বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
-স্মৃতিচারণ
.
এক
.
মুক্তোদানার মত শিশির জমে আছে
সিঁড়িগুলোয়। আবছা আলোয় বেশ প্রাণবন্ত
লাগছে । কেন যেন আসাদের কাছে এই
সিঁড়িগুলোকে জড় পদার্থ বলে মনে হচ্ছে না।
.
লাল ইটের এই সিঁড়িগুলোকে দেখতে ঠিক
ওদের
বাড়ির সিঁড়ির মতই লাগছে। কিন্তু ওদের বাড়ির
সিঁড়ি কখনো এইরকম শিশিরে ভিজে থাকতো
না। থাকবে কেমন করে? প্রকাণ্ড প্রাসাদের মত
সেই বাড়ির সিঁড়িকে আগলে রাখার জন্য,
ওগুলোর উপরে টিনের চাল ছিল যে! উপরে
চাল
থাকায় অবশ্য ভালই হয়েছিল তার জন্য।
কারণ, সূর্য উঠার আগে সে লাফাতে লাফাতে
বাড়ির বাইরে যেত। চাল না থাকলে শিশিরভেজা
সিঁড়িতে আছাড় খেয়ে পড়ে নিশ্চয়ই কোমর
ভাঙতো।
.
সূর্য উঠে গেছে। লাল ইটের সিঁড়ি-গুলোয়
সূর্যের
প্রথম রশ্মি এসে পড়ায় শিশিরস্নাত সিঁড়ির
ধাপগুলো চকচক করছে। জুতা খুলে সিঁড়িতে পা
রাখতে গেল সে। সাথে সাথেই কোথা থেকে
যেন
জল্লাদমুখী একজন গার্ড তেড়ে এলো!
সাধারণ দর্শকদের নাকি এই সিঁড়িতে উঠার অনুমতি
নেই।
.
এই সিঁড়িতে উঠার অনুমতি না পেলে কেমন করে
হবে? পারুল থাকলে এতক্ষনে হেসে কুটি কুটি
হয়ে যেত। বলত,
‘কিরে দাদা, তোকে তো প্রথম ধাপেই পা
রাখতে দিলো না? শেষ ধাপ পর্যন্ত তুই কিভাবে
যাবি?’
.
ও থাকলে এখন এক চোট ঝগড়া হয়ে যেত।
পাগলীটাকে আজ খুব মনে পড়ছে। ভাই-বোন
দুজনে কী ঝগড়াটাই না করতো সারাদিন! ওকে
খেপাতে ভীষণ মজা লাগতো আসাদের। ভয়াবহ
মেজাজ ছিল পাগলিটার! কোন কিছুতেই বনত না
আসাদের সাথে। ঝগড়াঝাঁটি করে চিমটি আর
রামখামচি দিয়েও ওর রাগ কমত না। মায়ের কাছে
বিচার দিয়ে মার খাওয়াতে পারলে, তারপর
স্বস্তি পেত। রাগ পড়ে গেলে অবশ্য এসে মাফ
চাইত।
বলতো,
‘দাদা আর তোর সাথে ঝগড়া করবো না,
প্রমিস!’
.
গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলোটা চোখে
এসে পড়ল আসাদের্। মুখটা ফিরিয়ে নিলো ও।
ধীর পায়ে জলাধারটার কাছে এসে দাঁড়ালো।
পানিটা এখন কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে
গেছে।
শ্যাওলা জমে সবুজ বর্ণের দেখাচ্ছে। অথচ
এককালে কি টলটলে পানি ছিল! পানিতে তাকালে
নিজের মুখটা পুরো স্পষ্ট দেখা যেত।
.
অবশ্য চাইলে এখনও এই পানিতে মুখ দেখা যায়,
তবে আগের মত অতটা স্পষ্ট না। পানিতে উঁকি
দিলো ও। স্থির পানিতে মুখটা মোটামুটি
স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিলো। সহসা ওর মুখের
দুপাশে আরো দুইটা কচি মুখ দেখতে পেল। ঝট
করে পিছনে ফিরে তাকাল আসাদ।
না! ধারে কাছে তো নয়ই, পুরো এলাকাতেই
সে
আর গার্ড ছাড়া আর কোন মানুষ নাই।
.
দুই
৭১এর ডায়েরিটা সবসময় সাথেই থাকে আসাদের।
কত স্মৃতি যে জমা আছে এই ডায়েরির পাতায়!
স্মৃতিচারণ করতে ইচ্ছা হলেই ডায়েরিটা পড়ে
সে। তখন কেন জানি মনে হয়, ডায়েরিটা ওর
নিজের না। অন্য কারোর ডায়েরি। ঘাসের উপর
বসে ডায়েরিটা বের করলো আসাদ। পাতা উল্টে
পড়তে শুরু করল।
*
‘সই দেখ! তোর কপালের টিপটা বাঁকা।’
.
