বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্কুলের নাম পথচারী (৭)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (০ পয়েন্ট)

X মির্জা মাস্টার তখন ফরাসত আলি আর ফারুখ বখতের দিকে তাকালেন, ইতস্তত করে বললেন, “কী মনে হয় আপনাদের? স্কুলঘরটা যখন শোওয়ানো হবে তখন কি একটা ঘর পাওয়া যাবে আমার ছাত্রছাত্রীর জন্যে” ফারুখ বখত বললেন, “আপনি এটা কী বলছেন?” মির্জা মাস্টার থতমত খেয়ে বললেন, “না মানে ভাবলাম এত বড় একটা স্কুল তার একটা ছোট ঘর যদি দিতেন। কিন্তু আপনাদের যদি অসুবিধে হয় তা হলে থাক–” ফারুখ বখত মেঘস্বরে বললেন, “না-না-না, আমি মোটেও সেটা বলছি না। আমি বলছি আপনি শুধু একটা ঘর কেন চাইছেন, এই পুরো স্কুল আমরা দিয়ে দেব আপনার ছাত্রছাত্রীদের “পু-পু-পুরো স্কুল?” “পুরো স্কুল। ফারুখ বখত ফরাসত আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, দিয়ে দেব না পুরো স্কুল?” ফরাসত আলি মাথা নাড়লেন, “অবশ্যই পুরো স্কুল দিয়ে দেব। স্কুলঘর শেষ হবার আগেই আমাদের ছাত্র খুঁজে বের করার কথা ছিল, এখন আমাদের আর ছাত্র খুঁজে বের করতে হবে না। না চাইতেই পেয়ে গেলাম।” ফরাসত আলি আনন্দে দাঁত বের করে হাসলেন, সাধারণত তিনি হাসলে দাড়িগোঁফের আড়ালে তার দাঁত ঢেকে থাকে, এবারে ঢেকে থাকল না, বেশ খানিকটা বের হয়ে গেল। মির্জা মাস্টারের ছোট ছোট চোখগুলি গোল হয়ে গেল, খানিকক্ষণ তিনি কথা বলতে পারলেন না, বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে কোনোমতে বললেন, “পু-পু পুরো স্কুলটা আমার ছাত্রছাত্রীর জন্যে দিয়ে দেবেন? আমার এইসব গরিব মিনতি মুটে ছাত্রদের? কাজের ছেলে, টোকাইদের?” ফরাসত আলি মাথা নাড়লেন। মির্জা মাস্টার খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “আসলে ঠাট্টা করছেন, তাই না? আসলে এটা বড়লোকের বাচ্চাদের জন্যে স্কুল। তারা যেন পাস করেই বিলাত আমেরিকা যেতে পারে। তাই না?” ফারুখ বখত মাথা নেড়ে বললেন, “না। আজ থেকে এটা আপনার ছাত্রদের স্কুল।” মির্জা মাস্টার হঠাৎ তার বিশাল শরীর নিয়ে থপথপ করে স্কুলের মাঠে ছুটে যেতে থাকলেন। মাঠের মাঝামাঝি গিয়ে তিনি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, “পথচারী স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা–” হঠাৎ উপস্থিত লোকজনের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলি বাচ্চা মির্জা মাস্টারকে ঘিরে দাঁড়াল, তাদের পায়ে জুতো নেই, শরীরে কাপড় নেই, ছোট কয়েকজনের নাক থেকে সর্দি ঝরছে। কয়েকটি বাচ্চা মেয়ে, তাদের কোলে আরও ছোট ন্যাদান্যাদা বাচ্চা। মির্জা মাস্টার তার ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে দেখছ স্কুলঘর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, এই স্কুল এখন থেকে তোমাদের। “আমাদের?” “হ্যাঁ।” “খোদার কসম?” মির্জা