মিলি তার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। বিছানায় বসে মিলির হাত ধরল ও।নরম গলায় শুরু করল, দেখ মিলি,ওটা একটা ভুল ছিল! ভ্রু কুঁচকে ফেলল মিলি, ভুল? হ্যাঁ,আসলে আমরা দুজনে ইমম্যাচিউরড... তাকে কথা শেষ করতে দিলনা মিলি।কড়া গলায় বলল,কি বলতে চাচ্ছ তুমি? দেখ মিলি,যা হয়েছে শেষ।ভুল নিয়ে তো আর এত মাথা ঘামালে চলেনা।এখনার এসব তেমন ব্যাপারনা।টাকা দিলে যে কোন হাসপাতালে...বুঝতেই পারছ।তুহিন হাসার চেষ্টা করল। মিলি হাসি ফিরিয়ে দিলনা।তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আছে।তুহিনের কথা শুনে তার গা জ্বলে যাচ্ছে।এমনভাবে কথা বলছে যেন কিছুই হয়নি। আরে এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?রিল্যাক্স।এতে চিন্তার কিছু নাই।হরদম হচ্ছে।বাচ্চাটা খালাস করে ফেলতে হবে।বলেই হাসল ও। এত নোংরাভাবে কেউ কথা বলতে পারে ওর ধারনাতেই ছিলনা।তার উপর তুহিন!ওর ভালবাসার মানুষ! নাহ মিলি এটা পারবেনা,মরে গেলেও না।তার সন্তান...সে পারবেনা। তুহিনের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,প্লিজ তুমি আমাকে বিয়ে কর। বলতে বলতে মিলির কন্ঠ ধরে আসে,কেপে ওঠে।ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে সে। তুহিন বিরক্ত হয়। আহা,এত কান্নাকাটির আছেটা কি?থাম দেখি।আর যা বললাম শোন।টাকা নিয়ে এস একদিন।মালটাকে সরিয়ে দিয়ে আসি। ঘেন্নায় মুখে থু থু জমে গেল মিলির। আস্তে করে হেটে চলে গেল,তুহিনের দিকে একবারের জন্যও ফিরে তাকালোনা। বাসার ফিরল প্রচন্ড মাথাধরা নিয়ে।জ্বরও আসছে বলে মনে হয়।হোক জ্বর-ঝড় যা হয় হবে।আজ সারাদিন সে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকবে।নিজেকে কষ্ট দেবে। আফজাল হোসেন আনন্দিত।তার দারুন খুশি খুশি লাগছে।তিনি ঠিক করে ফেলেছেন মিলির বিয়ে দেবেন।বুড়ো বয়সে নাতি-নাতনীর সাথে সময় কাটানো দারুন ভাগ্যের ব্যাপার।মানুষ আর বাঁচে কয়দিন।তার ইচ্ছা বাসায় ফিরেই মিলিকে বলবেন সব। ছেলেও ঠিক করে ফেলেছেন তিনি।ডাক্তার।দেখতে শুনতেও খারাপ না।তার থেকে বড় কথা ছেলেকে তিনি অনেকদিন ধরে চেনেন। ছেলের বাবাই প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।মনে মনে আফজাল হোসেনও তাই চেয়েছিলেন। আল্লাহ প্রার্থনা শুনেছেন।তিনি অন্তর্যামী। আনন্দে অফিসে তাঁর মন বসেনি।ছুটি নিয়ে নিয়েছেন।কয়েক কেজি রসমালাই কিনে নিয়েছেন।মিলির প্রিয় মিষ্টি।একটা ব্যাপার নিয়ে একটু টেনশনে আছেন।মিলিকে কিভাবে বল্বেন।কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে।রেহানা থাকলে এমন হতনা।সেই বলতে পারত মেয়েকে।বাবাদের অনেক কিছু বলা মুশকিল।নাহ,এখন থেকে শিখতে হবে।ছেলে-মেয়ের কাছে আবার লজ্জা কি! মিলি ছাদে দাঁড়িয়ে আছে।শীতের বাতাসে তার সমস্ত শরীরে কাঁপুনি ধরে গেছে।জ্বরের ঘোরে মনে হচ্ছে পৃথিবী দুলছে।সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে।বাবাকে সে বলতে পারবেনা।একথা শুনলে তার বাবা লজ্জায় মারাই যাবেন।এর থেকে ভালো সে মরে যাক।সব জ্বালা-যন্ত্রনার অবসান হোক। মেয়েকে ঘরে না দেখে আফজাল হোসেন পুরো বাড়ি খুঁজলেন।মেয়েটা কোথায় গেল! এই রাতের বেলা সে কি করছে একা একা?ছাদে নাতো?তিনি উঠে এলেন।সিড়ি ঘরের বাতি বন্ধ। কুয়াশায় ঢাকা চাঁদের আলোয় সব কিছু কেমন ঝাপসা লাগছে।ছাদে এক মাথায় একটা আবছা ছায়া মূর্তি দেখা যাচ্ছে।মিলি নিশ্চয়ই।মেয়েটা এই ঠান্ডায় ছাদে কি করছে! তার ঠান্ডার ধাত।একটুতেই গলা বসে যায়। তাঁর বুকটা কেন যেন কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছে কিছু ঠিক নেই।অশুভ কি যেন ঘটতে চলেছে। আফজাল হোসেন নড়তে পারছেননা,তিনি মেয়ের কাছে ছুটে যেতে চান কিন্তু পারছেননা।পা দুটো যেন আটকে আছে। মিলির মাটিতে শুয়ে পড়েছে।তার শাড়ি রক্তে ভেসে যাচ্ছে।এবোরশান হয়ে যাচ্ছে নাতো!মিলি প্রচন্ড ব্যথায় চিৎকার করে উঠে।তার বাবা ততক্ষনে মেয়ের কাছে ছুটে আসতে পেরেছেন।কি হচ্ছে কিছুই তিনি বুঝতে পারছেননা। কি হয়েছে তাঁর মেয়ের!মাটিতে বসে পড়ে মেয়ের মাথা তিনি কোলে তুলে নিলেন।কি হয়েছে না হয়েছে কিচ্ছু জানার সময় নেই এখন তাঁর। তিনি শুধু জানেন সব ঠিক করে ফেলতে হবে তাকে।মেয়ের জীবনের থেকে বড় কিছু নেই তাঁর কাছে। মেয়ের হাত শক্ত করে ধরলেন তিনি,ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, কোন ভয় নেই গো মা।বাবা আছে।দেখ মা,তোর বাবা সব সময় আছে। মিলির শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে।তবু সে হাসার চেষ্টা করল।তার অবলম্বন,তার বাবা হাত ধরে আছে।সে জানে সব ঠিক হয়ে যাবে। মিলি চোখ বন্ধ করল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সন্ধ্যা নামে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now