বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এই গল্পটি উৎসর্গ করলাম আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল বীর এবং বীরাঙ্গণা মা-বোনদেরকে…………………………..]
.
.
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে । নিজের আকাঙ্খা অনুযায়ী রেজাল্ট পেয়েই খুশিতে তাড়াতাড়ি বেতন দেবার কাউন্টারে গেল রায়হান । নতুন ক্লাসে উঠার টাকাটা দিয়েই সোজা বাসায় যেতে হবে । মামাকে দেখাতে হবে রেজাল্টটা ......
.
.
“এই বেটা সর”
হঠাৎই হেঁচকা টানে প্রায় মাটিতে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিল রায়হান । কোনরকমে দাঁড়িয়ে বলল,
-“এটা কেমন কাজ হল নাফিস?”
নাফিস জবাব দিল , “উচিত কাজ হল”
-“কেন?”
-“কারণ পিতৃ পরিচয় বিহীন ছেলেদের সামনে না পিছনে দাঁড়ানোই উচিত”
বলেই হাহাহাহা করে হেসে উঠল নাফিস আর আশপাশের বন্ধুরা । রায়হান আর কিছুই বলতে পারল না । চুপ করে ওদের উপহাসের পাত্র হয়েই দাঁড়িয়ে রইল…………………….
.
.
বাসায় এসে ব্যাগ রেখে মন খারাপ করে বসে রইল রায়হান ।
রায়হানের মামা,মাসুদ সাহেব এসে দেখলেন রায়হান মুখ গোমরা করে বসে আছে । জন্ম থেকেই মা-বাবা বিহীন এই ছেলেটা তার কাছেই মানুষ । মা হোক আর বাবা , দুটোই ইনিই । ওর জন্য উনি নিজে বিয়েও করেন নি । সুতরাং নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসার মানুষটাকে মন খারাপ করতে দেখে স্বভাবিকভাবেই তারও মন খারাপ হয়ে গেল ।
-“কিরে রায়হান , এভাবে বসে আছিস কেন ?”
হাত থেকে রিপোর্ট কার্ডটা নিয়ে দেখলেন, বরাবরের মত এবারও রায়হান প্রথম হয়েছে ।
-“কিরে ফার্স্ট হয়েও মন খারাপ কেন ?”
-“এই ফার্স্টের কি দাম যার পিতৃ পরিচয় নেই?”
মাসুদ সাহেব বুঝতে পারলেন………………এই ঘটনাটা নতুন নয় । অনেকবারই রায়হানকে ওর বন্ধুরা ওর এই দুর্বলতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেছে …………….
.
.
-“একটা গল্প শুনবি রায়হান?”
-“না”
-“আরে শোন না , ভাল লাগবে”
-“মায়ের গল্প ?”
-“হুম”
-“সে তো অনেক শুনেছি”
-“কিন্তু আমার কাছে তো শুনিস নি । শুনবি না ?”
-“আচ্ছা বল”
... মাসুদ সাহেব বলতে শুরু করলেন...
...
...
মুক্তিযুদ্ধের এগারটা সেক্টরের মধ্যে অন্যতম একটা সেক্টর হল ৪ নং সেক্টর । সেই সেক্টরের আন্ডারে একটা গ্রাম ,নকশীডাঙ্গা । সেই গ্রামে থাকত দুটো ভাই-বোন । ইতিমধ্যেই ওদের মা-বাবাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মেরে ফেলেছে । তাই অনেক ভয়ে ভয়ে আর লুকিয়ে লুকিয়ে থাকত ওরা । কিন্তু একদিন পনের বছরের বোনটা হঠাৎ ভাইকে বলল,
-“ভাইয়া আমরা যুদ্ধ করি না কেন ?”
-“আমি যদি যুদ্ধে যাই তাহলে তোকে কে দেখবে?”
-“কেন? আমিও তোমার সাথে যুদ্ধ করব”
-“পাগলি একটা”
-“কেন?”
-“যুদ্ধ মেয়েদের কাজ না রে পাগলি”
-“তাহলে অন্তত তোমাকে সাহায্য তো করতে পারব”
-“তা পারবি”
... বলেই ভাইটা ভাবতে থাকল ,আসলেই তার ছোট বোনটা খারাপ বলেনি । রান্না-বান্নার কাজ ভালই পারে ও । যদি সাথে থাকে তাহলে তার সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদেরও লাভ হবে ।
.