পানি থেকে চোখ না ফিরিয়েই বলল শিউলি।
‘আমার বাঁকা টিপই ভালো। আর তোর
লিপস্টিক যে লেপটে গেছে?’
খোঁচাখুঁচি তে পারুলও কম যায় না।
.
ওরা দুজনেই পুকুর পাড়ে দাড়িয়ে আছে। আর
আমি তখন ছোট ছোট পা ফেলে ওদের
পিছনে
গিয়ে দাঁড়ালাম। হাতের মুঠোয় কিছু কাঁকড় আর
নুড়ি লুকিয়ে রেখেছিলাম। বললাম,
‘তোরা কী করছিস?’
.
পারুল বলল, ‘দাদা দেখ! পানিতে আমাদের মুখ
দেখা যাচ্ছে!’
.
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই হাতের নুড়ি গুলো
আস্তে করে পুকুরে ছেড়ে দিলাম। পানিতে
ছোট
ছোট ঢেউ উঠায়, পারুল আর শিউলির মুখ দেখা
সেদিনের মত মাঠে মারা গেলো। পারুল আমাকে
৫-৬ টা কিল ঘুষি দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের
কাছে ছুটে গেলো। শিউলি কি করবে বুঝতে না
পেরে সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল।
.
আমি বললাম, ‘কীরে চুন্নি! তোর লিপস্টিক
তো লেপটে গেছে, আয় মুছে দেই।’
.
১৫ বছরের বালকের স্পর্শ ১২ বছরের বালিকার
হৃদয়ে সেদিন কিসের ঝড় তুলল, তা বুঝতে
পারিনি। শিউলি এক ঝটকায় আমার হাত সরিয়ে
দিয়ে কোথায় যেন পালিয়ে গেলো।
.
শিউলি আমাদের বাড়িতেই থাকে। মিলিটারির
গুলিতে তার বাবা মা দুজনেই মারা যাওয়ার পর মা
তাকে আমাদের বাড়িতে এনে রেখেছেন। ওই
দিনের
পর থেকে ও আমাকে দেখলে কেমন জানি
লজ্জা
পায়। তার ঐ লাজমাখা হাসি দেখলে আমার হৃদয়
ধুকপুক করা শুরু করে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করি,
যাতে কেউ তা শুনতে না পায়।
.
কে জানি গ্রামে খবর রটিয়ে দিল, মিলিটারির
পরবর্তী ঘাটি আমাদের গ্রাম। আমরা সবাই
তখন কোনার একটা রুমে থাকি। সবাই একসাথে
থাকলে সাহস পাওয়া যায় বলে। মাঝেমধ্যে বাড়ির
সামনের রাস্তায় মিলিটারিদের জীপের শব্দ
শোনা যায়। তখন আমরা ভয়ে জড়সড় হয়ে
থাকি। প্রচন্ড ভয় আর আতঙ্ক সবাইকে গ্রাস
করে ফেলে তখন।
.
এক মধ্যরাতে দরজার খটখট আওয়াজে মায়ের ঘুম
ভেঙ্গে গেল। তিনি ভয় পেয়ে আমাকে
জাগিয়ে
তুললেন। তখনো দরজার খটখট আওয়াজ হয়েই
চলেছে। মা ভয়ে ভয়ে বললেন,
‘কে?’
.
বাইরে থেকে ফিসফিসে গলায় উত্তর এলো,
'খালা! আমরা মুক্তিসেনা!’
.
মা জলদি করে দরজা খুলে দিলেন। দুজন ছেলে
ঘরে এসে ঢুকল।
কতইবা বয়স ওদের?
আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড়।
অথবা তারও কম।
মা ওদের খেতে দিলেন। খেয়েদেয়ে চলে
যাওয়ার
জন্য পা বাড়াল ওরা ।
আমি বললাম,
‘দাঁড়াও! আমিও যাবো তোমাদের সাথে।’
.
মা আঁতকে উঠে বললেন,
‘কী বলিস, বাবা? তুই এখনো অনেক ছোট!’
’না মা! ওদের দিকে চেয়ে দেখ, ওরা তো
আমার
চেয়ে খুব একটা বড় নয়।' নাছোড়বান্দার মত
মাথা নাড়লাম। 'আমার জন্য দোয়া করো।’
.
ফিরে তাকাব না ভেবেও বের হওয়ার আগে শিউলি
আর পারুলের দিকে একবার তাকালাম। দুজনের
চোখেই জল টলমল করছ। পারুলের চোখে
যেন
নীরব অনুরোধ- ভাইয়া! যাসনে।
.
শিউলির চোখেও যেন একই অনুনয়। কঠোর
গলায় বললাম,
‘ফিরে এসে যেন সবকটাকে এইখানেই
দেখতে
পাই!’
*
ডায়েরিটা বন্ধ করে দিলো আসাদ। আর পড়তে
ইচ্ছা করছে না। এরপর আর তার কোনদিন দেখা
হয়নি ওদের সাথে। চিত হয়ে ঘাসের উপরে শুয়ে
পড়লো। অদূরেই লাল সবুজ পতাকাটা পতপত
করে উড়ছে।
.