মাস্টার হুংকার দিয়ে বললেন, “কথায়-কথায় তোমাদের সাথে আমার কসম কাটতে হবে? বলেছি বিশ্বাস হয় না?” উপস্থিত বাচ্চাগুলি মাথা নাড়ল, না তাদের বিশ্বাস হয় না। মির্জা মাস্টার হাঁসফাঁস করতে করতে বললেন, “আমি তোমাদের শিক্ষক। শিক্ষক হচ্ছে বাবার মতো। বাবারা কি তার ছেলেমেয়েকে মিথ্যা কথা বলে?” উপস্থিত বেশির ভাগ ছেলেমেয়েরা মাথা নেড়ে বলল, “জে, বলে।” মির্জা মাস্টার হুংকার দিয়ে বললেন, “কিন্তু আমি বলি না। এটা তোমাদের স্কুল।” কালো ঢ্যাঙামতন একজন বলল, “আমরা যদি দালানটা ছুঁই তা হলে সাহেবেরা রাগ করবে না?” “না, রাগ করবে না।” “গিয়ে ছুঁয়ে দেখব?” ”যাও দ্যাখো।” বলমাত্র একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল, হঠাৎ করে পুরো শিশুর দল স্কুলঘরের দিকে ছুটে যায়। তারা স্কুলঘরের কাত হয়ে শুয়ে থাকা দালানটি ছুঁয়ে দেখে। একজন দুজন দরজা-জানালা বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে। কয়েকজন আড়াআড়িভাবে বসানো দরজায় ফাঁক দিয়ে নিচের একটা ক্লাসঘরে ঢুকে যায়। কাত হয়ে থাকা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বাচ্চাগুলি দেয়াল থেকে বের হয়ে থাকা বেঞ্চে ঝুলছে। ঘরের ভেতর থেকে হৈচৈ এবং আনন্দধ্বনি শোনা যেতে থাকে। ফরাসত আলি অবাক হয়ে বললেন, “ঢুকল কেমন করে ভিতরে?” ফারুখ বখত হাসিমুখে বললেন, “ছোট বাচ্চাদের ব্যাপার! তাদের অসাধ্য কিছু নাই।” সত্যি সত্যি তাদের অসাধ্য কিছু নেই। দেখা গেল বাচ্চাগুলি দেয়াল খিমচে ধরে উপরে উঠে যাচ্ছে। পিছনে একটা বাচ্চাকে ঝুলিয়ে একটা ছোট মেয়ে বিপজ্জনকভাবে একটা জানালা দিয়ে ঢুকে গেল। কয়েকজনকে দেখা গেল একটা দরজা দিয়ে ঝুলতে ঝুলতে ভিতরে কোথায় জানি লাফিয়ে পড়ছে। ছোট ছোট কয়েকটি শিশুকে ছুটতে দেখা গেল, মনে হল একজন তাদেরকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ করে কালোমতন একটা বাচ্চা একটা জানালা দিয়ে লাফিয়ে বের হল, উপর থেকে নিচে পড়তে পড়তে সে নিজেকে সামলে নিল, দেয়াল বেয়ে পিছলে সে নিচে নেমে আসতে থাকে। দেখে মনে হয় ছেলেটির ভয়ংকর ফূর্তি হচ্ছে। হারুন ইঞ্জিনিয়ার তার চশমা মুছতে মুছতে পাংশুমুখে বললেন, “ছেলেগুলি পড়ে ব্যথা পাবে না তো?” ফারুখ বখত ভুরু কুচকে বললেন, “শুধু ছেলে বলছ কেন? কমপক্ষে একডজন মেয়েও আছে ওখানে। ওই দ্যাখো, ঘাড়ে একটা বাচ্চা নিয়ে কীভাবে লাফ দিল! ইশ! ফারুখ বখত আতঙ্কে তার চোখ বন্ধ করে ফেললেন।” ফরাসত আলি বললেন, “আমাদের কথা তো শুনবে বলে মনে হয় না।” হারুন ইঞ্জিনিয়ার মাথা নাড়লেন, “না। শুনবে না।” ফাসত আলি তাঁর দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “মির্জা মাস্টারের কথা শুনবে, হাজার হলেও তাদের শিক্ষক। তাঁকে বলতে হবে।” ফরাসত আলি হন্তদন্ত হয়ে মাঠের মাঝে হেঁটে যেতে লাগলেন, তাঁর পিছুপিছু ফারুখ বখত, ফারুখ বখতের পিছুপিছু হারুন