.
চার মাস পর...
.
.
ট্রেনিং শেষ করেও অনেকগুলো মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে ওদের দলটা । দুই ভাই বোনের উপর দলের সবাই খুবই খুশি ,বিশেষ করে কমান্ডার ...
...
একদিন এক মিশন শেষ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল ওদের পুরো দল । হঠাৎ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ওদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বসল । হঠাৎ আক্রমণে সবাই দিসেহারা হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল । শত্রুর গুলিতে আহত হয়ে পড়ল চার-পাঁচ জন । তারপরেও তারা পাল্টা আক্রমণ করতে চাইল । কিন্তু তাদের গোলা-বারুদও ফুরিয়ে গিয়েছিল । আকষ্মিক আক্রমণে সবাই একজন আরেকজন থেকে দূরে সরে পরেছিল । উপায় না দেখে কমান্ডার সবাইকে পিছু হটার অর্ডার দিলেন । তখন সবাই পালাতে লাগল ।
সেই ভাইটা ক্যাম্পের পাশেই গুলি চালাচ্ছিল । কমান্ডারের অর্ডার পেয়েই সে তার বোনকে খুঁজল , কিন্তু কোথাও পেল না । অনেক খোঁজার পর দেখল তার থেকে কিছুটা সামনে ,তার সেই ছোট্ট বোনটা একটা অভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধার মতই গুলি চালাচ্ছে । খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে তার বোনকে ডাকার চেষ্টা করল । কিন্তু ওদের মধ্যে দূরত্ব এতই বেশি ছিল যে বোনটি ভাইয়ের ডাক কিংবা কমান্ডারের অর্ডার কোনটাই শুনতে পায়নি । তাই কোনদিক না তাকিয়ে নির্ভীকভাবেই নিজের জীবন তুচ্ছ করে দেশের জন্য লড়াই করে যাচ্ছিল সেই পনের বছরের মেয়েটা…………
.
.
হঠাৎ কোথা থেকে একটা গ্রেনেড এসে পড়ল ওদের মাঝখানে । তারপর গ্রেনেডটার বিষ্ফোরনের ধাক্কায় ভাইটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল …….
প্রায় চার-পাঁচ ঘন্টা পর ভাইটার জ্ঞান ফিরল ।
উঠেই বোনের খোঁজ করল সে । কিন্তু যা শুনল তাতে তার এতটাই রাগ-দুঃখ আর অভিমান হল যে , ইচ্ছে করছিল তখনই নিজেকে নিজে শেষ করে দিক । কারণ সহযোদ্ধাদের কাছে জানতে পারল , তার বোনকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে …….
.
হঠাৎ উঠে দাড়াল সে । তারপর গুলিটা কাঁধে নিয়েই বের হয়ে পড়ল বোনের খোঁজে । কমান্ডার বুঝতে পারলেন , তাই তিনি বাধা দিলেন না । বরং কয়েকজন মোটামুটি সুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তিনিও ভাইটার পিছন পিছন এগুতে থাকলেন............
...
...
প্রায় তিনঘন্টার মত যুদ্ধ চলল...
এবং মুক্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটল ।
কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে ।
রক্তাক্ত এবং প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় পাওয়া গেল মেয়েটাকে ...............
...
...
গল্প শেষ করে মাসুদ সাহেব রায়হানের দিকে তাকালেন ।
-“জানিস । ওই ভাই আর ওই বোনটা কে কে ?”
-“না”
তারপর মাসুদ সাহেব রায়হানের পাশে এসে বসলেন । ওর হাতটা ধরে বললেন , “ওই ভাইটা হলাম আমি আর বোনটা হল তোর মা । নিজের দেশের জন্য নিজের সর্বস্য দিতেও দ্বিধা করেনি সে । এমন একজন মায়ের সন্তান তুই । এবার তুই ই বল এই মাকে নিয়ে তোর গর্ব করা উচিত না দুঃখ .........”
... রায়হান কিছুই বলল না । শুধু মামার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল আর দেয়ালে টাঙানো মায়ের ছবিটার দিকে অনেক শ্রদ্ধা, অনেক ভালবাসা আর অনেক অহংকার নিয়ে তাকিয়ে রইল ...............
.
.
লিখেছেনঃ অচেনা অমিত
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now