পরদিন আবার একই জায়গায় এলো আসাদ।
তখনো সূর্য উঠেনি। গার্ড নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে।
গেটটা তালা দেওয়া। গেট বেয়ে পাশের
দেয়ালের
উপর চড়ে বসল সে। এইটুকু পরিশ্রম করতেই
একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠল। অথচ ৭১এ
এইসব
তার কাছে ডাল ভাত ছিল। বয়স টা তো আর
নেহায়েত কম হয় নি! কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলো
দেয়ালের উপর বসে। এরপর অতি সন্তর্পণে
লাফ
দিলো। ধুপ করে নরম মাটি আর ঘাসের উপর
পড়লো সে।
বেকায়দায় পড়ায় বাম পায়ে বেশ চোট
লেগেছে।
হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সেই লাল
সিঁড়ির কাছে এলো সে। একধাপ-দুধাপ করে
একেবারে উপরের সিঁড়িতে উঠে এলো।
ওদের
বাড়ির লাল সিঁড়ির ধাপে শুয়ে সূর্য উঠা দেখার
কথা ছিল দুই ভাইবোনের।
শিউলি আর ওর।
হয়নি।
সময়ই হয়নি পাগলীটার।
আসাদ উপরের সিঁড়িটায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
.
পূর্ব দিকের আকাশ তখন রক্তিম হয়ে আছে।
একটু পরই গাছপালার মাথার উপর দিয়ে টকটকে
লাল সূর্য দেখা গেল। আচ্ছা, সূর্যটার রঙ এতো
লাল কেন? পারুলদের রক্তের আভায় মনে হয়
সূর্যটা এত লাল হয়েছে। নাকি, ৩০ লক্ষ শহীদের
রক্তের রঙেই এদেশের সূর্য এত লাল হয়?
.
সারা পৃথিবীর মানুষ কি জানে, এই মুহূর্তে পূর্ব
দিগন্তে একটুকরো বাংলাদেশের ছবি দেখা
যাচ্ছে?
.
তিন
ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে
স্মৃতিসৌধে।
আজ মহান বিজয় দিবস।
প্রধানমন্ত্রী সহ বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিরা
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
করতে আসবেন। কোথাও কোন খুঁত থাকা
চলবে
না। অবশ্য ঝামেলা একটা হয়েছিলো। কাল
রাতে সব দেখে টেখে ঘুমাতে ঘুমাতে দেরি
হয়ে
গেছিল গার্ডের। তাই ঘুম ভেঙ্গেছেও একটু
দেরিতে। খানিক বাদেই প্রধানমন্ত্রী আসবেন।
শেষ বারের মত একবার ঘুরে আসতে গিয়ে
গার্ডের
চোখ কপালে উঠল।
স্মৃতিসৌধের সিড়িতে একটা লোক শুয়ে
আকাশের দিকে চেয়ে আছে। লোকটাকে
ধমকা-
ধমকি করার পরও নড়লো না একটুও। গার্ড তাকে
টেনে উঠানোর চেষ্টা করল। হটাৎ করেই সে
বুঝতে পারল, লোকটার প্রাণহীন দেহ
স্মৃতিসৌধের সামনে পড়ে আছে।
.
উফফ! এইসব উটকো ঝামেলা যে
কোত্থেকে
আসে!
গজগজ করতে করতে লাশটাকে স্টোররুমে
নিয়ে
তেরপল দিয়ে ঢেকে রাখল। প্রধানমন্ত্রীর
পরিদর্শন শেষে আশেপাশে কোথাও মাটি চাপা
দিয়ে দিলেই চলবে।
.
কিছুক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীবর্গ
স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে,
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
করলেন। তার কিছুক্ষণ পর বিরোধীদলীয়
নেতৃবর্গও শহীদদের সম্মান প্রদর্শন করলেন।
তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করলেন।
.
আমরা এখন লোকদেখানো সম্মান প্রদর্শন
করতে পুস্পস্তবক নিয়ে স্মৃতিশৌধে যাই।
মরণোত্তর পদক দিয়ে তাঁদের সর্বোচ্চ
সম্মানে ভূষিত করি। সারাবিশ্বের মানুষ দেখে ,
আমরা দেশকে কত ভালোবাসি! অথচ যেসব
মুক্তিযোদ্ধারা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁদের
কোন খোঁজখবর নেই না। ক্ষুধা-দারিদ্র্যে
কেউ
কষ্ট পাচ্ছে কিনা, রোগ-জরায় ঠিকমতো
চিকিৎসা পাচ্ছে কিনা, "মুক্তিযোদ্ধা ভাতা"
তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা জানিনা।
জানতে চাইনা।
ওঁদের খোঁজ খবর নেবার মত সময় কই
আমাদের?
.
লেখা : মাদিহা মৌ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now