ইঞ্জিনিয়ার। এই তিনজনকে হেঁটে আসতে দেখে মির্জা মাস্টার তাঁদের দিকে তাকালেন, তাঁর গোলগাল মুখে নাক চোখ মুখ এত ছোট ছোট দেখায় যে সেখানে কোনো ধরনের অনুভূতিরই ছাপ পড়ে না। তার স্কুলের ছাত্রছাত্রীর কাজকর্ম দেখে তিনি কতটুকু ভয় পেয়েছেন বোঝা গেল না। ফরাসত আলি বললেন, “মির্জা মাস্টার! আপনার কি মনে হয় না যে ছেলেমেয়েগুলি যেভাবে লাফঝাঁপ দিচ্ছে–” “ঠিকই বলেছেন।” মির্জা মাস্টার মাথা নেড়ে বললেন, “ছেলেমেয়েগুলি যেভাবে লাফ দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে তাদের স্কুলটা অসম্ভব পছন্দ হয়েছে।” “আমি সেটা বলছি না।” ফরাসত আলি মাথা নেড়ে বললেন, “আমি যেটা বলতে যাচ্ছি–” “বুঝেছি আপনি কী বলতে চাচ্ছেন।” মির্জা মাস্টার একগাল হেসে বললেন, “আমিও ঠিক এই কথাটাই বলতে চাচ্ছি। স্কুলঘরটা এইভাবে কাত হয়েই থাকুক। এটাকে সোজা করে কাজ নেই।” হারুন ইঞ্জিনিয়ার চোখ কপালে তুলে বললেন, “কী বললেন? স্কুলটাকে সোজা করে কাজ নেই?” “না! এই ছেলেপিলেরা কিছুতই স্কুলঘরে ঢুকতে চায় না। আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা স্কুলঘরের মাঝে ঢোকানো, কিন্তু কাত হয়ে থাকা এই স্কুলঘর দেখে এরা এত মজা পেয়েছে আমার মনে হয় স্কুলটা এভাবে রেখে দিলেই হয়। সবাই তা হলে প্রত্যেকদিন স্কুলে আসবে।” ফরাসত আলি খানিকক্ষণ অবাক হয়ে মির্জা মাস্টারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর কয়েকবার চেষ্টা করে বললেন, “স্কুলটা ঠিক করা হবে না? এইভাবে কাত হয়ে থাকবে? দরজা-জানালা আড়াআড়ি? মেঝে আকাশে উঠে যাচ্ছে?” মির্জা মাস্টার আবার একগাল হেসে বললেন, “হ্যাঁ।” হারুন ইঞ্জিনিয়ার তার চশমা খুলে জোরে জোরে কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে বললেন, “আপনি আসলে আমাদের সাথে মশকরা করছেন, তাই না?” মির্জা মাস্টার তার ছোট ছোট চোখ দুটিকে যতদূর সম্ভব উপরে তুলে বললেন, “আমি কখনো মশকরা করি না। সত্যি সত্যি বলছি।” ফারুখ বখত খানিকক্ষণ কাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুলটাকে দেখলেন, বাচ্চাদের হৈচৈ আনন্দোচ্ছ্বাস শুনলেন, তারপর মির্জা মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যদি পড়ে ব্যথা পায়?” “পাবে না।” মির্জা মাস্টার মাথা নেড়ে বললেন, “ব্যথা পাবে না। এরা চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামে, স্টিমার থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তরতর করে সুপারি গাছ বেয়ে উঠে যায়–এরা কখনো পড়ে ব্যথা পাবে না। এরা বড়লোকের ন্যাদান্যাদা বাচ্চা না, এদের নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না।” ফারুখ বখত বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে কয়েকদিন স্কুলঘরটাকে এভাবেই রাখা যাক। এটাকে সোজা করার এত তাড়াহুড়ো কী?” মির্জা মাস্টার জোরে জোরে মাথা নেড়ে বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। ফরাসত আলি স্কুলঘরটার দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে তা হলে থাকুক এইভাবে।” হারুন ইঞ্জিনিয়ার হঠাৎ করে খুব রেগে উঠলেন, গলা উঁচিয়ে বললেন, “তোমাদের সবার মাথা-খারাপ হয়েছে, তা-ই না?” ফারুখ বখত বললেন, “কেন? মাথা-খারাপ হবে কেন? মির্জা মাস্টার এত করে চাইছেন, তাই কয়েকদিন স্কুলটাকে এভাবে রাখা হচ্ছে, তার বেশি কিছু না।” “আর আমার মান-সম্মান? লোকজন বলাবলি করবে হারুন ইঞ্জিনিয়ার ঘরবাড়ি তৈরি করে উলটো। এরপর আমার কাছে কেউ কোনোদিন আসবে?” “আসবে না কেন? একসোবার আসবে।” ফারুখ বখত সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “এটা তো পাকাঁপাকিভাবে রাখা হচ্ছে না। কয়েকদিনের জন্যে রাখা হচ্ছে।” হারুন ইঞ্জিনিয়ার নাক দিয়ে ফোৎ করে একটা শব্দ করে খুব রেগেমেগে চুপ করে রইলেন। . পরদিন ভোরে স্কুলের আশেপাশে অনেক ভিড়। এলাকার যত বাচ্চা ছেলেপিলে আছে তারা সবাই চলে এসেছে। কীভাবে জানি খবর চলে গেছে যে এই স্কুলঘরে পড়াশোনা শুরু হয়েছে। ভিড়ের বেশির ভাগ অবিশ্যি মজা দেখার জন্যে এসেছে, সবাই স্কুলটাকে ঘিরে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পান-সিগারেটের দোকান বেশ কয়েকটা খুলে গেছে, ঝালমুড়ি এবং চানাচুর নিয়ে কিছু ছেলেপিলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠলে তারাও নাকি ক্লাসঘরে ঢুকে পড়বে। কৌতূহলী দর্শক ছাড়াও রয়েছে খবরের কাগজের সাংবাদিক। ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলে তারা, নোটবইয়ে কীসব লেখালেখি করছে। টেলিভিশন থেকেও লোক এসেছে, মস্ত বড় ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে তারা এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। সকাল আটটা বাজতেই বিশাল একটা ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়া হল এবং হঠাৎ করে দেখা গেল পিলপিল করে নানা আকারের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে স্কুলঘরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তারা দেয়াল খিমচে খিমচে সুপারি গাছের মতো স্কুলঘর বেয়ে উঠতে থাকে এবং আড়াআড়ি দরজা-জানালার মাঝে দিয়ে ভিতরে ঢুকতে শুরু করে। বাচ্চাদের হৈচৈ এবং আনন্দ-চিৎকারে জায়গাটা কিছুক্ষণের জন্য সরগরম হয়ে যায়। স্কুলঘরের দরজা-জানালা ছাদ এবং মেঝের মাঝে দিয়ে দুরন্ত ছেলেরা লাফঝাঁপ দিতে থাকে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল জনতা সার্কাস দেখার মতো সেটা উপভোগ করতে থাকে। লোকজনের হৈচৈ দেখে জায়গাটাকে ঠিক স্কুলের মতো মনে না হয়ে একটা বাজারের মতো মনে হচ্ছিল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ স্কুলের নাম পথচারী (৭)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now